রাজনৈতিক মিথ্যাচারের দলিল-দস্তাবেজ!

ভুল তথ্য দেয়াটা হচ্ছে অনিচ্ছাকৃত। কিন্তু কেউ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল তথ্য দেন তাহলে তাকে আর শুধু ভুল তথ্য বলা যায় না। তখন তা হয়ে যায় মিথ্যাচার। রাজনীতিতে মিথ্যাচার এখন খুব স্বাভাবিক একটি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে আমাদের সমাজে মিথ্যাচারের সংস্কৃতি দিন দিন বিকশিত হচ্ছে, যা পুরো জাতির মধ্যে এক ধরনের নীতিহীনতার বিকাশ ঘটাচ্ছে। যার ফলে জাতি গঠন ও জাতীয় বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

মিথ্যাচার প্রায় সর্বত্রই চলছে জোর গলায়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি হচ্ছে রাজনীতিতে। অর্থনীতি নিয়েও মিথ্যাচার চলে এদেশে। প্রায়শই অভিযোগ ওঠে নানা উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে অর্থনীতির নানা দিক সম্পর্কে ভুল তথ্য দেয়া হয়। সাংস্কৃতিক অঙ্গনও এ থেকে মুক্ত নয়। রাস্তাঘাটে, টিভি ও ইন্টারনেটে দিন-রাত নানা মিথ্যা বক্তব্য সম্বলিত পণ্যের বিজ্ঞাপন প্রচার হয়। নাটক, সিনেমায় অবাস্তব-সমাজে দেখা যায় না, এমন অনেক বিষয়কে স্বাভাবিক হিসেবে হাজির করা হয়। এমনকি ইতিহাস নিয়েও চলে মিথ্যাচার। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবইও এর বাইরে নয়।

এসবের ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে দায়িত্বশীলতা ও অধ্যবসায় কমছে। সমাজস্থ মানুষ অন্যায়ে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে। কেউ কারও অন্যায়কে সামনে টেনে আনলে তিনি অন্য একজনের অন্যায়কে উদাহরণ হিসেবে দেখান। অর্থাৎ বলা হচ্ছে, ‘এটা তো সাধারণ ঘটনা। সবাই করে, আমি করলে দোষ কী!’ এই চেতনার বিকাশ নিঃসন্দেহে এ অঞ্চলের জনসাধারণ এবং জাতিকে ভয়াবহ পরিণতির দিকে ঠেলে দিবে। এভাবে চলতে থাকলে সমাজে অপরাধপ্রবণতা আরও বাড়বে।

নানা ধরনের মিথ্যাচারের মধ্যে রাজনৈতিক মিথ্যাচারই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রাজনীতি আমাদের সমাজের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় এবং যেকোনো সমাজের জন্যই সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক নেতাদের বা দলের বক্তব্য-বিবৃতি দেশব্যাপী নানা ধরনের মাধ্যম দিয়ে প্রচার হয়। মুহূর্তেই মানুষের কাছে পৌঁছে যায় তাদের বক্তব্য। রাজনীতির মাধ্যমেই ঠিক হয় দেশের কী হবে, না হবে! রাজনৈতিক নেতারাই দেশে শান্তি, শৃঙ্খলা ও উন্নয়নের কথা বলেন। তারা সমাজকে বিকশিত করার কথা বলেন। ফলে ন্যায়-অন্যায় ও নীতিবিষয়ক আলাপ রাজনীতিবিদদের মুখে সবচেয়ে বেশি শোনা যায়।

বর্তমান ব্যবস্থায় দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কীভাবে চলবে, কোনটা সঠিক, কোনটা বেঠিক, কার মজুরি কত হবে, কার জন্য সেবা দরকার আর কার জন্য সাহায্য- এ সবকিছুই ঠিক হয় রাজনীতি দিয়ে অর্থাৎ সংবিধান তথা সংসদের মাধ্যমে। এখন এই রাজনৈতিক নেতারাই যদি হরদম মিথ্যাচার করেন, তাহলে জনগণের মধ্যে কী বার্তা যায়? খুব বেশি দূর অতীতে না গিয়ে রাজনৈতিক মিথ্যাচারের কিছু নমুনা দেখে নিই। তাহলেই পরিষ্কার হয়ে যাবে যে, এর ফলে সমাজ কতটা পেছনের দিকে হাঁটতে পারে!

?oh=2793258033a636e94c697923691e8537&oe=556F12D3&__gda__=1432029256_2c1fd1e93572738ded3f7eccbd613a70″ width=”400″ />

ইতিহাস নিয়ে মিথ্যাচার
সম্প্রতি ইতিহাসের মিথ্যাচার নিয়ে ব্যাপক আলাপ হয়েছে রাজনৈতিক অঙ্গনে। সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের পুত্র ও বিএনপির অন্যতম নেতা তারেক রহমান নিজ পিতা ও দলের প্রতিষ্ঠাতাকে মহান করতে গিয়ে ইতিহাস বিষয়ে এমন কিছু বক্তব্য দিয়েছেন, যা নিয়ে তর্কের খাতিরে হয়তো আলাপ করা যায়, কিন্তু এর ভেতরের ফাঁক ও বাস্তবতা অধিকাংশ মানুষেরই জানা।

তারেক রহমান যখন গেল বছরের ২৬ মার্চে লন্ডনে এক আলোচনা সভায় দাবি করছেন, ‘জিয়া বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি’, ঠিক তখনও কিন্তু বিএনপির ওয়েবসাইটে জিয়াকে দেশের ৭ম রাষ্ট্রপতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে! অথচ পরদিন একই দাবি ঢাকায় বসে করেছেন বেগম খালেদা জিয়াও।
১৫ আগস্ট বেগম খালেদা জিয়ার জন্মদিন পালনকেও দেশের অধিকাংশ মানুষ রাজনৈতিক মিথ্যাচার হিসেবেই জানে। এ সম্পর্কে অনেক অনুসন্ধান হয়েছে। কিন্তু কোনো পক্ষ তালগাছ ছাড়েনি।

জিয়া পরিবারের মতো একই কর্মকাণ্ড ঘটাতে দেখা গেছে শেখ পরিবারকেও। ২০১০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমির বইমেলা উদ্বোধন উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রীতিমাফিক দেয়া এক ভাষণে বলেন, ‘১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি খাজা নাজিমুদ্দীন আইন পরিষদে ঘোষণা দেন, পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মেনে নেবে। তার এই ঘোষণার বিরুদ্ধে ছাত্রলীগসহ গোটা ছাত্র সমাজ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের পরিকল্পনা গ্রহণ করে। এ সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়।’ (সূত্র : বাসস, ১ ফেব্রুয়ারি, ২০১০)

ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করে এ বিষয়ে সমাজের সর্বস্তরে স্বীকৃতি পেয়েছেন প্রখ্যাত তাত্ত্বিক বদরুদ্দীন উমর। তিনি এর বিপরীতে ৪ ফেব্রুয়ারি ‘দৈনিক আমার দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত এক কলামে তাজউদ্দীনের ডায়েরিকে সূত্র হিসেবে উল্লেখ করে লেখেন, ‘হাসিনার বক্তব্য সম্পূর্ণ মিথ্যা।… খাজা নাজিমুদ্দীনের এই বক্তব্য তিনি প্রদান করেন ঢাকায় আইন পরিষদে নয়, করাচিতে পাকিস্তান গণপরিষদে।… সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক মনোনীত হন শামসুল আলম। শেখ মুজিব এই সভার ধারেকাছেও ছিলেন না। কারণ, তিনি তখন ছিলেন কলকাতায়। সংগ্রাম পরিষদ গঠনের কয়েক দিন পর তিনি কলকাতা থেকে ঢাকায় আসেন।… কাজেই তার ‘প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে’ সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়েছিল, এ বক্তব্য সর্বৈব মিথ্যা। মিথ্যা যদি না হয় তাহলে এটা সম্পূর্ণভাবেই এক অজ্ঞতাপ্রসূত বক্তব্য।’

ওই একই ভাষণে শেখ হাসিনা আরও বলেন, ‘এ সময় তাঁকে ফরিদপুর জেলে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে তিনি ১৪ ফেব্রুয়ারি অনশন শুরু করলে ১৬ ফেব্রুয়ারি তাকে আবার ঢাকা মেডিকেল কলেজে চিকিৎসার জন্য আনা হয়। সেখান থেকেই বঙ্গবন্ধু একুশে ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভাঙার নির্দেশ দেন।’

এর বিপরীতে বদরুদ্দীন উমর লিখেন, ‘আসলে শেখ মুজিব ও বরিশালের মহিউদ্দীন আহমদকে ১৫ ফেব্রুয়ারি ফরিদপুর জেলে স্থানান্তরিত করা হয়। এরপর তিনি ও মহিউদ্দীন সেখানে ভাষার দাবি প্রতিষ্ঠার জন্য নয়, নিজেদের মুক্তির জন্য অনশন শুরু করেন। (অলি আহাদ- জাতীয় রাজনীতি পৃ : ১৫১, ১৫২)। কয়েকদিন পর তাদের দু’জনকেই ফরিদপুর জেল থেকে মুক্তি দেয়া হয়। এ বিষয়ে মহিউদ্দীন আহমদ এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আমি জেল থেকে ছাড়া পাই ২৮ ফেব্রুয়ারি এবং শেখ মুজিব ছাড়া পায় ২৪ ফেব্রুয়ারি। এটা ঘটে আমরা ফরিদপুর জেলে অনশন আরম্ভ করার পর।’ (ভাষা আন্দোলন প্রসঙ্গ : কতিপয় দলিল। বদরুদ্দীন উমর। বাংলা একাডেমি, প্রথম পুনর্মুদ্রণ, ১৯৯৫। পৃষ্ঠা : ২৮৭)

এমন বক্তব্যকে অনেকেই মনে করেন, এগুলো রাজনৈতিক বক্তব্য। অর্থাৎ রাজনীতিতে এমন কথা বললে তা তেমন কোনো অপরাধ নয়। এই মনোভাবের ফলে আমরা রাজনীতিবিদদের মিথ্যাচারের বিকাশ ঘটতে দেখেছি। সাবেক প্রেসিডেন্ট স্বৈরশাসক এরশাদ এখনও গলা চড়িয়ে বলেন, নূর হোসেনকে তার বাহিনী হত্যা করেনি। তিনি একজন সুশাসক ছিলেন, পল্লীবন্ধু ছিলেন। তিনি কখনও স্বৈরশাসন চালাননি। ২০ মে, ২০১০ এক সেমিনারে বক্তারা স্বৈরশাসক বলে আক্রমণ করলে এরশাদ সেখানে বলেন, ‘আমি স্বৈরশাসক নই। আমি একজন এমপি। প্রতিবার নির্বাচনে আমি জয়ী হয়েছি। জেলে থেকেও পাস করেছি।’

গেল ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এরশাদের নানা জ্বালাময়ী বক্তব্য ও কিছুক্ষণ পরই আবার তা অস্বীকার করা, মত পাল্টে ফেলা, এমন অনেক কিছুই ঘটতে দেখা গেছে। নির্বাচনে না যাওয়ার সিদ্ধান্তে অটল থেকে ৪ ডিসেম্বর রাতে তিনি বলেন, ‘নির্বাচনে যাব না এটিই আমার শেষ কথা। আমার সঙ্গে চালাকির চেষ্টা হলে সুইসাইড করব। আলমারি থেকে পিস্তল নামিয়ে গুলি লোড করে রেখেছি।’

এরপর ৬ ডিসেম্বর তিনি সম্পূর্ণ উল্টো কথা বলেন, ‘আমি সাবেক রাষ্ট্রপতি, সেনাপ্রধান, আমি কেন সুইসাইডের কথা বলব। সুইসাইডের কথা সত্য নয়।’ এরপর আরও অনেক কিছু ঘটেছে, এরশাদ এখন ‘প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত’ পদবি উল্লেখ করে সভা-সমাবেশে বক্তব্য দেন। তার দল সংসদে ৪০ আসন নিয়ে সরকারে থেকেও বিরোধী দল!

জামায়াতে ইসলামী দেশে ধর্মের রাজনীতি করে। আল্লাহর আইন চায় তারা। ‘শরিয়া’ প্রতিষ্ঠা তাদের দলীয় লক্ষ্য হলে সে অনুযায়ী তারা চলবে, এটাই স্বাভাবিক। সেই অনুয়ায়ী রাজনৈতিক মিথ্যাচার তাদের নিজেদের আইনেই অপরাধ। ইতিহাস নিয়ে তাদের মিথ্যাচার সর্বকালের সব সীমাকে অতিক্রম করেছে। একাত্তর সম্পর্কে তাদের কাছ থেকে জানতে গেলে মনে হবে বাংলাদেশ পাকিস্তান আমলে ফুলশয্যা ছিল। একাত্তরে পাক বাহিনীর সঙ্গে মিলে গণহত্যায় অংশ নিলেও, এবং সেগুলো তাদের নিজেদের পত্র-পত্রিকায় ছাপা হলেও এখন তারা তা অবলীলায় অস্বীকার করছে। হাতেনাতে প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও তারা সভা-সমাবেশে দাঁড়িয়ে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মতো করেই মিথ্যাচার করছে। অপরাধ তারা স্বীকার করছে না। অর্থাৎ আল্লাহর আইনের বরাত দিলেও রাজনৈতিক মিথ্যাচারকে তারাও অনুমোদন দিচ্ছে। তাদের ছাত্র সংগঠন শিবিরের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকার তথ্য-প্রমাণ সর্বজনে প্রতিষ্ঠিত হলেও তারা প্রায়শই সভা সমাবেশে তা অস্বীকার করে বক্তব্য-বিবৃতি দেয়। অথচ তাদের নৃশংসতার ইতিহাস এদেশের পত্রিকাগুলোতেই শুধু নয়, প্রমাণসমেত গ্রন্থিত ইতিহাস হিসেবে সংকলিত হয়ে আছে।

রাজনৈতিক পক্ষ-বিপক্ষের খাতিরে এক দলের হয়ে অন্য দলকে মিথ্যাচার করতে দেখা যাচ্ছে হরদম। জোটভিত্তিক রাজনীতির সুবিধা নিতে বেগম খালেদা জিয়া বলছেন, জামায়াতের নেতারা যুদ্ধাপরাধী নয়। আবার শেখ হাসিনা স্বৈরশাসককে বানাচ্ছেন তার বিশেষ দূত। যদিও এর আগে তাদের অবস্থান এমন ছিল না।

১২ অক্টোবর, ২০১১ তারিখে সিলেট আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে চারদলীয় জোটের জনসভায় মানবতাবিরোধীদের অপরাধের বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলে খালেদা জিয়া বলেন, ‘মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে ধরেছেন। এরা যদি মানবতাবিরোধীদের মধ্যে পড়েন, তাহলে নিজের ঘরের মানুষদের প্রথমে ধরা উচিত ছিল। নিজামী, মুজাহিদ, সাঈদী স্বাধীনতাবিরোধী হলে তাদের সঙ্গে নিয়ে বিগত সময়ে আন্দোলন করেছিলেন কেন? ১৯৮৬ সালে এরশাদের সঙ্গে যখন নির্বাচন করেছিলেন তখন তো নিজামীকে হাত ধরে টেনে নিয়ে নির্বাচনে গিয়েছিলেন।’ তিনি নিজামী, মুজাহিদ, সাঈদী, সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীসহ অন্য নেতাদের মুক্তি দাবি করে বলেন, ‘তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে নির্যাতন চালিয়ে মিথ্যা স্বীকারোক্তি আদায় করা হচ্ছে। তারা কোনো অন্যায় করেননি। এভাবে মিথ্যা স্বীকারোক্তি আদায় গ্রহণযোগ্য নয়।’

অথচ জামায়াত যখন জোটে ছিল না, তখন বিএনপি এ ধরনের বক্তব্য দিত না। ১৯৯৩ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রশিবিরের এক নারকীয় হামলায় শতাধিক নিরীহ ছাত্র আহত এবং ছাত্রনেতা রিমু নিহত হয়েছিলেন। নিহত রিমু ওয়ার্কার্স পার্টির ছাত্র সংগঠন ছাত্রমৈত্রীর নেতা হলেও তার মা হেলেনা চৌধুরী ছিলেন সাতক্ষীরা বিএনপির সভাপতি। বিএনপি তখন ক্ষমতায় ছিল। রিমু হত্যার প্রতিবাদে ২০ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে এক উত্তপ্ত ও আবেগপূর্ণ আলোচনা হয়েছিল। ক্ষমতাসীন বিএনপি দলের সাংসদরা তখন জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়েছিলেন।

তৎকালীন কিশোরগঞ্জ-২ আসন থেকে নির্বাচিত বিএনপির সাংসদ মেজর আখতারুজ্জামান সেদিন জাতীয় সংসদের অধিবেশনে বলেন, ‘আজকে আসুন শুধু সরকারিভাবে সরকার নয়, সবাই মিলে সামাজিকভাবে স্বাধীনতাবিরোধীদের বয়কট করি। আসুন, আজকে তাদের সঙ্গে আমরা এক কক্ষে বসব না সেই প্রতিজ্ঞা করি।… আজকে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে যেভাবে জামায়াত-শিবির ঔদ্ধত্য দেখানোর সুযোগ পাচ্ছে, এটা আমাদের দুর্বলতার জন্য। শুধু রাজনৈতিকভাবে নয়, আমাদের যারা বিরোধিতা করেছে, আমাদের অস্তিত্বের যারা বিরোধিতা করেছে, যারা আমার অস্তিত্ব স্বীকার করেনি তাদের সাথে আমাদের কোন সামাজিক বন্ধন হতে পারে না।’

সেদিন পাবনা-৪ আসন থেকে নির্বাচিত বিএনপির সাংসদ সিরাজুল ইসলাম, লক্ষ্মীপুর-৩ থেকে নির্বাচিত বিএনপির এমপি অ্যাডভোকেট খায়রুল এনামসহ বিএনপির ১৬ জন সাংসদ প্রায় একই ভাষায় জামায়াত-শিবিরের নৃশংসতার বিবরণ দিয়ে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে এ দুটি সংগঠন নিষিদ্ধকরণের দাবি জানিয়েছিলেন।

জোটভিত্তিক রাজনীতি আজ তাদের সে ইতিহাস ভুলিয়ে দিয়েছে। যেমন আওয়ামী লীগ ভুলে গেছে স্বৈরাচারবিরোধী ৯০-এর গৌরবময় গণঅভ্যুত্থানের কথা। অধিকাংশ রাজনৈতিক দলই সাময়িক সুবিধার নিমিত্তে ইতিহাস নিয়ে মিথ্যাচার করছে।

সাম্প্রতিক মিথ্যাচার
সম্প্রতি ঘটে যাওয়া বেশ কিছু ঘটনা রাজনৈতিক মিথ্যাচারের প্রসঙ্গটিকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে হাজির করেছে। সর্বশেষ বিএনপির পক্ষ থেকে বিজেপি সভাপতি ও যুক্তরাষ্ট্রের ছয় কংগ্রেস সদস্য সম্পর্কে দেয়া বিবৃতি এবং খালেদা জিয়ার বন্দিদশা নিয়ে শেখ হাসিনার বক্তব্য স্পষ্ট মিথ্যাচার হিসেবে সবার সামনে ধরা পড়েছে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়েও দুই জোটের বক্তব্য নানা দিক থেকেই ছিল মিথ্যাচারে পরিপূর্ণ। এর আগে গণজাগরণ মঞ্চ এবং শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশকে কেন্দ্র করেও পাল্টাপাল্টি মিথ্যাচার চলতে দেখা গেছে।

গত ৪ জানুয়ারি বিএনপি নেত্রীকে তার কার্যালয়ে তালা মেরে অবরুদ্ধ করা হলেও প্রধানমন্ত্রী বললেন, ‘বিরোধী নেতাকে নিরাপত্তা দেয়া হচ্ছে। তিনি যেকোনো সময় চাইলে বাড়ি যেতে পারেন। তাকে বন্দী বা অবরুদ্ধ করে রাখা হয়নি।’ এককাঠি সরেস হয়ে এ সম্পর্কে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বলেছেন, ব্যারিকেড দেওয়া বালু আর ইটের ট্রাক আসলে খালেদা জিয়ার বাড়ি মেরামতের জন্য আনা হয়েছে।

তুলনামূলক সফেদ চরিত্রের আওয়ামী নেতারা কেউই দলীয় নেত্রী ও অন্য নেতাদের এই মিথ্যাচার দেখতে পাননি। কিন্তু বিএনপির মিথ্যাচার নিয়ে তারা ঠিকই মাঠ কাঁপিয়েছেন। মতিয়া চৌধুরীর মতো নেত্রীর বক্তব্য দেখলেই রাজনৈতিক মিথ্যাচারের বিকাশ কতখানি ঘটেছে তা স্পষ্ট হয়ে যাবে। ১১ জানুয়ারি, ২০১৫ তারিখে তিনি বলেন, ‘বিএনপির কোনো লজ্জা নেই। চোরের মার বড় গলা। কংগ্রেসম্যান এবং বিজেপির সভাপতিকে নিয়ে তারা যে মিথ্যাচার করলো, এ কাজটা যদি আমাদের তরফ থেকে কেউ করতো, তাহলে তো আমরা লজ্জায় মুখ দেখাতে পারতাম না। বিএনপি যে মিথ্যাচার করেছে আওয়ামী লীগ সেই মিথ্যাচার করলে এই দলের নেতাদের তুলোধুনা করা হতো। কিন্তু সুশীলদের বিবেক এখন চুপ।’ (সূত্র : বাংলানিউজ)

অর্থাৎ ৭ জানুয়ারি রাতে বিএনপির মারুফ কামাল খানের ‘বিজেপিপ্রধান অমিত শাহ বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে ফোন করে তার কুশলাদি জানতে চেয়েছেন’ বলে দেয়া বক্তব্য এবং একই সময়ে বিএনপির পক্ষ থেকে প্রচার করা ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ছয়জন কংগ্রেসম্যান সরকারের স্বৈরাচারী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে যুক্ত বিবৃতি দিয়েছে’ শীর্ষক খবর মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ার পর আওয়ামী নেতারা একযোগে সেই মিথ্যাকে বড় করে দেখাতে গিয়ে নিজেরাও মিথ্যাচারে নামলেন।

এ ধরনের ভুয়া তথ্য পরিবেশনের অভিযোগ একেবারে নতুন নয়। কিছু দিন আগে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ উঠেছে প্রধানমন্ত্রীর যুক্তরাজ্য সফর নিয়ে। তখন সরকারিভাবে বলা হয়েছিল যুক্তরাজ্য সরকার বর্তমান সরকারকে সমর্থন দিয়েছে। অথচ সেদেশের প্রধানমন্ত্রীর মুখপাত্র জানান উল্টো কথা।

‘বাংলাদেশের গত ৫ জানুয়ারির সাধারণ নির্বাচনে অর্ধেকের বেশি সাংসদ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন। ২২ জুলাই লন্ডনের ১০ ডাউনিং স্ট্রিটে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকে তিনি এ মনোভাব ব্যক্ত করেন বলে জানিয়েছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর এক মুখপাত্র। তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে ‘অতীত’ আখ্যায়িত করে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন বাংলাদেশকে সামনে তাকানোর পরামর্শ দিয়েছেন।’ (সূত্র : প্রথম আলো, ২৫ জুলাই, ২০১৪)।

৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্যের দিকে তাকালেও জনগণ বিভ্রান্ত হন। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও নির্বাচন নিয়ে তখন বিভিন্ন দলের করা মিথ্যাচারের সীমা খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হয়ে গিয়েছিল। কে কী বলছে তা থেকে সিদ্ধান্ত টানা যায় না। কারণ দু’দিন আগে তারা এ বিষয়ে ঠিক উল্টো কথা বলে এসেছেন। নতুন করে তারা যা বলছেন তা কীভাবে জনগণ সত্য মনে করবেন!

১৭ নভেম্বর, ১৯৯৫ সালে শেখ হাসিনা এক ভাষণে বলেছিলেন, ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া অন্য ফর্মুলা মানব না। অন্যদিকে সেই সময়, ৯ ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৬ তারিখে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া বলেন, ‘দেশ ও জাতির অস্তিত্বের স্বার্থেই নির্বাচন হতে হবে।’ (সূত্র : দৈনিক বাংলা)।

কিন্তু এবারের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে দুই নেত্রীর বক্তব্য ছিল একেবারে বিপরীত। হুবহু একই কথা তারা বলেছেন একে অপরের মুখ থেকে ধার করে। কিন্তু এজন্য তারা কেউ তাদের আগের ভুল স্বীকার করেননি। দুই দফার বিপরীতমুখী বক্তব্যের মধ্যে জনগণ কোনটিকে গ্রহণ করবে, এটা তারা কেউ খোলাসা করেননি। এর মধ্য দিয়ে সুবিধামতো রাজনৈতিক মিথ্যাচার করা যাবে এমন প্রবণতা সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

গণজাগরণ মঞ্চ এবং হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ নিয়েও পাল্টাপাল্টি রাজনৈতিক মিথ্যাচার চলতে দেখা গেছে। যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার সর্বোচ্চ সাজার দাবিতে রাস্তায় নেমে আসা সমাজের নানা স্তরের মানুষের আন্দোলন সম্পর্কে ১৬ মার্চ, ২০১৩ বেগম খালেদা জিয়া বলেন, ‘শাহবাগ আন্দোলন নিরপেক্ষ নয়। এটি নাস্তিকদের চত্বর। এখানে আওয়ামী লীগ ঘরানার নষ্ট লোকেরা থাকে। সেখানে ফাঁসি ফাঁসি করে লাফানো হয়। গান-বাজনা ও নানা অপকর্ম করা হয়। নাস্তিকেরা বিভিন্ন ধর্মের বিরুদ্ধে কথা বলে। অথচ বলা হয়, সেটি না কি তরুণ-যুবকদের মঞ্চ। বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে ৫ কোটি যুবক রয়েছে। এসব মঞ্চে তার একভাগ যুবকও নেই। শাহবাগের তরুণরা আইন-আদালত-বিচার মানে না। তারা সরকারও মানে না। এই নষ্ট ও নাস্তিক তরুণদের নিয়ে সরকার নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে নানা অপকর্ম করছে।’

যারা গণজাগরণ মঞ্চে কম-বেশি গিয়েছেন বা এর সম্পর্কে খোঁজ খবর রেখেছেন, তারা এ বক্তব্যের অসারতা ধরতে পারবেন। সারা দিন ধরেই টেলিভিশনে গণজাগরণ মঞ্চের কর্মসূচি প্রচার হতো। সেখানে দেশের আপামর জনসাধারণের পাশাপাশি শ্রদ্ধেয় শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, গবেষকসহ সব স্তরের মানুষ অংশ নিয়েছেন এবং এক পর্যায়ে ফিরেও এসেছেন। কিন্তু খালেদা জিয়া একতরফা মিথ্যাচারই করলেন। গণজাগরণ সম্পর্কে জামায়াত-শিবিরের প্রেস রিলিজই আসলে খালেদা সেদিন পাঠ করেছেন। একই আচরণ দেখা গেছে হেফাজতের সমাবেশকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের বক্তব্যের ক্ষেত্রেও।

২০ জুন, ২০১৩ তারিখে হেফাজতের সমাবেশের প্রশ্নে শেখ হাসিনা বলেন, ‘সেদিন (৫ মে) কোনো গোলাগুলি বা সেরকম কোনো ঘটনাই ঘটেনি। তারা সেখানে গায়ে লাল রঙ মেখে পড়ে ছিল। পরে পুলিশ যখন তাদের ধরে টান দেয়, দেখা গেল উঠে দৌড়াচ্ছে।’

অথচ সরকারের পুলিশ ৭ মে বলেছে, ‘অভিযানে মারা গেছেন আটজন, তাদের একজন পুলিশ’ (সূত্র : প্রথম আলো, ৮ মে, ২০১৩)। ১২ মে, ২০১৩ তারিখে দৈনিক যুগান্তর খবর ছেপেছে, ‘৫ মের ওই অপারেশনে প্রায় ১ লাখ ৫৫ হাজার রাউন্ড গোলাবারুদ খরচ হয়েছিল। তবে এ গোলাবারুদের সিংহভাগই খরচ হয়েছিল ওই দিন দুপুর থেকে রাত ১০টার মধ্যে। রাত ২টা ৩১ মিনিটে শুরু হওয়া ‘অপারেশন সিকিউরিড শাপলা’য় খরচের পরিমাণ ছিল মোট গোলাবারুদের তিন ভাগের এক ভাগ। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।’ অথচ প্রধানমন্ত্রী বললেন, ‘কোনো গোলাগুলি ঘটেনি’। এদিকে বিএনপি নেতারাও তখন একই কায়দায় মিথ্যাচার করেছেন। তারা বলেছেন, পাখির মতো গুলি করে লাখো মানুষ হত্যা করা হয়েছে।

শুধু তা-ই নয়, রাজনৈতিক দলগুলো পাল্টাপাল্টি মিথ্যে কথা বলেছে এবং তা প্রশাসনকে দিয়েও করিয়েছে। ‘ক্রসফায়ার’ বা ‘বন্দুকযুদ্ধ’ এ শব্দগুলোর পেছনে থাকা প্রশাসনের বক্তব্য যে পুরোপুরি মিথ্যাচার, এটা বিভিন্ন আলাপ আলোচনায় উঠে এসেছে। অর্থাৎ ধারাবাহিকভাবে প্রশাসনও মিথ্যাচার করছে। দেশে যখন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতি ঘটছে, তখনও তারা বড় গলায় বলছে, সবকিছু নিয়ন্ত্রণে আছে। কোথাও কোনো সমস্যা নেই। বছর বছর লঞ্চ ডুবে মানুষ মারা যাচ্ছে। সরকারি দলের মন্ত্রী-এমপি ব্যবসায়ীরা মিথ্যাচার করছেন। লঞ্চ ডোবার আগ পর্যন্ত তারা বলছেন, সবকিছু নিয়মমাফিক করা হচ্ছে। আমাদের দিক থেকে কোনো ঘাটতি নেই। সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন মানুষ মরছে। ওদিকে মন্ত্রী বলছেন, সড়কে আমাদের মতো উন্নয়ন আর কেউ ঘটায়নি। প্রতি ঈদে হাইওয়েতে উঠে মানুষ যখন ভাঙা রাস্তায় পর্যুদস্ত, মন্ত্রী তখন বলেন, সব রাস্তা ঠিক করা হয়েছে। কোথাও কোনো সমস্যা নেই। ঈদে রাস্তা ঠিক আছে। বছর বছর কোরবানির পশু আনার ক্ষেত্রে ব্যাপারীরা সন্ত্রাসীদের কাছে জিম্মি থাকছেন, আর সরকার বলে দিচ্ছে চাঁদাবাজি নেই!

প্রতিশ্রুতি অস্বীকার
রাজনৈতিক মিথ্যাচারের পরিসর অনেক বিস্তৃত। রাজনৈতিক নেতারা বিভিন্ন স্থানে গিয়ে জনগণকে নানা ধরনের প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু এগুলো তারা পরে আর পালন করেন না। আইনের ভাষায় প্রতিশ্রুতিও এক ধরনের চুক্তি। যা ভঙ্গ করা অপরাধ। সাক্ষ্য প্রমাণ থাকলে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি প্রতিকার চেয়ে আদালতে যেতে পারেন। প্রতিশ্রুতি দিয়ে তা অস্বীকার করা হলে, এবং পরবর্তীতে প্রতিশ্রুতির সত্যতা প্রমাণীত হলে প্রতারণা ও মিথ্যাচারের অভিযোগ আনা যায়। এ প্রতারণার অভিযোগ প্রমাণ হলে শাস্তির বিধানও রয়েছে।

এদেশে রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতিশ্রুতি দেয়া এবং পরে তা অস্বীকার করার ইতিহাস বেশ লম্বা। সাম্প্রতিক কিছু বিষয়ের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এমন একটি ঘটনা হচ্ছে বিডিআর বিদ্রোহের পর বিডিআরদের দেয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিশ্রুতি। তিনি বিডিআর সদস্যদের সঙ্গে আলোচনায় তাদের আত্মসমর্পণ করলে ‘সাধারণ ক্ষমা’ ঘোষণার প্রতিশ্রুতি দেন। তার এই প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতেই বিডিআর সদস্যরা আত্মসমর্পণ করেন। কিন্তু পরবর্তীতে তাদের ক্ষমা করা হয়নি। বিডিআর সদস্যরা কী অপরাধ করেছিল, কেন করেছিল, তাতে কত বড় ভুল ছিল, কোথায় ন্যায্যতা ছিল, সে আলাপ দূরে ঠেলে অন্তত এটুকু বলা যায় যে, প্রধানমন্ত্রী ভবিষ্যতের জন্য বিরাট এক সংকট উপহার দিয়ে গেছেন। আগামীতে সত্যিকারের সাধারণ ক্ষমার ঘোষণায়ও কোনো যোদ্ধাদল আপসে আসবে না।

এরকম আরও অনেক ইস্যু আছে। পার্বত্য চুক্তির কথা বলা যায়। পার্বত্য শান্তিচুক্তির বাস্তবায়ন সরকার আজ পর্যন্ত করেনি। অথচ বারংবার তারা এ প্রতিশ্রুতি দিয়ে এসেছে। দিনাজপুরের ফুলবাড়ীর জনগণের কাছে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে বলা ‘এই চুক্তি না মানার পরিণাম হবে ভয়াবহ’ বলে জনগণের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি আজ আর তার মনে নেই। এখনও এশিয়া এনার্জি সেখানে তাদের দৌরাত্ম্য দেখাচ্ছে।

জ্বালানি খাতে কয়লা উত্তোলন নিয়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর নানা সময়ে নানা বক্তব্যও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের শামিল। বেশ কয়েকবার ‘কয়লা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রেখে দেয়া হবে’ বললেও আবার তার সরকারই নানা ধরনের তৎপরতা চালিয়েছে কয়লা উত্তোলনের বিষয়ে।

১০ টাকা কেজি চাল খাওয়ানো, ঘরে ঘরে চাকরি, একটি বাড়ি একটি খামার, এমন অনেক সরকারি প্রতিশ্রুতির কথা বলা যায়, পরবর্তীতে যা সরকারের নানা কেন্দ্র থেকে অস্বীকার করা হয়েছে। ২৯ ডিসেম্বর, ২০০৮ তারিখে আসন্ন সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সর্বশেষ ২৪ ডিসেম্বর বগুড়ার শেরপুর বাসস্ট্যান্ডের সমাবেশে দেয়া ভাষণে শেখ হাসিনা বলেন, ‘১০ টাকায় চাল খেতে হলে নৌকা মার্কায় ভোট দিন।’ দৈনিক জনকণ্ঠ ২৫ ডিসেম্বর এই খবরটি প্রকাশ করে।

অথচ নির্বাচনের কিছুকাল পর, ২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদে দেয়া ভাষণে ১০ টাকা কেজি দরে চাল খাওয়ানোর ঘোষণা সোজা অস্বীকার করেন প্রধানমন্ত্রী। বলেন, ওই ঘোষণা তিনি ১৯৯৬ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের আগে দিয়েছিলেন। বিরোধী দল নাকি সে ঘোষণাকেই ২০০৮ সালের ঘোষণা হিসেবে প্রচার করছে! ক্ষমতায় যাওয়া-আসা করা সব রাজনৈতিক দলের নেতাদেরই এ ধরনের কাজ করতে দেখা যায়, যা মানুষের একে অপরের প্রতি আস্থাহীনতা বাড়াচ্ছে।

মিথ্যাচারের শেষ নেই!
রাজনৈতিক মিথ্যাচারের সীমা সর্বত্র বিরাজমান। এটা অর্থনীতিকেও গ্রাস করেছে। আমাদের দেশের অনেক বিশ্লেষকই অভিযোগ করেন যে, সরকারের দেয়া তথ্যের ওপর নির্ভর করা যায় না। সরকার ভুল তথ্য দিয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি দেখানোর চেষ্টা করে। ২০১১ সালের জুলাইয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দাবি করেন, তার ক্ষমতার এই দুই বছরে নাকি দারিদ্র্য কমেছে ১০ ভাগ। কিন্তু বিশ্বব্যাংকের জরিপ তার কিছুদিনের মধ্যেই জানায়, ২০০৬ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত দারিদ্র্য হ্রাস পেয়েছে ৯ ভাগ। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ছিল মাত্র ২ বছর। (সূত্র : http://data.worldbank.org/indicator/SI.POV.NAHC/countries/BD?display=graph)

পদ্মা সেতু ও শেয়ারবাজার নিয়ে অর্থনৈতিক পরিসরে সরকারি তথ্যাবলিও চ্যালেঞ্জের মুখে। অনেকেই মনে করেন, সরকারের পক্ষ থেকে পদ্মা সেতুতে দুর্নীতি হয়নি, বিশ্বব্যাংকের ষড়যন্ত্র বলে যা প্রচার করা হয়, তা আসলে মিথ্যাচার। এমনকি শেয়ারবাজার নিয়ে সরকারের বক্তব্যকেও জনগণ একইভাবে দেখে।

২৪ আগস্ট, ২০১৪ তারিখে ‘সকালের খবর’ পত্রিকাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে আকবর আলি খান বলেন, ‘বাংলাদেশে এক সময় দারিদ্র্যের হার ৭০ শতাংশের মতো ছিল। এখন এ হার নেমে এসেছে ২৬ শতাংশে। কিন্তু এই কথাটা আমরা এত বেশি প্রচার করছি যে, এর ভেতরে থাকা দুর্বলতাগুলো আমরা মনে রাখছি না।… আমরা দুই ডলার করে আয় ধরে যদি মাপি তাহলে দেশের ৮০ শতাংশ মানুষ এখনও দারিদ্র্যসীমার নিচে আছে।’

২ এপ্রিল, ২০১৪ নিজের স্বায়ত্তশাসন নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছে মিথ্যাচার করেছে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। অথচ হল-মার্কের অর্থ আত্মসাৎ নিয়ে তার বক্তব্য- ‘চার হাজার কোটি টাকা তেমন কিছু নয়’ মানুষের কলিজায় এখনও বিঁধে আছে। ব্যাংকগুলোর দুর্নীতি নিয়েও সরকারপক্ষ সারাক্ষণ মিথ্যাচারে লিপ্ত থাকে।

অভিযোগ আছে, চাপে পড়ে এদেশে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারের ইচ্ছামাফিক প্রতিবেদন দেয়। আড়িয়ল বিলে বিমানবন্দর প্রকল্প, ফুলবাড়ীতে কয়লাখনি প্রকল্প, সুন্দরবনে কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে এ ধরনের অভিযোগ জোরেশোরেই উঠেছে।

১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৪ দেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসনের পক্ষে সংবিধানে থাকা নিয়ম সম্পর্কে ওইদিন সংসদে ভুল তথ্য দিয়েছেন আইন বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। তিনি বলেন, ‘সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেই স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার এ কাজ করতে পারেন। যখন রাষ্ট্রপতিকেই সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে অভিশংসন করা যায় সেখানে প্রধানমন্ত্রীকে অপসারণ করাতো একটি ভোটের ব্যাপার মাত্র।’

রানা প্লাজা-তাজরিনের মতো শিল্প বিপর্যয়ে সরকারের নেতা-মন্ত্রীরা যে ধরনের বক্তব্য রেখেছেন, তা মিথ্যাচারকে চূড়ায় পৌঁছে দিয়েছে। এর সূত্র ধরে জিএসপি হারানো, বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার বক্তব্য ও বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওঠা অভিযোগ সরকার যেভাবে বাতিল করেছে, তা-ও মানুষের কাছে মিথ্যা বলেই পরিগণিত হয়েছে।

শিক্ষা খাতও এ থেকে মুক্ত থাকতে পারেনি। প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা সবাই বললেও মন্ত্রী বলেছেন, এসব অভিযোগ অমূলক। মানুষ তাকেই অমূলক ভেবে নিয়েছেন। দেশের সংস্কৃতিপাড়াও এখন চলছে এই একই ধারায়। সম্পূর্ণ মিথ্যা তথ্য দিয়ে পণ্যের বিজ্ঞাপন দেয়া হয়, অথচ কোথাও এর প্রতিবাদ নেই। এভাবে রাজনৈতিক মিথ্যাচারের ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে পুরো জাতীয় জীবন এখন মিথ্যাচারকে মেনে নিয়েছে। মিথ্যাচারে কেউ কোথাও এমনকি অবাকও হচ্ছে না। সমাজ সম্পর্কে সাধারণ জ্ঞান থাকলেই অনুমান করা যায় যে, এটা আমাদের কোথায় নিয়ে দাঁড় করাবে।

পরিশেষে বলতে চাই, এটা খুব স্বাভাবিক যে, রাজনৈতিক মিথ্যাচার জনগণকে নীতিহীন হতে উদ্বুদ্ধ করছে। জনগণ দেখছে, যিনি শতকোটি টাকার মালিক, তিনি বলছেন আমি গরিব মানুষ, আমার কিছু নেই। রাজনৈতিক নেতাদের থেকে তারা শিখছেন, অন্যায় করাটা এদেশে স্বতঃসিদ্ধ। বড় অপরাধীরা এ সমাজে সবচেয়ে বেশি প্রতিষ্ঠিত। এটা জনগণকে ঠেলে দিচ্ছে সীমাহীন অন্ধকারের দিকে। শাসকশ্রেণীর এসব অন্যায় তৎপরতাকে সমাজের বিভিন্ন স্তরে উন্মোচিত করা না গেলে জনগণের বিকাশ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। যে শিশু ও তরুণেরা প্রতিদিন এসব মিথ্যাচারে অভ্যস্ত হচ্ছে, তারা কোন ভবিষ্যতের পথ দেখাবে, এটা এখনই আমরা আন্দাজ করে নিতে পারি। তাই এখনই সময় এই মিথ্যাচার রুখে দাঁড়ানোর।

রাজনৈতিক মিথ্যাচারের সাম্প্রতিক দলিলনামা : এখানে পাবেন।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১৩ thoughts on “রাজনৈতিক মিথ্যাচারের দলিল-দস্তাবেজ!

  1. গুরুত্বপূর্ণ একটি লেখা।
    গুরুত্বপূর্ণ একটি লেখা। মিথ্যাচার বাংলাদেশের নোংরা রাজনীতির অংশে পরিনত হয়েছে। তবে সবচেয়ে খারাপ লাগে দেশের জন্ম ইতিহাস নিয়ে কাউকে মিথ্যাচার করতে দেখলে।

  2. রাজনৈতিক শিষ্টাচার তো দূরে
    রাজনৈতিক শিষ্টাচার তো দূরে থাক,মানুষ হিসেবে রাজনীতিকরা নিজেদের সকল নীতি নৈতিকতার উর্দ্ধে ভাবছেন।অসম্ভব ভালো ও তথ্যবহুল লেখার জন্য ধন্যবাদ।

  3. আমি যখন হুললাম বঙ্গবন্ধু একজন
    আমি যখন হুললাম বঙ্গবন্ধু একজন বৈজ্ঞানিক ছিলেন তখন বুঝলাম চামচামি কাহারে কয়। মিথ্য সবসময় মিথ্যাই এর ব্যাপ্তিকাল খুব অল্প। সেটা যেই বলুক। হাসিনা যে ১৫নং সংশোধনি দিয়া রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সঙ্গাই পাল্টায়া দিল সেইটা লইয়া তো কেউ কিছুই কহে না। আমরা সবাই ভোদাই ওরাই শুদু চালাক।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

1 + 3 =