তসলিমা নাসরিনের একগুচ্ছ অপ্রকাশিত কবিতা

তসলিমা নাসরিন নানা কারণে খ্যাতিমান। কিন্তু সাহিত্যের মানদন্ডে তার আর সব তৎপরতার চেয়ে কবিতাই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। শক্তিমান কবি হিসেবে তরুণীবেলা থেকেই জনপ্রিয় তিনি। তার কয়েকটি কবিতা পেলাম পুরনো একটি পত্রিকায়। কবিতাগুলো অনলাইনে খুঁজে পেলাম না। গুগল মাঝে মাঝে দু/এক লাইনের উদ্ধৃতি দেখায়, যা হয়তো কবির ভক্তরা কোথাও তুলে দিয়েছেন। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ কবিতাগুলো অনলাইনে এই প্রথম। সবাইকে কবিতাগুলো ভালো করে পড়ে মতামত দেয়ার অনুরোধ জানাচ্ছি।
=====================

একটি মৃত্যু, কয়েকটি জীবন
——

একটি মৃত্যুকে ঘিরে দাঁড়িয়ে ছিল কয়েকটি জীবন।
কয়েক মুহূর্ত পর জীবনগুলো চলে গেল
যার যার জীবনের দিকে।

মৃত্যু পড়ে রইল একা, অন্ধকারে
কেঁচো আর কাদায়-

জীবন ওদিকে হিশেব পত্তরে,
বাড়িঘরে,
সংসারে সঙ্গমে।

যদি যেতে চাও
যদি যেতে চাও, এভাবেই যেয়ো-
ঠিক যেভাবে গেছ
ঠিক যেভাবে, আলগোছে, টের না পাই
দরজা আধখোলা রেখে
ফিরে আসবে ভেবে যেন কোনও দিন খিল না দিই।

যেয়ো, যেতেই যদি হয়- দু’চারটে কাপড় ভুল করে
আলনায় ফেলে- এভাবেই
স্নানঘরে রেখে যেয়ো তোয়ালে
এক জোড়া চপ্পল- এভাবেই।

দমকা বাতাসও কড়া নাড়ে সময় সময়
কোনও কোনও রাতে এরকমও ভেবে নেব, বুঝি ফিরেছিলে
বেঘোরে ঘুমিয়েছিলাম বলে চলে গেছ।
।।

অন্যরকম
——

তুমি এলে, দুঃখ দিয়ে চলে গেলে
বোকা ছেলে!
এ কোনও অচেনা দুঃখ নয়-
এর দাঁতগুলো, নখগুলো কতটা গভীরে যায়
মাংসে, হাড়ে, মজ্জায়
হৃদয়ের কোন কুঠুরিতে ঢুকে হল্লা করে, করে না-শুকোনো ঘা
কতটা জল শুষে নিয়ে চর ফেলে
কতটা দিতে পারে বনবাস বা সন্ন্যাস
কী রকম নিখুঁত খেলা খেলে
এ দুঃখ জানি, এ আমার অনেককালের চেনা।

এমন দুঃখ দিয়ে বুঝি স্বস্তি পেলে!
এ রকম যে কেউ দিতে পারে, যে কোনও ছেলে,
তুমি অন্যরকম কিছু দুঃখ দিলে না কেন
তুমি তো আর ছিলে না যে কোনও ছেলে!
ছিলে অন্যরকম,
তোমাকে ভালওবেসেছিলাম অন্যরকম।
।।

তিল পরিমাণ
——

আমার কাছে তিল ধারণের জায়গা হবে
তালকে যদি ফুঃ মন্তরে তিল করে দাও
জিভখানাকে খসিয়ে তুমি দু’চোখ মেলে দেখতে পারো
এর বেশি আর লোভ কোরো না।
আমার একটি অন্যরকম জীবন আছে
বড়জোর দরজা অবদি, ভুলেও যেন পা ফেলো না,
সেই জীবনটি যেমন ইচ্ছে যাপন করে গা ছড়িয়ে শোব
প্রয়োজনে শুতেও পারো সঙ্গে তুমি, তিল পরিমাণ তুমি।
।।

চুনোপুঁটির জীবন
——

নদী থেকে ভেসে ভেসে কোথাকার খালে এসে
অন্ধকারে, সাপখোপের গা ঘেঁষে, ফেঁসে
জড়াল জালে।
যন্ত্রের জালে
হালে
বা কলিকালে
এমনই দুর্গতি কপালে
এমনই সংসার লুটোপুটির,
জাল থেকে আলগোছে শরীর সরানো যায়
যদি, মন সরে না চুনোপুঁটির।
।।

জলপদ্য
——

লিখেছি একখানা অনবদ্য জলপদ্য
তুলেছি জল থেকে এক পদ্ম
লালপদ্ম
জলপদ্ম।

কাকে দেব জলপদ্ম, এই পদ্য
যে ছিল নেবার, তার যাবার
তাড়া ছিল তাই চলে গেছে
শীতের পাখির মতো গেছে
জলগ্রস্ত নাবিকের মতো গেছে।
হাতে পদ্য, জলপদ্ম
অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছি বোকার হদ্দ।
।।

গ্রামটির মতো
——

তুমি সেই গ্রামটির মতো দেখতে
যে গ্রামের আকাশে আর সূর্য ওঠে না, জমে থাকে
গাদা গাদা কাকতাড়ুয়া মেঘ, চাঁদও লুকিয়ে রাখে পোড়ামুখ।
গাছগুলো বুড়ি বেশ্যার মতো ন্যাংটো
কোনও ফুল ফোটে না কোথাও
এমনকী বসন্ত এলে একটি গন্ধহীন গাঁদাও না।

ঘরবাড়ি পাথরের মতো পড়ে থাকে স্যাঁতসেঁতে ক্ষেতের কিনারে
পাথরগুলো পাহাড়ের চারপাশ ঘিরে
পাহাড়গুলো নদীর দুদিকে
একটি পাখিও ডাকে না কোথাও কেবল রাত ফুঁড়ে খোঁড়া হাওয়ার
কাঁধে ভর রেখে এত তক্ষক ছাড়া
গাভীগুলো জল-চোখে মরা বেড়ালের দিকে,
মানুষের জলহীন চোখ, ভীত
গ্রামটি দেখতে ঠিক তোমার মতো, তোমার চোখের মতো
যে চোখে তাকালে কী নেই কী নেই করে ওঠে বুকের ভেতর।
।।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৬ thoughts on “তসলিমা নাসরিনের একগুচ্ছ অপ্রকাশিত কবিতা

  1. তাসলিমা নাসরিন যে একজন কবিও
    তাসলিমা নাসরিন যে একজন কবিও অনেক সময় সেটা ভুলেই যাই! কবিতাগুলো ব্লগ দিয়ে ভাল করেছেন। এখন অনলাইনে থেকে যাবে- হারিয়ে যাবে না।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 62 = 63