অভিজিৎ হত্যাকান্ড – ‘ন্যায় বিচার’ ও ‘লাশের রাজনীতি’

বাংলাদেশে এখন নাস্তিকের জীবনের বিশেষ দাম নাই। জীবন গেলে যে বিচার মিলবে তেমন সম্ভাবনাও নাই। বাংলাদেশের নাস্তিকদের জন্যে এই মুহুর্তে মক্কা মদিনায় হজ্জে গমন অথবা জার্মানীতে হিজরত ব্যতিত নিজ নিরাপত্তা সম্বন্ধে নিশ্চিত হওনেরও কোন উপায় নাই। আজকের এই অবস্থার গোড়া হলো শাহবাগ। শাহবাগীরা কাদের মোল্লার ফাঁসির স্লোগান তুলে যে আন্দোলন শুরু করেছিল তার মধেই নাস্তিকদের আজকের দূর্দশার সূত্রপাত। কাদের মোল্লার ফাঁসির জন্যে দায়ি হলো কসাই কাদের, শাহবাগীরা নয়। অর্থাৎ কাদের মোল্লা একাত্তরে যে ভুমিকা নিয়েছে, যে অপরাধ করেছে তার জন্যেই তার ফাঁসি হয়েছে। শাহবাগীরা তাকে ধরে বেধে ফাঁসিতে ঝুলায় নাই। এটা সত্যি যে শাহবাগে আন্দোলন না হলে কসাই কাদের ওরফে কাদের মোল্লা’র ফাঁসি হতো না। তার তো যাবৎজীবন কারাদন্ডের রায় হয়েছিল। শাহবাগ আন্দোলনের সাফল্য ছিল বাদীপক্ষের আপিল করার ক্ষমতা লাভ, আর সেই আপিল থেকেই কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় মিলেছিল। কাদের মোল্লা’র দল ও অনুসারীরা তার মৃত্যুর জন্যে তাই শাহবাগীদেরকেই দায়ি করে থাকে। তাদের এই দাবি ঠিক নয়। একাত্তরে কাদের মোল্লার কৃতকর্মের শাস্তি নিশ্চিত করার পথে শাহবাগের আন্দোলনকারীরা একটা ভুমিকা রেখেছে মাত্র। তারা বিচার প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক আপোষের সম্ভাবনাকে চিহ্নিত করেছিল এবং আইনের দুর্বলতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিল। বেআইনী কোনকিছু তারা করে নাই, আইন নিজেদের হাতেও তুলে নেয় নাই। একটি রাষ্ট্রের নাগরিকদের অধিকারের আওতার মধ্যে তারা আন্দোলন করেছে এবং নিজেদের দাবি জানিয়েছে। সেই দাবি আদায় হয়েছে বলেই বাদীপক্ষ আপিল করতে পেরেছে। আপিলে রায় পরিবর্তিত হয়েছে। কাদের মোল্লার ফাঁসি হয়েছে। পুরোপুরি আইনী প্রক্রিয়া মেনেই একাত্তরের এই যুদ্ধাপরাধীকে ফাঁসিতে ঝুলানো হয়েছে। জামাত-শিবির এই ঘটনাটিকে ‘জুডিশিয়াল কিলিং’ বলে প্রচার করে থাকে। কিন্তু হত্যাকান্ড বললেও এটি একটি বৈধ হত্যাকান্ড। পৃথিবীর কিছু দেশের সরকার এবং কিছু মানবাধিকার সংগঠন এখন আর কোন অপরাধের শাস্তি হিসাবে হত্যাকান্ড যথার্থ মনে করেন না, এদের প্রতিনিধী কেউ কেউ কাদের মোল্লার ফাঁসির বিরুদ্ধে তাদের আপত্তির কথা জানিয়েছিলেন। বাংলাদেশে যেহেতু শাস্তি হিসাবে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করার বিধান আছে, সুতরাং ঐ আপত্তি বাংলাদেশ আমলে নেয় নাই। যারা আপত্তি জানিয়েছিলেন, তারাও বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মানপূর্বক এই নিয়ে আর কথা বাড়ায় নাই। জামাত-শিবিরের দুনিয়া জোরা লবিং, অর্থ-সম্পদ কোন কাজে লাগে নাই। সুতরাং, কাদের মোল্লার ফাঁসি হয়েছে। এবং স্বাভাবিকভাবেই এই ফাঁসিটি বৈধতা অর্জন করেছে। মুখে স্বিকার না করলেও, জামাত-শিবির এই বিষয়টি মেনে নিয়েছে। না মেনে নিয়ে উপায় কি?

কিন্তু শাহবাগীদেরকে তো ছেড়ে দেয়া যায় না। আরো বিশেষভাবে বলতে গেলে শাহবাগী ব্লগারদের উপরই কসাই কাদেরের অনুসারী অনুরাগীদের প্রধান আক্রোশ। এরমধ্যে বেছে নেয়া হলো নাস্তিক ব্লগারদের। রাজীব হায়দারকে হত্যা করা হলো। হত্যার পর তার লেখা ছড়িয়ে দেয়া হলো বাংলাদেশের আনাচে কানাচে। তারপর একে একে অন্য নাস্তিকদের লেখাও ছড়ানো হলো। মাঠে নামলো হেফাজত। ‘রাজাকারের ফাঁসি চাই’ স্লোগানের বিপরীতে হাজির করা হলো ‘নাস্তিকের ফাঁসি চাই’ স্লোগান। রাজাকারের বিপরীতে নাস্তিক হাজির করা হলো। রাজীব হত্যাকান্ডের দায় স্বিকার করেছে ইসলামপন্থী সন্ত্রাসীরা। তাও সারাদেশে মোটামুটি যা প্রচার ও প্রতিষ্ঠা করা হলো, তা হলো যে রাজীব হত্যাকান্ডের জন্যে আসলে রাজীবই দায়ি। আল্লাহ রাসুলের বিরুদ্ধে ঐসব বাজে কথা লিখেছে বলেই তাকে মরতে হয়েছে। কাদের মোল্লা’র ফাঁসির দায় শাহবাগীদের উপরে চাপানো যায় নাই, কিন্তু নাস্তিক শাহবাগী হত্যাকান্ডের দায় নাস্তিক শাহবাগীর ঘাড়েই চাপানো গেছে। নাস্তিকদের ফাঁসি দাবি করে দেশজুরে আন্দোলন গড়ে তুলে এও বুঝিয়ে দেয়া হলো যে ভবিষ্যতে নাস্তিক হত্যার দায় নাস্তিকদের ঘাড়েই চাপানো হবে। রাজীবের পরিবার আওয়ামী পরিবার। এই ছেলের হত্যাকান্ডের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার বাড়িতে গিয়েছিলেন সান্তনা দিতে। কিন্তু তার নাস্তিক পরিচয় এবং লেখালেখি সামনে আসার পর দেখা গেলো তার হত্যার বিচার দাবিতে আর কাউকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রীও ভুলে গেলেন। খুনিরাও একরকম নৈতিক বৈধতা পেয়ে গেলো। অবস্থা এমন হয়ে গেলো যে খুনের আস্বামীকে জামিন দেয়া হলেও তা নিয়ে কারো কোন মাথা ব্যাথা দেখা গেলো না। রাজীব হত্যার দায় অত্যন্ত সফলভাবে রাজীবের ঘাড়েই চাপানো গেছে।অভিজিৎ হত্যাকান্ডের দায় যে অভিজিৎএর ঘাড়ে চাপানো যায় নাই (চেষ্টা হয়েছে যদিও) তাই এখন পর্যন্ত আমাদের সৌভাগ্য বলা যায়।

একাত্তরে পাক বাহিনী ও তাদের দালালদের হাতে যারা নিহত হয়েছেন, তাদের লাশ নিয়া রাজনীতি এবং তাদের জন্যে ন্যায় বিচারের আন্দোলন এই দুইয়ের ইতিহাসই বাংলাদেশে অনেকদিনের। যুদ্ধাপরাধের বিচার দাবির আন্দোলন যারা অতীতে করেছেন এবং এখনো করেন তারা মূলত ন্যায় বিচারের আন্দোলন করেন। আর একাত্তরের লাশ নিয়া যারা রাজনীতি করেন তাদের কাছে ন্যায় বিচার মূখ্য নয়, লাশের রাজনীতি করে ক্ষমতায় যাওয়া অথবা ক্ষমতায় টিকে থাকাই তাদের প্রধান লক্ষ্য। একাত্তরের লাশ নিয়ে বাংলাদেশে সবচাইতে বেশি যেই দলটি রাজনীতি করে সেটি হলো আওয়ামী লীগ। শাহবাগ আন্দোলনে সমর্থন দিয়ে এবং তাতে নিজেদের নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠা করেই আওয়ামী লীগ দলটি নিজেদের রাজনৈতিক ক্ষমতা সংহত করেছে এবং যুদ্ধাপরাধের বিচার সম্পন্ন করার মুলা ঝুলিয়েই ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্যে গুরুত্বপূর্ণ সমর্থন আদায় করে নিয়েছে। কিন্তু ৫ জানুয়ারির একপাক্ষিক নির্বাচনের পর ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্যে নাস্তিক শাহবাগীদের চাইতে ইসলামিস্ট হেফাজতিরাই আওয়ামী লীগের জন্যে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাই হেফাজতিদের নগদ জমি ও অর্থ লাভ হয়েছে, এবং আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ আল্লামা শফি ঘোষিত হেফাজতের বন্ধু হয়েছে। হেফাজতের মর্জি অনুযায়ি এখন বাংলা একাডেমির বইমেলা চলে। লাশের রাজনীতিতে হেফাজত বেশ কামিয়াব হয়েছে। আলেম ও মাদ্রাসা ছাত্রদের লাশের রাজনীতি করেই তাদের শক্তি বৃদ্ধি ঘটেছে। তবে গত কয়েক বছরে লাশের রাজনীতি সবচাইতে বড়ভাবে করেছে জামাতে ইসলামী। নিজেরা মানুষ খুন করে এবং নিজেদের কর্মীদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারকে মানবতাবিরোধী অপরাধী প্রমান করে নিজেদের নেতাদের যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ লাঘোব করাই তাদের উদ্দেশ্য ছিল। লাশের রাজনীতিতে জামাতের দক্ষতা তাই বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

লাশ নিয়ে রাজনীতি বাংলাদেশের নাস্তিকেরাও করে, তাদের পশ্চিমা গুরুদের অনুকরণে। কোথাও কোন ইসলামী সন্ত্রাসীর হাতে কোন হত্যাকান্ড ঘটলেই তারা সেই হত্যাকান্ডের দায় দুনিয়ার সকল মুসলমানে ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়ার রাজনীতি করে থাকেন। এরসাথে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের লাশের রাজনীতির মিল আছে। এই ধরণের লাশের রাজনীতি টুইন টাওয়ারে আল কায়েদার হামলার অপরাধে ইরাকে সামরিক হামলার বৈধতা দাবি করে। অভিজিৎ হত্যাকান্ডের বিচার দাবির আন্দোলন প্রথম থেকেই পথ হারিয়েছে। অভিজিৎ রায় বাংলাদেশের একজন প্রতিভাবান বিজ্ঞান লেখক ছিলেন। ইশ্বর চিন্তার দিক থেকে ‘নাস্তিক’ হিসাবেও তার একটি পরিচয় আছে। আর বাংলাদেশে নাস্তিক হত্যার বিচার আদায় করা প্রায় অসম্ভব একটি কাজ হয়ে গেছে বলা যায়, যেহেতু এখন পর্যন্ত একটি হত্যাকান্ডেরও কোন বিচার পাওয়া যায় নাই। বাংলাদেশের নাস্তিক’রা অনলাইনে যতোই তর্জন গর্জন করুক, নিজেদের খুনের বিচার আদায় করে নেয়ার মতো শক্তি সামর্থ তাদের আছে এমন প্রমান এখনো পাওয়া যায় নাই। তার বদলে নাস্তিকদের মধ্যে লাশের রাজনীতিতে পারদর্শী অপেক্ষাকৃত ধর্মতন্ত্রী একটা গ্রুপের আবির্ভাব ঘটেছে যারা অভিজিৎ হত্যার জন্যে অনলাইনে যার তার দিকে সন্দেহের তীর ছুড়ে নতুন নতুন তত্ত্ব তৈরি করে মিডিয়ার জন্যে কিছু মুখরোচক ‘কাহিনী’ এবং পুলিশের হাতে বারবার দেখানো যাবে এমন কিছু ‘কুমিরের বাচ্চা’ তুলে দিচ্ছে। পুলিশ এবং এফবিআই বলছে অভিজিৎকে হতা করেছে ইসলামিস্ট সন্ত্রাসীরা। আর এরা কারো ফেসবুক প্রোফাইলে ‘সুন্নি মুসলমান’ পরিচয় দেখলেও তাকে হত্যাকান্ডে জড়িত বলে সন্দেহ করছে। নাস্তিকতায় এরা যেহেতু খুবি ধার্মিক কিসিমের তাই এই আচরণ অস্বাভাবিক নয়। ন্যায় বিচার আদায় করে নেয়ার সচেতন কোন প্রয়াসের চাইতে লাশের রাজনীতি করে নিজ ধর্মতন্ত্রের বাহুবল প্রদর্শন ও নিজের সাথে যাদের মেলেনা, তাদের কে ‘সাইবার বুলি’র শিকার বানানোই তাই অভিজিৎএর মৃত্যুর পর এদের প্রধান কাজ হয়ে উঠেছে। জামাত-হেফাজতিরা শাহবাগী হত্যার দায় শাহবাগীদের ঘাড়েই চাপিয়েছিল। আর এরা বিজ্ঞান লেখক হত্যার দায় আরেকজন বিজ্ঞান লেখকের ঘাড়ে চাপাচ্ছেন।

যারা ন্যায় বিচারের আন্দোলন করেন এবং লাশের রাজনীতি করেন না, তারা ভালোমতোই জানেন যে অভিজিৎ হত্যার ন্যায় বিচার কোন বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। একাত্তরের হত্যাকান্ডের বিচার এর সাথে জড়িয়ে গেছে। গত কয়েক বছরে আওয়ামী লীগ-বিএনপি-জামাত-হেফাজতের যৌথ প্রযোজনায় দেশজুরে যেসব হত্যাকান্ড ঘটেছে সেসবের ন্যায় বিচারও এর থেকে বিচ্ছিন্ন প্রসঙ্গ নয়। স্বয়ং রাষ্ট্র যাতে লাশের রাজনীতিতে জড়িত না হয় এবং আস্তিক নাস্তিক নির্বিশেষে সকল নাগরিকের হত্যাকান্ডের ক্ষেত্রে ন্যায় বিচার নিশ্চিত করে তাই আমাদের দাবি। স্বাধীনতার ঘোষনাপত্রেও এই দাবি ছিল, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এই দাবিই করে। অভিজিৎ হত্যার আশু বিচার চাই, তার লাশ নিয়া রাজনীতি নয়। রাজনীতি হলে তা ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকবে। আর বিচার না করলে মনে রাখবেন, আজ হউক বা কাল বিচার হবেই। কাদের মোল্লার বিচার তার প্রমান।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৯ thoughts on “অভিজিৎ হত্যাকান্ড – ‘ন্যায় বিচার’ ও ‘লাশের রাজনীতি’

  1. পারভেজ আলমের পারফেক্ট
    পারভেজ আলমের পারফেক্ট অবজারভেশন।

    বাংলাদেশের জন্মের পর থেকে ইতিহাসই হলো “ন্যায়বিচার না পাওয়ার” ইতিহাস। ৭১ এর বিচার তো আজও শেষ হয়নি পুরোপুরি, সুতরাং, সেই গণহত্যার বিচারহীনতা দিয়েই আমাদের বঞ্চনার উপাখ্যান শুরু। এরপর থেকে লেগেই আছে। কেবলমাত্র যদি এদেশের বুদ্ধিজীবি হত্যাকাণ্ডের কথাই বিবেচনা করি, তাহলেও গোড়াটি কিন্তু ওই ১৯৭১ সাল থেকেই আসে। এরপর আরও কতো বুদ্ধিজীবি মরলেন তার শেষ কোনোটার বিচার শেষ হয়েছে কী? এক্কেবারে গোড়ার বিচার, মানে ৭১ এর বিচারই তো আজও শেষ হলো না। শুধু বুদ্ধিজীবি কেন, কতো শ্রমিক মরলেন, কতো নারী মরলেন, কতো শিশু মরলো, কতো মানুষ মরলো তার ন্যায়বিচার কি হয়েছে? হুমায়ুন আজাদ থেকে রাজীব, লিলন,অভিজিৎ, পাহাড় (পার্বত্য চট্টগ্রাম) থেকে প্লাজা (রানা), বিডিআর থেকে গার্মেন্টস (তাজরীন ইত্যাদি) আর প্রতিদিন একেকটা শহরের হাজারো “বিশ্বজিৎ” আর “তকী”রা খুন হয় সেইসব বঞ্চনার কয়টি হিসাব আমরা রাখি? আর কতো হিসাব স্রেফ হাওয়া হয়ে যায় তাই বা কয়জন জানি? এইসবই তো হাওয়া হয়ে গেছে। অথচ, আমরা কিন্তু সবই জানি, কে, কাকে, কিভাবে এবং কেন খুন করেছে। আমরা জানি বদমাশ, খুনী কারা। কিন্তু, হায় তারা তো সবাই নেতা, কেউ রাষ্ট্র চালায়, আর কেউ পেট্রোলবোমা জ্বালায়।

    আমরা পুড়ে যাই, অথচ, আমরা জানি কে আমাদের পুড়ালো। শুধু জানে না বিচারব্যবস্থা। তার স্মরণাপন্ন হওয়া মানেই বিরাট ফ্যাসাদে পড়া। তার জটিল কঠিন “ডকট্রিন” আর “কোড অফ ক্রিমিনাল প্রসিডিউর” আমাদের পুড়ে যাওয়াকে আমলে নিতে জানে না। অথচ, আমরা সবাই জানি, কার হাতে আমরা মরি, কার হাতে আমরা পুড়ি। তবুও, ন্যায়বিচার নামক ইলুশনেই আমাদের আস্থা!

    ন্যায়বিচারের বঞ্চনার ইতিহাস যদি কেবল বাংলাদেশেই ধরি তাহলেই হলো না। পৃথিবীর সর্বত্র এর চরিত্র এক। এই ন্যায়বিচারবোধ জন্ম দেয় একেকটা “ফোবিয়ার”। লেটেস্ট ফোবিয়াটির নাম “ইসলামোফোব”। এই ইসলামোফোব আসার আগেও বহু ফোবিয়া পৃথিবী পার করেছে। আর এসবের সাথে সরাসরি যুক্ত “দেশপ্রেম” ও “ন্যায়বিচার।” যারা এইসব ফোবিয়াকে রাষ্ট্রী পর্যায়ে এক্সিকিউট করেন তারা কিন্তু “ফর দ্য সেক অফ হিউম্যানিটি” এর ধুয়ো দিয়েই করেন। তাই, তত্ত্বের বিচারে আপনি কোনোভাবেই তাদের অস্বীকার করতে পারবেন না। এবং, আপনি অবধারিতভাবে, কখনো কখনো অজ্ঞাতেই নিজেকে হত্যা করার (শারীরিক এবং মানসিকভাবে) চুক্তিতে সই করে দিচ্ছেন।

    তাই, ন্যায়বিচার আর দেশপ্রেম উভয়ই শুভংকরের ফাঁকির নাম; মাকাল ফল। বাইরের চাকচিক্যে আমরা মোহিত হয়ে যাই। এগুলো আমাদের র‍্যাশনালিটিকে ভোঁতা করে দেয়। আমরা হয়ে উঠি ফোবিয়া আক্রান্ত, চোখের সামনে থ্রিডি গ্লাসে রাষ্ট্রপ্রণীত ন্যায়বিচারের ছবি। মনে হয় যেন স্বর্গীয়, শান্তিদায়ক। ফলে, আমাদের নিজেদের মিলেঝুলে থাকার চেষ্টাটা লোপ পায়। আমার পাশের মানুষ ঘোর সন্দেহজনক হয়ে ওঠে। আর আমরা রিপোর্ট করি রাষ্ট্রের কাছে, তার ন্যায়বিচারের কাছে। এরপর, কেমন করে যেন বাকিসব হাওয়া হয়ে যায়, বুঝতেও পারি না।

    ন্যায়বিচার ধারণাটি হলো “সংঘবন্ধ প্রতিহিংসা” আর দেশপ্রেম হলো “জাতীয়তাবাদী একনায়কতন্ত্র।” এখানে এসে রাজাকার আর মুক্তিযোদ্ধা সমার্থক হয়ে ওঠে। আজ যে রাজাকার কালই সে মুক্তিযোদ্ধা। আজ যে রাজাকার কালই সে দেশের মন্ত্রী – এই বাস্তবতা তো আপনি দেখেছেন, নাকি দেখেননি? একটা ক্লান্তিকর সময়ে পাশে ফিরে তাকানোর সময় নাই। গরুর পালের মতো হেঁটে চলা।

    চলো নিয়ম মতে
    দূরে তাকিও নাকো
    ঘাড় বাঁকিও নাকো
    চলো সহজ পথে
    চলো হিসাব মতে।

    1. পুনশ্চ: এখানে এসে আস্তিক এবং
      পুনশ্চ: এখানে এসে আস্তিক এবং নাস্তিকও সমার্থক হয়ে ওঠে। ফোবিয়া সকলকেই আক্রান্ত করে। তবে এই ফোবিয়া “বিশ্বাসের ভাইরাস” নয়, এই ফোবিয়া হলো মানুষকে “অবিশ্বাস-সন্দেহের” ফোবিয়া আর “ন্যায়বিচার-দেশপ্রেমের” ফোবিয়া।

  2. পারভেজ ভাই,
    আমার ‘মনোদৈহিক’

    পারভেজ ভাই,
    আমার ‘মনোদৈহিক’ বইটি প্রকাশ হবার পর থেকেই ইসলামিস্ট গ্রুপের কোপানলে আছি। ফেসবুকে প্রচুর মৃত্যুর হুমকি-ধমকি পেয়েছি। রাজিব হায়দার হত্যার জন্য যে হিটলিস্ট হয়েছিল আমিও তার মধ্যে একজন। মূল নাম এবং নিক ভিন্ন হওয়ায় আমাকে নিশ্চিত করতে হয়ত অনেকের সমস্যা হচ্ছে। সুতরাং আমি জানি এবং অনুভব করি এটার জ্বালা কি।

    অভিজিৎ দা’ হত্যার ব্যাপারে একটা ‘জজ মিয়া’ নাটক মনে হয় মঞ্চস্থ হতে যাচ্ছে। আপনার বিশ্লেষণেও সেগুলি উঠে এসেছে। খুব ভাল লিখেছেন। ব্যস্ত মানুষ আমি, সময় পাই না; তবু যতোটুকু সময় বের করতে পারি তা শুদ্ধচর্চায় দেবার চেষ্টা করি।

    কতগুলি বান ভুল চোখে পড়ল, উল্লেখ করে দিলাম। সময় পেলে এডিট করে পোস্ট দিতে পারেন। ভাল লেখা অনেকেই পড়ে, সেটি মাথায় রেখেই নির্ভুল করার চেষ্টা করেছি। আশাকরি সহজভাবে নেবেন।

    মুহুর্তে>মুহূর্তে
    জার্মানীতে>জার্মানিতে
    ব্যতিত>ব্যতীত
    গোড়া>গোঁড়া
    মধেই>মধ্যেই
    দূর্দশার>দুর্দশার
    দায়ি>দায়ী
    ভুমিকা>ভূমিকা
    কারাদন্ডের>কারাদণ্ডের (ণ+ড)
    বেআইনী>বেআইনি
    আইনী>আইনি
    হত্যাকান্ড>হত্যাকাণ্ড (ণ+ড)
    প্রতিনিধী>প্রতিনিধি
    স্বিকার>স্বীকার
    আরো>আরও
    দেশজুরে>দেশজুড়ে
    সান্তনা>সান্ত্বনা (ন+ত+ব)
    আস্বামীকে>আসামীকে
    ব্যাথা>ব্যথা
    অভিজিৎএর>অভিজিৎ এর>অভিজিৎ-এর
    মূখ্য>মুখ্য
    নিয়ন্ত্রন>নিয়ন্ত্রণ
    অনুযায়ি>অনুযায়ী
    প্রমান>প্রমাণ
    লাঘোব>লাঘব
    ইশ্বর>ঈশ্বর
    হত্যাকান্ডেরও>হত্যাকাণ্ডেরও
    সামর্থ>সামর্থ্য>সমর্থ
    হতা>হত্যা
    হত্যর>হত্যার
    ঘোষনাপত্রেও>ঘোষণাপত্রেও

    1. আপনার শুদ্ধচর্চার প্রচেষ্টা
      আপনার শুদ্ধচর্চার প্রচেষ্টা দেখছি। আপনাকে সাধুবাদ। আমার অনেক বানান ভুল হয়। আপনার এই সহযোগিতা কাজে লাগবে। আমি সময় নিয়ে বানানগুলো ঠিক করবো। তবে যেসব বানান ইচ্ছাকৃতভাবে লিখেছি, সেগুলা বাদে। আপনার প্রচেষ্টা জারি থাকুক, আমরা উপকৃত হই। ধন্যবাদ।

  3. রাজাকারদের বিচার প্রক্রিয়া
    রাজাকারদের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হবার অনেক আগে থেকে, স্বাধীনতার পর থেকে তাঁদের অপরাধের কথা লেখা হয়েছে। খুঁটিনাটি সংগ্রহ, গবেষণা আর এসবের জন্য নিয়োজিত অনেক নিবেদিত প্রাণের শ্রমের কারণে ইতিহাস বিকৃতি যেমন রোধ করা সম্ভব হয়েছে তেমনি বিচার কাজেও সহায়ক হয়েছে। অভিজিৎ রায়কে হত্যার পর যারা নির্ভেজাল ভাবে এই হত্যার বিচার চান, তাঁদের মধ্যে অনেকে সাধ্যমত চেষ্টা করছেন বিভিন্ন তথ্য সবার সামনে তুলে ধরতে। এর মাঝে কিছু অতিরঞ্জন, মিথ্যা বা ভুল, ব্যক্তিগত আবেগ বা আক্রোশ থাকতে পারে। কিন্তু এর মাঝে খুজেও পাওয়া যেতে পারে প্রকৃত ঘটনা। ইস্লামিস্টরা অভিজিতকে হত্যা করেছে, রাষ্ট্র তার বিচার করবে, আর সবাই কলম, আলোচনা বন্ধ করে বসে থাকবে তাই কি? ত্রিশ লক্ষ শহীদের হত্যার জন্য আন্দোলন হতে কত বছর লেগে গেলো! আর এক অভিজিতের জন্য এক্ষণই আন্দোলন বাঙ্গালীর দারা? বিচার একদিন হবে কিনা জানি না তবে হতার সাথে সম্পৃক্ত হতে পারে তুচ্ছতম তথ্যও আমরা জানতে চাই। অপর বিজ্ঞান লেখক যিনি আছেন, আরও যারা ছিলেন সেদিনের আড্ডায়, কোথায় তারা? কেমন তাঁরা? কি করেছিলেন সেদিন বা তার আগে থেকে কিছুদিন? এখন কি করছেন? অনেক কিছুর সাথে আমরা এসবও জানতে চাই।

  4. পোলারাইজেশন থেকে সরে আসার
    পোলারাইজেশন থেকে সরে আসার চেষ্টা হিসাবে সাবরিনা ফেরদৌসের কমেন্টটার দিকে মনোযোগ দেয়া যেতে পারে। এই লেখার যেমন যুক্তি আছে, কমেন্টেও যুক্তি আছে। দুইটা একত্রে পড়লে ধারণা স্বচ্ছ হতে পারে। এটা ন্যয্য কথা যে বিচার হচ্ছে না বলে সবাই হাত পা গুটিয়ে তো বসে থাকবে না। স্বাভাবিকভাবেই নিজেরা খোঁজখবর করবে, বুঝবার চেষ্টা করবে ব্যপারটা। মুশকিল হলো এক্ষেত্রে খোঁজখবরটা হচ্ছে জিজ্ঞাসার সাথে সাথে গভীর সন্দেহ এবং সন্দেহের সমাধান হবার আগেই অভিযুক্ত করে ফেলার টোনে। এরপর ক্রমান্বয়ে জিজ্ঞাসা অবলুপ্ত হয়ে সন্দেহের ভাগ কমতে কমতে কেবল অভিযোগনামা হিসাবে ছড়াচ্ছে। আত্মপক্ষ সমর্থন তো দূরে থাক, তৃতীয় পক্ষের তরফ থেকে এই জিজ্ঞাসাবাদ বিষয়ে কোন প্রশ্ন উঠলে সেটাকে দেখা হচ্ছে এপোলজির চেষ্টা হিসাবে, সেগুলিও ভবিষ্যতের প্রমাণ হিসাবে হয়ত স্ক্রিনশট হয়ে জমা হয়ে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে যে এই দেশে সাহস করে কচ্ছপের খোল থেকে ঘাড়টা বের করার মতো মানুষ আর থাকবে না তা তো পরিষ্কার। কী জানি বাবা কখন কার সাথে কোন আলাপের সূত্রে কোন ষড়যন্ত্রতত্বে জড়িয়ে যাই – তার থেকে থাকি না নিজের মতো, কেউ না চিনলে কোন বিপদে পড়ারও আশঙ্কা নাই! সমমনাদের নিয়ে আড্ডা দেবার উদয়োগের কারণে যখন রেপ ভিক্টিমের ‘তুমি ঐখানে ক্যান গেছিলা, ঐটাইমে ঐখানে কি করতেছিলা’ টাইপের প্রশ্নের মুখামুখি হতে হয়, তখন মুক্তমনাদের কলম এবং পিয়ার প্রেশার কাজের কাজ কিছু করার বদলে উলটা পালিয়ে বাঁচার মানসিকতা কাল্টিভেট করে। খটকা লাগলে প্রশ্ন উঠতেই পারে, কিন্তু সেটা গণহিস্টেরিয়ায় পরিণত হচ্ছে। সমস্যাটা এখানে।

  5. আমি অভিজিত আর রাজীবের মধ্যে
    আমি অভিজিত আর রাজীবের মধ্যে খুব বেশী পার্থক্য দেখিনা। মুক্তমনায় ইসলাম বিদ্যেষী কুরুচিপুর্ন পোস্ট, মন্তব্য আর আলোচনা অভিজিত রায়ের ছত্র-ছায়াতেই হয়েছে। তিনি নিজেও এসব আলোচনায় অংশ নিয়েছেন। তিনি একটি মন্তব্যে আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ(সা) কে মহাউন্মাদ বলেছেন। সবচেয়ে বড় কথা তিনি ও তার ব্লগের পক্ষ থেকে মুক্তচিন্তার নামে ইসলাম ধর্মকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

    তার বিজ্ঞান বিষয়ক লিখাগুলো খুব সুন্দর ও প্রশংসার দাবী রাখে। কিন্তু ইসলাম ধর্ম আর এই ধর্মের নবীকে নিয়ে মুক্তমনা ব্লগের ভূমিকা সত্যিই নিন্দনীয়।
    মুক্তচিন্তা– আসলে কি সেটি নিয়ে আমদেরকে আজকে নতুন করে ভাবতে হবে। মুক্তচিন্তার নামে বিদ্যেষ ছড়ানো গ্রহনযোগ্য নয়। বিদ্যেষ মানুষকে বিভক্ত করে।

    পরিশেষে অভিজিত হত্যার প্রকৃত কারন আর হত্যাকারীকে ধরা হোক এই আশা রাখি।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

50 − 41 =