ছাত্র ইউনিয়ন লড়াই করবে নাকি পুরানো আপোস

বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সামনে ইতিহাস গড়ার সময় এসেছে। ইতিহাস গড়বেন এই সংগঠনের কমরেডরা নাকি আবার সেই ভুলে ঢুব মারবেন এটা এখন দেখার বিষয়।

বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন কখনোই আমি করিনি। বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রী ত্যাগ করার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তী আমি শুধু সংগঠন হাতড়ে গেছি। কিন্তু বামপন্থি সংগঠনগুলোকে মনে হয়নি তারা বৃহত্তর জনগনের আকাঙ্খা পূরণ করতে চায়। তবে একথা অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে একমাত্র বামপন্থি ছাত্র সংগঠনগুলোতেই ব্যপকমাত্রায় নিবেদিত সৎ আন্তরিক কর্মী দেখিছি। সে অর্থে বামপন্থিরাই ছিলেন আমার সমকালে অগ্রগামি অন্যদের তুলনায়।
বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নে সাহসি ছাত্র নেতা আছে, তারাও বিপ্লব চায় এটা বিশ্বাস করিনি আমি যখন ছাত্র ছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালিন আমি বাকি ভাইকে, বাকি বিল্লাহকে পেয়েছি। তিনি অবশ্য বলতেন ছাত্র ইউনিয়নের মধ্যে এমন কী সিপিবির মধ্যে সশস্ত্র ধারার কর্মী সমর্থকরা আছেন। আমি এসব শুনে হাসতাম। যাদের সম্পর্কে সাধারণ মানুষ বলে থাকেন, ‘এই ধেনু সর, না সরলে ফুল ছুড়ে মারবো’। তবে আমি এরকম ভাবি না। আমার কাছে বরাবরই মনে হয়েছে, ছাত্র ইউনিয়নের এই দুগর্তীর জন্য দায়ি সিপিবি। তাদের যে পার্টি লাইন তার কারণেই একটি বড় সংগঠন দিনকে দিন ডায়নোসরের মত ইতিহাস হতে চলেছে।

এখন একটি সময় এসেছে, ইতিহাসের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করা। সেই চ্যালেঞ্জ যদি তারেক বা লাকিরা যদি গ্রহণ না করে তাহলে ইতিহাসের সেই জায়গাতেই চলে যাবে ছাত্র ইউনিয়ন যেখানে ডায়নোসররা গিয়েছে। যদি চ্যালেঞ্জটি ছাত্র ইউনিয়ন গ্রহণ করে তাহলে তাদের সামনে উজ্জল সম্ভাবনা। সম্প্রতি চিলিতে যে ছাত্র আন্দোলন হয়েছে বা গ্রীসের তরুনারা যেটা পেরেছে সেটা হয়তো ছাত্র ইউনিয়নের কমরেডরাও করতে পারেন।
ছাত্র ইউনিয়ন ব্যর্থ হতে পারে এই চিন্তা মাথায় এসেছে তার পূর্বসূরীদের কৃতকর্মের কথা ভেবে। এর থেকেও ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরী হয়েছিল ভিয়েতনামের মার্কিন আগ্রাসন বিরোধী মিছিল করতে গিয়ে ঢাকায় যখন মতিউল কাদেরকে গুলি করে হত্যা করে মুজিব সরকার। তখন ঢাকাসহ সারা দেশের মানুষ ফুশে উঠে। যখন জনগন রাস্তায় নেমে আসে সিপিবি ছাত্র ইউনিয়নের ডাকে তখন মুজিবের সঙ্গে গিয়ে চা মুড়ি খেয়ে এসে আন্দোলন ইস্তফা দেয় তারা। এরপরতো ইতিহাস আরো করুন। আওয়ামী লীগ বাকশাল গঠন করলে সিপিবি সেখানে পার্টি বিলুপ্ত করে যোগ দেয়। পৃথিবীর ইতিহাসে এরকমটা আর কোন দেশে হয়নি। কোন দেশে কমিউনিস্ট পার্টি বিপর্যয়ে পড়েছে। হয়তো সেন্ট্রাল কমিটির অধিকাংশ কমরেডকে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু কোন দেশের কমিউনিস্ট পার্টি স্বেচ্ছায় কোন বুর্জোয়াদের দলে যোগ দিয়ে বিলুপ্ত করেনি পার্টিকে। এটা করেছে সিপিবি। একইদিনে ছাত্র ইউনিয়নও বিলুপ্ত করা হয়। তবে সকালে বিলুপ্ত করে ছাত্র ইউনিয়নের নেতারা বুঝতে পারেন কি ভুল তারা করেছে। রাতেই আবার ঘোষণা দেয় ছাত্র ইউনিয়ন বিলুপ্ত করা হবে না।
আজকে যখন লাকি আক্তার বা হাসান তারেকরা প্রবল প্রতিবাদ গড়ে তুলছে তখন আশা জাগে। কিন্তু আবার মনে হয় যদি মতিউল কাদেরের রক্তের সাথে যেভাবে প্রতারণা করেছিলো তৎকালিন সিপিবি ছাত্র ইউনিয়ন আজও যদি তারা পিছিয়ে যায়?

কী হয়েছিলো সেদিন ঢাকায়?

১৯৭৩ সালের ১ জানুয়ারি। বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন আহূত দেশব্যাপী ‘ভিয়েতনাম দিবস’-এর কর্মসূচি অনুযায়ী ঢাকায় ভিয়েতনামের মার্কিনীদের বর্বর বোমাবর্ষণের প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। বেলা সোয়া ১২টায় মার্কিন তথ্যকেন্দ্রের সামনে ছাত্রদের ওপর বিনা প্ররোচনায় গুলি চালায় পুলিশ। গুলিতে নিহত হয় মতিউল ও কাদের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের তৃতীয় বর্ষ অনার্সের ছাত্র মতিউল ইসলাম এবং ঢাকা কলেজের প্রথমবর্ষের ছাত্র মির্জা কাদের ছিলেন ছাত্র ইউনিয়ন কর্মী। এ সময় গুরুতর আহত হন প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি আবুল কাশেম, দৈনিক বাংলার বাণীর ফটোসাংবাদিক রফিকুর রহমানসহ ৬ জন। এ ঘটনায় সিপিবি বাসদের ডাকে ঢাকার সর্বোচ্চস্তরের জনতা নেমে আসে রাস্তায়।

সাগরের ঢেউয়ের মত জনগনের সেদিনের মিছিলে আওয়াজ উঠে ‘নিক্সন-মুজিব ভাই ভাই, এক রশিতে ফাঁসি চাই,’ ‘শহীদ মতিউল-কাদেরের রক্ত বৃথা যেতে দেব না,’ ‘খুনি মান্নানের ফাঁসি চাই,’ ‘খুনিশাহী মুজিবশাহী ধ্বংস হোক,’ নিক্সনের দালালি করা চলবে না,’ ‘বাংলার মীরজাফর শেখ মুজিব।’
এ ঘটনার প্রতিবাদে পরেরদিন ২ জানুয়ারি সর্বাÍক হরতাল ডাকা হয়।

ডাকসুর তখনকার সহ-সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাস সেলিম, বর্তমানে সিপিবির সভাপতি আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানকে দেয়া জাতির পিতা ও বঙ্গবন্ধু উপাধি প্রত্যাহার করার ঘোষণা দেনয় এবং ‘ডাকসু’র আজীবন সদস্য পদ বাতিল করেন। এই খুনের পরেরদিন পত্রিকাগুলোতে চোখ বোলালেই বোঝা যাবে সেদিনের ঘটনা কিভাবে নিয়েছিলো সাধারণ মানুষ।

এসব ঘটনা ওই সময়ের বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হয়। ঘটনার পরদিন দৈনিক গণকণ্ঠ প্রথম পৃষ্ঠায় ‘অশ্বমেধের লালঘোড়া’ শিরোনামে সম্পাদকীয় প্রকাশ করে।
অশ্বমেধের ‘লালঘোড়া’
ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার দেশেপ্রেমিক ছাত্র-যুবকের বুকের তাজা রক্তপাতের মধ্যে দিয়ে তাদের নববর্ষের যাত্রা শুরু করেছে। বিশ্বের প্রতিবাদী মানুষ যখন ভিয়েতনামে সাম্রাজ্যবাদী মার্কিন দস্যুদের নির্বিচার হত্যালীলায় ঘৃণায় ক্ষোভে চিত্কার করতে করতে পৃথিবীর প্রতিটি শহর বন্দরের রাজপথে বিক্ষোভ মিছিলে নেমে এসেছে, তখন বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন দল ঢাকা শহরের রাজপথে তেমনি একটি মিছিলের ওপর মানবতার বক্ষস্থলকে নিশানায় এনে তাদের পূর্বে কথিত ‘লালঘোড়ার’ অশ্বমেধ যজ্ঞ শুরু করেছে। বিশ্ব মানবতার পক্ষে দাঁড়িয়ে ভিয়েতনামে মার্কিন হত্যালীলার প্রতিবাদে বাংলাদেশের ছাত্র-যুবারা যখন একটি শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ মিছিল নিয়ে তোপখানা রোড ধরে এগিয়ে যাচ্ছিল, ঠিক তখনি অতর্কিত এই গুলিবর্ষণ। এই গুলিবর্ষণের ফলে ঘটনাস্থলেই দু’জন ছাত্রযুবা শহীদ হয়েছেন এবং ৬ জন মারাত্মকভাবে জখম হয়ে হাসপাতালে স্থানান্তরিত হয়েছেন। এই ঘটনার সঙ্গে সঙ্গেই বিভিন্ন শহর বিক্ষোভ ও ধিক্কার ধ্বনিতে ফেটে পড়ে। শহরের রাজপথ বিক্ষুব্ধ মানুষের মিছিলে প্রকম্পিত হতে থাকে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের সত্যিকারের স্বরূপ উপলব্ধি করে ঢাকায় জনসাধারণ যেত হতচকিত হয়ে। তাহলে কি আওয়ামী লীগের অশ্বমেধের লালঘোড়া নিরীহ ছাত্র-যুবাদের ওপর দিয়ে এভাবেই চলতে শুরু করল? এত তাড়াতাড়ি? কিন্তু বোকা শাসকরা কি জানে না যে, সদ্য উত্থিত এই জাতি রক্তের লালপথ ধরে আজ এতদূর উঠে এসেছে। রক্তের বন্যায় তারা সর্বধরনের অন্যায়কে ভাসিয়ে দিতে দিতে এগিয়ে চলেছে। তাদের পেছনে পড়ে আছে নূরুল আমীন-আইয়ুব-ইয়াহিয়া-মোনেমের বন্দুক কামানের মুহুর্মুহু গর্জন আর রাজপথ ভরা চাপ চাপ রক্তের দাগ। এ চলা থামবে না। বর্তমান ক্ষমতাসীনদের রাইফেলের গর্জন যত বাড়বে, ততই এ চলা দুর্দম হয়ে উঠবে। আর ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হবে আজকের ক্ষমতাদর্পী গুলিবর্ষণকারীরা। কোনো সাম্রাজ্যবাদই তাদের পুতুলদের দাঁড় করিয়ে রাখতে পারবে না।
দৈনিক গণকণ্ঠ : ০২ জানুয়ারি ১৯৭৩


পল্টনের ঘোষণা

গতকাল মঙ্গলবার পল্টন ময়দানের জনসমাবেশে শহীদ মতিউল ইসলাম ও শহীদ মির্জা কাদিরুল ইসলামের লাশকে সামনে রেখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি ও বাংলাদেশে ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম নিম্নোক্ত ঘোষণা পাঠ করেন। এই সমাবেশের সামনে ডাকসুর পক্ষ থেকে আমরা ঘোষণা করছি যে, বিগত ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিবুর রহমানকে ডাকসু’র পক্ষ থেকে আমরা যে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি দিয়েছিলাম ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে আজ সেই বঙ্গবন্ধু উপাধি প্রত্যাহার করে নিলাম। আমরা দেশের আপামর জনসাধারণ, সংবাদপত্র, রেডিও ও টেলিভিশনের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি যে আজ থেকে শেখ মুজিবুর রহমানের নামের আগে তার বঙ্গবন্ধু বিশেষণ ব্যবহার করবেন না। একদিন ডাকসুর পক্ষ থেকে আমরা শেখ মুজিবকে জাতির পিতা আখ্যা দিয়েছিলাম। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে আবার ছাত্রের রক্তে তার হাত কলঙ্কিত করায় আমরা ছাত্র সমাজের পক্ষ থেকে ঘোষণা করছি, আজ থেকে কেউ আর জাতির পিতা বলবেন না। শেখ মুজিবুর রহমানকে একদিন ডাকসু’র আজীবন সদস্যপদ দেয়া হয়েছিল। আজকের এই সমাবেশ থেকে ডাকসু’র পক্ষ থেকে আমরা ঘোষণা করছি, আজ থেকে শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকসু’র আজীবন সদস্যপদ বাতিল করে দেয়া হলো।)
দৈনিক সংবাদ : ০৩ জানুয়ারি ১৯৭৩

পুলিশের গুলিবর্ষণ ও ছাত্রহত্যার প্রতিবাদে ঢাকাসহ দেশের সর্বত্র
হরতাল, বিক্ষোভ, মিছিল, সমাবেশ খুনিদের ফাঁসি চাই : পল্টনের দাবি

নিজস্ব বার্তা পরিবেশক : শহীদ মতিউল ও শহীদ কাদিরুলের পবিত্র লাশ সামনে রেখে এদেশে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রামের নতুন ইতিহাস সৃষ্টিকারী বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন ও ডাকসুর নেতারা গতকাল (মঙ্গলবার) পল্টনের বিরাট সমাবেশে ছাত্রহত্যার জন্য দায়ী খুনিদের ফাঁসি দাবি করছেন— সেই খুনি প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু যে কোনো মন্ত্রী বা আমলাই হোক না কেন।
বিকাল ৩টায় ‘ডাকসু’ সহ-সভাপতি ও বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই শোক বিধুর অথচ বিক্ষুব্ধ সমাবেশে বক্তৃতা করেন বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সহ-সভাপতি নূহউল আলম লেনিন, সাধারণ সম্পাদক আবদুল কাইয়ুম মুকুল, সহ-সম্পাদক কামরুল আহসান ও ডাকসু সম্পাদক মাহবুব জামান।
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : ডাকসুর সহ-সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, আজ যেন শোকের দিন। তিনি ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের ঘটনার উল্লেখ করে বলেন যে, পাকিস্তান আমলেও পাঁচ বছর পর ছাত্রদের ওপর গুলি ছোড়া হয়েছিল। আর মুজিব এক বছরও যেতে দিলেন না। শেখ মুজিব আজ নুরুল আমিনের পদাঙ্ক অনুস্মরণ করে তারই সমপর্যায়ে চলে গেছেন। ১৯৫৪ সালে যেমন ছাত্র হত্যাকারী নুরুল আমীন ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে তেমনি আগামী নির্বাচনে মুজিবও নিক্ষিপ্ত হবে।
কুলাঙ্গার তোফায়েল : ১ জানুয়ারি ঘটনা উল্লেখ করে সেলিম বলেন যে, লজ্জার বিষয় যখন মার্কিন তথ্যকেন্দ্রের সামনে ছাত্রদের হত্যা করা হচ্ছিল তখন একদা ছাত্রনেতা জনাব তোফায়েল আহমদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মান্নান ও পুলিশের আইজির সঙ্গে সেক্রেটারিয়েটে বসে ছাত্র হত্যার পরিকল্পনা করছিলেন। আজ থেকে আমরা তাকে ‘ছাত্র সমাজের কুলাঙ্গার’ হিসেবে অভিহিত করতে চাই।
লাশের ওপর ঢিল : সেলিম বলেন, শেখ মুজিবের চেলাচামুণ্ডাদের ঔদ্ধত্য সীমা ছাড়িয়ে গেছে। আজ আমরা যখন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শহীদ কাদিরের লাশ নিয়ে আসছিলাম তখন মুজিববাদী ছাত্রলীগ লাশের ওপর ঢিল ছুড়ে, মিছিলের ওপর হামলা চালায়। তিনি বলেন যে আজ থেকে ছাত্রদের রক্তে রঞ্জিত ‘মুজিববাদ’ ছাত্র সমাজ থেকে পরিত্যক্ত হলো।
লাল ঘোড়া : ডাকসুর সহ-সভাপতি প্রধানমন্ত্রীর লালঘোড়া দাবড়ানোর কথা উল্লেখ করে বলেন যে, তিনি ছাত্র সমাজের ওপর দিয়েই তা চালু করলেন। তিনি বর্তমান সরকারকে হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, ছাত্রসমাজ শুধু গড়তেই জানে না ভাংতেও জানে। কী করে খুনি জালেম সরকারকে উত্খাত করে বঙ্গোপসাগরে ভাসিয়ে দিতে হয় ছাত্র সমাজ তা জানে। আগামী দিনে ছাত্র জনগণকে সঙ্গে নিয়ে দেশব্যাপী দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলবে এবং তা শুধু হরতাল মিছিলেই সীমাবদ্ধ থাকবে না।
আবদুল কাইয়ুম মুকুল : ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আবদুল কাইয়ুম মুকুল সরকারী প্রেসনোট টুকরো টুকরো ছিড়ে ফেলে বলেন যে, এমন মিথ্যা ভাওতা জনগণ ঔপনিবেশিক আমলেই ডাস্টবিনে নিক্ষেপ করেছে। তিনি প্রধানমন্ত্রীর দুঃখ প্রকাশের ঘটনা উল্লেখ করে বলেন যে খুনির দুঃখ প্রকাশের কোনো অধিকার নেই। (দৈনিক সংবাদ : ৩ জানুয়ারি ১৯৭৩)

শহীদদের লাশ নিয়ে মিছিল বটতলার প্রতিবাদ সভায় ধিক্কার
গতকাল বিকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বটতলায় পুলিশের বর্বর গুলি ও ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে এক বিক্ষোভ সভা অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম এতে সভাপতিত্ব করেন। সভাশেষে ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকারের নির্মম গুলির শিকার শহীদ মতিউল ইসলাম ও মির্জা কাদেরের লাশ নিয়ে এক বিরাট বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। বিক্ষোভ মিছিল বিভিন্ন শ্লোগান সহকারে শহরের প্রধান রাজপথগুলো প্রদক্ষিণ করে বায়তুল মোকাররমে এসে সমাপ্ত হয়। বায়তুল মোকাররমে এক বিক্ষোভ সভায় বক্তৃতা করেন ন্যাপ প্রধান অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ, ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি ও ডাকসুর সহ সভাপতি জনাব মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম। বিক্ষোভ মিছিলে ছাত্রছাত্রী ছাড়াও শ্রমিক জনতা যোগদান করে। তারা সোচ্চার কণ্ঠে হত্যার বিরুদ্ধে শ্লোগান দেয়। বিক্ষোভ মিছিলে উচ্চারিত শ্লোগানগুলো হচ্ছে—‘নিক্সন-মুজিব ভাই ভাই,—এক রশিতে ফাঁসি চাই,’ ‘সাম্রাজ্যবাদের মরণ ফাঁদ—১৯৭৩ সাল,’ ‘শহীদ মতিউল-কাদেরের রক্ত বৃথা যেতে দেব না,’ ‘খুনি মান্নানের— ফাঁসি চাই,’ ‘ভিয়েতনামের বদলা নেব, বাংলাদেশের মাটিতে, ‘আগামীকাল হরতাল, গাড়ির চাকা ঘুরবে না, খুিনশাহী মুজিবশাহী ধ্বংস হোক, ‘নিক্সনের দালালি করা চলবে না,’ ‘সমাজতন্ত্রের নামে ভাওতা দেয়া চলবে না,’ ‘বাংলার মীরজাফর শেখ মুজিব।’
দৈনিক সংবাদ : ২ জানুয়ারি ১৯৭৩

অতপর মুজিব অভিমান ভাঙ্গলেন!
এই ঘটনায় যখন উত্তাল দেশ। তখন শেখ মুজিবের সাথে দেখা করে অভিমান ভেঙ্গে আন্দোলন বিসর্জন দিলো সিপিবি। এরপর বাকশালে সিপিবিকে বিলিন করা হলো। সাধারণ মানুষ হয়তো এ কারণে সিপিবিকে ঐতিহাসিকভাবে আওয়ামী লীগের ‘বি’ টিম মনে করেন। আর মূল দল মনে করেন আওয়ামী লীগকে।
কিন্তু গত ৭ বছরে সিপিবির বেশ কিছু বিষয়ে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। অন্তত দৃশ্যত পরিবর্তন এসেছে। এর মধ্যে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে না যাওয়া। যদি সেই না যাওয়ার মধ্যে খানিকটা দ্বিধায় রাখা হয়েছিলো। এরপর সরকার বিরোধী তীব্র আন্দোলন না থাকলেও সরকারের সাথে তারা মিশে যায়নি। বোঝা যাচ্ছিলো খানিকটা আওয়ামী লীগের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখার নীতি নিয়েছে তারা।

২১ এপ্রিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে স্মারকলীপি দেওয়ার কর্মসূচী দেয় বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন। সেখানেও পুলিশ লাঠিপেটা করে। আহত হয়েছেন ৬ জন। মনে রাখা দরকার শাসকের অত্যাচার যত নিষ্টুর হয় বিপ্লব ততই আসন্ন ও প্রয়োজনীয় হয়ে উঠে। নিশ্চয় শান্তির সুবাতাসে রবীন্দ্র সংগীত গেয়ে বিপ্লব হবে না।

কমরেড এই ব্যারিকেড ভাঙ্গতেই হবে।

পুলিশ যখন এরকম একটি কর্মসূচীতেও হামলা করেন তখন একইসঙ্গে আরো মনে রাখা দরকার যে, সরকার আসলে ভয় পেয়েছে। যদি এই ইস্যুতে সারা দেশে ছাত্র ইউনিয়ন ও বৃহত্তর বাম ঐক্য তৈরী হয়। সরকারের বিরুদ্ধে প্রবল জনমত আগে থেকেই তৈরী আছে। সেই প্রবল জনমতের সাথে নারী নিপিড়ন ইস্যু যুক্ত হয়। যুক্ত হয় গুম খুন লুটের ব্যপারে। সাগরের তেল গ্যাস, সুন্দরবনসহ গার্মেন্ট ইস্যু-তাহলে সরকারের কী পরিণতি হবে তা তারা আন্দাজ করতে পারে। এ কারণেই হামলা।

পুলিশের লাঠিপেটায় আহত।

কিন্তু লড়াকুদের জানা থাকতে হবে, ময়দানে নেমে শুধু তখনই ফেরা যায় যখন বিজয় আসে। বিজয় অথবা লড়াই মাঝামাঝি কিছু নেই। কমরেডস, আপনারা আনুন রঙ্গিন সকাল। সেই সকালে একদিন বাসা থেকে বেরিয়ে বুক ভরে নিশ্বাস নেওয়া যাবে। মনে হবে না এই বাংলাদেশের কোথাও কেউ ভাতের কস্টে কাদছে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৮ thoughts on “ছাত্র ইউনিয়ন লড়াই করবে নাকি পুরানো আপোস

  1. ‘সেলিমের কল্লা চাই’ বলে তারা
    ‘সেলিমের কল্লা চাই’ বলে তারা মিছিল করতে শুরু করে। কিন্তু আন্দোলনের ক্রম অগ্রগতি স্তব্ধ না হয়ে তা ছড়িয়ে পড়তে থাকে। সংগ্রামের দৃঢ়তার মুখে সরকার পিছু হটতে শুরু করে। তার কথা ও আচরণ নরম হয়ে আসতে থাকে। সরকার একে একে ৭ দফা মানার ঘোষণা দিতে শুরু কর। সরকার নিম্নলিখিত ব্যবস্থা গ্রহণের কথা ঘোষণা করে।

    এক) স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে নেয়া হল।

    দুই) বর্তমান স্থান থেকে ইউএসআইএস সরিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা করা হল।

    তিন) ভিয়েতনাম সরকারকে ঢাকায় দূতাবাস খোলার অনুমতি দেয়া হল।

    চার) দক্ষিণ ভিয়েতনামের অস্থায়ী বিপ্লবী সরকারকে বাংলাদেশ সরকার স্বীকৃতি প্রদান করল।

    পাঁচ) আহতদের সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। গুরুত্বর আহত পরাগ মাহাবুবের একজন ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও পরিবারের একজন সদস্য সহ উচ্চতর চিকিৎসার জন্য সরকারি খরচে লন্ডনে পাঠানো হয়।

    ছয়) পয়লা জানুয়ারি গুলি বর্ষণের ঘটনা তদন্তের জন্য হাইকোর্টের একজন বিচারপতিকে প্রধান করে একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি অবিলম্বে কাজ শুরু করে।

    প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, বাংলাদেশই প্রথম অ-কমিউনিস্ট দেশ যে কী-না দক্ষিণ ভিয়েতনামের অস্থায়ী বিপ্লবী সরকার ও ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্টকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়েছিল। আমাদের দাবি ও সংগ্রামের মুখে সরকার যে ব্যবস্থাগুলো গ্রহণ করেছিল, সেগুলো ছিল খবুই তাৎপর্যপূর্ণ সাফল্য। মতিউল-কাদেরের রক্তের বিনিময়েই এই সাফল্য ছিনিয়ে আনা সম্ভব হয়েছিল। সরকারকেও বাধ্য হয়ে পিছু হটতে হয়েছিল। গুলি বর্ষণের দায়ভার ছাত্রদের উপর চাপিয়ে দেয়া থেকে সরকারকে সরে আসতে হয়েছিল। তদন্ত কমিটি গঠন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে সরিয়ে দেয়া, আহতদের চিকিৎসাসহ নানা দায়ভার সরকারকে নিতে হয়েছিল।

  2. ছাত্র ইউনিয়ন তথা তাদের
    ছাত্র ইউনিয়ন তথা তাদের অভিভাবক সংগঠন সিপিবি আপোষ করতে করতে মার্ক্সবাদের অবশিষ্ট কিছুই বাকি নাই। সব আদর্শ আপোষের ফাপড়ে জমা দিতে হয়েছে। এক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম কিছু আশা করি না।

  3. এই ঘটনায় যখন উত্তাল দেশ। তখন

    এই ঘটনায় যখন উত্তাল দেশ। তখন শেখ মুজিবের সাথে দেখা করে অভিমান ভেঙ্গে আন্দোলন বিসর্জন দিলো সিপিবি। এরপর বাকশালে সিপিবিকে বিলিন করা হলো। সাধারণ মানুষ হয়তো এ কারণে সিপিবিকে ঐতিহাসিকভাবে আওয়ামী লীগের ‘বি’ টিম মনে করেন। আর মূল দল মনে করেন আওয়ামী লীগকে।

    কথা সত্য। শুধু সিপিবি না, অন্য বাম দলগুলোর বেশিরভাগই দেখা যায় ঘুরে ফিরে শেষ পর্যন্ত হাম্বালীগের কাছেই লেজ নাড়াতে নাড়াতে চলে যায়। ‘মৌলবাদ-দমন’ আর ‘স্বাধীনতা-বিরধি শক্তি’ দমনের নামে হাম্বালীগ যে সাম্রাজ্যবাদ আর ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের প্রসার ঘটিয়ে চলেছে বাংলাদেশে, সেই ফাঁদে পা দিয়ে অনেক বামই নিজেদের নিজস্বতা হারিয়ে ফেলেছে।

  4. ১৯৭৩ সালের ১ জানুয়ারি ঘটনার
    ১৯৭৩ সালের ১ জানুয়ারি ঘটনার যে বর্ননা করা হয়েছে সেখানে কি কি অর্জন হয়েছিল সেটিকে আডাল করা হয়েছে। লেখক কিছুটা কৌশলী ভূমিকা নিয়েছেন কি/না জানি না। তবে লেখাটা তথ্যবহুল।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 1 = 9