বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে পুরো উত্তরবঙ্গ!

?oh=6559d77333a7135c4ae1f22a0114f614&oe=55653196&__gda__=1432133233_2752361e7be5bee4c94121d369bad6f2″ width=”300″ />


?oh=6559d77333a7135c4ae1f22a0114f614&oe=55653196&__gda__=1432133233_2752361e7be5bee4c94121d369bad6f2″ width=”300″ />

১৭ জানুয়ারি রাত ন’টা। প্রায় ফাঁকা রাজধানীর কল্যাণপুর বাসস্ট্যান্ড। যাত্রী নেই বললেই চলে। অধিকাংশ কাউন্টারই বন্ধ। দোকানপাটগুলোর শার্টারও নামানো। নিম্নমানের দুই-একটি বাস ঠায় দাঁড়িয়ে। দীর্ঘ অপেক্ষার পরেও যাত্রী মিলছে না। যে বাসগুলো অপেক্ষা করছে, সেগুলোর আবার কাউন্টারও নেই কল্যাণপুরে। টানা অবরোধে পাল্টে গেছে কল্যাণপুর বাসস্ট্যান্ডের চিত্র। সন্ধ্যার পর থেকেই যেখানে সুপার, লাক্সারি, হিনো, ক্লাসিক, ইকোনোমিক, বিজনেস, এসি, নন এসি ব্র্যান্ডের শত শত চেয়ার কোচ দাঁড়িয়ে যাত্রী ওঠা-নামা করায়, সেখানে এদিন রাত সাড়ে ১১টা পর্যন্ত একটি চেয়ার কোচেরও দেখা মেলেনি।

উত্তরবঙ্গে যাত্রী পরিবহনের প্রতিটি বাস কোম্পানির কাউন্টার রয়েছে কল্যাণপুরে। অবরোধের কারণে গত ৪ জানুয়ারি থেকেই উত্তরবঙ্গের সকল রুটের বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে। সঙ্গত কারণে কাউন্টারও বন্ধ রাখতে হয়েছে মালিকদের।

শুধু কল্যাণপুর নয়, আসাদ গেট, শ্যামলী, টেকনিক্যাল, মাজার রোড, গাবতলীর কোনো কাউন্টার থেকেই টিকেট বিক্রি হচ্ছে না উত্তরবঙ্গের রুটগুলোর। প্রথম সারির প্রতিটি কোম্পানি বাস চলাচল বন্ধ রেখেছে অবরোধের শুরু থেকেই। অবরোধ না ওঠা পর্যন্ত বাস ছাড়বে না বলেও সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মালিকেরা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কল্যাণপুর থেকে প্রতিদিন হানিফ পরিবহনের নাটোর-রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ রুটে ২৯টি, বিরামপুর-ফুলবাড়ী-সেতাবগঞ্জ-দিনাজপুর রুটে ১৫টি, ঠাকুরগাঁও-পঞ্চগড়-তেঁতুলিয়া রুটে ৯টি, বগুড়া-রংপুর রুটে ১৯টি, কুড়িগ্রাম রুটে ৮টি, গাইবান্ধা রুটে ১৬টি এবং লালমনিরহাট বুড়িমারি রুটে ১টি করে বাস চলাচল করে।

এছাড়া উত্তরবঙ্গের জেলাভিত্তিক আরও কয়েকটি বাস চলে হানিফ পরিবহনের। শ্যামলী পরিবহন রংপুর রুটে ১৪টি, রাজশাহী রুটে ২৩টি, গাইবান্ধা রুটে ৮টি, বগুড়া-নওগাঁ রুটে ১৯টি, জয়পুরহাট রুটে ১০টি, ঠাকুরগাঁও রুটে ২টি, কুড়িগ্রাম রুটে ১টি, দিনাজপুর রুটে ১২টি এবং ঢাকা-শিলিগুড়ি রুটে একটি করে পরিবহন ছেড়ে যায়। একইভাবে ওইসব রুটগুলোতে সমানসংখ্যক বাসযাত্রী নিয়ে ফিরে আসে ঢাকায়।

হানিফ, শ্যামলীর মতো উত্তরবঙ্গের সব রুটে বন্ধ রয়েছে এসআর, ন্যাশনাল, দেশ ট্রাভেলস, আগমনী, খালেক, গ্রীন লাইন, বসুন্ধরা, মডার্ন, শাহআলী, নাবিল, বাবলু, টিআর, ডিপজল, সিলভার লাইনসহ উল্লেখযোগ্য কোম্পানিগুলোও। এই কোম্পানিগুলোই উত্তরবঙ্গে যাত্রী চলাচলের অন্যতম বাহন। অবরোধে এসব পরিবহন বন্ধ থাকায় রাজধানী থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে গোটা উত্তরবঙ্গ। এতে করে লাখ লাখ যাত্রী যেমন বিপাকে পড়েছে, তেমনি শত শত বাস বন্ধ থাকায় কোটি টাকার লোকসান গুনতে হচ্ছে পরিবহন মালিকদের।

দিনের বেলায় পুলিশ পাহারায় কিছুসংখ্যক নিম্নমানের বাস চলাচল করলেও তা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। আর রাতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যাত্রীরাই বাসে যাতায়াত করতে চাইছে না। পুলিশ পাহারাতেও যাত্রীদের আশ্বস্ত করা যাচ্ছে না। রংপুরের মিঠাপুকুরে পুলিশ পাহারার মধ্যেই বাসে দুষ্কৃতকারীদের দেয়া পেট্রলবোমায় শিশুসহ ৫ যাত্রী পুড়ে মরে। ওই ঘটনার পর উত্তরবঙ্গের যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক আরও বেড়ে গেছে বলে পরিবহন সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

বিএনপি-জামায়াতের ডাকা হরতাল-অবরোধে মূলত উত্তরবঙ্গেই বেশি প্রভাব পড়ে। বিশেষ করে জামায়ত-শিবির অধ্যুষিত যেমন সিরাজগঞ্জ, পাবনা, বগুড়ার শেরপুর, গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ-পলাশবাড়ী, রংপুরের মিঠাপুকুর, রাজশাহীর বানেশ্বর-বাইপাস, চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাট-শিবগঞ্জ, দিনাজপুরের সেতাবগঞ্জ, লালমনিরহাটের পাটগ্রাম, নীলফামারীর জলঢাকা স্পটগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিতে সর্বশক্তি প্রয়োগ করে আন্দোলনকারীরা। এখানে প্রশাসনও অসহায় হয়ে পড়ে। এই স্পটগুলোতেই হতাহতের ঘটনাও ঘটছে বেশি। আর উত্তরবঙ্গের জেলাগুলোতে যেতে চাইলে এসব জায়গার ওপর দিয়েই যেতে হয়। ফলে বিশেষ এই জায়গাগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়েই আন্দোলনকারীরা ঢাকা থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারছে বলে অনেকে মনে করছেন।

এ ব্যাপারে কথা হয় ‘হানিফ পরিবহন’-এর গাবতলী কাউন্টারের টিকেট মাস্টার রাজিবের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘অবরোধের পর আমরা কিছু রুটে স্বল্পসংখ্যক বাস ছেড়েছি বটে। কিন্তু উত্তরবঙ্গের প্রতিটি রুটে আমাদের পরিবহন সম্পূর্ণভাবে বন্ধ রয়েছে। আজ পর্যন্ত একটি গাড়িও ছাড়তে পারিনি। এর আগের হরতাল-অবরোধে আমাদের বেশ কয়েকটি বাস ভাংচুর, অগ্নিসংযোগের শিকার হয়। এ কারণেই মালিক আর ঝুঁকি নিতে চাইছেন না। রাস্তায় একটি পরিবহন নামাতে খরচ হয় ৭০ থেকে ৮০ লাখ টাকা। পুড়িয়ে দিলে তার আর এক পয়সা মূল্যও থাকে না। আপনি বাসের মূল্য নির্ধারণ করতে পারবেন, কিন্তু মিঠাপুকুরে যে ৫ জন যাত্রী পুড়ে মরল তার মূল্য কীভাবে নির্ধারণ করবেন।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে, শ্যামলী পরিবহনের এক ম্যানেজার বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিনিয়ত চাপ বাড়ছে। গোয়েন্দারা এসে ভয় দেখাচ্ছে। পুলিশ পাহারার কথা বলছে। ক্ষতিপূরণ দেয়ার কথাও বলছে। কিন্তু কোনোভাবেই উত্তরবঙ্গে বাস ছাড়তে পারছি না। কোটি কোটি টাকা লোকসান হচ্ছে, ব্যাংকের সুদ বাড়ছে। এরপরেও যাত্রীর জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাস চালানোর কোনো অধিকার আমার নেই।’

শুধু যাত্রী পরিবহনই নয়, পণ্য পরিবহনও চলছে না এসব রুটে। পঞ্চগড়ের বাংলাবান্ধা, দিনাজপুরের হিলি, লালমনিরহাটের বুড়িমারী, চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনামসজিদ স্থলবন্দরে শত শত পণ্যবাহী ট্রাক আটকা পড়েছে। যদিও পুলিশ পাহারায় কিছুসংখ্যক পণ্যবাহী ট্রাক পারাপারে চেষ্টা চলছে, তবে তা খুবই অপ্রতুল।

বুড়িমারী স্থলবন্দর ব্যবহারকারী সিএন্ডএফ এজেন্ট ব্যবসায়ী মাইদুল ইসলাম বলেন, ‘অবরোধের কারণে বুড়িমারী স্থলবন্দর এলাকায় খোলা মাঠে প্রায় ১ লাখ মেট্রিক টন কয়লা ক্রেতা সংকটের কারণে অবিক্রীত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। টানা অবরোধ-হরতালে সার্বিক নিরাপত্তাজনিত কারণে ক্রেতা সংকট সৃষ্টি হয়েছে। পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধিতে আরও সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। এ কারণে দামও কমেছে প্রতিটন কয়লায় প্রায় দেড় থেকে আড়াই হাজার টাকা।’

এমন বিপর্যয় ট্রেনের সিডিউলেও। ফলে যাত্রীদের ভোগান্তি, হতাহত, আর বাবসায়ীদের উপর্যুপরি লোকসানে দিশেহারা উত্তরবঙ্গবাসী। চলমান পরিস্থিতিকে সরকার স্বাভাবিক বললেও উত্তরবঙ্গের চিত্র সম্পূর্ণ আলাদা। যদিও সরকারের বক্তব্যেও রয়েছে শত স্ববিরোধিতা।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৫ thoughts on “বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে পুরো উত্তরবঙ্গ!

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

4 + = 12