বনানীতে ফাটল ধরা গার্মেন্টে ঢুকতে বাধ্য করছে মালিকপক্ষ!

রাজধানীর অভিজাত বনানী থানার সৈনিক ক্লাব এলাকা। গতকাল এখানে দুটি ভবনে ভূমিকম্পের সময় ফাটল দেখা দেয়। ভবন দুটিতে গ্লোরি ফ্যাশন ও ম্যাডোনা ফ্যাশন নামে দুটি গার্মেন্ট কারখানা অবস্থিত। কারখানা দুটি কমপ্লায়েন্স তথা আধুনিক নিরাপত্তার সুযোগ সুবিধা সম্বলিত বলে দাবি মালিকদের।

কারখানা দুটোতে গতকাল ভূমিকম্পের সময় ফাটল ধরে বলে জানিয়েছেন সেখানে কর্মরত শ্রমিকরা। কমপ্লায়েন্সের কথা বলা হলেও আদতে ভূমিকম্প নিরাপত্তার কোনো ব্যবস্থাই কারখানায় ছিল না বলে অভিযোগ করেছেন তারা। তার ওপরে ফাটল ধরা ভবনেই কাজ করতে চাপ দিচ্ছে মালিকরা।

?oh=af7584f51d6d4aa3764e99104abd08f0&oe=55D2342F” width=”400″ />
আজ সকালের ছবি

আজ সকালে কারখানা দুটোর সামনে শ্রমিকরা এসে জড় হতে থাকে। দুই ভবনের মধ্যে ফাটল এবং ম্যাডোনা ফ্যাশন অবস্থিত নয় তলা ভবনটির ভেতরে ফাটল, একটি ভবন অন্যটির তুলনায় বেশ খানিকটা দেবে যাওয়া, ভবনের মধ্যেকার বীমে ফাটলসহ ঝুঁকিপূর্ণ অনেক কিছুই শ্রমিকদের চোখে পড়ে। তাই তারা এ অবস্থায় কাজে ঢুকতে অস্বীকৃতি জানায়।

শ্রমিকরা বলছেন, কারখানার জেনারেটর ও যন্ত্রপাতি চালু হলে যোগ হবে বাড়তি কম্পন। যা ডেকে আনতে পারে রানা প্লাজার মতো ভয়াবহ পরিণাম। তারা প্রকৌশলী আনিয়ে পরীক্ষা করে জানতে চান যে, এই ভবনে কাজ করা নিরাপদ কিনা! কিন্তু মালিকপক্ষ এর বিরোধিতা করে।

ম্যাডোনা ফ্যাশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা শ্রমিকদের এসে কারখানায় ঢুকে কাজ শুরু করার জন্য বলেন। আর না গেলে হাজিরা বোনাস কেটে নেয়া এবং চাকরি থেকে ছাটাইয়ের হুমকিও দেন। এতে শ্রমিকদের একাংশ বাধ্য হয়ে ভবনে ঢোকে। আর একাংশ ক্ষুব্ধ অবস্থায় এখনো নিচের রাস্তায় অবস্থান করছেন। ওদিকে গ্লোরি ফ্যাশনের মালিকপক্ষ এসে বলেছেন, তারা প্রকৌশলী ডাকার ব্যবস্থা করেছেন।

”পাশের কারখানায় কাজ বন্ধ, অথচ আমাদের জোর করে হুমকির মধ্যে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। এই মালিকরা সব জানোয়ার। শ্রমিকের জীবন নিয়ে তাদের একটু বিন্দুও ভাবনা নেই।” এমন কথা বলছেন ম্যাডোনা ফ্যাশনের শ্রমিকরা।

ঘটনা এই পর্যায়ে যাওয়ার পর আমরা যোগাযোগ করি ম্যাডোনা ফ্যাশনের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে। যে কেউ তাদের সঙ্গে কথা বলতে পারেন। শ্রমিকদের বিরুদ্ধে কোনো অন্যায় হচ্ছে কিনা খোঁজ নিতে পারেন। ফোন নম্বর ০২৯৮৯০৬৭১। এই নম্বরে ফোন দিয়ে সাংবাদিক পরিচয় দেয়ার পর কারখানার প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোজাম্মেল আমার সঙ্গে কথা বলেন।

মোজাম্মেল সবকিছুই অস্বীকার করেন। তিনি জানান, ‘শ্রমিকদের কাজ করতে চাপ দেয়া হয়নি। বলা হয়েছে কাজ করতে পার, ভবনে কোনো সমস্যা নেই।’ তিনি ফাটল ধরার কথা অস্বীকার করে বলেন, ‘আমরা ভবনে কোথাও ফাটল দেখিনি।’ শ্রমিকদের অভিযোগ ও আতঙ্কের কথা বলার পর তিনি বলেন, ‘সম্ভবত আজ কারখানা ছুটি দিয়ে দেয়া হবে।’

কিন্তু শ্রমিকরা জানান, মালিকপক্ষ বাইরে এসব বললেও ভেতরে ঠিকই শ্রমিকদের বলছে, আমরা কোনো গ্যারান্টি দিতে পারব না। ইচ্ছা হলে কাজ কর, নয় চলে যাও। অনেক শ্রমিক বাইরে অবস্থান নেয়ায় ইতোমধ্যে পুলিশের কর্মকর্তাদের ডেকে আনা হয়েছে। তারা যাচ্ছে তাই ভাষায় শ্রমিকদের গালি দিয়েছে। সর্বশেষ বেলা ১০.০০ টায় তারা জানিয়েছেন, পুলিশের বড় কর্তারা হুমকি দিয়েছেন এক ঘন্টার মধ্যে শ্রমিকরা না সরে গেলে লাঠিচার্জ করা হবে।

এরপর মালিকপক্ষের লোকজন গ্যারান্টি দিয়ে বলে যে, তোমরা কাজ শুরু কর, কোনো সমস্যা হবে না। শ্রমিকদের দাবি ছিল প্রকৌশলী ডেকে এনে পরীক্ষা করানো। কিন্তু মালিকরা তা করল না। শ্রমিকরা বাধ্য হয়ে পুলিশি চাপে কাজে যোগ দিল। এরপর বেলা ১টা ০৯ মিনিটের দিকে আবার ওই এলাকায় ভূকম্পন অনুভূত হওয়ার পর শ্রমিকরা কারখানা ছেড়ে বেরিয়ে আসেন। অনেক শ্রমিক ভাবছেন, বুঝি এবারের মতো প্রাণে বেঁচে গেলেন। এ অবস্থায় আবার কারখানায় ঢুকতে চাইছেন না অনেকেই। ১টা ৩০ মিনিটেও শ্রমিকরা আতঙ্কে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছেন।

শ্রমিকরা ফাটল ধরা ভবনে আতঙ্ক নিয়ে কাজ করবেন নাকি চাকরি হারাবেন, এই দোলাচলের মধ্যে রয়েছেন। শ্রমিকরা শেষ অবধি আমাদের কাছে সহায়তা দাবী করেছেন। তারা গণমাধ্যম ও সংশ্লিষ্টদের পাশে এসে দাঁড়ানোর অনুরোধ করেছেন। আরেকটি রানা প্লাজা ঘটার আগে তারা সহায়তার হাত বাড়ানোর জন্য অনুরোধ করেছেন।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৪ thoughts on “বনানীতে ফাটল ধরা গার্মেন্টে ঢুকতে বাধ্য করছে মালিকপক্ষ!

  1. শ্রমিকদের জীবনের কোন মূল্য
    শ্রমিকদের জীবনের কোন মূল্য নাই পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থায়। রাষ্ট্র ও মালিকপক্ষ শ্রমিকস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে জানোয়ার হয়ে উঠে।

    দেয়ালে ফাটল ধরা দু’টি গার্মেন্টস এ তদন্ত করা হোক। শ্রমিকদের জীবনকে হুমকিতে ফেলে দিয়ে কাজ করানো বন্ধ করা হোক। দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখা শ্রমিকশ্রেনীকে বিপদের মুখে ফেলে দিয়ে কারখানার চাঁকা ঘোরানোর ফন্দি বন্ধ করে এইসব অমানবিক মালিকপক্ষকে প্রশাসনের কাছে জবাবদিহীতা নিশ্চিত করা হোক।

  2. একটি রানাপ্লাজা দেখেও তাদের
    একটি রানাপ্লাজা দেখেও তাদের শিক্ষা হয় না। মুনাফার জন্য তারা দরকার হলে হাজারটা রানাপ্লাজা করবে।হ্যা!শ্রমিকদের যদি কাজ করতে হয় তাহলে মালিকদের ও ওই বিল্ডিংয়ে থাকতে হবে।।

  3. গার্মেন্টস ব্যবসা এদেশের
    গার্মেন্টস ব্যবসা এদেশের সবচাইতে অমানবিক খাতে পরিণত হয়েছে। এই খাতে জড়িতদের অধিকাংশই হয় সন্ত্রাসী ,গডফাদার, দলীয় ক্যাডার কিংবা মুনাফালোভী অসৎ মানুষ । এদের কাছ থেকে আর কি আশা করা যায়?

  4. এদেশে পোশাক খাত শ্রমিকরাই
    এদেশে পোশাক খাত শ্রমিকরাই সবচেয়ে বেশি শোষন বঞ্চনার শিকার এব্যাপারে কোন সন্দেহই নেই। এখন দেখার বিষয় আমরা কতটা তাদের পাশে দাঁড়াতে পেরেছি। আমি বলবো না আমরা দাঁড়ায়নি কিন্তু আমরা তাঁদের স্বার্থ রক্ষায় কিছুই করতে পারি নাই বলা চলে। এর ফলে এদেশে রানা প্লাজার মতো বারবার পুনরাবৃত্তি ঘটলেও অবাক হবার কিছু নেই।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

63 + = 71