সেনাবাহিনীর বুটের তলায় জুম্মজনগণ, সর্বহারা শ্রেণী বনাম জুম্ম জাতি!

পার্বত্য চট্রগ্রাম হিসেবে পরিচিত রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবন তিন জেলার রাজনীতির হিসেব নিকেশ আর সমতলের রাজনীতির হিসেব নিকেশ এক নয়। সমতলে দিনে দুপুরে মানুষ এখন গুম হচ্ছে কিন্তু পাহাড়ে এই গুমের কোন শুরু ও শেষ নেই। পাহাড়ে এর সাথে বাড়তি যোগ হওয়া হলো, সরাসরি সেনাবাহিনীর সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়া।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কোন আইন শৃঙ্খলা বাহিনী নয় যে, আইন শৃঙ্খলার অবনতি হলে তা রোধকল্পে সেনাবাহিনী মাঠে নামবে। সেনাবাহিনী মাঠে নামার জন্য সরকারের বিশেষ ঘোষণা দিতে হয়। কিন্তু পাহাড়ের প্রয়োজন হয় না। এ বিষয়টি সামনে এসেছে গত রবিবার খাগড়াছড়ির বাবুছড়ায় স্থানীয় পাহাড়ি জনগনের সাথে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর মধ্যেকার সংঘর্ষে। এই সংঘর্ষের কারণ হলো বিজিবির ব্যাটালিয়ন সদর স্থাপন করা হচ্ছে খাগড়াছড়ির বাবুছড়ায়। ব্যাটালিয়ন সদর করার কারণে সেখানে ২২টি পরিবারকে উচ্ছেদ করেছে সরকার। এ কারণে সেখানকার পাহাড়িরা আন্দোলন করছেন দীঘিনালা ভূমি রক্ষা কমিটির ব্যানারে। গত রবিবার এ কমিটির নেতৃত্বে একটি পদযাত্রা ছিলো, তাতে সেনাবাহিনী ও পুলিশ যৌথভাবে বাধা প্রদান করে। রবিবার বেলা ১২টার দিকে বড়াদম এলাকা থেকে দুই শতাধিক আদিবাসী নারী-পুরুষ পদযাত্রা নিয়ে বাবুছড়ার উদ্দেশে রওনা হন। কার্বারী টিলা এলাকায় পৌঁছার পর তাঁদেরও বাধা দেওয়া হয়। সেনাবাহিনী ও পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে সংঘর্ষ শুরু হয়। এ সময় দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া এবং ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রায় ৫০টি ফাঁকা গুলি করে। তবে এই গুলি সেনাবাহিনী করেছে কিনা তা কিন্তু স্পষ্ট হয়নি। অর্থ্যাৎ জনসাধারণের সাথে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ার পর সেনাবাহিনী প্রকৃত কী করেছে তা জানা যায়নি, কারণ সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কিছুই বলা হয়নি।

?oh=a906a0273daf71fb7564f79f324a5a52&oe=55BA6B3B” width=”400″ />

তাহলে পত্রপত্রিকায় সংঘর্ষের যে বিবরণ এসেছে যাতে সেনাবাহিনীর ভূমিকা রয়েছে সে বিষয় কিছু না বলা মানে তা মেনে নেওয়া। এটা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর জন্যই বিপদজ্জনক।

এ সংঘর্ষে নির্বাহী হাকিম মিজানুর রহমানসহ সেনাবাহিনী ও আনসারের ছয় সদস্য আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এ ছাড়া ভূমি রক্ষা কমিটির সদস্য ত্রিদিব চাকমা, বিজুবি চাকমা, ইন্দ্রমুনি চাকমা ও পাবলাখালী শান্তিপুর উচ্চবিদ্যালয়ের ছাত্র সুবিকাশ চাকমা আহত হন।

আন্দোলন চলছে
গত রবিবারের ঘটনায় পাহাড়ের জনগণ আজ সোমবারও খাগড়াছড়িতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। বিবিসি বাংলা জানিয়েছে, খাগড়াছড়ি শহর দিঘীনালা উপজেলা পর্যন্ত সড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালন করছে সেখানকার পাহাড়ী সম্প্রদায়ের আন্দোলনকারীরা। দীঘিনালা ভূমি রক্ষা কমিটির ব্যানারে এ কর্মসূচির কারণে প্রায় ২৫ কিলোমিটার সড়কে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে।

এতে করে খাগড়াছড়ি ছাড়াও দীঘিনাল সংলগ্ন রাঙ্গামাটির কয়েকটি এলাকার সাথে সড়ক যোগাযোগ প্রায় বন্ধ রয়েছে। আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিভিন্ন স্থানে মোতায়েন করা হয়েছে এবং টহল দিচ্ছে সেনা সদস্যরাও ।’

অর্থ্যাৎ বিবিসিও জানিয়েছে যে, সেখানে সেনাবাহিনী টহল দিচ্ছে। প্রশ্ন হলো দেশে কী জরুরী অবস্থা জারি হয়েছে যে সেনাবাহিনী টহল দিবে? কারণ হলো পাহাড়। সমতল আর পাহাড়ে এক আইন নয়। এক দেশে দুই আইন।

প্রথম আলো ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১০ সালের এক রিপোর্ট থেকে জানা যায় ‘ভূমি কমিশন আইন সংশোধন না করে চুক্তি বাস্তবায়নের পথে সরকার এক পা-ও এগোতে পারবে না। ২০০১ সালে প্রণীত ওই আইন সংশোধনের বিষয়ে ২০০২ সাল থেকেই কথা হচ্ছে। বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের আমলে জেএসএসের ১৯টি সংশোধনী প্রস্তাবের সবগুলোর ব্যাপারেই একমত হয়েছিলেন তৎকালীন আইনমন্ত্রী মওদুদ আহমদ। এরপর বিষয়টি স্থানীয় সরকারমন্ত্রী আবদুল মান্নান ভূঁইয়ার নেতৃত্বাধীন কমিটির কাছে গিয়ে অজ্ঞাত কারণে আটকে গেল।’

?oh=f59ad0ab5c2fdc16e5fe5b443026273e&oe=5587D1E4″ width=”300″ />

প্রথম আলো ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১০ সালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের কিছু লাইনের দিকে চোখ বুলালে দেখা যাচ্ছে সংঘাতপূর্ণ পাবর্ত্য অঞ্চল ছেড়ে যারা ভারতে চলে গিয়েছিলেন তারা যখন ফিরে এসেছেন তাদের ভিটে মাটিতে তখন জমি পাননি, তারা হয়েছেন ভারত প্রত্যাগত সরণার্থি। ওই প্রতিবেদনে পাবর্ত্য সমস্যার অন্যতম কারণ হিসেবে এটিকে বলা হয়েছে, ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর সরকার ও জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) মধ্যে স্বাক্ষরিত পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ‘ঘ’ খণ্ডের ২ ধারায় বলা হয়েছে, ‘…উপজাতীয় শরণার্থী ও অভ্যন্তরীণ উপজাতীয় উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের পর সরকার চুক্তি অনুযায়ী গঠিত আঞ্চলিক পরিষদের সঙ্গে আলোচনাক্রমে যথাশীঘ্র পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি জরিপ কাজ শুরু এবং যথাযথ যাচাইয়ের মাধ্যমে জায়গা-জমিসংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তিকরত উপজাতীয় জনগণের ভূমি মালিকানা চূড়ান্ত করিয়া তাহাদের ভূমি রেকর্ডভুক্ত ও ভূমির অধিকার নিশ্চিত করিবেন।’ তবে এই বিরোধ এখনো চলমান।

এ পরিস্থিতিতে যদি ২২টি পরিবারকে তাদের বাস্তভিটা থেকে উচ্ছেদ করা হয় তাহলে পরিস্থিতি যে আরো ঘোলাটে এটা বোঝার জন্য পদার্থ বিদ্যার অধ্যাপক হবার দরকার নেই।

অনেকের মনে হতে পারে পাহাড়েতো মানুষ কম, সেখানে কী আর জমির অভাব আছে? যে কোন স্থানে বসে পড়লেই হয়। তাহলে একটা হিসাব দেয়া যেতে পারে। সরকারি হিসাব বলছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে (১৯৯৬-২০০০) গঠিত ভারত প্রত্যাগত শরণার্থী ও অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু পুনর্বাসনবিষয়ক টাস্কফোর্স তিনটি পার্বত্য জেলায় মোট ৯০ হাজার ২০৮টি আদিবাসী পরিবারকে অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু হিসেবে চিহ্নিত করেছিল।

২০০০ সালের ১৫ মে টাস্কফোর্সের তৎকালীন চেয়ারম্যান এবং বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদার অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুদের জেলাভিত্তিক পরিবারের সংখ্যা ঘোষণা করেন। সে অনুযায়ী রাঙামাটিতে ৩৫ হাজার ৫৯৫, বান্দরবানে আট হাজার ৪৩ এবং খাগড়াছড়িতে ৪৬ হাজার ৫৭০টি পরিবার রয়েছে। এদের একটি পরিবারও পুনর্বাসিত হয়নি।

এ ছাড়া ভারত থেকে ফিরে আসা আদিবাসী শরণার্থী পরিবার ছিল ১২ হাজার ২২২টি। এর মধ্যে নয় হাজারের মতো পুনর্বাসিত হয়েছে। বাকি তিন হাজরেরও বেশি পরিবার এখনো উদ্বাস্তুর মতো ছন্নছাড়া জীবন যাপন করছে।

?oh=2a3b98e85be3e1582db8861e77f3fd90&oe=55B4E850&__gda__=1434895756_89d4ad1dfddb326c352eaaec55d042fc” width=”300″ />

রাঙ্গামাটি বা বান্দরবানের হিসাব যদি আমরা এই মূহুর্তে বাদও রাখি তাহলে শুধু খাগড়াছড়িতে উদ্বাস্ত পাহাড়ি পরিবারের সংখ্যা ৪৬ হাজার ৫৭০টি। প্রতি পরিবারে যদি গড়ে ছয় জন লোকও হয় তাহলে দেখা যাবে প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার মানুষ এই জেলাতে উদ্বাস্ত। তবে মুসলিম পরিবারের মত পরিবার প্রতি হিসেব করলে এ সংখ্যা আরো বেশি হবে। এ পরিস্থিতির মধ্যে ২২টি পরিবার কেন ১টি পরিবারও যদি উচ্ছেদ হন তাহলে তা হলো মরার উপর খাড়ার ঘা।

পুরো খাগড়াছড়ি একটি ক্যান্টনমেন্ট। যারা খাগড়াছড়িতে গেছেন তারা জানেন, সেখানে নিরাপত্তার নামে কিভাবে সামরিকায়ন করা হয়েছে।

সর্বহারা শ্রেণী বনাম জাতী সমস্যা:
পার্বত্য অঞ্চলে সারা বাংলাদেশ থেকে দরিদ্র মানুষদের নিয়ে গিয়ে পুর্নবাসন করা হয়। বিশেষত খাগড়াছড়িতে এই পুর্নবাসন সব থেকে বেশি হয়ে থাকে। সারা বাংলাদেশের ভূমিহীন সর্বহারাদের ভূমি দেওয়া হবে এই গল্প শুনিয়ে সরকারের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো খাগড়াছড়িতে নিয়ে যায়। তারপর কোন পাহাড় দখল করা হয়। প্রথমে এই পাহাড়ে মেশিন গান বসানো হয়। পাহাড়ের সব গাছ কেটে ফেলা হয়। এরপর সেখানে নিরাপত্তার নামে বিজিপি ছোট ছোট ঘর করে আর সার্বক্ষনিক পাহারা দেয়। এক সময় সরকারি টাকায় দোচালা ঘর উঠে টিনের। সেই ঘরে আশ্রয় নেয় সমতলের ভূমিহীণ দরিদ্র মানুষ। এরপর রেশন হিসেবে মাসে ওই বাঙালী পরিবারকে দেয়া হয় ৮০ কেজি চাল। আর ঘরের সামর্থ্যবান পুরুষদের দেয়া হয় একটি কাজ। এভাবেই একেকটি পাহাড় দখল করে সরকারের বাহিনী।

সমতলের ভূমিহীন সর্বহারা মানুষের বাচার লড়াই আর অন্যদিকে জুম্ম জাতী নিশ্চিহ্ন করার নীল নকশা। এতে দুই নিপীড়িত গোষ্টিকে মুখোমুখি করে দেয় রাষ্ট্র। অথচ তারা উভয় নিপীড়িত। একদল প্রধানত শ্রেণীগতভাবে নিপীড়িত অন্যদল অন্যতম প্রধান নিপীড়ন জাতীগত।

এ পরিস্থিতিতে বিজিপি ব্যাটালিয়ান নির্মাণ মানে সেখান থেকে শুধু ২২ পরিবার উচ্ছেদ নয় বরং সামনের দিকে আরো ভূমি হারানোর বাস্তবতা তৈরী করা।

আমরা পাকিস্তানীদের জাতীগত শোষনের বিরোধীতা করে দেশ স্বাধীন করেছিলাম আরেকটি জনগোষ্ঠীকে এভাবে নিশ্চিহ্ন করার জন্য নয়।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৪ thoughts on “সেনাবাহিনীর বুটের তলায় জুম্মজনগণ, সর্বহারা শ্রেণী বনাম জুম্ম জাতি!

  1. এরাই নাকি মুক্তিযুদ্ধের
    এরাই নাকি মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছে! এরাই নাকি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলে! পাকিদের সাথে বর্তমান সরকারের তফাৎ কি? পাকিরা এদেশের মানুষের সাথে যেমন আচরণ করেছিল, আওয়ামীলীগ ভিন্ন জাতি-গোস্টির সাথে একই আচরণ করছে।

    পাহাড়ী জনগোষ্টির ভুমির অধিকার রক্ষার আন্দোলনে সংহতি জানাচ্ছি।

    1. আপনি তাদের বিভিন্নমুখি
      আপনি তাদের বিভিন্নমুখি সমস্যার কথা তুলে ধরলেন কিন্তু আমার প্রশ্ন একটাই ,সেনা সদস্যদের সাথে এই পঞ্চাশজন বিতর্কে জড়ানোর সাহস কোথা থেকে পায়?

      ইকারাস ভাই@সরকার তাদেরকে আর কত সুযোগ সুবিধা দিবে?
      ইকারাস ভাই কথিত আদিবাসীদের(বাংলাদেশের আদিবাসী বাঙ্গালীরাই) পক্ষ নিয়ে বল্লেন , এরা ভিন্ন জাতীগোষ্ঠী বিধায় সরকার এদের সাথে পাকিদের মত আচরন করে।এরাও যে বাঙ্গালীদের অন্য জাতীগোষ্ঠী হিসেবে দেখে সে বিষয়ে ইকারাস ভাইয়ের অবশ্যই ধারনা আছে ।যদি না থাকে তাহলে ইকারাস ভাইকে কুয়াকাটা যেতে বলব ,ওখানে বসবাসরত উপজাতীরা আপনাকে তাদের এড়িয়ায় কখনো ঢুকতে দিবেনা ।স্বাধীনতার আগে ঐ অঞ্চলে কোন বাঙ্গালী ঢুকলে হত্যা করা হত ।

  2. আমরা পাকিস্তানীদের জাতীগত

    আমরা পাকিস্তানীদের জাতীগত শোষনের বিরোধীতা করে দেশ স্বাধীন করেছিলাম আরেকটি জনগোষ্ঠীকে এভাবে নিশ্চিহ্ন করার জন্য নয়।

    জাতীয়তাবাদ জিনিসটাই খারাপ। শন্তিচুক্তির পূর্ণবাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত পাহাড়ে জাতিগত শোষন বন্ধ হবে না।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

63 − 55 =