পলাতক মালিককে ধরে এনে অবরুদ্ধ করেছে শ্রমিকরা!

মহাখালির ওয়্যারলেস মোড়ে অবস্থিত জেমিনি গার্মেন্ট। প্রতি মাসেই বেতন নিয়ে এখানে টালবাহানা চলে। সাত তারিখের মধ্যে বেতন দেয়ার কথা থাকলেও বেতন পেতে কাউকে কাউকে ২০ তারিখ বা তারও বেশি অপেক্ষা করতে হয়। এর ওপর শ্রমিকরা গত মাসখানেক ধরে দেখছেন, যে কাজগুলো কারখানাতেই করা সম্ভব, তা না করে বাইরে পাঠানো হচ্ছে। মালিকপক্ষেরও কাজ নিয়ে তেমন উদ্বেগ নেই। শ্রমিকরা টের পাচ্ছিলেন ভেতরে ভেতরে কিছু হতে চলেছে। শোনা যাচ্ছিল, মালিকেরা গাজীপুর বাইপাসের পাশেই নতুন একটি গার্মেন্ট চালু করছে। কিন্তু শ্রমিকরা নিশ্চিত হতে পারেননি। দ্বিধা আর শঙ্কায় কাটছিল দিন।

অবশেষে ১০ তারিখ পেরুনোর পরেও গত জানুয়ারি মাসের বেতন নিয়ে যখন টালবাহান চলছিল, শ্রমিকদের উদ্বেগ আরও বেড়ে গেল। দু’ দিন না যেতেই, গত ১৩ তারিখে মালিকপক্ষ ঘোষণা দিল, গার্মেন্টটি তারা বন্ধ করে দিচ্ছেন। প্রাথমিকভাবে তারা জানালেন, বেতন চুকিয়েই কারখানা বন্ধ করা হবে। অধিকাংশ শ্রমিক সেদিন থেকে কারখানার ভেতরে বা আশেপাশেই আছেন। পরদিন ১৪ ফেব্রুয়ারি, শনিবার মধ্যরাতে শ্রমিকরা খবর পেলেন, দুই মালিক পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছে। তারা দ্রুত কর্মপরিকল্পনা ঠিক করলেন।

এরপর শ্রমিক ও কর্মচারীরা মিলে একটি দল নিয়ে মধ্যরাতে হানা দিলেন উত্তরায়। দুজন মালিককে তারা উত্তরার হাউস বিল্ডিং এলাকা থেকে ধরে নিয়ে আসলেন। দুই মালিক সেই শনিবার রাত থেকে এখনো কারখানার ভেতরে অবরুদ্ধ আছেন। কিন্তু সদা তৎপর গণমাধ্যম- টিভি চ্যানেল বা পত্রিকাগুলোতে এ নিয়ে তেমন কোনো খবর ছাপা হলো না। শ্রমিকরা জানালেন, বিভিন্ন পত্রিকা ও টিভির সাংবাদিকরা এসেছেন, কিন্তু টিভি বা পত্রিকায় খবর আসেনি। শ্রমিকদের খবর গণমাধ্যমে আসতে তিন দিন লেগে গেল। আজ সকালে আমরা খবর দেখলাম যে, দুই মালিককে অবরুদ্ধ করেছে শ্রমিকরা।

শ্রমিকদের দাবি খুবই ন্যায্য। তারা কাজ করেছেন, বেতন চান। পাশাপাশি আইনে বলা আছে, কাউকে হঠাৎ করে কাজ থেকে বিদায় দিতে হলে তিন মাসের বেতন-ভাতা পরিশোধ করতে মালিকরা বাধ্য। শ্রমিকরা তাদের এই ন্যায্য পাওনার জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন। গত তিনদিন ধরে দুই মালিক, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলুর রহমান ও পরিচালক আবুল কালাম আজাদকে অবরুদ্ধ করে রেখেছেন। নিজেরা ঐক্যবদ্ধভাবে কারখানার ভেতরে অবস্থান করছেন। এর মধ্যেই মালিকরা শ্রমিকদের কাছে স্বীকার করেছেন যে, তারা গাজীপুরের বাইপাসে একটি নতুন কারখানা করছেন। মার্কেটের ওপর হওয়ায় এবং আনুষঙ্গিক আরও অনেক সুবিধা না থাকার কারণে এই কারখানাটি কমপ্লায়েন্স পায় না। কমপ্লায়েন্স হলে বিদেশি বায়ারদের কাছ থেকে সরাসরি কাজ পাওয়া যায়, যাতে লাভ বেশি। তাই তারা নতুন কারখানার মেশিনপত্র কিনছেন, ওটা দাঁড় করাচ্ছেন, সেজন্যই এখানে কাজে ভাটা পড়েছে।

?oh=5265dbd0ac7b4d3447dbeffdfab67b4c&oe=5559EBDF&__gda__=1430956868_9b89437b8528370c30940eb041d35d4e” width=”400″ />
আজ বেলা সাড়ে বারোটার দিকে শ্রমিকরা যখন দুপুরের খাবার খেতে নামছেন

আজ বেলা ১২ টার দিকে আমরা কারখানাটিতে যাই। শ্রমিকদের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলি। তাদের পরিকল্পনার কথা জানতে চাই। বিজিএমইএ যদি নগদ বেতন না দিয়ে তারিখ দেখিয়ে আশ্বাস দেন, তাহলে তারা কি করবেন সে সম্পর্কে তাদের কাছে জানতে চাই। এক্ষেত্রে আমরা তাদের পুরনো অভিজ্ঞতাও স্মরণ করিয়ে দেই- সাধারণত দেখা যায় যে, মালিকরা এরকম একটা তারিখ দেয়। পরে সেই তারিখে বেতন হয় না। আর তারিখ দেয়ার পরে যদি শ্রমিকরা অবরুদ্ধ মালিকদের না ছাড়তে চায়, তাহলে তারা পুলিশ নিয়ে চড়াও হয়।

জবাবে কারখানার শ্রমিকরা জানান, ‘আমরা বেআইনি কোনো দাবি করিনি। আমাদের যা পাওনা তা চেয়েছি। আমরা পুলিশকে জানিয়েছি। জিডি করেছি। তার পরেও যদি তারা আমাদের বেতন না দিয়ে উল্টো আমাদের ওপরে নির্যাতন চালায়, তাহলে আমরা আরও কঠোর কর্মসূচীর দিকে যাব।’ তারা আরও জানান, ‘ইতোমধ্যেই এরকম নানা তৎপরতা মালিকরা দেখিয়েছে। তারা একবার বলেছেন, কারখানা চলবে। এদিকে ভবন মালিক কারখানা মালিককে চলে যাওয়ার নোটিশ দিয়েছেন, এটাও আমরা জানি। তারা ব্যাংকে লোক পাঠানোর কথাও বলেছেন। এরকম নানা কথা নানা সময় বলা হচ্ছে। টাকা না পেলে আমরা তাই কোনো কথায় বিশ্বাস করি না। ম্যানেজিং ডিরেক্টর সাহেবের কথাবার্তার এমনিতেই ঠিক নাই। আমরা তাদের বিশ্বাস করি না।’

পরিস্থিতি দেখে আমাদের মনে হলো, শ্রমিকরা বড় নিঃসঙ্গ আন্দোলন চালাচ্ছেন। টেক্সটাইল গার্মেন্ট ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সঙ্গে যুক্ত কিছু শ্রমিক এখানে আছেন। এর বাইরে শহুরে মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবীরা ও শ্রমিক অধিকার সংশ্লিষ্ট সংগঠন ও রাজনৈতিক দলগুলো এখনো তাদের পাশে দাঁড়ায়নি। গণমাধ্যমগুলোর কথা তো আগেই বলেছি। সর্বস্তরের জনগণের ও জন অধিকার প্রতিষ্ঠাকামী সংগঠনগুলোর উচিত দ্রুতই শ্রমিকদের ন্যায্য আন্দোলনের পাশে দাঁড়ানো। শ্রমিকরা পলাতক মালিকদের ধরে এনে তাদের স্পিরিটের প্রমাণ দিয়েছেন। বাকিরা এবার এই ন্যায্য আন্দোলন এগিয়ে নিতে হাত বাড়ান। সবার প্রতি এই একটাই আহবান।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১১ thoughts on “পলাতক মালিককে ধরে এনে অবরুদ্ধ করেছে শ্রমিকরা!

  1. সর্বস্তরের জনগণের ও জন অধিকার

    সর্বস্তরের জনগণের ও জন অধিকার প্রতিষ্ঠাকামী সংগঠনগুলোর উচিত দ্রুতই শ্রমিকদের ন্যায্য আন্দোলনের পাশে দাঁড়ানো। শ্রমিকরা পলাতক মালিকদের ধরে এনে তাদের স্পিরিটের প্রমাণ দিয়েছেন। বাকিরা এবার এই ন্যায্য আন্দোলন এগিয়ে নিতে হাত বাড়ান। সবার প্রতি এই একটাই আহবান।

    মনের কতা খুইল্লা কচা লস্করের বাপ!

    1. তিনদিন ধরে মালিকদের আটকে
      তিনদিন ধরে মালিকদের আটকে রেখেও শ্রমিকরা মিডিয়ার নজর পায় নাই, এটা মিডীয়ার চরিত্র বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটা ঘটনা। এই মিডীয়াগুলার কি করা যায়?

  2. শ্রমিকরা পলাতক মালিকদের ধরে

    শ্রমিকরা পলাতক মালিকদের ধরে এনে তাদের স্পিরিটের প্রমাণ দিয়েছেন

    আমার ধারনা এটি অন্য সব কারখানার মালিকদের জন্য মারাত্নক সতর্ক বার্তা হিসেবে কাজ করতে পারে। শ্রমিকদের এই জাতীয় ন্যায্য প্রতিবাদের পর্যাপ্ত প্রচার তাই অত্যন্ত জরুরী। মুল ধারার মিডিয়াগুলোর নীরবতা অত্যন্ত রহস্যজনক বলে মনে হচ্ছে।

      1. সহমত। এদেশের মিডিয়ার ব্যবসা
        সহমত। এদেশের মিডিয়ার ব্যবসা অত্যন্ত লাভজনক । তাই এ ব্যাবসাও দুর্নীতিবাজ আর অসৎ ব্যবসায়ীদের দখলে। এদের কারনেই এই জাতীয় ন্যায্য প্রতিবাদের পর্যাপ্ত প্রচার হয় না।

      2. খোঁজ নিলে দেখা যাবে, অধিকাংশ
        খোঁজ নিলে দেখা যাবে, অধিকাংশ মিডিয়া মালিকই গার্মেন্ট ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। সমকাল ও চ্যানেল ২৪ এর মালিকের কারখানা হামীম গ্রুপ।

    1. এটা তাদের নিরপেক্ষতা ও
      এটা তাদের নিরপেক্ষতা ও সত্যভাষণের ভন্ডামীপূর্ণ সব শ্লোগানের ওপর দলীয় বশ্যতার শ্লোগানকে অধিষ্ঠিত করেছে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

87 − = 85