হাইকুঃ এক অনন্য অনুকাব্যের নাম

জাপানী ভাষায় হাইকু লেখার ধরন সহজ। কিন্তু অন্য ভাষার জন্য ঐ নিয়ম সামান্য ভিন্ন। বিদেশী ভাষায় হাইকু লেখার ধরন সম্বন্ধে একেক জনের একেক রকম মতামত। যেকোন কিছু হাইকু কবিতার বিষয় হতে পারে। সাধারন মানুষের অজানা এবং উপলব্ধির বাইরের বিষয়ে হাইকু খুব কমই আছে। কিছু দুর্দান্ত কবিতায় দৈনন্দিন জীবনের ঘটনা এমন আকর্ষনীয় এবং সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে যে পাঠকরা সহজেই চমৎকৃত হবেন। হাইকু সম্পর্কে নতুন ভাবে কিছু বলতে চাইনা কারন এ সম্পর্কে বোদ্ধা অনেক।

তবে একটা কথা বলবো, পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় চমৎকার সব হাইকু রচিত হলেও বাংলা ভাষায় হাইকু হয়নি খুব বেশী। বুদ্ধদেব চ্যাটার্জী তাঁর তিনশো বছরের হাইকু – গ্রন্থের ভূমিকায় প্রথমেই বলেছেন, সুন্দরের প্রকাশ ব্যাপ্তিতে আছে আবার ক্ষুদ্র পরিসরেও আছে।তার পরে তিনি অবশ্য হাইকুর গঠন নিয়ে অন্য প্রসঙ্গ টেনেছেন। যে কথাটা অব্যক্ত রয়ে গেছে তা হলো, হাইকু কেবল ক্ষুদ্র পরিসরে সুন্দরের প্রকাশ নয়, ক্ষুদ্রতার মধ্য দিয়ে ব্যাপ্তির সৌন্দর্যকে উপলব্ধি করাও বটে।

যেমন, একটি বনসাই বৃক্ষের দিকে তাকিয়ে আমরা এক বিশাল মহীরূহের ব্যাপ্তি ও বিন্যাশ উপলব্ধি করতে পারি। এটা জাপানের সৌন্দর্য চর্চার একটি বিশেষ দিক। আমার মনে হয়, বাংলায় হাইকুর প্রসার না ঘটার অন্যতম কারণ, কঠোর নিয়ম ও অতিসংক্ষিপ্ততার কারণে তিন লাইনে সেই ভাবের জানালাটি ঠিক মতো তৈরী করার ব্যর্থতা, যেখান দিয়ে ব্যাপ্তির সৌন্দর্য দেখার প্রয়াস থাকবে।

এক |

শেষ হলে সুরা উধাও হবে সাকী
যৌবন,
তাকে শেকলে বাঁধা যায় নাকি !?!?

দুই |

অন্ধ আবেগে আজ
রন্ধ্রে
ষড়যন্ত্রের আমেজ |

তিন |

পাখিরা শীষ কাটলেই গান হয়
আমি শীষ কাটলে অসভ্যতা,
আকাশ অশ্রু ঝরালেই বৃষ্টি হয়
আমি ঝরালেই কাপুরুষতা …..

চার |

জাল ফেলে ঘের টানো
হায় !
তুমি ‘ই তো নারী |

পাঁচ |

ঈশ্বর
জানেন ??
আমরা মানুষ !!

ছয় |

পৃথিবীটা আদতে
বেশ্যার যোনির মতোন-
রসালো, অথচ বড্ড নোংরা !!?!?

সাত |

হায়! হৃদয় চাইতেই
তোমরা কেন
সর্বশেষ বসনটুকু ও ছুড়ে ফেল ?

আট |

ভালোলাগা ভালবাসার চেয়ে
ভালথাকা
অধিক জরুরি |

নয় |

এক পশলা বৃষ্টি হয়ত বলতে পারবে
কতটা প্রেম
তোমার প্রসাধনের আড়ালে !!?!?

দশ |

লাল শাড়িটা লাল করেছ একটা চুমুর দাগে
প্রেম, তোমায় ধরব আমি
শেষ বিকেলের আগে |

এগারো |

আলতো হাতের রেশমি ছোয়ায় হয়ত খানিক পুলক জাগে
তাই বলে কি আকুল হব
নষ্টা নারীর নষ্ট ‘রাগে ??

বারো |

স্বভাবে, অভাবে
আর অনুভবে
মেতেছি প্রলয়ে…

তের |

চমকে উঠি
যখন রাস্তা’র ভিক্ষুকটি বলে
“আমি মুক্তি-যোদ্ধা ছিলাম”…..!!?!?!?

চৌদ্দ |

আমার পকেটের
মস্ত ফুটো’টা
তোমায় ভালবাসতেই দেয় নি …..

পনের |

একটু সুখের ‘ও লাগিয়া
শান্তি’র বিকিকিনি করি এমন করিয়া
কেন রে মন ?
আমি কি তবে দুখ: বিলাসী !?!?

ষোল |

নারীর
রন্ধ্রই
সকল ক্ষমতার উৎস…

সতেরো |

আচ্ছা, বেহেস্তের হুর পরী’রা কি
পাশের বাড়ীর জমিলা’র চেয়েও
সুন্দর !?!?

আঠারো |

মধ্যরাতে সোডিয়াম বাতি’র আলোয়
কেনা ভালবাসা
আমাকে স্বাধীনতা’র মানে বুঝিয়েছে !!

উনিশ |

তুমি ভাল আছো তো ?
আমি তবে
বেশ আছি …।

বিশ |

একসাথে যদি নাইবা পারো
কিস্তিতেই
তবে হৃদয়টা দিও।

একুশ|

সুখ টু অসুখ
ভায়া নারী |

বাইশ |

মাত্র একটিবারের জন্য
ঈস্রাফিলের বিউগলটা ধার চাই,
অনেষ্টলি রিফান্ডেবল।

তেইশ |

মানুষ,
ধর্মশৃঙ্খলাবদ্ধ পশুর
পরিমার্জিত সংস্করণ ।

চব্বিশ |

পাপ
মানুষকে সাহসী করে
পরবর্তী প্রক্রিয়ায়।

পঁচিশ |

নারী তুমি আগ্রাসী ক্ষুধা ,
সুখের পাশ-বালিশে
জ্যান্ত হ্যান্ড গ্রেনেড ।

ছাব্বিশ |

বিলম্বে
বিড়ম্ব
বাড়ে ।

সাতা’শ |

সঙ্কটকালে
ঈশ্বার থাকেন
সর্বোচ্চ ব্যাস্ততায়।

আটা’শ |

শেকল-বন্দীতা’ও
অলঙ্কারের রূপ পায়
নারীর মাহাত্মে।

ঊনত্রিশ |

একটি মৃত প্রজাপতি
প্রান পেলে
উড়ে যাবে,
দুঃখ পেলে ?

ত্রিশ |

কত যে হরেক পাখি
উড়ে যায় নিত্য,
ছায়া শুধু পড়ে থাকে,
এই হল সত্য ।

একত্রিশ |

বিয়ে
নারীর দখলস্বত্তসমেত
পৌরুষের বিজয়পতাকা।

বত্রিশ |

মর্তের অপূর্ণতাই
স্বর্গের ঠিকানা।

সর্বস্বত্ব সংরক্ষনঃ সেরিব্রাল ক্যাকটাস।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৫ thoughts on “হাইকুঃ এক অনন্য অনুকাব্যের নাম

  1. আমি চরম হাইকু ভক্ত। আমার
    আমি চরম হাইকু ভক্ত। আমার সংগ্রহে কিছু জাপানিজ কবির হাইকু আছে। মলয় রায় চৌধুরীর অনুবাদ। কেমন যেন পড়লেই হারিয়ে যেতে হয়। আপনার হাইকুও ভালো লাগলো :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:

  2. রেডিও জাপান, বাংলা বিভাগ থেকে প্রতি সপ্তাহে হাইকু নিয়ে নিয়মিত অনুষ্ঠান হয়। আমি হাইকু কবিতা পছন্দ করি। তবুও এবিষয়ে লেখার জন্য ধন্যবাদ।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

49 − 39 =