প্রসঙ্গঃ সূফীবাদ এবং সংশ্লিষ্ট বিভ্রান্তি

সূফীবাদের উন্মেষকালে সূফীরা তাঁদের মতবাদ নিয়ে ছড়িয়ে পড়তেন দেশে দেশে। এবং নিজে নিজের মত প্রচার করতে লাগলেন। তাঁদের মধ্যে অনেকে ভারতবর্ষেও আসেন। তবে ভারতবর্ষে যাঁরা মতপ্রচার তাঁরা প্রত্যেকেই শ সম্প্রদায়ভুক্ত। এরা সুফিবাদ প্রচার করতে আসেননি। এসেছিলেন ইসলাম এর প্রচার করতে। কারণ, ভারত হল ইসলামের আদি পিতা আদম এর জন্মস্থান। আর সেখানেই মূর্তিপূজা সর্বাধিক প্রচলিত। এখানকার ভূমি পুন্যভূমি। এখানকার মানুষ জ্ঞানী। তাই ইসলামকে পৌত্তলিকতা মুক্ত রাখতে গেলে ভারতবর্ষকে দখল না করে তা করা যাবে না। ভারতে আগমনকারী সূফীদের প্রধান সম্প্রদায়গুলি আমরা দেখে নেব। এবং এরই মধ্যে আমরা বিচার করে দেখে নেব যে, এদের মধ্যে প্রকৃত সূফীবাদের কোন বৈশিষ্ট্যগুলো ছিল।

প্রশ্ন হতে পারে এখানে কি সুক্‌র্‌ সূফী একজনও আসেননি নিজ মত প্রচারে? হয়ত এসেছিলেন। কিন্তু ইসলামী শাসকদের অনুগ্রহ তাঁরা পাননি বলেই তারা আস্তে আস্তে বিলুপ্ত হয়ে যান। বাকিরা ইসলামী শাসকদের সাথে হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করতেন ভারতকে ইসলামের অন্তর্ভুক্ত করার জন্য।

ভারতে যে কয়টি সূফী সম্প্রদায় এসে নিজ নিজ মতের প্রচার চালায়, তারা ঠিক কতটা নিজ মতের প্রচার চালায় তা আমরা পরে আলোচনা করব। ভারতে প্রচারকারী মোট আটটি সম্প্রদায়ের কথা সবিস্তার জানা যায়। এদের মধ্যে নিম্নোক্ত তরীকাগুলি খুব বেশি জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল।

সুফীবাদের বিভিন্ন তরীকার বিবরণ

সুফীদের রয়েছে বিভিন্ন তরীকা। স্থান ও কাল অনুযায়ী অসংখ্য সুফী তরীকা আত্ম প্রকাশ করার কারণে এর সঠিক সংখ্যা নির্ধারণ করা কঠিন। আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশে অসংখ্য সুফী করীকা আত্ম প্রকাশ করেছে। তার মধ্যে নিম্নের কয়েকটি তরীকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রায়ই সুফী তরীকার পীর ও মুরীদদের মুখে এ সমস্ত তরীকার নাম উচ্চারণ করতে শুনা যায়। এ সমস্ত তরীকা হচ্ছেঃ

১) কাদেরীয়া তরীকাঃ আব্দুল কাদের জিলানীকে (মৃত ৫৬১ হিঃ) এ তরীকার প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে সুফীরা দাবী করে থাকেন। কিন্তু নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ ও তার জীবনী অধ্যায়ন করলে জানা যায় যে, তিনি কোন তরীকা প্রতিষ্ঠা করে যান নি। তার নামে যে সমস্ত কারামত বর্ণনা করা হয় তা সম্পূর্ণ বানোয়াট ও ভিত্তিহীন।

২) নকশবন্দীয়া তরীকাঃ মুহাম্মাদ বাহাউদ্দীন নকশবন্দীকে (মৃত ৭৯১ হিঃ) এই তরীকার প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

৩) চিশতিয়া তরীকাঃ খাজা মঈন উদ্দীন চিশতীকে (মৃত ৬২০ হিঃ) এ তরীকার প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ভারতের আজমীরে তার মাজার রয়েছে। হিন্দু-মুসলিম সকলেই এ মাজার যিরারত করে থাকে।

৪) মুজাদ্দেদীয়া তরীকাঃ মুজাদ্দে আলফে ছানীকে (মৃত ১০৩৪ হিঃ) এই তরীকার প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে দাবী করা হয়।

৫) সোহরাওয়ার্দী তরীকাঃ শিহাব উদ্দীন উমার সোহরাওয়ার্দীর (মৃত ৬৩২ হিঃ) নামে এই তরীকাটির নিসবত করা হয়। এই পাঁচটি তরীকার নামই আমাদের দেশের সুফীদের মুখে ব্যাপকভাবে উচ্চারণ করতে শুনা যায়।

এই নিয়ে আরও বিস্তারিত আলোচনা না করে আমরা মূল বক্তব্যের দিকে এগিয়ে যেতে পারি। আমরা দেখলাম, যে সব সূফী ঘরানা ভারতে তাঁদের মত প্রচার করেছিলেন, তাঁরা প্রত্যেকেই হিন্দু-বৌদ্ধদের ঘৃণার চোখে দেখতেন। তাদের ধর্মান্তরিত হতে বাধ্য করতেন, কখনো লোভ কখনো ভয় দেখিয়ে। এবং এই একই ফরমুলাতে তাঁরা রাজানুগ্রহ ও জনপ্রিয়তা লাভ করতেন। এবং যে সব সূফী তা না করতেন, তাঁদের তা করাতে বাধ্য করা হত। নয়ত তাদের বিলুপ্তি ঘটতো।

ভারতে এইসব প্রচারক শ্রেণীর বৈশিষ্ট্যগুলি আমরা দেখে নেব। বোঝার চেষ্টা করব, এদের মধ্যে প্প্রকৃত সূফীবাদের কোন বৈশিষ্ট্যগুলো ছিল।।

প্রথমত, প্রথম পর্যায়ের সূফীরা ইসলামের মূলধারার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতেন। কিন্তু এরা কখনই তা করেননি। নিজামুদ্দিন আউলিয়া বলেছেন, “উলেমারা যে কাজ করতে চান বক্তৃতা দ্বার , আমরা তা করে দেখাই আচরণ দ্বারা।”

দ্বিতীয়ত, প্রথম পর্যায়ের সূফীরা শাসকশ্রেণীর নেক নজরে কোনোদিনই ছিলেন না। কিন্তু এঁরা শাসকশ্রেনীর সাথে হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করতেন ভারতকে ইসলামী রূপ দিতে।
তৃতীয়ত, প্রথম পর্যায়ের সূফীরা কখনই রাজনীতিতে মন দেননি। কিন্তু এঁরা সর্বদাই প্রত্যক্ষ রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন।

চতুর্থত, প্রথম পর্যায়ের সূফীরা ছিলেন মুলত শাসক শ্রেণী। কিন্তু এঁদের নিজস্ব সৈন্যবাহিনী ছিল। এবং ইসলামী শাসকদের তাঁরা সাহায্য করতেন অমুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে।

পঞ্চমত, প্রথম পর্যায়ের সূফীদের বিষয়বাসনা ছিল না। তারা ঘৃণাভরে সেসব প্রত্যাখ্যান করতেন। কিন্তু এঁরা যুদ্ধজয়ের পর ইসলামী শাসকদের কাছ থেকে গনিমতের প্রচুর সম্পদ গ্রহণ করতেন ।

সর্বোপরি, প্রথম পর্যায়ের সূফীরা ইসলামের মূলধারায় চলে আসা মুসলিমদের নিজ মতে দীক্ষিত করে মূলধারা থেকে সরিয়ে আনতে চাইতেন। কিন্তু ভারতের সূফীরা নিজ মতে দীক্ষিত না করে অমুসলিমদের ইসলামে দীক্ষিত করতেন।

প্রচলিত সুফীবাদের কতিপয় বিভ্রান্তিঃ
সুফীবাদের যেহেতু বিভিন্ন তরীকা রয়েছে তাই তরীকা ও মাশায়েখ অনুযায়ী তাদের রয়েছে বিভিন্ন আকীদা ও কার্যক্রম। নিম্নে আমরা অতি সংক্ষেপে তাদের কতিপয় আকীদা ও বিশ্বাসের কথা উল্লেখ করবো। তবে এখানে মনে রাখতে হবে যে, সুফীবাদের সকল সমর্থকের ভিতরেই যে নিম্নের ভুল-ভ্রান্তিগুলো রয়েছে তা বলা কঠিন।

• الحلول হুলুল এবং وحدة الوجود ওয়াহদাতুল উজুদঃ
সুফীদের যে সমস্ত ইসলাম বিরোধী আকীদাহ রয়েছে, তার মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্টি আকীদাহ (বিশ্বাস) হচ্ছে, عقيدة الحلول والاتحاد আকীদাতুল হুলুল ওয়াল ইত্তেহাদ।
সুফীদের কতিপয় লোক হুলুল তথা সৃষ্টির মধ্যে আল্লাহর অবতরণে বিশ্বাস করে। হুলুল-এর সংজ্ঞায় আলেমগণ বলেনঃ
أما الحلول فمعناه (عند الصوفية) أن الله يحل في بعض مخلوقاته ويتحد معهاكاعتقاد النصارى حلوله في المسيح عيسى ابن مريم واعتقاد بعض الناس حلوله في الحلاج وفي بعض مشايخ الصوفية

হুলুল এর তাৎপর্য হচ্ছে, আল্লাহ তাআলা তাঁর কতিপয় সৃষ্টির মধ্যে অবতরণ করেন এবং তার সাথে মিশে একাকার হয়ে যান। যেমন খৃষ্টানদের ধারণা যে, ঈসা ইবনে মারইয়ামের মাধ্যমে আল্লাহ অবতরণ করেছিলেন। সুফীদের কতিপয় লোকের বিশ্বাস হচ্ছে প্রখ্যাত সুফী সাধক মানসুর হাল্লাজ এবং অন্যান্য কতিপয় সুফী সাধকের মধ্যে আল্লাহ অবতরণ করেছেন। নাউযুবিল্লাহ। এটি যে একটি কুফরী বিশ্বাস তাতে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই।
আল্লাহ তাআলা বলেনঃ
وَمَا قَدَرُوا اللَّهَ حَقَّ قَدْرِهِ وَالْأَرْضُ جَمِيعًا قَبْضَتُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَالسَّماوَاتُ مَطْوِيَّاتٌ بِيَمِينِهِ سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى عَمَّا يُشْرِكُونَ

তারা আল্লাহ্‌কে যথার্থরূপে বুঝে নি। কিয়ামতের দিন গোটা পৃথিবী থাকবে তাঁর হাতের মুঠোতে এবং আসমানসমূহ ভাঁজ করা অবস্থায় থাকবে তাঁর ডান হাতে। তিনি পবিত্র। আর এরা যাকে শরীক করে, তা থেকে তিনি অনেক উর্ধ্বে। (সূরা যুমারঃ ৬)

মানসুর হাল্লাজকে তার যুগের খলীফা চারটি কারণে হত্যা করেনঃ
১) أنا الحق আনাল হক্ক বলার কারণে তথা রুবুবীয়াত ও উলুহীয়াতের দাবী করার কারণে।
২) ইসলামী শরীয়তে নিষিদ্ধ যাদু চর্চা করার কারণে।
৩) শরীয়তের ফরজ বিষয়সমূহ অস্বীকার করার কারণে। মানসুর হাল্লাজ থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বলেছেনঃ কোন ব্যক্তি হজ্জ করতে চাইলে সে যদি তার বাড়িতে একটি ঘর নির্মাণ করে হজ্জের মৌসুমে তার তাওয়াফ করে তাতেই যথেষ্ট হবে।
৪) কারামেতা তথা বাতেনী সমপ্রদায়ের প্রতি আহবান জানানোর কারণে। কারামেতা সমপ্রদায় প্রকাশ্যে ইসলামের কথা বললেও তারা ছিল মূলতঃ গোপনে অগ্নিপূজক। এই সমপ্রদায় ৩১৯ হিজরী সালে কাবা ঘরে হামলা চালিয়ে হাজীদেরকে অকাতরে হত্যা করেছিল, যমযম কূপ ধ্বংস করে দিয়েছিল এবং হাজরে আসওয়াদ চুরি করে নিয়ে ছিল। ২০ বছর পর্যন্ত মুসলিমগণ হাজরে আসওয়াদ বিহীন কাবা ঘরের তাওয়াফ করেছে।

অপর পক্ষে সুফীদের আরেক দল ওয়াহদাতুল উজুদে বিশ্বাসী। ওয়াহ্‌দাতুল উজুদের এর তাৎপর্য হচ্ছে
وأما الاتحاد فمعناه (عند الصوفية) أن عين المخلوقات هو عين الله تعالى
সৃষ্টি এবং স্রষ্টা একই জিনিষ। অর্থাৎ সৃষ্টিজীব এবং আল্লাহ তাআলার মধ্যে কোন পার্থক্য নেই, উভয়ই এক ও অভিন্ন। ইবনে আরাবী এ মতেরই সমর্থক ছিল। তার মতে পৃথিবীতে যা আছে সবই মাবুদ। অর্থাৎ সবই সৃষ্টি এবং সবই মাবুদ। এ অর্থে কুকুর, শুকর, বানর এবং অন্যান্য নাপাক সৃষ্টিও মাবুদ হতে কোন বাঁধা নেই। সুতরাং তার মতে যারা মূতি পূজা করে তারা আল্লাহরই এবাদত করে। (নাউযুবিল্লাহ)

ইবনে আরাবীর মতেঃ
إن العارف المكمل هو من يرى عبادة الله والأوثان شيء واحد
অর্থাৎ পরিপূর্ণ মারেফত হাসিলকারীর দৃষ্টিতে আল্লাহর এবাদত ও মূর্তিপূজা একই জিনিস।

ইবনে আরাবী তার কবিতায় বলেনঃ
العبد رب والرب عبد * يا ليت شعري من المكلف
إن قلت عبد فذلك حق * أو قلت رب فأنى يكلف
বান্দাই প্রভু আর প্রভুই বান্দা। আফসোস যদি আমি জানতাম, শরীয়তের বিধান কার উপর প্রয়োগ হবে। যদি বলি আমি তাঁর বান্দা তাহলে তো ঠিকই। আর যদি বলি আমিই রব তাহলে শরীয়ত মানার প্রয়োজনীয়তা কোথায়? উপরোক্ত কারণ এবং আরও অসংখ্য কারণে আলেমগণ ইবনে আরাবীকে গোমরাহ বলেছেন। সৃষ্টি এবং স্রষ্টা কখনই এক হতে পারে না।

আল্লাহ ব্যতীত বাকী সকল বস্তু হচ্ছে সৃষ্টি। আল্লাহ তাআলা বলেনঃ
بَدِيعُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ أَنَّى يَكُونُ لَهُ وَلَدٌ وَلَمْ تَكُنْ لَهُ صَاحِبَةٌ وَخَلَقَ كُلَّ شَيْءٍ وَهُوَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ
তিনি নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের আদি স্রষ্টা। কিরূপে আল্লাহ্‌র পুত্র হতে পারে, অথচ তার কোন সঙ্গিনী নেই? তিনি যাবতীয় কিছু সৃষ্টি করেছেন। তিনি সব বস্তু সম্পর্কে সুবিজ্ঞ। (সূরা আনআমঃ ১০১)

কুরআন ও সহীহ হাদীছে দিবালোকের মত পরিস্কার করে বলা আছে যে, মহান আল্লাহ আরশের উপরে সমুন্নত, তার গুণাগুণ সৃষ্টি জীবের গুণাবলী থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।

এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশের বিরাট সংখ্যক মুসলিম ওয়াহ্‌দাতুল উজুদে বিশ্বাসী। তাবলীগী নিসাব ফাযায়েলে আমাল বইয়ে গাঙ্গুহী তার মোরশেদ হাজী এমদাদুল্লাহ মুহাজেরে মক্কীর খেদমতে লিখিত এক চিঠিতে বলেনঃ ——-অধিক লেখা বে-আদবী মনে করিতেছি। হে আল্লাহ! ক্ষমা কর, হজরতের আদেশেই এই সব লিখিলাম, মিথ্যাবাদী, কিছুই নই, শুধু তোমরাই ছায়া, আমি কিছুই নই, আমি যাহা কিছু সব তুমিই তুমি। (দেখুনঃ ফাযায়ে আমাল, দ্বিতীয় খন্ড, ১৮৫ পৃষ্ঠা) এই কথাটি যে একটি কুফরী কথা তাতে কোন সন্দেহ নেই। আসুন আমরা এই বাক্যটির ব্যাপারে আরব বিশ্বের আলেমদের মূল্যায়ন জানতে চেষ্টা করি।

তাদের কাছে উপরের বাক্যটি এভাবে অনুবাদ করে পেশ করা হয়েছিল।
إن إطالة الكلام سوء الأدب , اللهم اغفر , فإنما كتبت كل هذه بأمر الشيخ أنا كذاب أنا لا شيء إنما أنا ظلك , أنا لا شيئ, وما أنا, هو أنت
অনুবাদটি শুনে তারা বলেছেনঃ شرك محض অর্থাৎ এটি শির্ক ছাড়া অন্য কিছু নয়।

• অলী-আওলীয়াদের আহবানঃ
সুফীদের বিরাট একটি অংশ নবী-রাসূল এবং জীবিত ও মৃত অলী-আওলীয়াদের কাছে দুআ করে থাকে। তারা বলে থাকেঃ ইয়া জিলানী, ইয়া রিফাঈ, ইয়া রাসূলুল্লাহ ইত্যাদি। অথচ আল্লাহ তাআলা তাঁকে ছাড়া অন্যেকে আহবান করতে নিষেধ করেছেন। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহ ছাড়া অন্যের কাছে দুআ করবে, সে মুশরিক হিসেবে গণ্য হবে।

আল্লাহ তাআলা বলেনঃ
وَلا تَدْعُ مِنْ دُونِ اللَّهِ مَا لا يَنْفَعُكَ وَلا يَضُرُّكَ فَإِنْ فَعَلْتَ فَإِنَّكَ إِذًا مِنَ الظَّالِمِين
তুমি আল্লাহ ব্যতীত এমন বস্তুকে ডাকবে না যে তোমার উপকার কিংবা ক্ষতি কোনটিই করতে পারে না। যদি তুমি তাই কর তবে তুমি নিশ্চিত ভাবেই জালেমদের মধ্যে গন্য হবে।
(সূরা ইউনুসঃ ১০৬)।

আল্লাহ তাআলা আরও বলেনঃ
وَمَنْ أَضَلُّ مِمَّنْ يَدْعُو مِنْ دُونِ اللَّهِ مَنْ لا يَسْتَجِيبُ لَهُ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ وَهُمْ عَنْ دُعَائِهِمْ غَافِلُونَ
এবং ঐ ব্যক্তির চেয়ে আর কে বেশী পথভ্রষ্ট যে আল্লাহ ব্যতীত এমন ব্যক্তিদেরকে আহবান করে যারা কিয়ামত পর্যন্ত তার ডাকে সাড়া দিবে না এবং তারা তাদের ঐ আহবান থেকে সমপূর্ণ বেখবর রয়েছে? (সূরা আহকাফঃ ৫)

• সুফী তরীকার মাশায়েখগণ বিপদ হতে উদ্ধার করতে পারেনঃ
সুফীরা বিশ্বাস করেন যে, তাদের মাশায়েখ ও অলীগণ বিপদ হতে উদ্ধার করতে সক্ষম। তাই বিপদে তারা তাদের অলীদেরকে আহবান করে থাকে। তারা বলে থাকে মদদ ইয়া আব্দুল কাদের জিলানী, হে উমুক, হে উমুক ইত্যাদি। এভাবে বিপদাপদে পড়ে আল্লাহ ছাড়া অন্যকে আহবান করা প্রকাশ্য শির্কের অন্তর্ভূক্ত।

আল্লাহ তাআলা বলেনঃ
وَإِنْ يَمْسَسْكَ اللَّهُ بِضُرٍّ فَلَا كَاشِفَ لَهُ إِلَّا هُوَ وَإِنْ يَمْسَسْكَ بِخَيْرٍ فَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
আর যদি আল্লাহ তোমাকে কোন কষ্ট দেন, তবে তিনি ব্যতীত তা অপসারণকারী কেউ নাই। পক্ষান্তরে যদি তোমার মঙ্গল করেন, তবে তিনি সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান। (সূরা আনআমঃ ১৭)

আল্লাহ্‌ তাআলা আরও বলেনঃ
قُلْ لَا أَمْلِكُ لِنَفْسِي نَفْعًا وَلَا ضَرًّا إِلَّا مَا شَاءَ اللَّهُ وَلَوْ كُنْتُ أَعْلَمُ الْغَيْبَ لَاسْتَكْثَرْتُ مِنَ الْخَيْرِ وَمَا مَسَّنِيَ السُّوءُ إِنْ أَنَا إِلَّا نَذِيرٌ وَبَشِيرٌ لِقَوْمٍ يُؤْمِنُونَ
আপনি বলে দিন, আমি আমার নিজের কল্যাণ সাধনের এবং অকল্যাণ সাধনের মালিক নই, কিন্তু যা আল্লাহ্‌ চান। আর আমি যদি গায়বের কথা জেনে নিতে পারতাম, তাহলে বহু মঙ্গল অর্জন করে নিতে পারতাম। ফলে আমার কোন অমঙ্গল কখনও হতে পারত না। আমি তো শুধু একজন ভীতিপ্রদর্শক ও সুসংবাদাতা ঈমানদারদের জন্য। (সূরা আরাফঃ ১৮৮)

• অলী-আওলীয়াদের ব্যাপারে তাদের বিশ্বাসঃ
অলী-আওলীয়াদের ক্ষেত্রে সুফীদের আকীদা হচ্ছে, তাদের কেউ নবীদের চেয়ে অলীগণকে শ্রেষ্ঠ মনে করেন। আবার কেউ কেউ মনে করেন যে, অলীগণ এবং আল্লাহর মাঝে কোন পার্থক্য নেই। আল্লাহর সকল গুণই অলীদের মধ্যে বর্তমান। যেমন সৃষ্টি করা, রিযিক প্রদান করা, কাউকে জীবন দান করা, কাউকে মৃত্যু দান করা ইত্যাদি আরও অনেক। এ জাতীয় বিশ্বাস যে শির্ক তাতে বিন্দু মাত্র সন্দেহের অবকাশ নেই।

• কবর ও মাজার সম্পর্কে সুফীদের আকীদাঃ
সুফীও সুফিবাদের প্রভাবিত ব্যক্তিগণ অলী-আওলীয়া ও তরীকার মাশায়েখদের কবর পাকা করা, কবরের উপর গম্বুজ নির্মাণ, তাতে বাতি জ্বালানো, কবর ও মাযার যিয়ারত করার উপর বিশেষ গুরত্ব প্রদান করে থাকে। এমন কি সুফীরা বেশ কিছু মাজারের চার পাশে তাওয়াফও করে থাকে মিশরে সায়্যেদ বদভীর কবরের চতুর্দিকে সুফীরা কাবা ঘরের তাওয়াফের ন্যায় তাওয়াফ করে থাকে। অথচ সকল মুসলিমের কাছে অতি সুস্পষ্ট যে তাওয়াফ এমন একটি এবাদত, যা কাবা ঘরের চতুর পার্শ্বে এবং একমাত্র আল্লাহর জন্যই করতে হবে। সুতরাং কোন কবরকে কেন্দ্র করে তাওয়াফ করা বড় শির্ক, যা ইসলাম থেকে বের করে দেয়।

আল্লাহ তাআলা বলেনঃ
وَلْيَطَّوَّفُوا بِالْبَيْتِ الْعَتِيقِ
এবং তারা যেন এই সুসংরক্ষিত (পবিত্র) গৃহের তওয়াফ করে। (সূরা হাজ্জঃ ২৯) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কবর নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে উম্মাতকে সতর্ক করেছেন।

তিনি বলেনঃ
اللَّهُمَّ لَا تَجْعَلْ قَبْرِي وَثَنًا يُعْبَدُ اشْتَدَّ غَضَبُ اللَّهِ عَلَى قَوْمٍ اتَّخَذُوا قُبُورَ أَنْبِيَائِهِمْ مَسَاجِدَ
হে আল্লাহ্‌! আমার কবরকে পূজার স্থানে পরিণত করো না, যাতে এর ইবাদত করা হয়। আল্লাহ্‌ অভিশাপ করেছেন ঐ জাতিকে যারা তাদের নবীদের কবর সমূহকে কেন্দ্র করে মসজিদ তৈরী করেছে। (মুসনাদে আহমাদ)

আবু হুরায়রা (রাঃ) এর সূত্রে বুখারী ও মুসলিমের বর্ণনায় বলা হয়েছেঃ
لَعَنَ اللَّهُ الْيَهُودَ وَالنَّصَارَى اتَّخَذُوا قُبُورَ أَنْبِيَائِهِمْ مَسَاجِدَ

ইহুদী খৃষ্টানদের প্রতি আল্লাহ্‌র লানত। কারণ তারা তাদের নবীদের কবরগুলোকে মসজিদে রূপান্তরিত করেছে। আলী (রাঃ) থেকে বর্ণিত।

তিনি আবুল হায়্যায আল আসাদীকে বলেন, আমি কি তোমাকে এমন আদেশ দিয়ে প্রেরণ করব না, যা দিয়ে নবী (সাঃ) আমাকে প্রেরণ করেছিলেন?
أَنْ لَا تَدَعَ تِمْثَالًا إِلَّا طَمَسْتَهُ وَلَا قَبْرًا مُشْرِفًا إِلَّا سَوَّيْتَهُ
কোন মূর্তি পেলেই তা ভেঙ্গে চুরমার করে ফেলবে। আর কোন কবর উঁচু পেলেই তা ভেঙ্গে মাটি বরাবর করে দিবে। (মুসলিম)

এমনিভাবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিষেধ করেছেন, কবর পাকা করতে, চুনকাম করতে, তার উপর বসতে, কবরে লিখতে। আর তিনি অভিশাপ করেছেন ঐ সমস্ত ব্যক্তিদেরকে যারা কবরকে মসজিদ বানায় এবং সেখানে বাতি জ্বালায়। (মুসলিম) সাহাবা, তাবেঈন ও তাবে তাবেঈন (রাঃ)এর যুগে ইসলামী শহর সমূহে কোন কবর পাকা করা বা কবরের উপর গম্বুজ নির্মাণ করা হয় নি। না নবী (সাঃ) এর কবরে না অন্য কারও কবরে। এরপরও কি আমাদের সমাজের বিপথগামী লোকদের হুশ হবে না?

• মৃত আওলীয়ার নামে মান্নত পেশ করাঃ
সুফীবাদে বিশ্বাসীগণ মৃত অলী-আওলীয়াদের কবর ও মাজারের জন্য গরু, ছাগল, হাস-মুরগী-কবুতর, টাকা-পয়সা ইত্যাদি মানত করাকে ছাওয়াবের কাজ মনে করে থাকে। অথচ কুরআন ও সহীহ হাদীছের মাধ্যমে জানা যায় যে মানত হচ্ছে বিরাট একটি এবাদত, যা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও উদ্দেশ্যে করা সম্পূর্ণ শির্ক।

সুতরাং মান্নত যেহেতু আল্লাহর একটি গুরুত্বপূর্ণ এবাদত, তাই আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও সন্তুষ্টি ও নৈকট্য অর্জনের জন্য তা পেশ করা শির্ক। যেমন কেউ বললঃ উমুক ব্যক্তির জন্য নযর মেনেছি। অথবা এই কবরের জন্য আমি মান্নত করেছি, অথবা জিবরীল (আঃ) এর জন্য আমার মানত রয়েছে। উদ্দেশ্য হল এগুলোর মাধ্যমে তাদের নৈকট্য অর্জন করা। নিঃসন্দেহে ইহা শির্কে আকবরের অন্তর্গত। এ থেকে তাওবা করা আবশ্যক।

আল্লাহ তাআলা বলেনঃ
وَمَا أَنْفَقْتُمْ مِنْ نَفَقَةٍ أَوْ نَذَرْتُمْ مِنْ نَذْرٍ فَإِنَّ اللَّهَ يَعْلَمُهُ وَمَا لِلظَّالِمِينَ مِنْ أَنْصَارٍ
তোমরা যাই খরচ কর বা নযর মান্নত কর, আল্লাহ্‌ সে সম্পর্কে অবগত থাকেন। আর জালেমদের জন্য কোন সাহায্যকারী নেই। (সূরা বাকারাঃ ২৭০) কোন বস্তুকে আল্লাহ্‌র ইলমের সাথে সম্পৃক্ত করা হলে সে বিষয় হল ছাওয়াব অর্জনের স্থান। আর যে বিষয়ে ছওয়াব পাওয়া যায় সেটাই তো ইবাদত। আর ইবাদত মাত্রই গাইরূল্লাহর জন্য সমপাদন করা অবৈধ।

আল্লাহ তাআলা আরও বলেনঃ
يُوفُونَ بِالنَّذْرِ وَيَخَافُونَ يَوْمًا كَانَ شَرُّهُ مُسْتَطِيرًا
তারা মান্নত পূর্ণ করে এবং সেদিনকে ভয় করে, যেদিনের অনিষ্ট হবে সুদূরপ্রসারী। (সূরা দাহ্‌রঃ ৭)

আর এ ধরণের মান্নত যদি আল্লাহ ছাড়া অন্যের সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভের আশায় করা হয়, যেমন কেউ মান্নত করল, আমি আজমীর শরীফে কিংবা বড় পীর আব্দুল কাদের জিলানী অথবা খাজা বাবার উদ্দেশ্যে একটি ছাগল যবাই করবো, তাহলে শির্ক হবে এবং তা থেকে বিরত থাকা ওয়াজিব।

• অলী-আওলীয়ার উসীলাঃ
সকল প্রকার সুফী তরীকার লোকদের আকীদার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ এই যে, তারা মৃত অলীদের উসীলা দিয়ে দুআ করে থাকেন, গুনাহ্‌ থেকে আল্লাহর দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। উসীলা অর্থ হচ্ছে, যার মাধ্যমে কারও নৈকট্য অর্জন করা যায়, তাকে উসীলা বলা হয়। আর কুরআন ও হাদীছের পরিভাষায় যে সমস্ত বিষয় দ্বারা আল্লাহর নৈকট্য হাসিল করা যায়, তাকে উসীলা বলা হয়।

কুরআন মাযীদে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ
يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَابْتَغُوا إِلَيْهِ الْوَسِيلَةَ وَجَاهِدُوا فِي سَبِيلِهِ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং তাঁর নিকট উসীলা প্রার্থনা কর এবং তাঁর পথে জিহাদ কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার। (সূরা মায়িদাঃ ৩৫)

সাহাবী, তাবেয়ী এবং পূর্ববর্তী সম্মানিত উলামায়ে কিরাম থেকে উসীলার যে অর্থ বর্ণিত হয়েছে, তা হল ভাল আমল করার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করা।

ইমাম ইবনে যারীর (রঃ) وَابْتَغُوا إِلَيْه الْوَسِيلَة এর ব্যাখ্যায় বলেনঃ আল্লাহর সন্তোষ জনক আমল করার মাধ্যমে তোমরা আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়ার চেষ্টা কর। ইমাম ইবনে কাছীর (রঃ) ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করে বলেন, উসীলা অর্থ নৈকট্য। মুজাহিদ, হাসান, আবদুল্লাহ ইবনে কাছীর, সুদ্দী এবং ইবনে যায়েদ থেকেও অনুরূপ কথা বর্ণিত হয়েছে। কাতাদাহ (রঃ) বলেন, আল্লাহর আনুগত্যমূলক এবং সন্তোষ জনক কাজ করার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন কর। উপরোক্ত কথাগুলো বর্ণনা করার পর ইবনে কাছীর (রঃ) বলেন, উসীলার ব্যাখ্যায় যা বলা হলো, এতে ইমামদের ভিতরে কোন মতবিরোধ নেই। কাজেই আয়াতের মাঝে উসীলার অর্থ অত্যন্ত সুসপষ্ট। (দেখুন তাফসীরে ইবনে কাছীর, ৩/১০৩)

উপরোক্ত আয়াতকে দলীল হিসাবে গ্রহণ করে যারা আম্বীয়ায়ে কিরাম, আওলীয়াদের ব্যক্তিসত্বা এবং তাদের সম্মানের উসীলা দেয়া বৈধ মনে করে, তাদের ব্যাখ্যা সমপূর্ণ বাতিল এবং কুরআনের আয়াতকে পরিবর্তনের শামিল। এমনকি কুরআনের আয়াতকে এমন অর্থে ব্যবহার করা, যার কোন সম্ভাবনা নেই এবং যার পক্ষে গ্রহণযোগ্য কোন মুফাসসিরের উক্তি নেই। আমাদের দেশের কিছু তথাকথিত আলেম উপরোক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলে থাকে, আল্লাহ তায়ালা এখানে পীর ধরতে বলেছেন। পীরই হলো উসীলা। পীর না ধরলে কেউ জান্নাতে যেতে পারবে না। এ ধরণের ব্যাখ্যা সমপূর্ণ বানোয়াট। পূর্ব যুগের গ্রহণযোগ্য কোন আলেম এ ধরণের ব্যাখ্যা করেন নি।

• ইসলামের রুকনগুলো পালনের ক্ষেত্রে সুফীদের দৃষ্টিভঙ্গিঃ
সুফীবাদে বিশ্বাসীগণ মনে করেন যে, তাদের কল্পিত অলীদের উপর নামায, রোজা, হজ্জ, যাকাত ইত্যাদি কোন কিছুই ফরজ নয়। কেননা তারা এমন মর্যাদায় পৌঁছে যান, যেখানে পৌঁছতে পারলে এবাদতের প্রয়োজন হয় না।

তাদের কথা হচ্ছেঃ
إذا حصلت المعرفة سقطت العبادة
মারেফত হাসিল হয়ে গেলে এবাদতের কোন প্রয়োজন নেই। তারা তাদের মতের পক্ষে কুরআনের একটি আয়াতকে দলীল হিসেবে পেশ করে থাকে।

আল্লাহ তাআলা বলেনঃ
‏واعبد ربك حتى يأتيك اليقين
তুমি ইয়াকীন আসা পর্যন্ত তোমার রবের এবাদত কর। (সূরা হিজিরঃ ৯৯) সুফীরা বলে থাকে এখানে ইয়াকীন অর্থ হচ্ছে, মারেফত। এই মারেফত হাসিল হওয়ার পূর্ণ পর্যন্ত আল্লাহর এবাদত করতে হবে। তা হাসিল হয়ে গেলে এবাদতের আর কোন প্রয়োজন নেই। তাদের এই কথাটি সম্পূর্ণ বাতিল। ইবনে আব্বাস (রাঃ)সহ অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে এখানে ইয়াকীন অর্থ হচ্ছে, মৃত্যু। (দেখুনঃ ইবনে কাছীরঃ (৪/৫৫৩)

সুতরাং তাদের কথা হচ্ছে নামায, রোজা, হজ্জ, যাকাত ইত্যাদি এবাদত সাধারণ লোকেরা পালন করবে।

• সুফীদের যিকির ও অযীফাঃ
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একজন মুসলিম ঘুম থেকে উঠে, ঘুমানোর সময়, ঘরে প্রবেশ কিংবা ঘর হতে বের হওয়ার সময় থেকে শুরু করে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে পঠিতব্য অসংখ্য যিকির-আযকার শিখিয়েছেন। কিন্তু সমস্ত সুফী তরীকার লোকেরা এ সমস্ত যিকির বাদ দিয়ে বিভিন্ন ধরণের বানোয়াট যিকির তৈরী করে নিয়েছে। নকশবন্দী তরীকার লোকেরা যিকরে মুফরাদ তথা শুধু الله (আল্লাহ) الله (আল্লাহ) বলে যিকির করে। শাযেলী তরীকার لا إله إلا الله এবং অন্যান্য তরীকার লোকে শুধু هوهو হু হু বলে যিকির করে থাকে। আল্লামা ইবনে তাইমিয়া বলেনঃ এভাবে আওয়াজ করে বা আওয়াজবিহীন একক শব্দ দ্বারা যিকির করার কোন দলীল নেই; বরং এগুলো মানুষকে বিদআত ও গোমরাহীর দিকে নিয়ে যায়। (মাজমুআয়ে ফতোয়াঃ পৃষ্ঠা নং- ২২৯) আমাদের দেশের বিভিন্ন পীরদের মুরীদদেরকে যিকরে জলী ও যিকিরী খফী নামে বিভিন্ন ধরণের বিদআতী যিকির করতে দেখা যায়, যেগুলোর কোন শরঈ ভিত্তি নেই।

• সুফীদের যাহেরী ও বাতেনীঃ
সুফীরা দ্বীনকে যাহেরী ও বাতেনী এই দুটি স্তরে ভাগ করে থাকে। শরীয়তকে তারা যাহেরী স্তর হিসেবে বিশ্বাস করে, যা সকলের জন্য মান্য করা জরুরী। বাতেনী স্তর পর্যন্ত শুধু নির্বাচিত ব্যক্তিরাই পৌঁছতে পারে। ইসলামী শরীয়তে যাহেরী ও বাতেনী বলতে কিছু নেই। কুরআন ও সুন্নাহর মধ্যে যা আছে, তাই ইসলাম।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ
(عَلَيْكُمْ بِسُنَّتِي وَسُنَّةِ الْخُلَفَاءِ الْمَهْدِيِّينَ الرَّاشِدِينَ تَمَسَّكُوا بِهَا وَعَضُّوا عَلَيْهَا بِالنَّوَاجِذِ وَإِيَّاكُمْ وَمُحْدَثَاتِ الأُمُورِ فَإِنَّ كُلَّ مُحْدَثَةٍ بِدْعَةٌ وَكُلَّ بِدْعَةٍ ضَلاَلَةٌ)
আমার পরে তোমাদের মধ্যে যারা জীবিত থাকবে, তারা অনেক মতবিরোধ দেখতে পাবে। সুতরাং তোমরা সে সময় আমার সুন্নাত এবং খোলাফায়ে রাশেদার সুন্নাতকে আঁকড়ে ধরবে তোমরা দ্বীনের মাঝে নতুন বিষয় আবিষ্কার করা থেকে বিরত থাকবে, কেননা প্রত্যেক নতুন বিষয়ই বিদআত। আর প্রতিটি বিদআতের পরিণাম গোমরাহী বা ভ্রষ্টতা। (আবু দাউদ, অধ্যায়ঃ কিতাবুস্‌ সুন্নাহ, তিরমিযী, অধ্যায়ঃ কিতাবুল ইল্‌ম। ইমাম তিরমিযী বলেনঃ হাদীছটি হাসান সহীহ। মুসনাদে আহমাদ, (৪/১২৬), মাজমুওয়ায়ে ফাতাওয়া ১০/৩৫৪)

• ইলমে লাদুন্নী নামে কল্পিত এক বিশ্বাসঃ
সুফীরা বেশী বেশী ইলমে লাদুন্নীর কথা বলে থাকে। ইলমে লাদুন্নী বলতে তারা বুঝাতে চায় যে, এটি এমন একটি ইলম যা আল্লাহর পক্ষ হতে বিশেষভাবে সুফীরা পেয়ে থাকে। সাধনা ও চেষ্টার মাধ্যমে এটি অর্জন করা যায় না। তাদের কল্পিত কথা হচ্ছে অলী-আওলীয়ারা আল্লাহর পক্ষ হতে ইলমে লাদুন্নী অর্জন করে থাকে।

তাদের বানোয়াট কথার মধ্যে এটিও একটি বানোয়াট ও কল্পিত কথা এবং আল্লাহর নামে চরম মিথ্যাচার ছাড়া আর কিছু নয়। এই উম্মতের প্রথম কাতারের সৎ লোক তথা সাহাবীদের মাঝে এ ধরণের কথা শুনা যায় নি। তারা ঈমান, আমল ও তাকওয়ায় এত বেশী অগ্রগামী ছিলেন যে, আল্লাহ্‌ তাআলা তাদের প্রশংসায় কুরআনে একাধিক আয়াত নাযিল করেছেন এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের অনেককেই জান্নাতী বলে ঘোষণা দিয়েছেন।

• নবী ও মৃত অলী-আওলীয়াগণঃ
সুফীদের আরও কথা হচ্ছে, তারা আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে জাগ্রত অবস্থায় সরাসরি মিলিত হয়ে থাকেন। শুধু তাই নয় তারা অন্যান্য নবীদের রুহের সাথেও সাক্ষাত করেন ও তাদের আওয়াজ শুনেন এবং বিভিন্ন দিক নির্দেশনা লাভ করেন। মৃত অলী-আওলীয়া, ফেরেশতাদের সাথেও তারা সাক্ষাত করেন এবং তাদের থেকে বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করেন।

• খিজির আলাইহিস সালামঃ
সুফীদের মধ্যে খিযির (আঃ)এর ব্যাপারে অনেক কাল্পনিক ঘটনা প্রচলিত রয়েছে। তাঁর সাথে সাক্ষাতের বিষয়েও অসংখ্য কাহিনী বর্ণিত রয়েছে। তাদের ধারণা খিজির (আঃ) এখনও জিবীত আছেন। তিনি যিকির ও দ্বিনী মাহফিলে হাজির হন। সুফীরা তাঁর সাথে সাক্ষাত করেন এবং তাঁর কাছ থেকে দ্বিনী বিষয়ের জ্ঞান, শরীয়তের হুকুম-আহকাম ও যিকির-আযকার শিক্ষা করেন। তাদের এ কথাটি বানোয়াট। কোন মৃত ব্যক্তির সাথে জীবিত মানুষের কথা বলার ধারণা একটি কুফরী বিশ্বাস।

আব্দুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) বলেনঃ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর শেষ জীবণে একদা আমাদেরকে নিয়ে ইশার নামায আদায় করলেন। সালাম ফিরানোর পর তিনি বললেনঃ
أَرَأَيْتَكُمْ لَيْلَتَكُمْ هَذِهِ فَإِنَّ رَأْسَ مِائَةِ سَنَةٍ مِنْهَا لاَ يَبْقَى مِمَّنْ هُوَ عَلَى ظَهْرِ الأَرْضِ أَحَدٌ
আজকের রাত্রির গুরুত্ব সম্পর্কে তোমাদের কোন ধারণা আছে কি? আজকের এই রাত্রিতে যারা জীবিত আছে, আজ থেকে শুরু করে একশত বছর পর পৃথিবীতে তাদের কেউ আর জীবিত থাকবেনা। (বুখারী হাদীছ নং- ১১৬)

এই হাদীছ থেকে জানা গেল যে, খিযির (আঃ)ও ইন্তেকাল করেছেন। তিনি কিয়ামতের পূর্বে কারও সাথে সাক্ষাত করবেন না।

পরিশেষে বলতে চাই যে, বর্তমানে মুসলিমরা যে সমস্যার সম্মুখীন তার অন্যতম কারণ হচ্ছে সুফীবাদের বিভ্রান্তি। এই পঁচা মতবাদের কারণেই মুসলিম জাতি দুনিয়ার বুকে তাদের মর্যাদা হারিয়েছে। সুবিশাল উছমানী খেলাফতের সুলতানগণ ইসলামের সঠিক আকীদাহ থেকে সরে গিয়ে যখন সুফীবাদের বেড়াজালে আটকে পড়েন তখন থেকে তাদের শক্তিতে ভাটা পড়তে থাকে। এক পর্যায়ে উছমানী সম্রাজ্যের ভিত্তি একেবারে দুর্বল হয়ে পড়ে এবং পতনের দিকে দ্রুত অগ্রসর হতে থাকে।

তাই আজ মুসলিমদের হারানো শক্তি ও মর্যাদা ফেরত পেতে চাইলে খোলাফায়ে রাশেদার যুগের ন্যায় নির্ভেজাল তাওহীদের দিকে ফেরত আসতে হবে। অন্যথায় তারা ভ্রষ্টতা ও বিভ্রান্তির টানে দ্বীন ও দুনিয়ার উন্নতি ও অগ্রগতি অর্জন করার চেষ্টা করে কখনই সাফল্য লাভ করতে পারবে না।

সর্বস্বত্ত সংরক্ষনঃ সেরিব্রাল ক্যাকটাস।।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১১ thoughts on “প্রসঙ্গঃ সূফীবাদ এবং সংশ্লিষ্ট বিভ্রান্তি

  1. সূফীবাদ নিয়ে অনেক কিছু
    সূফীবাদ নিয়ে অনেক কিছু জানলাম। এই জিনিসের প্রতি কখনই আগ্রহ জন্মায় নাই। সূফীবাদের ভক্তদের দেখলে সবসময় একটা প্রবাদই মনে হইছে- সূর্যের চেয়ে বালি গরম বেশী।

  2. আপনার এই পোস্ট এখনো পড়ি নাই।
    আপনার এই পোস্ট এখনো পড়ি নাই। পড়ার আগে আপনার কাছে একটা প্রশ্ন ছিল- আপনি নিজে সূফীবাদে বিশ্বাস করেন কিনা? সরাসরি উত্তর আশা করছি। আপনার উত্তর পাওয়ার পর পোস্ট পড়ে আমার মতামত জানাব মন্তব্য আকারে।

  3. অনেক বড় একটি পোস্ট, তাই
    অনেক বড় একটি পোস্ট, তাই ভেঙ্গে ভেঙ্গে পড়ছি। আশা করি অনেক কিছুই জানতে পারবো। অনুরোধ থাকবে সামনে থেকে যেন দুই খন্ডে করে দেন। তাহলে পড়তে সুবিধা হবে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

52 + = 61