এলভারদ্যুগো [ জল্লাদ ] – অনর দ্য বালজাক এর ছোটগল্প

ছোট্ট শহর মেন্ডা। এই মাত্র গীর্জার ঘড়িতে মাঝ রাতের ঘণ্টা পড়ল। দীর্ঘ পাহাড়ী ঢালের কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে নগর দুর্গের বাগানগুলোকে ঘিরে থাকা সীমানা প্রাচীর। তার পাশেই দাঁড়ানো তরুণ এক ফরাসী সামরিক অফিসার। একজন সৈনিকের স্বভাবসুলভ ভাবলেশহীনতার চাইতে সে যেন একটু বেশীই চিন্তামগ্ন। স্বীকার করতেই হয়, ভাবনায় ডুবে যাওয়ার মত এমন সময়, স্থান এবং রাত আর হয় না। স্পেনের চমৎকার আকাশ তার মাথার উপর নীল রঙের একটি আবরণ বিছিয়ে দিয়েছে। তারার আলো আর স্নিগ্ধ জ্যোৎস্না পুরো উপত্যকাটিকে করে তুলেছে মোহময়। এর থেকেই ছড়িয়ে পড়া একটি মায়াবী রেখা এসে ছুঁয়েছে তার পা। ফলভারে নুয়ে-পড়া একটি কমলালেবুর গাছে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে-থাকা ব্যাটেলিয়ান কমান্ডার প্রায় একশ ফুট নীচে মেন্ডা শহরটির দিকে তাকিয়ে আছে।

যে পাহাড়ের উপর দুর্গটি অবস্থিত তার ঠিক পাদদেশেই মেন্ডা। যেন পাহাড়ের গায়ে নিজেকে আড়াল করে উত্তুরে হাওয়ার হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছিল। মাথা ঘুরিয়েই সৈনিকটি সাগর দেখতে পায়। সাগরের ফেনিল জলরাশি প্রকৃতিকে পরিয়ে দিয়েছে রূপালী রঙের রাখী। দুর্গে আলো জ্বলছে। শোনা যাচ্ছে সাগরের কলতানের সঙ্গে মিশে-যাওয়া নাচের আনন্দধ্বনি, অর্কেস্ট্রার সুর আর অফিসার ও তাদের সঙ্গীসাথীদের হাস্যরোল। রাতের এই হিমশীতল পরিবেশ তার সারাদিনের ক্লান্ত দেহে কিছুটা স্বস্তি এনে দেয়। গাছগাছালি আর মিষ্টি মধুর গন্ধ-ছড়ানো ফুলে ফুলে বাগানগুলো পরিপূর্ণ। যুবকটির মনে হচ্ছিল সে যেন আতর জলে অবগাহন করছে।

দুর্গটি স্পেনের এক সম্ভ্রান্ত অমাত্যের। সে সময় তিনি তার পুরো পরিবার নিয়েই ওখানে বসবাস করছিলেন। পরিবারের বড় মেয়েটি সারা বিকেল আগ্রহভরা বিষণ্ন দৃষ্টিতে অফিসারটির দিকে তাকিয়ে ছিল। স্পেনীয় মেয়েটির মায়াভরা সেই চাহনিই হয়তো বা যুবকের এই ভাবালুতার কারণ হয়ে থাকবে। সুন্দরী ক্লারার আরো একটি বোন ও তিনটি ভাই রয়েছে। তবে মার্কুইজ দ্য লাগেন্স অঢেল বিষয়-সম্পত্তির অধিকারী। আর সম্পদের এই বিপুলতাই ভিক্টর মার্চেন্টকে অনুমান করতে সাহায্য করেছিল যে, যুবতী এই নারী বিয়ের সময় প্রচুর পরিমাণ যৌতুক সঙ্গে করে নিয়ে আসবে। কিন্তু কোন ভরসায় সে বিশ্বাস করবে যে, স্পেনীয় সম্ভ্রান্তদের মধ্যে কৌলিন্যের প্রতি অতিমাত্রায় মোহাচ্ছন্ন এই প্রবীণটি প্যারিসের এক মুদী দোকানীর ছেলের হাতে নিজ কন্যাকে তুলে দেবেন? তাছাড়া এমনিতেই আবার ফরাসীরা ঘৃণিত। ভিক্টর মার্চেন্টের অধীনস্থ ব্যাটেলিয়ানটিকে মেন্ডা শহরে সন্নিবেশিত করার কারণ ছিল মার্কুইজ দ্য লাগেন্সের প্রভাবাধীন আশপাশের গ্রামগুলোর উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। কারণ প্রদেশটির প্রশাসনিক দায়িত্বে নিয়োজিত জি.টি.আর-এর সন্দেহ হয়েছিল যে, মার্কুইজ দ্য লাগেন্স সপ্তম ফার্দিনান্দ-এর পক্ষে একটি অভ্যুত্থান সংগঠিত করছিলেন। অতিসম্প্রতি মার্শাল নে-এর কাছ থেকে পাওয়া একটি বার্তায় এই আশংকারও ভিত্তি তৈরি হয়েছিল যে, ইংরেজ বাহিনী খুব শীঘ্রই সমুদ্র তীরে অবতরণ করবে। বার্তায় মার্কুইজের নাম উল্লেখ করে বলা হয়, লন্ডনে মন্ত্রী পরিষদের সঙ্গে তার একটি গোপন যোগাযোগ রয়েছে।

সুতরাং স্পেনীয়রা ভিক্টর মার্চেন্ট ও তার সৈন্যদের সাদরে গ্রহণ করলেও তরুণ অফিসারটি তার তীক্ষ্ণ নজরদারি অব্যাহত রেখেছিল। নিজ দায়িত্বাধীন শহর এবং আশপাশ এলাকার অবস্থাটা একটু আঁচ করার জন্য চত্বরের উপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সে তার প্রতি মার্কুইজ পরিবারের এই অকৃপণ বদান্যতা প্রদর্শনের কী অর্থ থাকতে পারে তাই নিয়ে ভাবছিল। আর ভাবছিল কী করে পুরো এলাকায় পুনরায় স্বাভাবিক শান্তি ফিরিয়ে এনে তার জেনারেলকে দুশ্চিন্তামুক্ত করা যায়। কিন্তু সহজাত একটা বিচক্ষণতাবোধ আর স্বাভাবিক কৌতূহল মিনিট দুয়েকের মধ্যেই তার মন থেকে এসব চিন্তা উধাও করে দেয়। এইমাত্র সে লক্ষ্য করল শহরের মধ্যে বেশ কিছু বাতি জ্বলছে। সময়টা সেন্ট জ্যাক্‌স উৎসবের। তবুও আজ সকালেই সে নির্দিষ্ট সময়ের পর থেকে শহরের সব আলো নিভিয়ে রাখার নির্দেশ জারি করেছিল। একমাত্র দুর্গটিই ছিল এই নির্দেশের আওতার বাইরে। আশেপাশে প্রহরারত তার সৈন্যদের বেয়োনেটগুলোর ঝলকানি দেখতে পাচ্ছিল সে। কিন্তু সর্বত্রই বিরাজ করছিল একটা ভাবগম্ভীর নীরবতা। কোন কিছুই প্রমাণ করছিল না যে, স্পেনীয়রা একটা উৎসবের আনন্দে মত্ত।

নগরবাসীদের এই নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গের কারণটি ভাবতে গিয়ে তার মনে হলো সান্ধ্য আইনটি না মানার পেছনে কী যেন একটা রহস্য লুকিয়ে আছে। নৈশ প্রহরায় নিয়োজিত অফিসারদের ছেড়ে আসা অবধি রহস্যটি তার কাছে অনুদ্‌ঘাটিতই রয়ে যায়। তারুণ্যের বেগে ছুটছিল সে। দ্রুত পৌঁছানোর উদ্দেশ্যে চালু রাস্তাটি বাদ দিয়ে ভাঙা দেয়ালের একটা ফোঁকড় গলিয়ে পাথুরে ঢাল বেয়ে দুর্গের দিকে যেতে চাচ্ছিল। লক্ষ্য ছিল নগরীর দুর্গের দিককার প্রবেশ দ্বারে স্থাপিত ছোট একটি প্রহরাস্থল। ঠিক এমনি সময় ভেসে-আসা একটি ক্ষীণ কণ্ঠস্বর তাকে থামিয়ে দেয়। মনে হলো বালুকাময় পথটির উপর যেন একজন মহিলার মৃদু পদধ্বনি। সে ঘুরে দাঁড়ায়। কিন্তু কিছুই দেখতে পায় না। সাগরের অপূর্ব শোভা বিমোহিত করে তুলেছিল তাকে। কিন্তু হঠাৎ করেই এমন একটি ভয়ঙ্কর দৃশ্য চোখে পড়ল যে, বিস্ময়ে তাকে থমকে দাঁড়াতে হল। মনে হচ্ছিল নিজের চোখ বুঝি তাকে ফাঁকি দিচ্ছে। ক্রমশঃ দীপ্তিমান চাঁদের আলোয় বেশ কিছুটা দূরে সে একটা নৌবহরের ছায়া দেখতে পায়। পুনরায় চলতে শুরু করল সে। নিজেকে এই বলে প্রবোধ দেয়ার চেষ্টা করে, ব্যাপারটি আসলে সাগরের ঢেউ আর চাঁদের আলোর অপূর্ব মিলন থেকে সৃষ্ট দৃষ্টিশক্তিরই একটি বিভ্রম মাত্র। ঠিক এই সময়েই একটি ভগ্ন কণ্ঠস্বর অফিসারটির নাম ধরে ডেকে উঠল। দেয়ালের ভাঙ্গনটার দিকে তাকিয়ে সে দেখতে পায় ধীরে ধীরে একজন সৈনিকের মাথা উপরের দিকে উঠে আসছে। সৈনিকটিকে সে আগে থেকেই দুর্গে যাওয়ার সময় তার সঙ্গী হওয়ার নির্দেশ দিয়ে রেখেছিল।

‘কে, মেজর নাকি?’
‘হ্যাঁ, কিন্তু এটা কী?’ একটু নীচুস্বরেই জানতে চায় যুবকটি। কিছু একটা ঘটার পূর্বাভাস তাকে সাবধানী করে তোলে।
‘সেই বদমাশগুলো ওখানে কীটের মত কিলবিল করছে, আমি যা দেখেছি তা বলার জন্যই তাড়াতাড়ি আপনার কাছে ছুটে এলাম।’
ভিক্টর মার্চেন্ট বলল, ‘বলো।’
‘দুর্গ থেকে লণ্ঠন হাতে বেরিয়ে-আসা একটি লোককে একটু আগেই আমি অনুসরণ করছিলাম। এদিকেই আসছিল সে। লণ্ঠনটি কিন্তু ভয়ঙ্করতার ইংগিতবাহী। আমি বিশ্বাস করি না ঐ যীশু পুত্রটির এ সময় লণ্ঠন জ্বালানোর প্রয়োজন থাকতে পারে। আমার মনে হলো তারা আমাদেরকে শেষ করে দিতে চায়। তারপরই খুব কাছ থেকে আমি তাকে অনুসরণ করতে শুরু করি। আর জানেন মেজর, মাত্র কয়েক পা দূরেই পাথরের চাঁইয়ের উপর সন্দেহজনক এক-বোঝা কাঠ পড়ে থাকতে দেখে এলাম।’

হঠাৎ করেই শহর থেকে ভেসে আসা ভয়ঙ্কর এক চিৎকারের শব্দ সৈনিকটির কথা বলা থামিয়ে দেয়। তীব্র বিদ্যুতের ঝিলিক চমকে দিল মেজরকে। হতভাগ্য পদাতিকটির মাথায় এসে বিদ্ধ হলো একটি বুলেট, সে পড়ে গেল। যুবক যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল তা থেকে মাত্র দশ-বার হাত দূরেই জ্বলন্ত খড়-কুটো আর শুকনো কাঠের স্তূপ থেকে আগুনের লেলিহান শিখা ঊর্ধ্বমুখী হলো। নাচঘরের বাদ্যযন্ত্রের শব্দ এবং হাস্যরোলও আর শোনা যাচ্ছিল না।

মুহূর্তের মধ্যেই কোলাহল আর সঙ্গীতধ্বনির পরিবর্তে উৎসব স্থলটিতে নেমে এল মৃত্যুপুরীর নিস্তব্ধতা এবং থেকে থেকে ভেসে আসতে লাগল গোঙানীর শব্দ। সাগরের ফেনিল জলরাশির ঊর্ধ্বাকাশে শোনা যাচ্ছিল কামানের গর্জন। তরুণ অফিসারটির কপালে দেখা দিল কয়েক ফোঁটা হিমশীতল জলবিন্দু। তবে হাতে কোন অস্ত্র ছিল না। বুঝতে পারল নিজের সেনাদলটি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে এবং ইংরেজবাহিনী সাগর তীরে অবতরণ করল বলে। এ অবস্থায় বেঁচে থাকাটা নিজের কাছেই অসম্মানজনক মনে হলো তার। কল্পনায় দেখতে পেল তাকে দাঁড়াতে হচ্ছে একটি সামরিক আদালতের সামনে। মুহূর্তের মধ্যে উপত্যকাটির গভীরতা অনুমান করে নিয়ে দ্রুত ঢাল বেয়ে নেমে যেতে চাচ্ছিল সে। ঠিক তখনই ক্লারার একটি হাত তাঁর হাতটি চেপে ধরে।

‘পালান’, বলল সে, ‘আপনাকে হত্যা করতে আমার ভাইয়েরা পিছু নিয়েছে। ঢালের নীচে গিয়ে দেখবেন জুয়ানিতুর আন্দালুশীয় ঘোড়াটি দাঁড়িয়ে আছে, যান!’

ক্লারা তাকে একটা ধাক্কা দেয়। হতবাক যুবকটি একপলক তাকাল তার দিকে। তবে ওই মুহূর্তে আত্মরক্ষার সহজাত প্রবৃত্তিটিই বেশী মাত্রায় তাড়া দিচ্ছিল তাকে। বলশালী পুরুষের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। মেয়েটির দেখিয়ে দেয়া পথ ধরে ক্ষিপ্র গতিতে সে দুর্গের সীমানাটি অতিক্রম করল। এক সময় দৌড়ে পার হয়ে গেল পাথুরে পথটিও যেটি তখন কেবলমাত্র ছাগল-ভেড়া চলাচলের জন্যই ব্যবহৃত হতো। যুবকটি শুনতে পেল চিৎকার করে ক্লারা ভাইদেরকে তার পিছু ধাওয়া করতে বলছে। ঘাতকদের পায়ের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিল সে। কানের পাশ দিয়ে শোঁ শোঁ শব্দে ছুটে যাচ্ছিল বুলেট, কিন্তু ততক্ষণে সে উপত্যকায় পৌঁছে গেছে। ঘোড়াটিকে দেখতে পেয়েই এক লাফে চড়ে বসল তাতে এবং মুহূর্তের মধ্যে বিদ্যুৎ গতিতে অদৃশ্য হয়ে গেল।

কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সে জেনারেল জি. টি. আর-এর সদরদপ্তরে এসে পৌঁছল এবং দেখতে পেল জেনারেল তার সহকর্মীদের নিয়ে নৈশভোজে বসেছেন।

‘আমি আমার মাথাটি আপনার কাছে নিয়ে এসেছি,’ বিমর্ষ এবং বিধ্বস্ত ব্যাটেলিয়ান কমান্ডারটি কেঁদে ফেলল। এরপর বসে পড়ে ভয়াবহ ঘটনাটিকে বর্ণনা করতে থাকে। ভীতিকর এক নিস্তব্ধতা নিয়ে সবাই তার কাহিনী শোনে।

‘আমি মনে করি তুমি একজন অপরাধীর চাইতেও দুর্ভাগা’, সব শুনে রুদ্রমূর্তির জেনারেল বলে উঠলেন, ‘স্পেনীয়দের দুষ্কর্মের জন্য তুমি অবশ্য দায়ী নও। আর মার্শাল যদি ব্যাপারটাকে অন্যভাবে না নেন তো আমি তোমাকে এই অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দিলাম।’

কথাগুলো বিমর্ষ অফিসারটিকে সামান্য সান্ত্বনাই দিল।
‘কিন্তু সম্রাট যখন ব্যাপারটি জানতে পারবেন!’ বিস্ময়ের সঙ্গে বলল সে।

‘তিনি হয়ত তোমাকে গুলি করে হত্যা করার নির্দেশই দেবেন’, জেনারেল বললেন, ‘কিন্তু আমরা সেটা দেখব। যাক এ ব্যাপারে এখন আর নয়’, রুদ্ধস্বরে আবার তিনি বলেন, ‘এখন শুধু প্রতিশোধের পালা, এমন প্রতিশোধ নিতে হবে যাতে করে যেখানে তারা সমগ্র এলাকায় যুদ্ধের নামে এই কাপুরুষোচিত হামলা চালিয়েছে, সেখানে তাদের জন্য একটা ত্রাসের রাজত্ব কায়েম হয়।’

ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই পুরো একটি বাহিনী; একদল অশ্বারোহী ও গোলন্দাজ যাত্রা শুরু করে। অভিযানের পুরোভাগে স্বয়ং জেনারেল এবং ভিক্টর মার্চেন্ট। সৈন্যদেরকে তাদের সহযোদ্ধাদের ধ্বংসের কথা জানানোর পর থেকে প্রচণ্ড ক্রোধে ফেটে পড়ছিল তারা। মেন্ডা শহর ও তাদের সদর দপ্তরের মাঝখানের পথটি নিমেষেই অতিক্রান্ত হলো। পথিমধ্যে জেনারেল দেখতে পেলেন সবগুলি গ্রামই তাদের দখলে। ধ্বংসপ্রায় বিক্ষিপ্ত নগরপল্লীর সবগুলিই অবরুদ্ধ অবস্থায়, আর জনসংখ্যার প্রায় সবটাই গেছে নিশ্চিহ্ন হয়ে।

কোন এক অজ্ঞাত কারণে ইংরেজদের যুদ্ধজাহাজগুলো থেমে যায়, একটুও অগ্রসর হলো না। পরে অবশ্য জানা গিয়েছিল এই জাহাজগুলো শুধুমাত্র গোলাবারুদ বহন করছিল। ওগুলো কেবল অন্যান্য রসদ বোঝাই জাহাজের একটু আগে আগে চলছিল। সুতরাং ইংরেজদের পতাকাবাহী জাহাজগুলো দেখে যে আশার সঞ্চার হয়েছিল সেই প্রত্যাশিত সাহায্য আর এলো না। ফলে এভাবেই মেন্ডা শহরটি ফরাসী বাহিনী-কর্তৃক অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। একটি গুলিও খরচ করতে হলো না তাদের। ভীত-সন্ত্রস্ত নগরবাসী নিঃশর্তে আত্মসমর্পণ করার ইচ্ছা প্রকাশ করল।

উপদ্বীপ অঞ্চলের লোকদের মধ্যে এমনিতেই একটা আত্মবলিদানের প্রবণতা কাজ করে। জেনারেলের নিষ্ঠুরতার কথা তাদের কাছে অজানা ছিল না। পুরো মেন্ডা শহরই আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়া হতে পারে, হত্যা করা হতে পারে সমস্ত অধিবাসীকে। এসব কিছু বিবেচনা করেই ফরাসীদের হত্যাকারীরা জেনারেলের হাতে নিজেদেরকে সমর্পণ করার কথা জানিয়ে দিল। তাদের প্রস্তাব মেনে নেয়ার পূর্ব শর্ত হিসেবে জেনারেল বললেন, দুর্গের চাকরবাকর থেকে শুরু করে মার্কুইস পর্যন্ত সবাইকে তার হাতে তুলে দিতে হবে। জেনারেল কথা দিলেন, কেবল এই শর্তটি মেনে নিলেই বাদবাকী সকল জীবিত নগরবাসী প্রাণে রক্ষা পাবে এবং সৈন্যদেরকে নগরে লুটতরাজ ও অগ্নিসংযোগ করা থেকে বিরত রাখা হবে। এক বিশাল অঙ্কের ক্ষতিপূরণও দাবী করা হলো এবং ধনাঢ্য নগরবাসীরা চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যেই তা মিটিয়ে দেবার নিশ্চয়তাস্বরূপ নিজেদেরকে জেনারেলের হাতে জিম্মি হিসেবে সমর্পণ করল।

জেনারেল তার বাহিনীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সবধরনের ব্যবস্থাই গ্রহণ করলেন। পুরো এলাকার প্রতিরক্ষার জন্যও নেয়া হলো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা। আর সৈন্যদেরকে বেসামরিক আবাসিক এলাকায় অবস্থান করানোর প্রস্তাবটিও নাকচ করে দিলেন। তাদের জন্য শিবির স্থাপনের ব্যবস্থাদি সম্পন্ন করে তিনি উঠে এলেন দুর্গের উপরে এবং সামরিক কায়দায় এর দখলদারিত্ব গ্রহণ করলেন। লেগ্যান্স পরিবারের প্রতিটি সদস্যের উপরই তীক্ষ্ণ নজর রাখা হয়েছিল। যেখানে নাচগানের আসর বসেছিল সেই ঘরটিতেই তারা এখন হাতকড়া অবস্থায় বন্দী। ঘরের জানালা দিয়ে চত্বরটি খুব সহজেই চোখে পড়ছিল। এখান থেকেই সমগ্র শহরটি নিয়ন্ত্রণ করা হতো। সন্নিহিত গ্যালারিতে সদর দপ্তরটি স্থাপন করেই সর্বাগ্রে জেনারেল সেখানে একটি মন্ত্রণাসভা ডাকলেন, উদ্দেশ্য ইংরেজ বাহিনীর অবতরণ ঠেকানো।

বার্তাসহ মার্শাল নে-এর কাছে একজন সহকারী পাঠিয়ে দেয়া হলো। উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ব্যুহ স্থাপনের নির্দেশ দিয়ে জেনারেল এবার তার সহকর্মীদের সঙ্গে বন্দীদের ব্যাপারে আলোচনায় বসলেন। তাৎক্ষণিকভাবে দু’শ স্পেনীয়কে গুলি করে হত্যা করা হলো। নগরবাসীরাই এদেরকে জেনারেলের কাছে আত্মসমর্পণ করিয়েছিল। সামরিক কায়দায় দণ্ডাদেশ কার্যকর করার পর জেনারেল দুর্গচত্বরের উপরে অনেকগুলো ফাঁসিকাষ্ঠ স্থাপনের নির্দেশ দিলেন। সেই সঙ্গে নগরজল্লাদকেও ডেকে পাঠালেন। কারণ দুর্গকক্ষে তখনও বেশ কিছু বন্দী রয়ে যায়। নৈশভোজে যাওয়ার আগে হাতে একটু সময় ছিল। সেই সুযোগে বন্দীদের একটু দেখতে গেল ভিক্টর মার্চেন্ট। তবে দ্রুতই সে ফিরে এল জেনারেলের কাছে।

‘আমি আপনার কাছে ক্ষমা প্রদর্শনের অনুরোধ নিয়ে এসেছি’, আবেগ জড়িত কণ্ঠে বলল সে।
‘তুমি!’ বিস্মিত জেনারেলের কণ্ঠস্বরে ছিল তেতো বিদ্রুপের ঝাঁঝ।

‘হায়!’ উত্তরে ভিক্টর বললো, ‘যে ক্ষমার কথা আমি বলতে এসেছি তা যে এক সীমাহীন বিষাদময়তা। ফাঁসি কাষ্ঠগুলি স্থাপন করতে দেখার পর মার্কুইজ এই মর্মে ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন যে, আপনি যেন তাঁর পরিবারবর্গের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার ক্ষেত্রে প্রথাগত কিছু পরিবর্তন ঘটান। আর তাই অনুরোধ জানিয়েছেন, তাঁদের মতো সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদের যেন শিরশ্ছেদের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।’

জেনারেল বললেন, ‘তাই হবে।’
‘তাঁরা ধর্মীয় বিধানের পাপ স্বীকার অনুষ্ঠান আয়োজনেরও অনুরোধ জানিয়েছে এবং বাঁধা অবস্থা থেকে মুক্ত হতে চাইছে। পালিয়ে যাবার চেষ্টা করবে না বলেও কথা দিয়েছে তারা।’
‘আমি রাজি’, বললেন জেনারেল, ‘তবে তাদের ব্যাপারে তোমাকেই কিন্তু জবাবদিহি করতে হবে।’
‘এছাড়া প্রবীণ ব্যক্তিটি তাঁর নিজের সমস্ত বিষয়সম্পত্তিও দিয়ে দিতে চাইছেন, যদি কিনা আপনি তাঁর কনিষ্ঠ পুত্রটিকে প্রাণে রক্ষা করেন।’

‘বটে’, উত্তরে জেনারেল বললেন, ‘তাঁর সমস্ত সম্পত্তি ইতিমধ্যেই সম্রাট জোসেফের অধিকারে চলে গেছে’, থামলেন তিনি। কপালে গভীর চিন্তারেখা ফুটে উঠল। পুনরায় বললেন, ‘তারা যা চায় তার চেয়ে বেশী আমি তাদের দেব। মার্কুইজের শেষ অনুরোধের গুরুত্বটি আমি বুঝি। ঠিক আছে, তাকে তার নামের জন্য অমরত্ব কিনতে দাও। তবে স্পেনকে চিরদিনের জন্য মনে রাখতে দাও বিশ্বাসঘাতকতা এবং এর জন্য প্রাপ্ত দণ্ডের কথা। আর মার্কুইজের কোন পুত্র যদি জল্লাদের দায়িত্ব পালন করতে পারে তবে তাকেই কেবল আমি সমস্ত উত্তরাধিকারসহ প্রাণে বাঁচিয়ে রাখব। যাও, এ ব্যাপারে আর কোন কথা নয়।’

নৈশভোজ সাজানো হলে অফিসাররা খেতে বসল। পরিশ্রান্ত শরীরের প্রচণ্ড ক্ষুধা মিটিয়ে নেয় তারা। একজনই কেবল অনুপস্থিত সেখানে, ভিক্টর মার্চেন্ট। অনেকক্ষণ ইতস্ততঃ করার পর হলঘরটিতে প্রবেশ করল সে। এখানেই সেই দাম্ভিক লেগান্স পরিবারের সদস্যরা চরম দুর্দশার মধ্যে নিপতিত অবস্থায় রয়েছে। বেদনার্ত দৃষ্টিতে তাকাল সেই ঘরের দিকে ঠিক আগের সন্ধ্যায় যেখানে দেখেছিল উচ্ছ্বাস মুখর তিনটি তরুণ ও দু’টি তরুণীকে। নৃত্যরত অবস্থায় ঘূর্ণায়মান মস্তকগুলো তাদের ধীরে ধীরে আন্দোলিত হচ্ছিল। ভাবতে গিয়ে কেঁপে উঠল সে। খুব শীঘ্রই এই মস্তকগুলো জল্লাদের তরবারীর আঘাতে ভূলুণ্ঠিত হবে। স্বর্ণখচিত চেয়ারগুলোর সাথে শক্ত করে বাঁধা বাবা-মা, তিন ভাই ও বোন দু’টি একেবারে নিথর হয়ে পড়ে আছে।

আটজন চাকর পেছনে হাত বাঁধা অবস্থায় দাঁড়িয়ে রয়েছে। পনেরটি প্রাণী নীরব দৃষ্টিতে একে অপরের দিকে তাকিয়ে ছিল। চোখগুলো তাদের অন্তরের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। তবু অন্তরের দুঃখকে আড়াল করতে পরছিল না। নিজেদের উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়ার কারণে সৃষ্ট বিমর্ষ ভাব এবং অপারগতাজনিত একটা দুঃখবোধও কারও কারও চেহারায় ফুটে উঠছিল। স্থির, নিশ্চুপ সৈন্যরা পাহারা দিচ্ছিল তাদেরকে। নৃশংস শত্রুপক্ষের দুরবস্থায়ও যথেষ্টই শ্রদ্ধাশীল ছিল তারা। ভিক্টর আসার সঙ্গে সঙ্গেই তাদের চোখে মুখে একটা কৌতূহল লক্ষ্য করা গেল। অভিযুক্ত পরিবারটির সকলের বাঁধন খুলে দেয়ার নির্দেশ দিল সে। আর নিজে গিয়ে ক্লারার হাতের বাঁধনটি খুলে দেয়। ক্লারা রশি দিয়ে একটা চেয়ারের সঙ্গে বাঁধা ছিল। একটু হাসল সে, করুণ হাসি। ঘন কালো চুল আর হালকা গড়নটির প্রশংসা করতে গিয়ে আলতোভাবে তার হাত দু’খানা না ছুঁয়ে পারল না অফিসারটি। মেয়েটি স্পেনীয়। গায়ের রঙটি পুরোমাত্রায় স্পেন দেশীয়। বাঁকা এবং টানা ভ্রুযুক্ত একজোড়া স্পেনীয় চোখ। দাঁড়কাকের পাখনার চেয়েও কালো দু’টি মণি।

‘তুমি কি সফল হতে পেরেছো?’ বিষাদ মাখানো হাসিতে অফিসারটির দিকে তাকিয়ে জানতে চাইল সে। সেই হাসিতে একজন যুবতী নারীর সজীবতার তখনো খানিকটা অবশিষ্ট ছিল।

চাপা নিঃশ্বাস আটকাতে পারল না ভিক্টর। একবার ভাই তিনটির দিকে, আরেকবার ক্লারার দিকে তাকাচ্ছিল সে। এদের মধ্যে বড় ছেলেটির বয়স তিরিশ। ছোটখাট, দেখতে কিছুটা বেঢপ ধরনের, তবে চোখেমুখে ছিল অহঙ্কার আর অবজ্ঞার ভাব। আচার আচরণে আভিজাত্যের অভাব ছিল না। অনুমান করা যায় আবেগ অনুভূতির দিক থেকেও ছিল না সেই কোমলতার কোন ঘাটতি, যার জন্য স্পেনীয় যুবকেরা এককালে খ্যাতি অর্জন করেছিল। সেই যুবকের নাম জুয়ানিতু। দ্বিতীয় ছেলেটি ফিলিপ, বয়স কুড়ির কাছাকাছি। দেখতে অনেকটা ক্লারারই মত। সবচেয়ে ছোটটি আট বছরের যার নাম ম্যানুয়েল। একজন চিত্রকরের চোখে হয়ত ম্যানুয়েলের অঙ্গসৌষ্ঠবে রোমানদের সেই দৃঢ়তার লক্ষণগুলি ধরা পড়ত যা ডেভিড তাঁর প্রজাতান্ত্রিক চিত্রকর্মগুলোতে শিশুদের অবয়বের মধ্যে দৃষ্টিনন্দনভাবে মূর্ত করে তুলেছিলেন। ঘটনাক্রমে রক্ষা পেয়ে যাওয়া মুরিল্লোর কোন চিত্রকর্মের মতই দেখাচ্ছিল বৃদ্ধ মার্কুইজের সাদা চুলে-ঢাকা মাথাটি।

পরিবারটির সামনে এসে তরুণ অফিসারটি এমনভাবে মাথা নাড়ল যে, সে বুঝতে পেরেছে এই চারজন মানুষের অন্ততঃ একজনের দ্বারাও জেনারেলের প্রস্তাবটি গৃহীত হওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই। তা সত্ত্বেও ক্লারার কাছে প্রস্তাবটি রাখার মতো সাহস খুঁজে পেল সে। প্রথমে শিউরে উঠল স্পেনীয় মেয়েটি। কিন্তু পরক্ষণেই নিজের শান্তসমাহিত ভাবটি ফিরিয়ে এনে হাঁটু গেড়ে পিতার সামনে বসে পড়ল।

‘উঃ!’ বলতে লাগল সে, ‘জুয়ানিতুকে শপথ করে বলতে বলুন, যে নির্দেশই তাকে আপনি দেবেন সে তা বিশ্বস্ততার সাথেই পালন করবে, আর তাতেই আমাদের শান্তি।’

মার্কুইজ পত্নী এ ব্যাপারে কিছু একটা আশ্বাস দিতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু স্বামীর দিকে একটু ঝুঁকে পড়ে ক্লারার মুখে সেই ভয়ঙ্কর গোপন কথাটি শুনে ফেলা মাত্রই মূর্চ্ছা গেলেন। জুয়ানিতুর কাছে কোন কিছুই অস্পষ্ট ছিল না। খাঁচায় পোরা সিংহের মতো সে পায়চারী করতে লাগল। মার্কুইজের কাছ থেকে সমর্পণের পুরো নিশ্চয়তা পাওয়ার পর ভিক্টর সৈন্যদেরকে সরিয়ে দিল। চাকরবাকরদের জল্লাদের হাতে তুলে দিতেই তাদেরকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেয়া হলো। এখন কেবল ভিক্টর একাই পরিবারটির প্রহরায় নিযুক্ত। বৃদ্ধ পিতা এবার উঠে দাঁড়ালেন।
‘জুয়ানিতু’, ডাকলেন তিনি।

জুয়ানিতু কেবল মাথা নেড়ে এর জবাব দিল, যার অর্থ প্রত্যাখ্যান। চেয়ারের উপর আবারও বসে পড়ল সে। নিষ্করুণ চোখে ভয়ঙ্কর দৃষ্টি মেলে বাবা-মার দিকে তাকালো। ক্লারা এবার কাছে এসে তাঁর হাঁটুর উপর বসে পড়ে। গলা জড়িয়ে ধরে চোখের উপর চুমু খেয়ে অনুচ্চ স্বরে বলতে লাগল, ‘তোমার স্পর্শে মৃত্যু যে আমার কাছে কত মধুর তা যদি জানতে, জল্লাদের হাতের নির্মম যন্ত্রণাও আমাকে সহ্য করতে হতো না। অপেক্ষমান দুর্দশার হাত থেকে তুমি আমাকে রক্ষা করবে, প্রিয় জুয়ানিতু, তুমি কখনো চাওনি যে আমি অন্য কোন পুরুষের হই, সুতরাং…।’

শীতল চোখ দু’টি তার ভিক্টরের দিকে একটি তির্যক দৃষ্টি হানল, যেন সে জুয়ানিতুর মনে ফরাসীদের প্রতি ঘৃণা জাগিয়ে তুলতে চাইছে।
‘সাহস রাখ’, ভাই ফিলিপ বলল, ‘তা নাহলে যে আমাদের এই রাজকীয় রক্তের ধারাটি বিলুপ্ত হয়ে যাবে।’
হঠাৎ উঠে দাঁড়াল ক্লারা। জুয়ানিতুকে ঘিরে থাকা জটলাটাও এবার সরে গেল। সঙ্গত কারণেই নির্দেশ মানতে নারাজ পুত্রটি দেখতে পেল বৃদ্ধ পিতা তার সম্মুখে দণ্ডায়মান। একটা গাম্ভীর্য বজায় রেখেই তিনি চিৎকার দিয়ে উঠলেন, ‘আমি তোমাকে বলছি, এটা করতেই হবে জুয়ানিতু।’

অভিজাত যুবকটি এতোটুকুও টলছে না দেখে বৃদ্ধ পিতা তার সামনে এসে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন। অনিচ্ছা সত্ত্বেও ক্লারা, ম্যানুয়েল এবং ফিলিপও তাকে অনুসরণ করল। এই ব্যক্তিটিই শুধু পারে পরিবারটিকে একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করতে। প্রার্থনার ভঙ্গিতে সবাই তার দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়। মনে হচ্ছিল তারা তাদের পিতার কথাগুলোরই পুনরুক্তি করতে চাচ্ছে ‘পুত্র, তুমি কি স্পেনীয়দের শক্তিমত্তা ও স্বাভাবিক অনুভূতিগুলোও হারিয়ে ফেলেছ? দীর্ঘক্ষণ ধরে কি আমাকে এই নতজানু অবস্থায় ফেলে রাখবে? নিজের জীবন আর কষ্টের কথাও কি ভাববে না একবার?’ পেছন ফিরে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বৃদ্ধ পুনরায় বললেন, ‘মহোদয়া, ও কি আমারই ঔরসজাত সন্তান?’

‘সে রাজি,’ আর্তস্বরে গর্ভধারিণী চিৎকার দিয়ে উঠলেন। জুয়ানিতুর ভ্রু কুঁচকানোর বিশেষ ভঙ্গিটি দেখতে পেয়েছিলেন তিনি। আর এই বিশেষ ভঙ্গিটির অর্থ কেবল তিনিই বুঝতে পারতেন।

দ্বিতীয় কন্যা মারকুইটা করুণ স্বরে আর্তনাদ করছিল। উবু হয়ে পড়ে মায়ের শিথিল হাত দু’খানি ধরে রেখেছিল সে। এর জন্য ছোট ভাই ম্যানুয়েল এসে তাকে ভর্ৎসনা করল। ঠিক এই সময়ই দুর্গের যাজক এসে হাজির হলেন। সঙ্গে সঙ্গেই পুরো পরিবারটি তাকে ঘিরে ধরে জুয়ানিতুর কাছে নিয়ে গেল।

আর এই দৃশ্য ভিক্টর এক মুহূর্তের জন্যও সহ্য করতে পারছিল না। ক্লারাকে একটা ইশারা করেই দ্রুত চলে গেল সে। উদ্দেশ্য জেনারেলের মত পাল্টানোর জন্য শেষবারের মতো চেষ্টা করা। ভোজসভার মাঝখানটায় বেশ খোশমেজাজেই ছিলেন তিনি। অন্যান্য অফিসারের সঙ্গে মদ্যপান অবস্থায় সবে ঠাট্টা-রসিকতা শুরু করতে যাচ্ছিলেন।

ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই মেন্ডা নগরীর একশ’র মতো বিশিষ্ট নাগরিক চত্বরের উপরে এসে সমবেত হলেন। জেনারেলের নির্দেশমত লেগান্স পরিবারের সদস্যদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দৃশ্য প্রত্যক্ষ করবেন তাঁরা। ফাঁসি কাষ্ঠগুলোতে ইতিমধ্যেই মার্কুইজের চাকরবাকরদেরকে ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে। সেগুলোর নীচে সারিবদ্ধভাবে স্পেনীয়রা দাঁড়িয়ে আছে কিনা তা তদারক করার জন্য সেনাবাহিনীর একটি দলকে নিয়োগ করা হলো। ঝুলে থাকা মৃতদেহগুলোর পা প্রায় মেন্ডাবাসীদের মাথায় এসে ঠেকছিল। শিরশ্ছেদ কার্যকর করার জন্য স্থাপন করা হয়েছে একটি কাঠের গুঁড়ি। তার উপরে রাখা ধারাল খড়গটি ঝলসে উঠছিল। জল্লাদটিও দাঁড়িয়ে ছিল সেখানেই, পাছে জুয়ানিতু তার মত পাল্টায়।

অল্পক্ষণের মধ্যেই নিথর নীরবতা ভেদ করে কিছু মানুষের পদধ্বনি স্পেনীয়দের কানে এল। তা ছিল আগুয়ান একদল সৈন্যের মাপা পদক্ষেপ ও তাদের বন্দুকের মৃদু ঝনঝনানি। অফিসারদের হাস্যরোলের সাথে মিলেমিশে সেগুলো একাকার হয়ে যাচ্ছিল। অনেকটা যেন, সেই কিছু আগের রক্তাক্ত বিশ্বাসঘাতকতার প্রস্তুতিপর্বটিকে বুঝতে না দেয়ার উদ্দেশ্যে আয়োজিত নাচ-গানের আসরটিরই মতো। প্রাসাদের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ হলো সকলের। অভিজাত পরিবারটির সদস্যরা অবিশ্বাস্য দৃঢ়তার সাথে সামনের দিকে এগিয়ে আসছে। সকলেরই শান্ত, সমাহিত মুখাবয়ব। কেবল একজন ছিল আলাদা, বিমর্ষ, নিমগ্ন। যাজক তাকে বেষ্টন করে নিয়ে আসছিলেন। ধর্মীয় প্রশান্তির যাবতীয় আপ্তবাণী ও সান্ত্বনার কথা শুনিয়েছেন তিনি তাকে। তারই একমাত্র বেঁচে থাকার কথা। অন্য সকলের মতো জল্লাদটিও বুঝতে পারছিল জুয়ানিতুই তাঁর স্থানটি দখল করেছে। বৃদ্ধ মার্কুইজ ও তাঁর পত্নী, ক্লারা, মার্কুইটা এবং অন্য দু’টি ভাই, সবাই এসে সর্বনাশা সেই স্থানটির কয়েকপা দূরে নতজানু হয়ে বসল। যাজক নিয়ে আসছিলেন জুয়ানিতুকে। গুঁড়িটির কাছে পৌঁছতেই জল্লাদ তাঁকে হাত ধরে একটু পাশে নিয়ে যায়। মনে হলো কিছু নিয়মকানুন শিখিয়ে দেবে। সাজাপ্রাপ্ত অন্যদেরকে পাপ স্বীকারোক্তি শ্রবণকারী যাজক এমনভাবে বসিয়ে দিলেন যাতে তারা দণ্ডকার্যকরণ দৃশ্য দেখতে না পায়। কিন্তু এরা ছিল জাত স্পেনীয়, নির্ভয় চিত্তে সোজা হয়ে বসে থাকে।

প্রথমে ক্লারাই এগিয়ে এল ভাইয়ের সামনে। ‘জুয়ানিতু’, বলতে লাগল সে, ‘ভীরুতার জন্য না হয় ধিক্কারই দিও! তবু আমাকে দিয়েই শুরু কর তুমি।’
ঠিক এই সময়েই কার যেন ত্রস্ত পায়ের শব্দ শোনা গেল। দৃশ্যপটে হাজির হলো ভিক্টর। নতজানু অবস্থায় ছিল ক্লারা। তরবারীর ঠিক নীচেই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল তাঁর শ্বেতশুভ্র গ্রীবাদেশ। অফিসারটির মুখখানা ফ্যাকাশে হয়ে গেল। তবে দ্রুতই একেবারে ক্লারার কাছটিতে চলে যাওয়ার মতো শক্তি খুঁজে পেল সে।

‘জেনারেল বলছেন তিনি তোমার জীবন বাঁচাতে রাজী, যদি তুমি আমাকে বিয়ে কর’, খুব নীচু স্বরেই বলল সে।
স্পেনীয় মেয়েটি অবজ্ঞাসূচক ভঙ্গিতে তাকায় অফিসারটির দিকে।
‘চালিয়ে যাও জুয়ানিতু’, বেশ ঋজু স্বরেই বলল সে। ভিক্টরের পায়ের কাছেই গড়িয়ে পড়ল তার মস্তকটি। সেই শব্দটি শোনা মাত্রই মার্কুইজ পত্নী কাঁপতে শুরু করেছিলেন। আর সেটুকুই ছিল তাঁর যন্ত্রণার চিহ্ন।
‘আমি স্বাভাবিক আছি তো প্রিয় জুয়ানিতু?’ ছোট্ট ম্যানুয়েল তার ভাইয়ের কাছে জানতে চাইল।
‘একি, তুমি যে কাঁদছ মার্কুইটা’, জুয়ানিতু বলল তাঁর বোনকে।
‘ও, হ্যাঁ’, মেয়েটি উত্তর দিল, ‘হতভাগা জুয়ানিতু, আমি যে তোমার কথাই ভাবছিলাম। আমাদের সবাইকে হারিয়ে একা একা কী দুর্বিষহ জীবনই না তোমাকে বয়ে বেড়াতে হবে।’

অল্পক্ষণের মধ্যেই মার্কুইজের দীর্ঘ দেহখানি এসে হাজির হলো। নিজ সন্তানদের রক্তের দিকে তাকালেন তিনি। চোখ তুলে চাইলেন নির্বাক, নিশ্চল জনতার দিকে। জুয়ানিতুর দিকে হাত দু’টি বাড়িয়ে দিয়ে ঋজু স্বরে বলতে লাগলেন, ‘আমি আমার সন্তানের ওপর পিতৃত্বের আশীর্বাদ বুলিয়ে দিলাম। হে যুবক, নির্ভয়ে এবার আঘাত হান, তুমি যে এখন কলঙ্কহীন।’
কিন্তু পাপস্বীকারোক্তি শ্রবণকারী যাজকের সঙ্গে জন্মদাত্রী মাকে আসতে দেখেই আঁতকে উঠল জুয়ানিতু। চিৎকার করে বললো, ‘তিনি যে আমাকে লালন পালন করেছেন।’

তার কথাগুলো সমবেত জনতার মাঝে আর্তনাদের জন্ম দিল। শিহরণ জাগানো কান্নার শব্দ ভোজসভার হৈ চৈ আর অফিসারদের হর্ষধ্বনিও থামিয়ে দিল। মার্কুইজ পত্নী বুঝতে পারছিলেন জুয়ানিতুর শক্তি সাহস একেবারেই লোপ পেয়েছে। মুহূর্তে চত্বর বেষ্টনির উপর দিয়ে লাফিয়ে পড়লেন তিনি নীচের পাথুরে মাটিতে। গড়াগড়ি খেতে থাকে ফেটে চৌচির হয়ে যাওয়া তার মস্তকখানি। ধন্য ধন্য একটি রব শোনা গেল। পড়ে গিয়ে মূর্চ্ছা গেল জুয়ানিতু।

‘এই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা নিয়েই মার্চেন্ট একটু আগে আমার সাথে কথা বলছিল। আমি বাজি রেখেই বলতে পারি এ ব্যাপারে আপনি কোন নির্দেশই দেননি,’ অর্ধমাতাল একজন অফিসার এসে জেনারেলকে বলল।
‘বলছ কী’! বিস্মিত জেনারেল জি. টি. আর বলে উঠলেন, ‘তুমি কি ভুলে যাচ্ছ যে মাসখানেকের মধ্যেই পাঁচশ ফরাসী পরিবারকে চোখের জলে ভাসতে হবে এবং এখনও আমরা স্পেনের মাটিতেই? হাড়গোড়গুলো কি সব এখানেই রেখে যেতে চাও?’
এই নীতিদীর্ঘ বক্তৃতার পর কেউই আর, এমনকি একজন সাব-লেফটেন্যান্টও তার মদের গ্লাস শেষ করার মতো মনের জোর খুঁজে পেল না।

মর্যাদাপূর্ণ বিভিন্ন রকম খেতাব দ্বারা অভিজাত যুবকটি এখন পরিবৃত। স্পেনের সম্রাট সম্মানসূচক ‘এলভারদ্যুগো’ (জল্লাদ) উপাধিতে ভূষিত করেছেন তাকে। এতসব সত্ত্বেও গভীর শোকে আচ্ছন্ন সে। সব ধরনের সামাজিকতা সে এড়িয়ে চলে, কালেভদ্রে উপস্থিত হয় জনসমক্ষে। মহিমান্বিত সেই নিষ্ঠুরতার ভারে সে এখন ন্যুব্জ। অধীর চিত্তে অপেক্ষা করছে পরবর্তী প্রজন্মের একটি পুত্র সন্তানের জন্য। সে-ই তাঁকে হারিয়ে যাওয়া ছায়াগুলোর সাথে মিলিত হওয়ার সুযোগ করে দেবে; যারা আর কখনো ছেড়ে যাবে না তাকে।

[‘এলভারদ্যুগো’ (জল্লাদ) নামক এই গল্পটির মূল লেখক অনর দ্য বালজাক। অনুবাদ করেছেন নেয়ামুল হক]

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “এলভারদ্যুগো [ জল্লাদ ] – অনর দ্য বালজাক এর ছোটগল্প

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

73 + = 74