সুমেরুতে প্রাকৃতিক গুপ্তধনকে কেন্দ্র করে যুদ্ধের দামামা!

?oh=e0023ca995b0c40877a41705f4309daf&oe=55B1F0C6&__gda__=1436724109_a31db48911402a14fb78d7020d15f7e2″ width=”350″ />
সুমেরুতে এখন গুপ্তধনের সন্ধান পেতে ছুটছে বিশ্বের সব দেশ। সম্প্রতি সেখানে সন্ধান মিলেছে বিপুল তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস ও খনিজ পদার্থের। তাই এই মেরুপ্রদেশের দখল নিতে মরিয়া আমেরিকা থেকে ইউরোপ, এমনকি সুদূর এশিয়ার দেশগুলোও।

পাশের দেশ ভারতের ভূমিকা এখনও পর্যন্ত গবেষণামূলক। কর্তৃত্ব ফলানোর ক্ষমতা নেই। কিন্তু তারাও ভাবছে। সে দেশের বিশেষজ্ঞরা সরকারকে বিশ্বের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি পরিবর্তনের দিকে নজর রাখতে বলছেন। যেখানে কিনা মরু অঞ্চলের এই সম্পদের অংশীদারিত্ব নিশ্চিতের বিষয়টা গুরুত্বপূর্ণ!

নক্ষত্র যুদ্ধ কিংবা মহাকাশ যুদ্ধের সম্ভাবনা এখনও কল্পকাহিনী। কিন্তু এই পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধের সুমেরুতে তুষার যুদ্ধের আশঙ্কা এখন বাস্তব হতে চলেছে। যেখানে তাপমাত্রা মাইনাস চল্লিশ থেকে ষাট ডিগ্রি, যেখানে বছরের প্রায় অর্ধেকের বেশি সময় দিন অথবা রাত, যেখানে বিরল জ্যোতির্ময় ঐশ্বরিক মেরুজ্যোতির ছটা রঙধনুর থেকেও বিস্ময়কর, সেখানে এখন ক্রমশ বাড়ছে সামরিক অস্ত্রের মজুদ! গুপ্তধনের সন্ধান পেতে ছুটছে বিশ্বের সব দেশ।

কয়েক বছর আগেই চীনা লালফৌজের জনৈক অ্যাডমিরাল ইন ঝাউ পার্টির রাজনৈতিক সম্মেলনে সুমেরু নিয়ে মন্তব্য করে গোটা বিশ্বে বিতর্কের ঝড় তুলে দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘সুমেরুর ওপর পৃথিবীর সকল জনতার অধিকার রয়েছে। কোনও এক দেশ বা দেশসমূহের কোনও একচেটিয়া অধিকার থাকতে পারে না।’

সুমেরু বৃত্তের চতুর্দিকে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ডেনমার্ক, নরওয়ে এবং রাশিয়া। কিন্তু এই সুমেরু পরিচালনার জন্য যে পরিষদ তৈরি হয়েছে, তাতে এই দেশগুলোর সঙ্গে পরিদর্শক হিসাবে আরও অনেকগুলো দেশকে নেওয়া হয়েছে। তার মধ্যে চীন ও ভারতও রয়েছে। এখন প্রত্যেক দেশ এখানকার এলাকার ওপর দখল রাখার জন্য চাপ তৈরি করছে একে-অপরের ওপর।

কিন্তু এটা সবার কাছে পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে যে, সুমেরুর দখল নিয়ে আসলে কোনও বড় শক্তিই চুপ থকতে পারবে না। সুমেরুর পরিস্হিতি ব্যাখ্যা করলেই এটা বোঝা যাবে। জাতিসংঘ নির্দেশিত বর্তমান সমুদ্র এলাকার অধিকার আইন অনুযায়ী উপকূল থেকে ৩৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত উপকূলবর্তী দেশগুলো সামুদ্রিক সম্পদ আহরণ করতে পারে। কিন্তু ইতিমধ্যেই সুমেরু বৃত্তের চারপাশের দেশগুলো এই অধিকার ৬৫০ কিলোমিটার করার আর্জি জানিয়েছে। একমাত্র রাশিয়া ব্যতীত অবশিষ্ট মেরুবৃত্তের দেশগুলো আন্তর্জাতিক সামরিক মোর্চা ন্যাটোর সদস্য।

?oh=d346314a47e79c4ab927700f06ee985f&oe=55A35AF2&__gda__=1437029828_acbe2ef12b48763394e38e0a8e01941d” width=”400″ />
সুমেরুতে রুশী বাহিনীর সামরিক জাহাজ!

সুমেরুকে কেন্দ্র করে এই বড় শক্তির দেশগুলো নিজেদের স্বার্থে এখন নয়া সামরিক মোর্চা গড়ে তুলছে। যে নরওয়ে দীর্ঘদিন ধরে রাশিয়ার সঙ্গে মেরু এলাকার দখল নিয়ে বিবাদ চালিয়ে গিয়েছে, এখন তারাই সামরিক সমঝোতা করে ফেলেছে। দুটি দেশই মেরু অঞ্চলের দখলদারি বজায় রাখার জন্য বিশেষ সামরিক বাহিনী গড়ে তুলেছে। রাশিয়া ‘বরফ শ্রেণীর’ (আইস-ক্লাস) এক বিশেষ যান তৈরি করে তা মোতায়েনও করে দিয়েছে ইতোমধ্যে। সামরিক রসদ মেরুবৃত্তে পৌঁছে দেয়ার জন্য এই যান ব্যবহার করা হয়।

মেরু এলাকায় নিজেদের অধিকার বজায় রাখতে নরওয়ে বিশেষ এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের স্কোয়াড্রেন তৈরি করে ফেলেছে। অন্যরাও পিছিয়ে নেই। বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করা হচ্ছে তুষার যুদ্ধে দক্ষ সামরিক বাহিনী তৈরি করতে। কানাডা এর মধ্যেই বিশেষ নৌবাহিনী পাঠিয়ে দিয়েছে নিজেদের তথাকথিত এলাকা দখল করতে। গ্লেসিয়ার গলে যাওয়া জলে ভাসমান সেই প্রহরী জাহাজ। প্রয়োজনে বরফের পাহাড় ভেঙে ভিন্নপক্ষকে ঘায়েল করতে ফ্রিগেট জাতীয় আক্রমণাত্মক যুদ্ধজাহাজও মোতায়েন সঙ্গে রেখেছে তারা।

এর মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ডেনমার্ক একত্রে নিজেদের সামরিক শক্তির প্রদর্শনী করেছে মেরু অঞ্চলে। নরওয়ে অন্য দেশগুলোর সঙ্গে মিলিত হয়ে হিমবাহের মধ্যে ষোলো হাজার সেনার কুচকাওয়াজ করিয়ে পাল্টা শক্তির প্রদর্শনী করেছে। এই সামরিক শক্তির প্রদর্শনীর নেপথ্যে রয়েছে মেরুগর্ভের বিপুল সম্পদ। কেবলমাত্র আলাস্কাতেই নাকি ২৬ বিলিয়ন গ্যালন তেলভাণ্ডার রয়েছে। সেই কারণেই আগামী দিনে সংঘাতের মূল মঞ্চ হয়ে উঠছে এই সুমেরু। তাৎপর্যপূর্ণ হলো, কুমেরুর ক্ষেত্রে কিন্তু একটা আন্তর্জাতিক চুক্তি রয়েছে। যা মেনে চলা সকলের কর্তব্য। সুমেরুর ক্ষেত্রে এ ধরনের কোনও চুক্তি নেই।

?oh=ec0ff1790a6f17b4242459d03a8d35b2&oe=55B505ED” width=”400″ />
মার্কিন নিউক্লিয়ার সাবমেরিন!

এটা ঠিকই রাশিয়ার ভূখণ্ডের এক-তৃতীয়াংশ মেরুবৃত্তের অন্তর্গত। যে কারণে তারা এই এলাকার ওপর দখল রাখার জন্য মরিয়া। কিন্তু মেরুগর্ভের সম্পদ আহরণে রাশিয়ার নিজস্ব পরিকাঠামো নেই বলে তারা অন্য দেশকে এখানে আহবান করছে। তাদের অনেকেই মেরুবৃত্তের বহুযোজন দূরে। রাশিয়া যেমন ইতালির সংস্থাকে ডেকে এনেছে, তেমনই নরওয়ে এনেছে ফ্রান্সকে। এখন তো প্রায় হুড়োহুড়ি পড়ে গিয়েছে মেরু দখলের জন্য। নরওয়ে তো এখন মেরুবাজার খুলতে চলেছে। সেই বাজারে শামিল এখন চীনের সঙ্গে ভারতও।

এই দখলদারির মধ্যে এখানকার আদিবাসী এস্কিমোরা প্রায় নিজভূমে পরবাসী। অথচ এখানকার এলাকার ওপর তাদের অধিকার প্রথম। এখানে যে মেরু পরিষদ গঠিত হয়েছে, তাতে এস্কিমোসহ আদিবাসীদের প্রতিনিধিত্ব রাখা হয়েছে। কিন্তু বিশ্বের ক্ষমতাধর দেশের ভিড়ে তাদের কথা শোনা যাবে কি! শুধু তাই নয়, আরও আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে, এই বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতার মধ্যে মেরু অঞ্চলের পরিবেশ এবং স্বাভাবিকতা নষ্ট হলে বিশ্বের প্রাকৃতিক ভারসাম্য সঙ্কটের মধ্যে পড়তে পারে।

সদ্যগঠিত মেরু পরিষদ বৈঠকে বিজ্ঞান থেকে পরিবেশ, অনেক কিছুই আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু এই প্রতিযোগিতার নামে যে সামরিক উপস্থিতির প্রসার ঘটছে, তা নিয়ে কোনও আলোচনাই হচ্ছে না। বিজ্ঞানের নামে তেল-গ্যাস আহরণের সঙ্গে গোলা-বারুদের সম্ভার গড়ে উঠে মেরুবৃত্তকেই বিপজ্জনক করে তুলছে, সেটা বিবেচনায় আনা হচ্ছে না। অথচ আশঙ্কার কারণ বেশ ভালোভাবেই রয়েছে। উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর মতো হিমালয়কেও তৃতীয় মেরু বলা হয়। সেই হিমালয়ের বরফ কমছে– এটা এখন বিজ্ঞান সমীক্ষার তথ্য। এখন সুমেরুতে যদি মানুষের এসব তৎপরতার ফলে বরফ গলে যায়, তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বিশ্বের সর্বত্র। তার থেকে হিমালয়ও বাদ পড়বে না।

সুমেরুতে ভারতের একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণা কেন্দ্র আছে। ‘হিমাদ্রি’ নামক স্টেশনটির কাজ সামুদ্রিক স্রোতের গবেষণা করা। এখানকার নিকটবর্তী দেশ আইসল্যান্ডকে একবার আর্থিক বিপর্যয় থেকে বাঁচিয়েছিল ভারত ও চীন। সেই আইসল্যান্ডের বদৌলতেই ভারত ও চীনের প্রবেশ মেরুবৃত্তে। সমর্থন করেছিল নরওয়ে। চীনের প্রধানমন্ত্রী ওয়েন জিয়া বাও এখানে নিজেই ছুটে এসেছিলেন। এমনকি গিয়েছেন ভারতের রাষ্ট্রপতিও। তবে এসব সফর হাওয়া বদলানোর জন্য ছিল না। বড় দেশগুলো বিরাট গুরুত্ব দিচ্ছে এখানকার সামুদ্রিক সম্পদ সংগ্রহে ও ক্ষমতা করায়ত্ত করতে। স্বাভাবিকভাবেই ক্ষমতার ভারসাম্যের প্রশ্ন তুলে এগিয়ে আসছে আরও অনেক দেশ। ফলে মেরু হিমবাহর অস্তিত্ব নিয়ে আলোচনা ক্রমেই গৌণ হয়ে পড়ছে। তাই অদূর ভবিষ্যতে মেরুর বুকে যে বিরাট ঝড় উঠতে চলেছে, এ কথা চোখ বন্ধ রেখেই বলাই যায়! তবে আশা আপাতত এটুকু যে, অনলাইনে এ বিষয়ক আলোচনা ক্রমশ বাড়ছে। তরুণরা এ বিষয়ে সচেতন হচ্ছে, খোঁজ খবর নিচ্ছে। তারা উদ্যোগী হলে পৃথিবী এই সুমেরু যুদ্ধে সুবাহিনীর খোঁজ পাবে!

?oh=2690f4ca65243aeba401df8668efbe1a&oe=5597F58E&__gda__=1437632394_e329a384d61de57e83782dbf006b3a07″ width=”250″ />
অনলাইনে সুমেরু রক্ষার জন্য চলছে প্রচারণা!

উল্লেখ্য, সুমেরু অঞ্চল বা আর্কটিক (Arctic) হলো পৃথিবীর সর্ব উত্তরের অঞ্চলটির নাম। এতে অবস্থিত স্থানগুলোর মধ্যে রয়েছে গ্রিনল্যান্ড; নরওয়ের Svalbard ও অন্যান্য মেরুদ্বীপ; সাইবেরিয়া, আলাস্কা ও কানাডার সর্বউত্তরের ভূমিসমূহ; ল্যাব্রাডরের উপকূল; আইসল্যান্ডের উত্তরাংশ এবং ইউরোপের আর্কটিক উপকূলের কিছু অংশ। উত্তর মেরু তথা সুমেরু কোন ভূমি নয়, বরং বরফাচ্ছাদিত সমুদ্রের উপর অবস্থিত, যাকে আর্কটিক মহাসাগর বা উত্তর মহাসাগর বলা হয়। সুতরাং বলা যায় বরফাচ্ছাদিত উত্তর মহাসাগর এবং তার চারদিকের কিছু চিরহিমায়িত ভূমি নিয়েই সুমেরু অঞ্চল।

সংবাদ সূত্র : foxnews

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৭ thoughts on “সুমেরুতে প্রাকৃতিক গুপ্তধনকে কেন্দ্র করে যুদ্ধের দামামা!

  1. অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ একটি
    অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ একটি লেখা। এ বিষয়টা একেবারেই জানা ছিল না। সম্পূর্ণ নতুন কিছু জানলাম, অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।
    আরো অনেক কথা বলা যায়! কিন্তু কীইবা বলব!
    ——-

    পৃথিবীর এখনও অনেক দেখতে বাকি!
    এখনও অনেক যুদ্ধ বাকি!
    এখনও অনেক দখল বাকি!
    রেড আমেরিকানরা নেই তাতে কী!
    এস্কিমোদের রক্তে এগুবে সভ্যতা আর তার
    সাধের সেরা কম্পু ও ড্রিলিং সাইন্স!
    আমি সুমেরু দেখিনি, অনেক দূরে থাকি!
    সাঁওতাল আর মগ, মারমাদের কান্না শুনে
    ইগলুবাসী এস্কিমোদের কথা ভাবি!

  2. ইস্টিশনে ঢুকেই চমৎকার লেখাটি
    ইস্টিশনে ঢুকেই চমৎকার লেখাটি পড়ার সৌভাগ্য হলো। জানতাম না বিষয়টা। মধ্যরাতের ট্রেনকে ধন্যবাদ লেখাটির জন্য।

  3. এতে করে আরেকটি বড় প্রাকৃতিক
    এতে করে আরেকটি বড় প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সম্ভাবনা তৈরী হল।কোন যুদ্ধ যদি বাধে,পৃথিবীর ইকোসিস্টেম তীব্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।।

  4. জানাই ছিল না এ বিষয়ে। ধন্যবাদ
    জানাই ছিল না এ বিষয়ে। ধন্যবাদ লেখককে।
    সাম্রাজ্য দখলের কোন শেষ নাই। নরওয়ের মত দেশকে এই ভূমিকাই দেখব বলে মনে করিনি।

  5. অসাধারণ একটা আর্টিকেল !!!
    অসাধারণ একটা আর্টিকেল !!! আসলে … স্বীকার করতে দোষ নেই সুমেরুর উপর এতো গোছান আর্টিকেল আগে পড়েছি কিনা । ধন্যবাদ মধ্যরাতের ট্রেনকে !!!!

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

6 + 4 =