জাপান তার মুখোশ খুলে ফেলছে!

আগাগোড়াই তারা শক্তিমান এক জাতি। বিশ শতকের শুরুতে তারা সম্রাটের অধীনে এসে একটি সামরিক রাষ্ট্র দাঁড় করায়। জাপান তখন কোরিয়া, তাইওয়ান ও চীনের বেশির ভাগ অংশ দখল করে নিয়েছিল। ওই সময় জাপানের সম্রাটকে ঈশ্বর বলে বিবেচনা করা হতো এবং লোকেরা তাকে পূজা করত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে কোরীয় নারীদের যৌনদাসীতে পরিণত করে জাপ বাহিনী। এছাড়া তারা চীনে গণহত্যাও চালায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর চাপের মুখেই তারা প্রতিরক্ষা নীতি বদলায় এবং আত্মরক্ষামূলক নীতি (ডিফেন্সিভ পলিসি) গ্রহণ করে। সে অনুযায়ী এতদিন তারা চলেও এসেছিল। কিন্তু জাপানের নতুন প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই জাপানের আসল চেহারাটা দেখা দিতে শুরু করেছে। ধীরে ধীরে জাপান আক্রমণাত্মক প্রতিরক্ষা নীতির (অফেন্সিভ পলিসি) দিকে এগুচ্ছে।

শিনজো আবে একাই এ ধরণের পরিবর্তন সাধন করছেন বিষয়টা মোটেও তা নয়। জাপানের বৃহদাকৃতির বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পূর্ণ সমর্থন আছে তার ওপর। জনপ্রিয়তার তুঙ্গে আছেন এই নেতা। প্রায় ৫৬ ভাগ জনগণের সমর্থন রয়েছে এ মুহূর্তে তার। জাপানের হিসেবে এই পরিমাণ সমর্থন অনেক বেশী। শিনজো এই ক্ষমতাটা কাজে লাগাচ্ছেন যথার্থভাবে। জাপানকে সামরিকভাবে শক্তিশালী করার নানা ধরণের উদ্যোগ নিচ্ছেন তিনি।

গত ১৫ মে ২০১৪ আবে তার সরকারি কার্যালয়ে এক জনাকীর্ণ সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন, ‘আমি দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা দিতে চাই যে, জাপান শান্তির পক্ষে শক্ত অবস্থানে থাকবে। তবে জাতীয় নিরাপত্তানীতির অবশ্যই পরিবর্তন করতে হবে এবং এটা যুগের চাহিদা। জাপান পুনরায় আর কখনো একটি যুদ্ধবাজ দেশ হিসেবে বিশ্বে আত্মপ্রকাশ করবে না এটা যেমন সত্য এবং আমাদের কামনা, তেমনি প্রতিটি জাপানির নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও আমাদের দায়িত্ব।’

আবে আরো বলেন, ‘এজন্য প্রয়োজনে আমাদের বহুদিনের পুরনো সংবিধান পরিবর্তনের উদ্যোগ নিতে হবে। সাত দশক আগে রচিত (দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর) সংবিধানে জাপানের সমষ্টিগত আত্মরক্ষার অধিকার খর্ব করা হয়েছে। কিন্তু এখন আর সেটাকে চলতে দেয়া যায় না।’ তিনি নাম উল্লেখ না করে একটি নির্দিষ্ট দেশের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, ‘ওই দেশটি সবসময় জাপানের দিকে মিসাইল তাক করে রেখেছে। আমরা তা প্রতিহত করার মতো অধিকার আদায় করতে না পারলে আমাদের বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে।’

উল্লেখ করা দরকার যে, নিরাপত্তা নীতি পরিবর্তনের লক্ষ্যে আবে প্রশাসনের এটাই প্রথম উদ্যোগ নয়। এর আগে তারা বিস্তর হোমওয়ার্ক করেছেন। ২০০৭ সালে প্রথম বারের মতো যখন আবে ক্ষমতায় আসেন, সেই বছর মে মাসে জাতীয় নিরাপত্তানীতি পর্যালোচনা এবং পুনর্গঠনে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি উপদেষ্টা কমিটি গঠন করেন। সে সময় আবে প্রশাসন এক বছরের বেশি ক্ষমতায় থাকতে না পারায় উদ্যোগ আর বেশি এগুতে পারেনি। এরপর ২৬ ডিসেম্বর ২০১২ তে দ্বিতীয় বারের মতো ক্ষমতায় আসলে আবে আবার কাজে নামেন। ১৪ সদস্যবিশিষ্ট উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি গঠন করেন নিরাপত্তানীতি পুনর্গঠন পর্যালোচনায়। কমিটি ৭টি সভা করে অবশেষে ১৫ মে ২০১৪ প্রতিবেদন রিপোর্ট জমা দেন। প্রতিবেদন রিপোর্ট হাতে পেয়ে প্রধানমন্ত্রী আবে এই সংবাদ সম্মেলন করেন।

জাপানের সংসদে বিষয়টা দ্রুতই উঠতে যাচ্ছে। তবে আবের এই পদক্ষেপের বিরোধিতাও করছেন একাংশ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তারা দূর-দূরান্ত থেকে আবের সংবাদ সম্মেলনে ছুটে এসেছিল প্রতিবাদ জানাতে। এ সময় তারা ‘যুদ্ধ চাই না শান্তি চাই’, ‘আর কোনো যুদ্ধ নয়’, ‘যুদ্ধের নামে আমাদের সন্তানদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া চলবে না’, ‘সংবিধান মেনে চল, সংশোধন বন্ধ কর’ এবং ‘আবের পদত্যাগ চাই’ বলে শ্লোগান দিতে থাকেন। অংশগ্রহণকারীদের বেশিরভাগই ছিল ষাটোর্ধ্ব।

আবের উদ্যোগ এবং তাতে জাপানের কর্পোরেটদের সমর্থন ইঙ্গিত দেয় যে, জাপান নয়া প্রতিরক্ষা নীতির দিকে এগুচ্ছে। আত্মরক্ষার নীতিতে তারা আর থাকছে না। এক্ষেত্রে এক সময় জাপানের টুঁটি চেপে ধরা মার্কিনেরও খুব বেশি আপত্তি নেই। পার্শ্ববর্তী চীনকে শায়েস্তা করতে জাপান যতক্ষণ রাজী আছে ততক্ষণ মার্কিন তার পাশে থাকবে এটা বোঝাই যায়। জাপানকে তাই এখন আমেরিকা এক ধরণের উষ্কানী দিচ্ছে। গত বছরের শেষে, ২৬ ডিসেম্বর শিনজো আবে যুদ্ধাপরাধীদের সমাধিস্থল ইয়াসুকুনিতে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া কয়েক শ যুদ্ধাপরাধীকে এখানে সমাহিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৯৪৮ সালে মৃত্যুদণ্ডে মারা যাওয়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার জাপ বাহিনীর সর্বাধিনায়ক জেনারেল হাইডেকি তোজোও আছেন। এই ঘটনায় চীন আবেকে তিরষ্কার করলেও আমেরিকা একেবারেই চুপ ছিল।

এদিকে ২০১২ সালের ডিসেম্বরে আবে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই চীন জাপান উত্তেজনা ক্রমশ বেড়ে চলেছে। এ বছরের ৯ মার্চ চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই বলেছেন, ‘ভৌগোলিক সীমা এবং ইতিহাস নিয়ে আমাদের দেশের সঙ্গে জাপানের আপসরফার কোনো সুযোগ নেই। জাপানের হাত থেকে চীন তার প্রতি ইঞ্চি জমি রক্ষা করবে।’ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে ও পরে চীনা ভূখণ্ডের অংশবিশেষ দখল করে নিয়েছিল জাপান। পূর্ব চীন সাগরের বসতিহীন দ্বীপমালা দিয়াইউ বা সেনকাকু দ্বীপমালার মালিকানা নিয়ে গত ১৮ মাস ধরে জাপানের সঙ্গে চীনের টানাপড়েন চলছে। তার মধ্যেই জাপানের এই আক্রমণাত্মক প্রতিরক্ষা নীতির ঘোষণা।

জাপানের এই আক্রমণাত্মক মনোভাব দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক কাঠামোতেও বিরাট প্রভাব ফেলবে। মার্কিনের ক্ষমতা দুনিয়াব্যাপী কিছুটা কমেছে। জাপান সেটুকু দখলে নিতে চায়। সুতরাং আঞ্চলিক ঘুটিগুলো তারা এখন সচল করবে। আঞ্চলিক রাজনীতি ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটের হিসেবে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতই হচ্ছে জাপানের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র। জাপান আক্রমণাত্মক নীতি নিলে তাদের শক্তিও বাড়বে। নতুন নতুন সামরিক চুক্তি হতে পারে দু’ দেশের ভেতর। ভারতে নরেন্দ্র মোদী আর জাপানে শিনজো আবে এই জুড়ি একাট্টা হয়ে মাঠে নামলে তা হবে সকলেরই চিন্তার বিষয়। মোদি হিটলার অভিধা পেয়েছেন আগেই। সেটা যদি আবে দখল করে নেন তাহলে মোদিকে হয়তো দেখা যাবে মুসোলিনির ভূমিকায়।

ফ্যাঁসিবাদ দুনিয়াজুড়ে এগিয়ে আসছে। আগামী এক যুগের মধ্যে বিশ্বের মানচিত্রে অনেক রক্তক্ষয়ের আশঙ্কা দিনে দিনে পরিপক্ক হচ্ছে। এ পরিণতি মনে হয় না এড়ান যাবে। সকলের উচিত যার যার ক্ষেত্রে প্রস্তুতি নেয়া।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১৭ thoughts on “জাপান তার মুখোশ খুলে ফেলছে!

  1. এশিয়ায় সামরিক শক্তির দিক দিয়ে
    এশিয়ায় সামরিক শক্তির দিক দিয়ে এগিয়ে থাকা দেশগুলো পরস্পরের প্রতি বিরূপ মনোভাব প্রকাশ না করে বরং আত্মরক্ষামূলক নীতি ধারন করলেই এই মুহুর্তে মঙ্গল। মঙ্গল সার্বিকভাবে। নইলে বিশ্ব মোড়লদের গুঁতোগুঁতিতে এশিয়ার বর্তমান পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল হতে বেশি সময় লাগবে না।

    1. কিন্তু এ মূহুর্তে সারা
      কিন্তু এ মূহুর্তে সারা বিশ্বের ক্ষমতার সমীকরণটা এমন জায়গায় এসে পৌঁছেছে যে, চাইলেও তারা নীরব থাকতে পারবে না। অস্থিতিশীলতার দিকে ক্রমশ এগুচ্ছে বিশ্ব।

  2. আমরা একটা ত্রিভুজ প্রেমের
    আমরা একটা ত্রিভুজ প্রেমের জটিল কাহিনী দেখবো সামনে দুরপ্রাচ্যে। বিগত দুইটা জাপানী প্রজন্মে আমেরিকা প্রীতি খুব বেশী ছিল। একটা জাপানি মেয়ের পরম আরাধ্য ছিল আমেরিকান একটা বয়ফ্রেন্ড। শেষ এক দশকে আবহাওয়া বদলে গেছে। আমেরিকা বিদ্বেষ (পশ্চিমা বিদ্বেষ না কিন্তু) বাড়ার সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে রেসিজম, তার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে উগ্র জাতীয়তাবাদ। বলা চলে, মননে চিন্তায় জাপান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পুর্ব অবস্থায় ফিরে যাবার দ্বারপ্রান্তে।

    1. যা বলেছিস, এক প্রকার ঠিকই
      যা বলেছিস, এক প্রকার ঠিকই আছে। তবে এখন দুনিয়াজোড়া ফসিল ফুয়েলের শেষ যুগে পরাশক্তিগুলো তেল, গ্যাস, খনিজ সম্পদের ওপর আমেরিকার যে একচেটিয়া দখলদারিত্ব তার একটা রিসেটেলমেন্ট চাইছে। বহুজাতিক কোম্পানিগুলোই এই খেলার প্রধান ক্রীড়নক। তারাই ঘুটিবাজী শুরু করেছে। আবে ও মোদি তারই ফলাফল। আর আভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো ক্রমশ এ সমীকরণকে আরো জমাটবদ্ধ করে তুলছে।

      1. তবে এখন দুনিয়াজোড়া ফসিল

        তবে এখন দুনিয়াজোড়া ফসিল ফুয়েলের শেষ যুগে পরাশক্তিগুলো তেল, গ্যাস, খনিজ সম্পদের ওপর আমেরিকার যে একচেটিয়া দখলদারিত্ব তার একটা রিসেটেলমেন্ট চাইছে। বহুজাতিক কোম্পানিগুলোই এই খেলার প্রধান ক্রীড়নক। তারাই ঘুটিবাজীশুরু করেছে। আবে ও মোদি তারই ফলাফল। আর আভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো ক্রমশ এ সমীকরোণকে আরো জমাটবদ্ধ করে তুলছে।

        সহমত!

      2. বে এখন দুনিয়াজোড়া ফসিল

        বে এখন দুনিয়াজোড়া ফসিল ফুয়েলের শেষ যুগে পরাশক্তিগুলো তেল, গ্যাস, খনিজ সম্পদের ওপর আমেরিকার যে একচেটিয়া দখলদারিত্ব তার একটা রিসেটেলমেন্ট চাইছে। বহুজাতিক কোম্পানিগুলোই এই খেলার প্রধান ক্রীড়নক। তারাই ঘুটিবাজীশুরু করেছে। আবে ও মোদি তারই ফলাফল। আর আভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো ক্রমশ এ সমীকরোণকে আরো জমাটবদ্ধ করে তুলছে।

        এটাই মুল কথা।

  3. মোদি আর আবের জুটি যথেষ্ট নয়!
    মোদি আর আবের জুটি যথেষ্ট নয়! মার্কিন মুলুকে আরেকটা যুদ্ধবাজ শাসক জুটলেই কেল্লা ফতে হয়ে যাবে। চীন রাশিয়ার জোটের বিপরীতে এই জোট তখন কতটা অগ্রসর হয় তার ওপরই নির্ভর করবে সারা বিশ্বের ভবিষ্যত।

  4. এটা হবারি ক থা . তারা
    এটা হবারি ক থা . তারা অর্থনীতির. বড়শক্তি . তারা তো চাইবে সাম রিক দিক হতে শক্তি শালি হতে। ধ্ন্যবাদ সুন্দর. বিশ্লেষণ এর জন্য .

  5. সাংবাদিক হবার এই একটা সুবিধা
    সাংবাদিক হবার এই একটা সুবিধা খুব সহজেই বিভিন্ন বিষয় নিয়ে চমৎকার বিশ্লেষণ করা যায়।
    আপনার পোস্টের জন্য ধন্যবাদ।

  6. বর্তমান বৈশ্বয়িক রাজনীতিতে
    বর্তমান বৈশ্বয়িক রাজনীতিতে জাপানের অবস্থান নিয়ে এটি অসাধারণ বিশ্লেষন। আনিস ভাইকে সাধুবাদ জানাই চমৎকার বিশ্লেষনটির জন্য।

  7. জাপান হচ্ছে কচ্ছপের মাথার মত
    জাপান হচ্ছে কচ্ছপের মাথার মত একটা জিনিস। এতদিন মাথাটা ভেতরে লুকিয়ে রেখেছে, এখন ধীরে ধীরে বের করছে। মাথা পুরোটা বের হয়ে গেলে আমরা তার লকলকে জিহ্‌বা দেখতে পাব। যে জিহ্‌বায় এতদিনের ক্ষোভ জমা ছিল তা উদগীরন করবে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 55 = 58