ভিন্নমতের বিশ্বায়ন – অরুন্ধতী রায়

[মে ২০০৩-এ এই সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেন আমেরিকার অল্টারনেট রেডিও’র প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ডেভিড বারসামিয়ান। অরুন্ধতী রায়, দানবের রূপরেখা (The shape of the Beast)। অনুবাদ – হাসান মোরশেদ, প্রকাশক – শুদ্ধস্বর। গুরুত্বপূর্ণ এ লেখাটি ইস্টিশনের পাঠকদের উদ্দেশ্যে প্রকাশ করলাম। কারো কাজে লাগলে ভালো লাগবে।]

ডেভিড বারসামিয়ান : মার্চ ২০০২ এ গুজরাটের মুসলিম জনগোষ্ঠী পরিকল্পিত গণহত্যার শিকার হয়। এ বিষয়ে তোমার একটি লেখা আছে”Democracy : Who is she when she is at Home” গুজরাটে আসলে কি ঘটেছিল?

অরুন্ধতী রায় : ফেব্রুয়ারি ২০০২-এ উত্তর প্রদেশের নির্বাচন নিয়ে বিজেপি মেতেছিল এবং বরাবরের মতোই তারা তাদের তুরুপের তাস অযোধ্যায় রামমন্দির নির্মাণকে নির্বাচনী ইস্যু করেছিল। ফলে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা তাতিয়ে উঠছিল। বিজেপির লোকজন ট্রেনে করে অযোধ্যা যাচ্ছিল মন্দির নির্মাণ কর্মসূচিতে যোগ দেয়ার জন্য। সে সময় একমাত্র গুজরাটই ছিল গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য যার কারণে ক্ষমতায় বিজেপি। এই ক্ষমতাকে ব্যবহার করে চলছিল হিন্দু ফ্যাসিবাদের চূড়ান্ত প্রয়োগের প্রস্ততি।

ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে বিশ্বহিন্দু পরিষদ ও বজরং দলের কর্মীভর্তি একটি ট্রেন কে বা কারা থামিয়ে দেয় গোধরা স্টেশনের কাছে, রাতের অন্ধকারে। এই কর্মীরা অযোধ্যা যাচ্ছিল রামমন্দির নির্মাণ কর্মসূচিতে যোগ দিতে। একটা গোটা কম্পার্টমেন্ট জ্বালিয়ে দেয়া হয়, জীবন্ত দগ্ধ হয় ৫৮জন মানুষ।
প্রকৃত সত্যটা কেউই জানে না, এই নির্মম হত্যাকান্ডের জন্য কে দায়ী?

কিন্তু গোধরার ঘটনার ঘন্টাখানেকের মধ্যেই শুরু হয়ে যায় মুসলমানদের বিরুদ্ধে সংগঠিত গণহত্যা। কমপক্ষে ২০০০ মুসলমানকে হত্যা করা হয়, উদ্বাস্তু হয় অন্তত ৫০ হাজার। নারীদের প্রকাশ্য রাস্তায় গণধর্ষণ করা হয়। শিশুদের সামনে পিটিয়ে হত্যা করা হয় মা-বাবাকে। অন্তঃসত্ত্বা নারীর পেট চিরে ফেলা হয়।

কম্পিউটারে প্রিন্ট আউট নেয়া তালিকা ধরে ধরে মুসলমানদের দোকান-পাট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান লুট করা হয়, জ্বালিয়ে দেয়া হয়। ঘরবাড়ি, মসজিদ মাটিতে গুঁড়িয়ে দেয়া হয়। ট্রাকভর্তি হাজার হাজার গ্যাস সিলিন্ডার নিয়ে তারা ধ্বংসযজ্ঞে মেতে উঠে। এই প্রস্ততি কিন্ত আগে থেকেই নেয়া!

পুলিশ উন্মত্ত হিন্দু দাঙ্গাকারীদের প্রতিরোধে কিছু তো করেইনি বরং তাদের নিশ্চিন্তে ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে দিয়েছে।

এর কয়েকমাস পর গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্রমোদী স্পষ্টই বলেছে তারা আগাম নির্বাচন চেয়েছিল এবং ধারণা করেছিল এই মুসলিম গণহত্যা তাদেরকে হিন্দু ভোটারদের মন জয় করতে সাহায্য করবে।

ডেভিড বারসামিয়ান : এবং মোদীর ধারণাই সত্য, প্রমাণিত হয়েছে।

অরুন্ধতী রায় : এই গণহত্যার পর উপনির্বাচনে মোদীর জয়ী হয়ে আসা আমাদের অনেকের ভিত্তিমূল নাড়িয়ে দেবার মতো ঘটনা। এটা তো শুধু নরেন্দ্র মোদীর মতো একটা স্বৈরতান্ত্রিক খুনি নয় বরং একটা গোটা সরকার যারা গণহত্যার জন্য দায়ী, জনগণের ভোটে আবার তাদেরই নির্বাচিত হসে আসা! এই দায়, এই লজ্জা, এই অপরাধ আমাদের প্রত্যেকের।

কিন্তু এই ঘটনা যে একেবারে অনন্য তা তো নয়। তুমি এখানকার কথা ভাবো। জর্জ বুশ আমেরিকান জনগণের ভোটে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি যে পৃথিবীজুড়ে বোমা ছুড়ছে, মানুষ হত্যা করছে।

একটা শিশু একবার আমাকে প্রশ্ন করেছিল, ‘কে বেশি খারাপ? বুশ নাকি মোদী’? পালটা প্রশ্ন করেছিলাম ‘কেন এদের তুলনা করছো’? সে উত্তরে বলেছিল ‘বুশ অন্য দেশের মানুষ খুন করছে আর মোদী নিজের দেশের।’ একমাত্র শিশুদের পক্ষেই এরকম সরল সত্য উচ্চারণ সম্ভব। শেষপর্যন্ত আমি তাকে বলেছিলাম, ‘যে যেখানেই খুন হচ্ছে তারা সবাইই মানুষ’।

ডেভিড বারসামিয়ান : গুজরাট গণহত্যা কিছু জরুরি প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। একটা নির্দিষ্ট ধর্মীয় পরিচয়ের ২০০০ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে, অন্তত ৫০ হাজারকে উচ্ছেদ করা হয়েছে ভিটেমাটি থেকে, নারীদের প্রকাশ্যে গণধর্ষণ করা হয়েছে, অন্তঃসত্ত্বাদের পেট চিরে ফেলা হয়েছে- এইসব তথ্য যখন জানবে, ঘটনার বাইরের যে কেউ আঁতকে উঠবে। কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর সত্য হলো- যেখানে এই নৃশংসতা সংগঠিত হয়েছে সেখানকার বেশির ভাগ মানুষ বলবে ‘এটা তাদেও পাওনা ছিল’। এই ফ্যানাটিজমকে তুমি মোকাবেলা করবে কোন শক্তিতে?

অরুন্ধতী রায় : ১/১১ এর পর গুজরাটে মুসলিম গণহত্যা কোনো কাকতালীয় ব্যাপার নয়। ১১ সেপ্টেম্বরের হামলায় গুঁড়িয়ে যাওয়া ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের বিষাক্ত ধ্বংসাবশেষ যে কয়টি জায়গায় সরিয়ে আনা হয়েছে গুজরাট তার একটি। এখান থেকে পরে লুধিয়ানায় নিয়ে যাওয়া হবে রিসাইক্লিংয়ের জন্য। এটা একটা মেটাফোর বলতে পারো।

পৃথিবী জুড়ে মুসলমানদের হত্যার অনুমতি স্বয়ং সাম্রাজ্যপ্রধান মহান বুশ দান করেছেন। সুতরাং নরেন্দ্র মোদীর মতো খুনির জন্য এটা একটা সবুজ সংকেত। মুসলমানরা হত্যার যোগ্য!

আমরা এমন একটা সংকটময় মুহূর্তে আছি যেখানে গণতন্ত্র নামের এক বিষাক্ত মায়াজাল ছড়িয়ে সবধরনের অপকর্ম জায়েজ করে নেয়া হচ্ছে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে।

এই তথাকথিক গণতন্ত্র বাঁচিয়ে রাখতে নির্বাচন জরুরি। আর নির্বাচনে জয়ী হবার জন্য জরুরি বুশের সৈন্যের ইরাক দখল আর নরেন্দ্র মোদীর মুসলমান হত্যা। ১৯৮৪ সালে দিল্লিতে শিখ গণহত্যা চালানোর পর কংগ্রেস জয়ী হয়েছিল বিপুল ভোটে।
গণতন্ত্রের এই ঘরানা প্রসঙ্গে নিজেদের প্রশ্নবিদ্ধ করা আমাদের জন্য আসলেই খুব জরুরি এখন।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৩ thoughts on “ভিন্নমতের বিশ্বায়ন – অরুন্ধতী রায়

  1. লেখাটা গুরুত্বপূর্ণ ।বিজেপিরা
    লেখাটা গুরুত্বপূর্ণ ।বিজেপিরা ঐ গণহত্যার সাথে জড়িত তা পুরানা কাসুন্দি নয়।তারা সংখ্যাগুরু হিন্দুদের দৃষ্টি আকর্ষন করতেই যে ঐ দাঙ্গা বাঁধিয়েছিল সেটাও অপ্রকাশিত নয় ।
    বাবরি মসজিদ ভেঙ্গে সেখানে রাম মন্দির স্থাপন এটা ছিল বিজেপির রাজনৈতিক জয়ের চাল।
    সরল সহজ হিন্দুদের বোকা বানিয়ে ফয়দা লুটেছে বিজেপি ।
    ধন্যবাদ অরুন্ধুতি রায় এবং অনুবাদ কারীকে ।ধন্যবাদ আপনাকে লেখাটা ব্লগে প্রকাশ করার জন্য ।

  2. আমাদের দেশে অরুন্ধতি’র মত
    আমাদের দেশে অরুন্ধতি’র মত স্পষ্টভাষী লেখকের জন্ম কখনো হবে না মনে হয়।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 70 = 73