‘১০ বছরের মধ্যে যাত্রাবাড়ীর ফ্লাইওভার ভাঙতে হবে’!!!

ঢাকা শহরের ফ্লাইওভারগুলো করার সময় বিল্ডিং অ্যাক্ট মানা হচ্ছে না। ফলে এগুলোর নির্মাণকালীন সময়ে স্থানীয় জনগণ দুর্ভোগে পড়ছে, ব্যবসায়ীরা লোকসান দিচ্ছে। তখন তারা আশা করছে যে, ফ্লাইওভারের কাজ শেষ হয়ে গেলে হয়তো এ দুর্ভোগ ও ক্ষতির অবসান ঘটবে। কিন্তু যে ফ্লাইওভারগুলো ইতোমধ্যে উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছে, সেগুলোর নিচে যত্রতত্র ব্যারিকেড, আইল্যান্ড, দুই স্তরের ফ্লাইওভার একই রাস্তা দিয়ে যাওয়ার ফলে নিচের রাস্তার ব্যবহার কমে যাওয়া, ফলে এসব স্থান অপরাধক্ষেত্রে পরিণত হতে শুরু করেছে। অনেক স্থানে ফ্লাইওভারের ওপর দিয়ে গাড়ি চললেও নিচের রাস্তা আজ অবধি মেরামত করা হয়নি। অধিকাংশ ফ্লাইওভারের নিচে রাবিশ জমে আছে। ফ্লাইওভারের নিচের আইল্যান্ডগুলো ময়লার স্তূপ, ডাস্টবিনে পরিণত হয়েছে। অপরিকল্পিতভাবে ফ্লাইওভার করায় নিচের ব্যবসা বাণিজ্য বন্ধ হয়ে গেছে।

?oh=1758245d437e9583d24a303dec2e5811&oe=55636510&__gda__=1432113832_4194fcdaa59692f4efc5ce42b639b7d5″ width=”400″ />
অব্যবস্থাপনার ফলাফল

সায়েদাবাদ সংলগ্ন এক তলা রাজধানী সুপার মার্কেট তো ফ্লাইওভারের নিচে ঢাকা পড়ে গেছে। মার্কেটটিতে ১৭৮৩টি দোকান রয়েছে। অধিকাংশ ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, তাদের বেচাকেনা অর্ধেক কমে গেছে। ফ্লাইওভার নির্মাণের সময় তারা লস দিয়েছেন, এখন ফ্লাইওভারের কাজ শেষ, তবু তাদের ক্ষতি হচ্ছে। ঢাকার বাইরে থেকে যাত্রাবাড়ী হয়ে এ মার্কেটে যে ক্রেতারা আসতো, তারা এখন ফ্লাইওভার দিয়ে সরাসরি গুলিস্তান চলে যাচ্ছে। পুরনো ঢাকার যে ক্রেতারা আগে এদিকে আসতো, ফ্লাইওভারের ফলে রাস্তাঘাট ঘুরে যাওয়ায় সেই ক্রেতাদের আসার হারও কমে গেছে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, এটা ঘটেছে ফ্লাইওভার নির্মাণের সময় নিচের এসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কথা বিবেচনা না করার ফলে।

?oh=d2ed543064595113bf318091f4061d87&oe=5552DEEC” width=”400″ />
ফ্লাইওভারের নিচের বেহাল দশা

সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে নগরবিদ, স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেছেন, একটা ফ্লাইওভার বানাতে পাঁচটা ফ্লাইওভারের অর্থমূল্যের সমান ক্ষতি হয়। তিনি জানান, সরকার বর্তমানে ঢাকায় যেসব ফ্লাইওভার বানাচ্ছে ও বানিয়েছে, এর কয়েকটি আগামী ১২ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে ভেঙে ফেলতে হবে। তার মতে, এসব ফ্লাইওভার নির্মাণে যে অর্থ ব্যয় হয়েছে, ফ্লাইওভার ভাঙতেও তার কাছাকাছি অর্থ ব্যয় হবে। সরকারের কর্মকান্ডে দীর্ঘমেয়াদি ভাবনা না থাকায় এবং সমন্বয়হীনতার কারণেই এসব ঘটছে।

বাংলাদেশের সরকারগুলোর উন্নয়ন তৎপরতার দিকে আঙুল তুলে এই নগরবিদ বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছি, ফ্লাইওভার নগরকে বিভাজিত করার কোনো উপাদান নয়। এটা চলাচল ব্যবস্থাকে সহজ করার জন্য নগরে একটি অতিরিক্ত সংযোজন। পৃথিবীর যে কোনো দেশে দেখবেন, রেলওয়ে মূল শহরের বাইরেই থাকে। তারপর যখন শহর বাড়তে বাড়তে রেললাইন ভেতরে চলে আসে, তখন তারা মাটির নিচে বা অনেক উপর দিয়ে রেল লাইন করে, এটা করা হয় যাতে কোনোভাবে শহর বিভাজিত না হয়ে পড়ে।

আমাদের ফ্লাইওভারগুলো সামগ্রিকতার ভিত্তিতে পরিকল্পনা করে, সবার সঙ্গে আলাপের মাধ্যমে গণশুনানী করে, প্রয়োজনীয় সমীক্ষা সেরে তৈরি হয়নি। নগর সরকার ব্যবস্থাপনা না থাকার ফলে এগুলোর সঙ্গে অন্যান্য উন্নয়ন প্রকল্পেরও কেনো সম্পর্ক নেই। ফ্লাইওভার একটা যদি বানায় সিটি করেপোরেশন, তো আরেকটা বানায় সড়ক ও জনপথ বিভাগ কিংবা রাজউক। এরা কাজ করার ক্ষেত্রে ফ্লাইওভারকে কেবল সংযোগ সড়ক হিসেবে, যানজট নিরসনের উপায় হিসেবেই বিবেচনা করে। ফলে আমরা সবগুলো ফ্লাইওভারের দিকে তাকালে একই চিত্র দেখব- এরা নগরকে খুব বাজেভাবে দ্বিখন্ডিত করেছে। নিচে এমনভাবে আইল্যান্ড করা হয়েছে যে, মানুষের স্বাভাবিক চলাচল ব্যবস্থাকে বন্ধ করা হয়েছে। আগে যে ব্যক্তির বাসা ছিল রাস্তার এপাশে আর ওপাশে ছিল দোকান, তার জীবন যাপনের ওপর এই ফ্লাইওভারটি একটি ছেদরেখা টেনে দিচ্ছে। এগুলো অন্যায়।’

তিনি আরো সুনির্দিষ্ট করে বলেন, ‘এরকম অন্যায় আপনি ফ্লাইওভার নির্মাণ কার্যক্রমের দিকে তাকালেই দেখতে পাবেন। ১৯৫৩ সালের বিল্ডিং অ্যাক্ট অনুযায়ী যে কোম্পানি প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে, বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থা করে জনজীবন নির্বিঘ্ন রাখার ব্যবস্থা তাদের নিতে হবে। এই ব্যয়টা ধরেই প্রকল্প অনুমোদন হয়। কিন্তু তারা এই ব্যয়টা করে না। টাকা মেরে দেয়।’

?oh=040466f86122b67b8f44ad07907cb986&oe=5566CCAE” width=”200″ />
স্থপতি ইকবাল হাবিব

প্রখ্যাত এই স্থপতি জোর দিয়ে বলেন, ‘আমি হিসাব করে দেখাতে পারবে যে, একটি ফ্লাইওভার বানাতে গিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য, মানুষের সময়, জনগণের স্বাস্থ্যগত ক্ষতি, গাড়ির ক্ষয় থেকে শুরু করে হিসাব করলে যে পরিমাণ ক্ষতি হয়, অর্থমূল্যে তার রূপান্তর ঘটালে ওই টাকায় পাঁচটা ফ্লাইওভার করা যাবে। এটা আমি জোর দিয়েই বলছি, একটা ফ্লাইওভার বানাতে পাঁচটা ফ্লাইওভারের অর্থমূল্যের সমান ক্ষতি হয়।’

এর কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘এই ফ্লাইওভারগুলো যে তারা করছে, এগুলোর কোনো সমন্বিত পরিকল্পনা নেই। ফলে ১০ বছরের মধ্যে ঢাকায় যখন এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, মেট্রোরেলসহ আরও অনেক প্রকল্প ঢুকবে, তখন যাত্রাবাড়ীর ফ্লাইওভার ভাঙতে হবে, এটা আমি নিশ্চিত। আর তখনো যেহেতু এসব স্থাপনার বন্ধন একেবারেই নতুন ও অটুট থাকবে, তাই এগুলো ভাঙার খরচও হবে অনেক।’

?oh=4bde7e6dae8dd550170fa86258d1dcd7&oe=554D2506″ width=”400″ />
ফ্লাইওভার হয়ে গেছে, রাস্তা মেরামত হয়নি

তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘তাহলে কেন জনগণের অর্থ ব্যয় করে এটা করা হলো? আগামী প্রজন্ম দেখবে, পূর্বসূরীরা অনেক টাকা ব্যয় করে কিছু জঙ্গল বানিয়েছে এবং তাদের বিকাশ রুদ্ধ করে দিয়ে গেছে।’

এরকম অন্যায়গুলো কেন ঘটছে তার কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘জবাবদিহিতার কোনো জায়গা নেই। নগর সরকার থাকলে বা এগুলো তদারকির জন্য সমন্বিত কোনো উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন পরিষদ থাকলে হয়তো বিষয়গুলোকে নিয়ন্ত্রণ করা যেত। কিন্তু তার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। জনদুর্ভোগের উন্নয়ন চলছেই। একে দুর্বৃত্তায়ন চাড়া কিছু বলা যায় না। অবশ্যই দৃশ্যমান এ উন্নয়নের রাজনৈতিক গুরুত্ব আছে। এজন্যই হয়তো বিনা বাধায় এই দুর্বৃত্তায়ন চলছে।’

ঢাকা শহরের বর্তমান অবস্থাকে মোকাবেলা করতে হলে ফ্লাইওভার নয়, বরং ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করা দরকার, এমনটা অনেকেই মনে করেন। কিন্তু সরকার তা না করে ফ্লাইওভারই বানাচ্ছে। এটাকে ইকবাল হাবিব রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের অংশ মানছেন। এই অবস্থার মধ্যে তার পরামর্শ হচ্ছে, ফ্লাইওভার করার সময় শুধু যানজটকে হিসাবে রাখলে তা অন্যদের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে এবং তাই ঘটছে। বড় বিপণী বিতান ও অন্যান্য বিষয়াদি মাথায় রেখে ফ্লাইওভারের ওঠা নামার লুপ বসানো হলে এই সমস্যাগুলো কিছুটা এড়ানো যেত।

তাছাড়া ফ্লাইওভারের নিচের সড়কের ব্যবস্থাপনা ও নির্মাণকাজ চলার সময় নাগরিক দুর্ভোগ প্রশমনের জন্য সরকারের আলাদা একটি বিভাগের প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে। দ্রুতই এ বিষয়গুলো আমলে নেয়া উচিত। নইলে অর্থনৈতিক গতিশীলতার যাত্রাকে পেছনমুখে ঠেলে দিতে পারে ফ্লাইওভার। উপরোক্ত তথ্যগুলো সেই নির্দেশনাই দিচ্ছে। এই অভিজ্ঞতা থেকে সরকারের শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৭ thoughts on “‘১০ বছরের মধ্যে যাত্রাবাড়ীর ফ্লাইওভার ভাঙতে হবে’!!!

    1. আপনি সাক্ষাৎকারটি মনে হয়
      আপনি সাক্ষাৎকারটি মনে হয় পড়েননি। পোস্টে লিংক দেওয়া আছে, পড়ে নিয়েন। তাছাড়া পোস্টেও স্পষ্টভাবেই নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেছেন-

      ‘এই ফ্লাইওভারগুলো যে তারা করছে, এগুলোর কোনো সমন্বিত পরিকল্পনা নেই। ফলে ১০ বছরের মধ্যে ঢাকায় যখন এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, মেট্রোরেলসহ আরও অনেক প্রকল্প ঢুকবে, তখন যাত্রাবাড়ীর ফ্লাইওভার ভাঙতে হবে, এটা আমি নিশ্চিত। আর তখনো যেহেতু এসব স্থাপনার বন্ধন একেবারেই নতুন ও অটুট থাকবে, তাই এগুলো ভাঙার খরচও হবে অনেক।’

  1. অবশ্যই দৃশ্যমান এ উন্নয়নের

    অবশ্যই দৃশ্যমান এ উন্নয়নের রাজনৈতিক গুরুত্ব আছে। এজন্যই হয়তো বিনা বাধায় এই দুর্বৃত্তায়ন চলছে।’

    এটাই হল আসল কথা। নেতারাই যখন দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন তখন দেশের উন্নয়নের জন্য নেতার ব্যাক্তিগত উন্নয়ন আগে প্রয়োজন। তাইতো এক সময় দেশের স্বার্থে ফ্লাই ওভার বানানো হয়েছে। এক সময় হয়তো দেশের স্বার্থে ভাঙ্গাও হবে। এই ফ্লাই ওভার ভাঙ্গার জন্য হয়তো এক সময় দেশি বিদেশী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে টেন্ডার আহ্বান জানানো হবে। মাননীয় মন্ত্রী মহোদয় দেশপ্রেমের পরিচয় দিয়ে টেন্ডার আহবান কারীদের কাছ থেকে কমিশন দাবী করবেন। ভাল তো । চলুক এরকম উন্নয়ন…

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

67 − 60 =