তসলিমা সম্পর্কে আহমদ ছফা ও হুমায়ুন আজাদ

তসলিমা নাসরিন সম্পর্কে আসুন ছফা ও আজাদের দুটো বক্তব্য পড়ি। “আহমদ ছফা” তার “আনুপূর্বক তাসলিমা এবং অন্যান্য স্পর্শকাতর বিষয়” বইয়ে বলেছেন, ”তসলিমা নাসরীন- এর ওপর যখন বাংলা একাডেমীর মেলায় হামলা করেছে সংবাদপত্রে শুনেছি , অন্যান্য লেখক সাহিত্যিক এর সংগে আমিও যৌথভাবে বিবৃতি দিয়ে এই অপকর্মের নিন্দা করেছি । পরে অবশ্য কিছু কিছু মানুষের কাছে শুনেছি তাসলিমা নাসরীন মানুষের সহানুভুতির দৃষ্টি আকর্ষন করার জন্য আগে থেকে যোগার করে এই স্বরচিত হামলা কান্ডটি ঘটিয়েছে। তসলিমা নাসরীন হালে এমন একজন মহিলায় রূপান্তরিত হয়েছে তার মধ্যে সম্ভব অসম্ভবের ভেদ রেখাটি মুছে গিয়েছে। কোনটা সত্য কোনটা বানোয়াট বলা খুবই মুশকিল ।”

”এখন আমি তাসলিমা নাসরীনের লজ্জা উপন্যাসটি নিয়ে গোটা ভারতবর্ষ জুড়ে যে তুল কালাম কান্ড চলছে এবং গোটা উপমহাদেশে তসলিমাকে আলোচনার বিষয় বস্তুতে পরিণত করেছে সে বিষয়ে কিছু বলতে চাই ।
তসলিমা বাংলাদেশের সমাজের সবটাই কালো করে দেখেছে । এখানে যে আলো আছে সে কথাটি তসলিমার একবারো খেয়াল হয়নি । তার এ বইটি যদি হিন্দু মৌলবাদিদের হাতে পড়ে, নতুন করে সাম্প্রদায়িকতা বিষবাষ্প ছাড়াবার অস্ত্র হিসেবে বইটি ব্যবহার করা অসম্ভব হবে না ।

প্রসংগক্রমে আমি আর একটা বই এর উল্লেখ করব । মিস মেয়ো নামে এক ইংরেজ ভদ্র মহিলা একসময় ভারতিয় হিন্দু সমাজের কুতসা করে ‘মাদার ইন্ডিয়া’ নামে একটি লোমহর্ষক গ্রন্হ লিখেছিলেন । মহাত্না গান্ধি বইটি পাঠ করার পর বলেছিলেন এটি একটি নর্দমা পরিদর্শনকারীর রিপোর্ট । নর্দমা দেখে বেড়ানোর যার কাজ সে কখনো ফুলের বাগান দেখে না । তসলিমাও বাংলাদেশের যেখানে যেখানে নর্দমা আছে নাকটি বাড়িয়ে দুর্গন্ধের স্বাদ নিচ্ছেন এবং সকলকে অংশ দিচ্ছেন ।”

ড. হুমায়ুন আজাদ এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, “মৌলবাদিরা কোন চক্রান্ত থেকে তার বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে, তা আমি জানি না। তবে এ-ধরণের গুজব শোনা যায় ভারতের বিজেপি এর সংগে সংশিষ্ট ছিল, এমনকি তসলিমা নাসরিন নিজের বিরুদ্ধে মিছিলের আয়োজন নিজেই করেছিল বলে আমরা শুনেছি। বাঙলা একাডেমির বইমেলায় মিছিল হচ্ছিল, ছোট মিছিল, আমি নিজে তা বাধা দিতে গিয়েছিলাম, পরে শুনি ওটার আয়োজন সে-ই করেছে। তাই আমি আর বাধা দিই নি। বাঙলা একাডেমির তখনকার মহাপরিচালক আমাকে জানিয়েছিলেন মিছিলটি তসলিমা নিজেই আয়োজন করেছে। তসলিমা চেয়েছিল একটি মহাগোলোযোগ হোক। তাহলে সে সাড়া জাগানো ঘটনা বা ব্যক্তিতে পরিণত হবে।”

“Don’t mention Taslima Nasrin to me – I may contract syphilis.” তসলিমা সম্পর্কে আজাদের বিখ্যাত এক উক্তি। এর কারণ ছিল, তসলিমা তার একটি বইতে বলেছিলেন, তার স্বামী কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ পতিতাদের কাছে যেতেন। তাই তিনি এক সময় সিফিলিসের আশঙ্কা করতেন।

তসলিমার নির্বাসনের বিরোধিতা করি। তবে তার কান্ডজ্ঞানহীন কর্মকান্ডের ও প্রতিষ্ঠাকামীতারও সমালোচনা করি। তসলিমাকে সমালোচনা ব্যতিরেকে গ্রহণের কোনো পথ দেখি না। তসলিমাকে নিয়ে হালে মাঠ খুব গরম। তসলিমার নব্য অনলাইন ভক্তরা লাইক কামানোর উদ্দেশ্যে ও নিজেদের মুক্তমনাপণা জাহিরের নিমিত্তে ব্যাপক মাতামাতি করছে তসলিমাকে নিয়ে। তারা তসলিমার প্রশ্নে কিছুই জানে না। মূলত, তসলিমা একজন অসুস্থ নারীবাদী। ব্যক্তিগত অনুভূতি দ্বারা চালিত। তার লেখায় কোনো সারবস্তু নেই। এ কারণে তার ভক্তদেরও দেখবেন, কবিতা ছাড়া তসলিমার কোনো লেখা থেকে তারা তেমন একটা উদ্ধৃতি দেয় না।

তসলিমা তার আত্মজীবনীতে লিখেছেন, তাকে প্রথম আক্রমন করে তার (৮ বছর বয়সে) মামা। তার খালাত বোন আত্মহত্যা করে একই মামার আক্রমনের আঘাত সহ্য করতে না পেরে। দ্বিতীয়বার তাকে আক্রমন করে (এর দুই বছর পর) তার কাকা। এগুলোর কারণে তার মধ্যে পুরুষ বিদ্ধেষী মনোভাব গড়ে ওঠে। এটা হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তসলিমা এসবের ফলে যতটা না নারীর মুক্তিকামী হয়েছেন, তার চেয়ে বেশি হয়েছেন পুরুষবিদ্বেষী। প্রতিষ্ঠাকামী ছিলেন বিধায়, বার বার নিজেকে ওঠানোর জন্য নারী মুক্তির নানা বিষয়কেও অবজ্ঞা করেছেন। আবু হাসান শাহরিয়ারের ‘অর্ধসত্য’ বইয়ে এ বিষয়ক বিবরণ আছে। প্রতিষ্ঠাকামীতা তার এতই ছিল যে, নিজ দেশকেও পায়ে ঠেলেছেন। ২০০৭ সালের নভেম্বরে প্রকাশিত “তুই নিষিদ্ধ, তুই কথা কইস না” গ্রন্থের ৩৯তম পৃষ্ঠায় লিখেছেন- ‘কলকাতাকে এখন আমার আর মাসি বলে মনে হয় না, মা বলে মনে হয়।’

তার চিন্তায় ছিল ব্যাপক স্ববিরোধিতা। একটা উদাহরণ দেই। “তুই নিষিদ্ধ, তুই কথা কইস না” গ্রন্থের প্রথম রচনা “বন্দী আমি” তেদেখা যায়, কলকাতা যাওয়ার আনন্দে তস্লিমা টানা ১ সপ্তাহ ধরে প্রিয় প্রিয় মানুষের জন্য শপিং করেছেন। কিনেছেন, ১) জামদানি শাড়ি, ২) আদ্দির পাঞ্জাবী, ৩) বই, ৪) শুটকি মাছ, ৫) মুক্তা গাছার মন্ডা, ৬) নকশি কাঁথা, ৭) আমের আচার।

ওই “তুই নিষিদ্ধ, তুই কথা কইস না” গ্রন্থের ৫৮ নং পৃষ্ঠায় লিখেছেন, “উৎসবের যদি প্রয়োজনই হয়, তবে কি পয়লা বৈশাখ,বর্ষবরণ,নবান্ন-উতসবের উপলক্ষে হতে পারে না? শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নানারকম উতসব চালু করেছেন,সে সব এখন মহাসমারোহে উদযাপিত হয়”
একই বইয়ের একই পৃষ্ঠায় লিখেছেন, “এরকম কি কেউ কখনো বলে যে, এবারের পুজোয় খরচের টাকাটা উন্মুল উদ্বাস্তু মানুষের জন্য ব্যয় করব। অথবা খরচ হতে যাচ্ছে যে কয়েক হাজার কোটি টাকা, সেই টাকা দুভাগ কি তিন ভাগ খরচ হবে অন্য খাতে। ইশকুলে পড়তে না পারা বালক-বালিকাদের লেখাপড়ায়! এবছর বাজি পোড়ানোর খাতে যে টাকা বরাদ্দ ছিলো, সে টাকাটা ছাই করে না দিয়ে বরং অন্য কিছু হোক”।

“তুই নিষিদ্ধ,তুই কথা কইস না” বইয়ের ৫৪ নাম্বার পাতায়, “পুজো কি,পুজো কেন” এই রচনাটির শুরুতে বলেছেন, “আমি ধর্মহীন মানুষ। যুক্তিবাদে, মুক্তিবাদে বিশ্বাসী। বিশ্বাসী লৌকিকে, ইহলৌকিকে, সাম্যবাদে, মনুষ্যবাদে, বিবাদ-বিতন্ডায়, বৈষম্যের প্রতিবাদে”। আবার একই বইয়ে কলকাতাবাসীকে ঘটি বলে সম্বোধন করছেন। আমরা তো সকলেই জানি যে এই “ঘটি” কথাটি অনেকে স্ল্যাং হিসেবে ব্যাবহার করে। আমরা এও জানি ঘটি শব্দটি একটি অত্যন্ত নোংরা শব্দ যা সম্মানিত কলকাতাবাসীদের সম্মানহানি-ই কেবল হয়। অথচ এর আগেই বলেছেন, কলকাতা তার মা। তাহলে আপন দাদা-দিদিদের ঘটি বলে গাল দিচ্ছেন কেন?

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৯ thoughts on “তসলিমা সম্পর্কে আহমদ ছফা ও হুমায়ুন আজাদ

  1. হা তার সমালোচনা করায় যায়।
    হা তার সমালোচনা করায় যায়। ধর্ম বিরোধিতা সব ভুয়া, ধর্মের
    কটূক্তিকে সামনে রেখে বা বলা যায় ধর্মের
    ঘাড়ে বন্দুক রেখে মূলত পুরুষ সমাজে বসবাসরত এক
    মেয়ে হয়ে পুরুষের বিরুদ্ধে “হাটে হাড়ি ভাঙ্গবে”
    একটি পুরুষ শাসিত সমাজ তা মেনে নিবে,
    বা নিরবে সহ্য করবে তা কি হয়।
    >জগত সমাজ নজরুলকে বলে তুমি লিখছ—ওকে লিখ।
    সেই জগত সমাজ তসলিমা লিখলে বলে – ইস
    কি পাকামো তোমাকে কে লিখতে বলেছে।
    এগুলি কোন যুক্তি না , না কোন সাম্যের ভাষা……
    একই কথা যখন নামধারি পীররা লিখে তখন এক বিচার
    আর তসলিমা লিখলে আরেক বিচার তবে কেন??
    >>তাহলে কি এগুলি সবই পুরুষতান্ত্রিক সমাজের
    কুটচাল নয় কি ???? http://www.istishon.com/node/6907

  2. ”এখন আমি তাসলিমা নাসরীনের

    ”এখন আমি তাসলিমা নাসরীনের লজ্জা উপন্যাসটি নিয়ে গোটা ভারতবর্ষ জুড়ে যে তুল কালাম কান্ড চলছে এবং গোটা উপমহাদেশে তসলিমাকে আলোচনার বিষয় বস্তুতে পরিণত করেছে সে বিষয়ে কিছু বলতে চাই ।
    তসলিমা বাংলাদেশের সমাজের সবটাই কালো করে দেখেছে । এখানে যে আলো আছে সে কথাটি তসলিমার একবারো খেয়াল হয়নি । তার এ বইটি যদি হিন্দু মৌলবাদিদের হাতে পড়ে, নতুন করে সাম্প্রদায়িকতা বিষবাষ্প ছাড়াবার অস্ত্র হিসেবে বইটি ব্যবহার করা অসম্ভব হবে না ।
    প্রসংগক্রমে আমি আর একটা বই এর উল্লেখ করব । মিস মেয়ো নামে এক ইংরেজ ভদ্র মহিলা একসময় ভারতিয় হিন্দু সমাজের কুতসা করে ‘মাদার ইন্ডিয়া’ নামে একটি লোমহর্ষক গ্রন্হ লিখেছিলেন । মহাত্না গান্ধি বইটি পাঠ করার পর বলেছিলেন এটি একটি নর্দমা পরিদর্শনকারীর রিপোর্ট । নর্দমা দেখে বেড়ানোর যার কাজ সে কখনো ফুলের বাগান দেখে না । তসলিমাও বাংলাদেশের যেখানে যেখানে নর্দমা আছে নাকটি বাড়িয়ে দুর্গন্ধের স্বাদ নিচ্ছেন এবং সকলকে অংশ দিচ্ছেন ।”

    তসলিমার নব্য অনলাইন ভক্তরা লাইক কামানোর উদ্দেশ্যে ও নিজেদের মুক্তমনাপণা জাহিরের নিমিত্তে ব্যাপক মাতামাতি করছে তসলিমাকে নিয়ে। তারা তসলিমার প্রশ্নে কিছুই জানে না। মূলত, তসলিমা একজন অসুস্থ নারীবাদী। ব্যক্তিগত অনুভূতি দ্বারা চালিত। তার লেখায় কোনো সারবস্তু নেই। এ কারণে তার ভক্তদেরও দেখবেন, কবিতা ছাড়া তসলিমার কোনো লেখা থেকে তারা তেমন একটা উদ্ধৃতি দেয় না।

    তসলিমা নাসরিনকে নিয়ে অবলামিটা দিন দিন মহামারী আকারে ধারণ করছে মধ্যম পন্থা অবলম্বনকারী কিছু আবালদের জন্য। ……..

  3. তসলিমাও
    বাংলাদেশের
    যেখানে

    তসলিমাও
    বাংলাদেশের
    যেখানে যেখানে নর্দমা আছে নাকটি বাড়িয়ে দুর্গন্ধের
    স্বাদ নিচ্ছেন এবং সকলকে অংশ
    দিচ্ছেন ।”

    সহমত। চমৎকার একটি পোষ্ট পড়লাম।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

3 + 7 =