ইসলামী মৌলবাদের অ আ (পর্ব-২)

মুসলমানদের মধ্যে এই বিষয়ে যতোই ঝগড়া হোক না কেনো, ইসলাম বলতে একক কিছু নাই। যা আছে তা হলো ‘ইসলামসমূহ’, যেমন আছে ‘আমেরিকাসমূহ’। বৈচিত্র (diversitiy) পৃথিবীর সকল ঐতিহ্য, ধর্ম ও জাতির ক্ষেত্রেই সাধারণ সত্য, যদিও কোন কোন অনুরাগী বৃথাই নিজের চারিদিকে দেয়াল তৈরি করে এবং নিজ ধর্মের একটা কাঠমো তৈরির চেষ্টা করে গেছেন। – এডওয়ার্ড সাইদ

মৌলবাদ বনাম বৈচিত্র
মৌলবাদ ও বৈচিত্র একে অপরের শত্রু। যে কোন ধর্মীয় মৌলবাদের মতো ইসলামের ক্ষেত্রেও এই কথা খাটে। মানুষের চিন্তা বিচিত্র। তাই সমাজে বহু ধর্মের অস্তিত্ব আছে এবং ধর্মের মধ্যে আবার বিভিন্ন তরিকার উপস্থিতি আছে। সমাজে ধর্মের বৈচিত্র এবং ধর্মের মধ্যে বিভিন্ন তরিকার বৈচিত্রের বিরুদ্ধে যে যতো বেশি অসহনশীল সে ততো বেশি মৌলবাদী। এইক্ষেত্রে বাংলাদেশের আহমেদিয়া মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মৌলবাদী গোষ্ঠির তৎপরতাকে উদাহরণ হিসাবে আনা যায়। আশির দশকের আগে বাংলাদেশে আহমেদিয়া সম্প্রদায় এতোটা ঝুকির মধ্যে ছিল না যেমনটা বর্তমানে আছে। ভারতিয় উপমহাদেশ বিশেষ করে বাংলাদেশ চিরকালই বহু ধর্ম ও তরিকায় বৈচিত্রময় ছিল। বাংলাদেশের ইসলামও বহু ধারার পীর, আউলিয়া, আলেম, উলামার বৈচিত্রে বৈচিত্রময় ছিল। অনুসারীরাও কম মৌলবাদী ও অধিক বৈচ্চিত্রপন্থী ছিলেন। কিন্তু আশি ও নব্বইয়ের দশকে মধ্যপ্রাচ্য ও পাকিস্তান থেকে ‘বহুজাতিক মৌলবাদী ইসলামে’র যে আমদানী বাংলাদেশে হয়েছে তাতে বাংলাদেশে ধর্মীয় বৈচিত্র ও ধর্মের মধ্যে তরিকার বৈচিত্র এবং পুরো সমাজেই চিন্তার বৈচিত্র হুমকির মুখে পরেছে। তবে বিদেশী ও বহুজাতিক ইসলাম মানেই মৌলবাদী এই ধারণা করা উচিৎ হবে না। ‘তাবলিগ জামাত’ এবং ‘খাতমে নবুয়াত বাংলদেশ’ দুইটাই বহুজাতিক ইসলামী আন্দোলন এবং বিদেশ থেকে আমদানীকৃত। কিন্তু মৌলবাদের দিক থেকে এদের অবস্থান প্রায় বিপরীত মেরুতে। এইক্ষেত্রে আমরা অধ্যাপক আলী রিয়াজের ‘বাংলাদেশে বহুজাতিক ও দেশীয় ইসলামের মিথস্ক্রিয়া’ নামের একটি লেখা থেকে উদ্ধৃতি দিতে পারি –

“তাবলিগ জামাত যদি বাংলাদেশের মানুষের সামনে ইসলামের একটি পৌরহিত্বহীন, মুক্ত, ইনক্লুসিভ ও সমাজনির্ভর ব্যাখ্যা হাজির করে থাকে তো ‘খাতমে নবুয়াত আন্দোলন’ এবং স্বল্পকালিন প্রবাসীদের মাধ্যমে ঠিক তার বিপরীত ধরণের ইসলাম বিদেশ থেকে আমদানি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের কট্টর ইসলামিক চর্চার সংস্পর্শে প্রবাসী বাংলাদেশীদের মধ্যে অর্থডক্সি এবং আক্ষরিক ইসলামের প্রতি আনুগত্ব জোরদার হয়েছে। এই ধরণের ইসলাম বাংলাদেশে প্রচলিত সিংক্রেটিস্টিক ঐতিহ্যের বিরোধী। … আশীর দশকের শেষদিকে জামিয়া ইউনুসিয়া মাদ্রাসা এবং এই মাদ্রাসার সাথে যুক্ত উলামারা ‘খাতমে নবুয়াত আন্দোলনে’র বাংলাদেশ পর্বের সূচনা করেছিল, পাকিস্তানের একিরকম আরেকটি সংগঠনের অনুকরণে। বাংলাদেশের আহমেদিয়া সমাজকে অমুসলিম ঘোষনার দাবিতেই এই আন্দোলনের সূত্রপাত। এই বিষয়টায় জোর দেয়া দরকার যে খতমে নবুয়াত আন্দোলন বাংলাদেশের ভেতর থেকে গড়ে ওঠে নাই, বরং বাংলাদেশী একটিভিস্টদের সাথে পাকিস্তানী সংগঠনটির সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে এই আন্দোলনের সুচনা হয়াছে”। (Interactions of ‘transnational’ and ‘local’ islam in Bangladesh, Ali Riaz)

খতমে নবুয়াত আন্দোলন বাংলাদেশে আহমেদিয়াদেরকে অমুসলিম ঘোষনা কিংবা কাফির ঘোষনার দাবিতে যে রাজনীতি শুরু করেছিল, বিগত দুই দশকে তার ব্যাপ্তি অনেক বেড়েছে এবং বর্তমান বাংলাদেশে আহমেদিয়ারা নির্যাতিত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠির একটি। ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশে একটি আহমেদিয়া মসজিদে বোমা হামলা চালিয়ে সাতজনকে হত্যা করা হয়। ২০০৩ সালেও আহমেদিয়া খুনের ঘটনা ঘটে। গত দুই দশকে বাংলাদেশে আহমেদিয়াদের বহু মসজিদে হামলা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে আমরা দেখেছি হেফাজতে ইসলাম তাদের তেরো দফার একটি দফায় আহমেদিয়াদের অমুসলিম ঘোষনার দাবি তুলেছিল। শিয়া-সুন্নি বিরোধীতাও বাংলাদেশের ইসলামী ঐতিহ্যে কখনো দেখা যায় নাই। সুন্নি পরিচয়ের রাজনীতিও বাংলাদেশে কখনোই অতোটা শক্তিশালী ছিল না যেমনটি এখন হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের আইসিস সমর্থক সালাফি জিহাদী ফেসবুক পেজগুলোতে এন্টি শিয়া বিভিন্ন প্রচার প্রচারণা চালানো শুরু হয়েছে। এইসবকিছুই বাংলাদেশে মৌলবাদী ইসলামের উত্থানের প্রমান। ইসলামী মৌলবাদীরা সহিত্বের নামে বৈচিত্র নির্মুলের রাজনীতি করে। আর সেই রাজনীতির ফলে বাংলাদেশের আহমেদিয়া, হিন্দু, বৌদ্ধ, নাস্তিক বিভিন্ন বিচিত্র গোষ্ঠির মানুষ নির্যাতিত হচ্ছে।

আহমেদিয়া কেনো, বাংলাদেশের কাউকেই অমুসলিম অথবা মুসলিম ঘোষনার অধিকার বাংলাদেশ সরকারের নাই। ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বৈশিষ্টই এইরকম। রাষ্ট্রের যেমন কোন ধর্ম নাই তেমনি রাষ্ট্র তার নাগরিকদের ধর্ম পালনের স্বাধীনতাও স্বীকার করে নেয়। অর্থাৎ কোন নাগরিকের ধর্মপালনের অধিকারের উপর ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করে না। মুসলমান অথবা নাস্তিক যে কোন পরিচয় নিয়ে বাংলাদেশের একজন নাগরিক আর দশজনের মতোই সমান অধিকার নিয়ে বাংলাদেশে বসবাস করতে পারবে। তাদের নিরাপত্তা দেয়া এবং তাদের উপর হামলা ও নির্যাতন হলে তার বিচার করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। ‘সহি ইসলাম’ কি বস্তু অথবা ‘সাচ্চা মুসলমান’ কোন ব্যক্তি সেই সার্টিফিকেট দেয়া রাষ্ট্রের কাজ নয়। বামপন্থী, উদারনৈতিক, ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক রাজনীতি যারা করেন তাদের কাজও এটা নয়। এইসব মূলত ডানপন্থী রাজনীতিকদের কাজ। বাংলাদেশের ডানপন্থী রাজনীতিকদের মধ্যে যেমন নিজেদেরকে সাচ্চা মুসলমান প্রমানের একটা চেষ্টা আছে তেমনি গত কয়েক বছরে বিরোধী পক্ষকে নাস্তিক সার্টিফিকেট দেয়ার রাজনীতিও তাদেরকে করতে দেখা গেছে। ভোটের জন্যে ইসলামপন্থীদের গুরুত্ব দিতে গিয়ে এবং মৌলবাদের বিভিন্ন ডিসকোর্সকে রাজনৈতিক প্রচারণায় ব্যবহারের মাধ্যমে বাংলাদেশের ডানপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো বাংলাদেশে মৌলবাদের শক্তি বৃদ্ধি করেছে, এখনো করে চলেছে।

বৈচিত্রের পক্ষে রাজনীতি
বাংলাদেশের বামপন্থী বুদ্ধিজীবী যতীন সরকার নব্বই দশকের শুরুর দিকে একবার আহমেদিয়া মুসলিমদের আয়োজিত মিলাদুন্নবীর অনুষ্ঠানে একটি বক্তৃতা করেছিলেন। বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান মৌলবাদের হুমকির মুখে পরেছিল তখন আহমেদিয়ারা। ফলে বাংলাদেশের বিভিন্ন ধর্মসম্প্রদায়ের বৈচিত্র প্রদর্শন এবং বিভিন্ন ধর্মের অনুসারিদের মধ্যে শান্তিপূর্ণ মতবিনিময়ের একটা প্রচেষ্টা তারা সেই সময় করেছে। তাদের সেই সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন বাংলাদেশের খ্রিষ্টান ও বৌদ্ধ ধর্মের প্রতিনিধীরাও। যতীন সরকারকে সেখানে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়েছিল একজন ‘মুক্তবুদ্ধির সাধক’ হিসাবে। কিন্তু যতীন সরকার মঞ্চে উঠে বললেন যে, তিনি হজরত মুহাম্মদের উম্মত। কেনো তিনি হজরত মুহাম্মদের উম্মত এই ব্যাখ্যা দিতে তিনি মাওলানা আবুল কালাম আজাদ, বঙ্কিম চন্দ্র প্রমুখের উদ্ধৃতি দিয়ে অসাধারণ একটি বক্তৃতা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন যে, “মুসলমানদের তো বাহাত্তরটা মজহাব বলে শুনেছি, আমি নাহয় তেহাত্তর নম্বর মজহাবেই পরলাম। তাতে ক্ষতি কি”? তার প্রশ্নের উত্তর এই লেখায় দেয়ার চেষ্টা করবো না। এটাও বলছি না যে বাংলাদেশের বামপন্থীদের উচিত নিজেদেরকে মুসলমানদের তেয়াত্তর নম্বর মজহাবের অনুসারী বলে পরিচয় দেয়া। যতীন সরকার নিজেও বামপন্থী অথবা সেকুলারদের জন্যে অথবা কারো জন্যেই এমন কোন উপদেশ দিচ্ছেন না। আজকাল যেইভাবে আমার লেখার বক্তব্য টুইস্ট করা হচ্ছে তাতে যেসব কথা না বললেও নয় তাই এখন বলে নিতে হচ্ছে। যতীন সরকার এখানে যা করেছিলেন তা হলো বৈচিত্র তথা ডাইভার্সিটির পক্ষে রাজনীতি। ঘটনা হলো যে – কোন ধর্মতন্ত্রই মানেন না এমন একজন আজীবন কমিউনিস্টও যদি দাবি করে যে সে মুহাম্মদের উম্মত তো তার সেই বলার, বুঝার অথবা ব্যাখ্যা করার স্বাধীনতা কেড়ে নেয়ার অধিকার বাংলাদেশে কারো নাই। সেখানে মির্জা গোলাম আহমেদকে ইমাম মাহদী মানার কারনে আহমেদিয়াদেরকে অমুসলিম ঘোষনার অধিকার কে রাখে? তবে বামপন্থী মাত্রই যতীন সরকারের কায়দাতেই ডাইভার্সিটির পক্ষের রাজনীতি করেন বা করা উচিৎ তা নয়। মৌলবাদের বিরুদ্ধে বৈচিত্রের পক্ষে বামপন্থীদের ধর্মনিরপেক্ষ চেতনাই প্রধান শক্তি, এখন রাজনীতিটা বিভিন্ন রকম হতে পারে। বাংলাদেশের বামপন্থীরা ধর্মনিরপেক্ষতা, ধর্মীয় বৈচিত্র, চিন্তার স্বাধীনতা ও বাক স্বাধীনতার পক্ষে বলেই তারা নাস্তিকদের অধিকারের পক্ষে লড়াই করে, হিন্দুদের পক্ষে করে, আহমেদিয়াদের পক্ষেও করে। শুধুমাত্র নাস্তিক গোষ্ঠির পক্ষে আন্দোলন করা তাদের কাজ নয়। একজন বামপন্থী নাস্তিক যখন নাস্তিকদের বাকস্বাধীনতা ও নাস্তিক হত্যার বিচার আদায়ের আন্দোলন করে তখন তা সে নাস্তিক বলে করে না, তার রাজনীতিটা মৌলবাদের বিরুদ্ধে এবং বাকস্বাধীনতা ও ন্যায় বিচারের পক্ষে বলেই করে। এই আন্দোলন সে সমাজের অন্যান্য সংখ্যালঘু ও নিপিড়িত গোষ্ঠির পক্ষেও করে।

ডানপন্থা ও মৌলবাদ
‘সহি ইসলাম’ ও ‘সাচ্চা মুসলমান’ আমাদের সময়ের দুই শক্তিশালী মৌলবাদী ডিসকোর্স। ডানপন্থী ও মৌলবাদী ইসলামিস্টরা এই ডিসকোর্সটি শক্তিশালী করেছে। এই ডিসকোর্স যেমন ইসলামের মধ্যে বৈচিত্র স্বীকার করে না, তেমনি রাষ্ট্রকে সহি ইসলামী ও মুসলমানের রাষ্ট্র বানানোর দাবি তুলে অন্যান্য ধর্মীয় নাগরিকদের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে শক্তি যোগায়। দুঃখজনকভাবে বাংলাদেশে বর্তমানে তরুণ নও-নাস্তিকরা বুঝে অথবা না বুঝেই ‘সহি ইসলামে’র মৌলবাদী ডিসকোর্সটি শক্তিশালী করে চলেছে। মৌলবাদী মুসলমানদের মতো তারাও একটি একক ও মৌলিক ইসলামের অস্তিত্বে বিশ্বাস করে এবং একট মৌলিক ও ‘সহি ইসলামে’র ডিসকোর্স প্রতিষ্ঠার জন্যে তারা রীতিমত সংগ্রাম করে চলেছে। মৌলবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের বদলে ইসলামের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়েই এই বিপত্তিটা ঘটেছে। এরফলে একটি একক ইসলাম তাদের কল্পনা করে নিতে হয়েছে। এবং এইক্ষেত্রে মৌলবাদী ও সন্ত্রাসীদের প্রচারিত ইসলামটিকেই সহি ইসলাম ও মৌলবাদী-সন্ত্রাসীদেরকে সাচ্চা মুসলমান অথবা সকল মুসলমানকেই মৌলবাদী ও সন্ত্রাসী হিসাবে প্রচার করে তারা মূলত মৌলবাদী ও সন্ত্রাসীদের মৌলবাদী ডিসকোর্সগুলোকে বৈধতা দিয়ে যাচ্ছেন ও শক্তিশালী করছেন। বাংলাদেশে আহমেদিয়াদের বিরুদ্ধে মৌলবাদী প্রচার ও হামলার বৈধতা যোগায় ‘সহি ইসলাম’ ও ‘সাচ্চা মুসলমান’ সংক্রান্ত বিভিন্ন ডিসকোর্স। আহমেদিয়ারা সহি মুসলমান নয় এই দাবি তুলেই মৌলবাদীরা তাদের উপর হামলা চালায় এবং এসব হামলার সামাজিক বৈধতা তৈরি করতে যায়। কোন ধর্মনিরপেক্ষ ও উদারনৈতিক ব্যক্তির পক্ষে ‘আহমেদিয়ারা সহি মুসলমান নয়’ এবং তাদের উপর হামলাকারী ‘মৌলবাদীরাই সহি মুসলমান’ এহেন দাবি তোলা সম্ভব নয়। ঐ দাবিটি পাশ্চাত্যের ডানপন্থী রাজনীতিকদের দাবি হতে পারে। দুঃখজনকভাবে আমাদের দেশের নও-নাস্তিকরা ঐ ডানপন্থী রাজনীতির ফাঁদেই পরেছেন।

সুতরাং, নাস্তিক হলেই কেউ ‘সহি ইসলাম’ নামক একটি মৌলবাদী ডিসকোর্সকে শক্তিশালী করেন তা নয়, বরং উদারনৈতিক ও বামপন্থী নাস্তিকরা বরং এইসব মৌলবাদী ডিসকোর্সের পক্ষে অথবা বিপক্ষে লড়াই না করে বহুত্ব ও বৈচিত্রের পক্ষেই লড়াই করে থাকেন। কিন্তু নাস্তিকতো ডানপন্থীও হতে পারে, সেইক্ষেত্রে ডানপন্থী আস্তিকের মতো বৈচিত্রের বিপক্ষে গিয়ে মৌলবাদী ডিসকোর্স শক্তিশালী করাও তার কাজ হতে পারে। পার্থক্যটা এখানে রাজনীতিতে। আল্লাহর অস্তিত্ব সম্পর্কে বিশ্বাসের তারতম্যে নয়।

সবশেষে, ‘জিহাদ ও খেলাফতের সিলসিলা থেকে’ –
সহি ও বেঠিক ইসলাম সংক্রান্ত ফতোয়াবাজী সেক্যুলারদের কর্তব্য হতে পারে না। বাস্তবে মৌলবাদীদের প্রচার প্রচারণা ও কর্মসূচির বাইরে সহি ইসলাম বলতে একক কিছুর দাবি নিয়ে কেউ দাঁড়ায় না। একটি ধর্ম তখনই গণমানুষের ধর্ম হয়ে ওঠে যখন সেই ধর্মটি গণমানুষের ঐতিহ্যের সাথে খাপ খাইয়ে নেয়ার সক্ষমতা রাখে। ইসলাম ধর্ম তার প্রাথমিক যুগে গড়ে উঠেছিল আরব ঐতিহ্য, নৈতিকতা ও আচার আচরণের সাথে খাপ খাইয়ে। পররর্তীতে দুনিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল ও ঐতিহ্যের মানুষের মাঝে জায়গা করে নেয়ার মতো নমনীয়তা ছিল বলেই ধর্মটি পৃথিবীর এত বিভিন্ন অঞ্চল ও সংস্কৃতির মানুষের ধর্ম হতে পেরেছে। আরবের পৌত্তলিক, সিরিয়া মেসোপটেমিয়ার ইহুদি-খ্রিস্টান, ইরানের জোড়াস্ট্রিয়ান, ভারতের হিন্দু-বৌদ্ধ ধর্মের বিভিন্ন জাতি ও ধর্মের মানুষের মাঝে যেহেতু ইসলাম জায়গা করে নিয়েছে, তাই অঞ্চলভেদে এসব মানুষের ধর্মচিন্তা ও আচারে কিছু বিশেষত্ব তৈরি হয়েছে। এই বিশেষত্ব স্বাভাবিক। আরব মুসলমান এবং বাঙালি মুসলমান ধর্মচিন্তা ও আচারে পুরোপুরি একরকম হবে এমন ভাবাটাই অস্বাভাবিক। এমন চাওয়ারও কোনো কারণ নাই। একমাত্র মৌলবাদীরাই এইরকম চাইতে পারে। সুতরাং যারা পৃথিবী জুড়ে ছড়িয়ে থাকা মুসলিম জনগোষ্ঠীর বহুত্বকে অস্বীকার করে কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর প্রচারিত ইসলামকে সহি এবং অন্যদের ইসলামকে ‘আধা’ অথবা ‘মডারেট’ ইসলাম বলে প্রচার করেন তারা দিনশেষে মৌলবাদের পক্ষেই প্রচারণা চালান। এইধরনের প্রচারণা আমাদের সময়কার সাম্প্রদায়িক বিভেদ দূর করার ক্ষেত্রে কোনো কাজে আসছে না, বরং দিনে দিনে সাম্প্রদায়িক ডিসকোর্সগুলোকেই শক্তিশালী করছে। (আত্মপরিচয়ের রাজনীতি ও শোষিতের দীর্ঘশ্বাস, জিহাদ ও খেলাফতের সিলসিলা) (চলবে)

(‘নিরাপদ নাস্তিকতাবাদ’ ও ‘মৌলবাদের অ আ’ একি সিরিজের লেখা। পাঠকদের সুবিধার্থে বিভিন্ন নামে প্রকাশিত হচ্ছে)

তথ্যসূত্রঃ
Islam and the West are inadequate banners By Edward Said
Interactions of ‘transnational’ and ‘local’ islam in Bangladesh By Ali Riaz
Faithful Education. Madrassahs in South Asia By Ali Riaz.

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “ইসলামী মৌলবাদের অ আ (পর্ব-২)

  1. আসলে ইসলামের অনেক ধরনের রুপ
    আসলে ইসলামের অনেক ধরনের রুপ আছে । কোরানে দয়া, ক্ষমা , উদারতার আয়াতের সাথে সাথে প্রয়োজনে শত্রুর কল্লায় আঘাত করার কথাও বলা আছে। ইসলামে জিহাদকে ফরজ করা হয়েছে । ইসলাম একই সাথে শান্তির আবার প্রয়োজনে চরম নির্মম। দাওয়াত , জিহাদ আর জিকির বা সুফিবাদ ইসলামের এই তিন ধরনের রূপই হচ্ছে সহীহ রুপ। যে যার যার উপলব্ধি আর পরিস্থিতি সাপেক্ষে এইসব পথের যেকোন টিকে বেছে নেয়।

    মধ্যপ্রাচ্যে বিপুল পরিমান মানুষ এইএসএস, আল-কায়দা , সালাফী-জিহাদী, আল-নুসরার অনুসারী হয়ে উঠছে এর কারনটি হচ্ছে – সেখানকার পরিস্থিতি। সেখানে এখন আর দাওয়াত আর জিকিরে ব্যাস্ত থাকার পরিস্থিতি এখন নেই। বরং সেখানে সশস্ত্র সংগ্রাম আর জিহাদ ছাড়া টিকে থাকার আর কোন উপায় নেই। তাই উদ্ভব হয়েছে আইএসএস, আল-কায়দা আর সালাফী-জিহাদী গ্রুপের। তারা ইসলামের জিহাদী রুপকে বেছে নিয়েছে। ঠিক যেমনটি হয়েছিল আফগানস্থানে। সেখানে রাশিয়ার আগ্রাসন রুখতে আল-কায়দার উদ্ভব হয়েছিল, আবার সম্রাজ্যবাদী আমেরিকার দখলদারিত্ব রুখতে তালেবানের উদ্ভব হয়েছে। যে তালেবানরা কিছুদিন আগেও ছিল মাদ্রাসা পড়ুয়া , তারাই দুদিন পরে হয়েছে জিহাদী।

    বাংলাদেশের অধিকাংশ ইসলামপন্থীরা কোন পথে হাটবে সেটা নির্ভর করছে পরিস্থিতির উপর। যদি অভিজিত গং বা স্যেকুলারদের দৌরত্ব ব্লগ-কি বোর্ডের সীমা অতিক্রম করে ক্ষমতার মসনদে পৌছে যায়, বা কোন কামাল আতাতুর্ক জন্মের সম্ভাবনা দেখা দেয়- তবে আমি নিশ্চিত অনেক সূফি-সাধু আর তাবলিগী সাথী ভাইরাও দাওয়াতী অভিজান ছেড়ে ইসলামের জিহাদী তরীকার উপর আমল করা শুরু করবেন।

    সময়ের প্রয়োজন আর পরিস্থিতি বাধ্য করে তার পথকে বেছে নিতে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

89 − 80 =