উম্মাহঃ মৌলবাদী ইসলামের রাজনৈতিক বাসনা

ইসলামের কি রূপ?

মিশরের নোবেল বিজয়ী সাহিত্যিক নাগিব মাহফুজের বিখ্যাত উপন্যাস ‘ইবনে ফাত্তৌমার সফর’-এর নায়ক ইবনে ফাত্তৌমা মধ্যযুগের ইবনে বতুতার মতোই একজন পরিব্রাজক। ইবনে বতুতা এক দেশ থেকে আরেক দেশে ঘুড়ে বেড়িয়েছেন। কিন্তু ইবনে ফাত্তৌমার সফর দেশ থেকে দেশে নয়, তিনি মূলত সময়ের পরিব্রাজক। নাগিব মাহফুজ তার এই উপন্যাসের নায়ককে এমন সব দেশে ঘুড়িয়েছেন যার প্রত্যেকটা দেশ আসলে মানব সভ্যতার বিভিন্ন সময়ের প্রতিনিধিত্ব করে। ইবনে ফাত্তৌমা নিজ দেশের প্রবল অবক্ষয় ও দূর্নীতি দেখে নিজ গুরুকে জিজ্ঞাস করেছিলেন, ‘আমার দেশের মানুষ তো ইসলামের অনুসারী, তাহলে এমন হচ্ছে কেনো’? তার গুরু তখন তাকে ‘গেবেল’ নামে এক ইউটোপিয় দেশের সন্ধ্যান দিলেন, যেখানে কোন অন্যায় ও বৈষম্য নাই। ইবনে ফাত্তৌমা গেবেলের উদ্দেশ্যে নিজ দেশ ছাড়লেন এবং এরপর যাত্রাপথে বিভিন্ন দেশে (প্রকৃতপক্ষে বিভিন্ন সময়ে) ঘুড়ে বেড়ালেন। এক পর্যায়ে তিনি হাজির হলেন ‘হালবা’ নামে এমন এক দেশে, যেখানে স্বাধীনতা সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ গন্য করা হয়। হালবা’য় সব ধর্মের মানুষ শান্তিতে বসবাস করে, সেখানে মুক্তচিন্তাকে উৎসাহিত করা হয়। হালবায় পৌছে ইবনে ফাত্তৌমা একজন স্থানীয় লিবারাল আলেমের বাসায় দাওয়াত পেলেন। এই আলেম মদ্য পান করেন, তবে অতিরিক্ত নয়। ডিনার টেবিলে আলেমের সাথে ছিলেন তার স্ত্রী ও সুন্দরী কন্যা। ইবনে ফাত্তৌমার বয়ানে ডিনার টেবিলের কিছু আলাপচারিতা এখানে তুলে ধরছি –

“ শায়েখ তার মাথার গামছা খুলে মাথায় হাত বুলালেন, তারপর আবার গামছাটা মাথায় পরে নিয়ে বললেন, ‘স্বাধীনতা এমন এক পবিত্র মূল্যবোধ যা সবাই স্বীকার করে’।
আমি প্রতিবাদ করে বললাম, ‘এই স্বাধীনতা ইসলামের সীমানা অতিক্রম করেছে’।
তিনি জবাব দিলেন, ‘কিন্তু এই স্বাধীনতা হালবার ইসলাম অনুযায়ি পবিত্র’।
হতাশ হয়ে আমি বললাম, ‘আমাদের নবীর যদি আজকে পুনরুত্থান হতো তবে আপনাদের ইসলামের এই অংশটিকে তিনি প্রত্যাখ্যান করতেন’।
‘নবীর উপর শান্তি বর্ষিত হোক’, তিনি জবাব দিলেন, ‘কিন্তু আজকে যদি তার পুনরুত্থান হতো তিনি কি আপনাদের পুরো ইসলামকেই প্রত্যাখ্যান করতেন না’?
ভেবে দেখলাম যে তিনি সত্য বলেছেন, এবং আমাকে তার প্রশ্নের সামনে মাথানত করে দিয়েছেন”। (দা জার্নি অফ ইবনে ফাত্তৌমা, নাগিব মাহফুজ)

নাগিব মাহফুজ যে দেশে জন্মগ্রহণ করেছেন সেখানে উনবিংশ শতকে মুহাম্মদ আবদুহর মতো নেতাদের রিভাইভালিস্ট ইসলাম এবং বিংশ শতকে মুসলিম ব্রাদারহুডের মতো সালাফিঘেসা ইসলামী আন্দোলন ও তৎপরবর্তি সময়ে বিভিন্ন কট্টর সালাফি ও ‘সালাফি জিহাদী’ ইসলামের চর্চা চলেছে। ইবনে ফাত্তৌমাকে সামনে রেখে নাগিব মাহফুজ ইসলামের মৌলবাদী চর্চার মোকাবেলা করার চেষ্টা করেছেন। তাই হালবার শায়েখের কন্যা তার কাছে মুক্তবুদ্ধির ইসলাম হাজির করে দাবি করেন, “তোমার এবং আমাদের ইসলামের পার্থ্যক্য হলো আমাদের ইসলামে কখনো স্বাধীন বিচার বিশ্লেষনের দড়জা বন্ধ হয় নাই, আর স্বাধীন বিচার বিশ্লেষন ছাড়া ইসলাম হলো – অযৌক্তিক ইসলাম”।

স্থান-কাল ভেদে পৃথিবীর মানুষের কাছে ‘ইসলাম’ বিভিন্ন রূপে অতীতে ধরা দিয়েছে, এখনো দেয় এবং ভবিষ্যতেও দেবে। এরমধ্যে কোন একটি রূপকে পৃথিবীর কোন অঞ্চলের বা কালের মানুষ ‘সহি ইসলাম’ গন্য করতে পারে, অথবা বিশ্বাস করতে পারে যে রূপ ও ব্যাখ্যা নানানরকম হলেও ইসলাম আসলে একটাই, বহু নয়। প্রত্যেক ইসলামের অনুসারীরই এইরকম বিশ্বাস করার এবং নিজের মতো করে ধর্মপালনের অধিকার আছে। সমস্যাটা হয় যখন কেউ তার বুঝের ইসলাম অন্যের উপর জোর করে চাপিয়ে দিতে চায়। আধুনিক যুগে এসে যে সমস্যাটা আমরা দেখছি তা হলো কোন কোন ইসলামের অনুসারী এমন এক ইসলামকে হাজির করছেন যা গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, চিন্তার স্বাধীনতা ইত্যাদি আধুনিক মূল্যবোধের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করে। বিশেষ করে বর্তমান সময়ে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে ইসলামী সন্ত্রাসবাদীরা যুদ্ধ ঘোষনা করছে। জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র কাঠামোকে অস্বীকার করে এই ইসলামী সন্ত্রাসবাদীরা মূলত দুনিয়ার সকল মুসলমানের জন্যে একক ‘উম্মাহ’ প্রতিষ্ঠার রাজনৈতিক দাবি তুলছে, প্রতিষ্ঠার চেস্টহাও করছে।

‘উম্মাহ’ কি বস্তু?

“মদিনার উম্মাহ ছিল প্রকৃতপক্ষে একধরণের ‘প্রতিরক্ষা চুক্তি’, যার মাধ্যমে শহরটির বিভিন্ন গোত্র মুহাম্মদ ও তার অনুসারীদের নিরাপত্তা দেয়ার অঙ্গিকার করেছিল। এই ঐক্য চুক্তিটি পরবর্তিতে ‘মদিনা সনদ’ হিসাবে পরিচিতি পায়। একটি অরাজক জনবসতিতে একধরণের সর্বোচ্চ শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা হয়েছিল এই চুক্তির মাধ্যমে। যেহেতু এই চুক্তি অনুযায়ি মদিনার সকল গোত্রই মুহাম্মদের কাছে আনুগত্ব স্বীকার করেছিল তাই দুর্বল ঐক্য ও অন্তর্গত দলাদলির সম্ভাবনা দূর হয়েছিল। …ঐ সময়কার যেসব নথি আমরা পাই, তাতে ‘উম্মাহ’ শব্দটিকে বিভিন্ন অর্থে ব্যবহার করা হয়ছে, যা মদিনার বছরগুলোতে বিভিন্ন পরিবর্তনের প্রতিফলনস্বরূপ। উম্মাহ দিয়ে কি ভাতৃত্ব, ধর্ম না এলাকা বোঝানো হতো? মুহাম্মদ মদিনায় যখন উম্মাহ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তখন উম্মাহ শব্দটার মধ্যে এই তিনটা জিনিসই অঙ্গিভুত ছিল। প্রাথমিকভাবে এই উম্মাহর অন্তর্ভুক্ত ছিল মুসলিম মুহাজিরদের পাশাপাশি স্থানীয় গোত্রগুলো এবং ইহুদী ও খ্রিস্টান বিভিন্ন দল”। (রি-ইমাজিনিং দা উম্মাহ, পিটার মেন্ডেভিল)

কোরআন শরিফে উম্মাহ শব্দটি সমাজ, জাতি, গোত্র বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। আধুনিক আরবী ভাষাতেও জাতি অর্থে উম্মাহ শব্দটির বহুল ব্যবহার দেখা যায়। যেমন আরবী ভাষায় ‘ইউনাইটেড নেশন্স’ অর্থাৎ জাতিসংঘ লেখা হয় الأمم المتحدة , যার অর্থ হয় ‘উম্মাহ সংঘ’। এই সাধারণ অর্থে বাংলাদেশীরা বাংলাদেশী উম্মাহর অন্তর্ভুক্ত। আর মদিনা সনদে যে উম্মাহর কথা উল্লেখ আছে সেই উম্মাহর সদস্য মুসলমানদের পাশাপাশি ইহুদি ও পৌত্তলিকরাও ছিল। ধর্মীয় আত্মপরিচয় বিচার করে উম্মাহ বলতে শুধুমাত্র ‘উম্মতে মুহাম্মদ’ অর্থাৎ মুহাম্মদের উম্মত তথা মুসলিম সমাজ বা জাতি বুঝানোর প্রচলন দেখা যায় পরবর্তিতে। উম্মাহ শব্দটি দুনিয়ার সকল মুসলমানদের সামাজিক ও রাজনৈতিক দুই ধরণের ঐক্য বুঝাতেই ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে ব্যবহার হয়েছে। কিন্তু উম্মাহর রাজনৈতিক নেতৃত্ব অর্থে ‘খেলাফত’ নিয়ে বিতর্ক শুরু হয় মুহাম্মদের মৃত্যুর পরেই এবং এই বিতর্ক চতুর্থ খলিফা আলীর আমলে চূড়ান্ত রাজনৈতিক বিভাজনে রূপ নেয়। তারপর থেকে রাজনৈতিক ও মতাদর্শিক দিক থেকে একক কোনো মুসলিম উম্মাহর অস্তিত্ব আর খুঁজে পাওয়া যায় না। যদিও দুনিয়ার অধিকাংশ মুসলমানরা সারা দুনিয়ার মুসলমানদের মধ্যে একটা ভাতৃত্বের দাবি করে থাকেন, কিন্তু তার বাইরে সারা দুনিয়ার মুসলমানদের মধ্যে বর্তমানে কোন প্রকৃত মতাদর্শিক এবং রাজনৈতিক ঐক্য খুঁজে পাওয়া যায় না। তারা বহু ভাষা ও জাতিতে যেমন বিভক্ত, তেমনি ইসলাম সম্পর্কেও সবার মতামত এক নয়। শিয়া এবং সুন্নি এই প্রধান দুই ভাগ ছাড়াও নানারকম মজহাব ও মতাদর্শের সম্প্রদায়ে মুসলমানরা বিভক্ত। এইসব বিভেদের মাঝে গোটা দুনিয়ার মুসলমানদের মধ্যে নূন্যতম রাজনৈতিক ঐক্য খুঁজে পাওয়া যেখানে কঠিন, যেখানে রাজনৈতিক ভাবে একক উম্মাহর ধারণা ইউটোপিয়ার চাইতে বেশিকিছু হয়ে উঠতে পারে নাই।

উম্মাহ প্রশ্নে মুসলমানদের মধ্য কোন মতাদর্শিক ও রাজনৈতিক ঐক্য মদিনা পরবর্তি যুগে আর কখনোই দেখা যায় নাই। চতুর্থ খলিফা আলীর শাসন মেনে নিতে অস্বীকার করে ও তৃতীয় খলিফা ওসমান হত্যার বিচার দাবিতে মুয়াবিয়া যখন সিরিয়ায় বিদ্রোহ করেছিলেন তখন তার মোকাবেলায় আলী মদিনা ত্যাগ করে ইরাকের কুফায় সাম্রাজ্যের রাজধানী স্থানান্তর করেছিলেন। ইরাক, ইরান, সিরিয়া, প্যালেস্টাইন ও মিশর বিস্তৃত বিরাট সাম্রাজ্য মদিনায় বসে নিয়ন্ত্রন করা আর সম্ভব ছিল না। সিরিয়ায় মুয়াবিয়া আর ইরাকে আলীর শাসন কেন্দ্র করে মুসলমানদের মধ্যে যে রাজনৈতিক বিভাজন শুরু হয়েছিল শিয়া ও সুন্নি মতাদর্শিক বিভাজন আকাড়ে তা এখনো ইরাক ও সিরিয়ায় বিরাজমান আছে। ব্রিটিশ উপনিবেশ পূর্ব যুগে তুরস্কের ওসমানি (ottoman) খেলাফতের মুসলিম উম্মাহর নেতৃত্বের দাবির বিরুদ্ধে হাজির ছিল ইরানের সাফাভিদ সাম্রাজ্য। এই দুই সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক যুদ্ধ শিয়া বনাম সুন্নি মতাদর্শিক বিভেদ আকাড়েও হাজির হয়েছিল। এই দুই বড় ভাগের বাইরে আবার ছিল ভারতবর্ষের মুঘোল সাম্রাজ্য। অর্থাৎ মুসলিম উম্মাহর উপর তুর্কি সাম্রাজ্যের একক রাজনৈতিক নেতৃত্বের দাবির বিরুদ্ধে ছিলেন ইরান ও ভারতবর্ষের সম্রাটরা। কিন্তু ব্রিটিশ উপনিবেশ পরবর্তী যুগে দেখা গেলো যে ভারতবর্ষের মুসলমানরা তুরস্কের খেলাফত বাঁচাতে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে খেলাফত আন্দোলন করছেন। মূলত আঠারো ও উনিশ শতকে প্রাচ্যের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ ও মুসলিম শাসিত দেশগুলোতে ইউরোপিয় ঔপনিবেশিক শাসনের মধ্যে আন্তর্জাতিক ‘মুসলিম উম্মাহ’ একটি নতুন রাজনৈতিক ধারণা হিসাবে জন্মলাভ করেছে। দেখা গেলো যে আফ্রিকা থেকে ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত ইউরোপিয় সাম্রাজ্যের বিস্তার লাভ করেছে। এই বিরাট অঞ্চলজুরে মুসলমানদের মধ্যে এই সময়টিতে ইউরোপিয় শাসন ও শোষনের বিরুদ্ধে যে সাধারণ ঘৃনা ও ক্ষোভের জন্ম হয়েছিল তা কাজে লাগিয়ে খ্রিস্টান ইউরোপের বিপরীতে আন্তর্জাতিক মুসলিম উম্মাহর ধারণাটি শক্তিশালী করেছেন কয়েকজন ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতা। রাজনৈতিক ইসলাম বিশেষজ্ঞ পিটার মেন্ডেভিলের ভাষায় –

“ উনিশ ও বিশ শতকের শুরুর দিকের প্যান-ইসলামবাদী সংস্কারকদের উপনিবেশ বিরোধী ডিসকোর্সগুলো থেকে আমরা ধারণা পেতে পারি ঠিক কোন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মুসলিম দুনিয়ার ইতিহাসে হাজার বছরে প্রথমবারের মতো উত্তর আফ্রিকা থেকে দক্ষিন-পূর্ব এশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলে সাধারণ ‘অপর’ পাশ্চাত্যের ‘বিরুদ্ধ বাগধারা’ হিসাবে উম্মাহ শব্দটি একটি রাজনৈতিক সমাজের ধারণা হিসাবে হাজির হয়েছে”।

ইউরোপিয় ঔপনিবেশিক যুগে উম্মাহ শব্দটিকে দুনিয়ার সকল মুসলমানের একক রাজনৈতিক সত্ত্বা অর্থাৎ মুসলমানের এক রাষ্ট্র বা কমনওয়েলথের ধারণা হিসাবে যারা জনপ্রিয় করেছেন তাদের মধ্যে মিশরের হাসান আল বান্না, সাইয়েদ কুতুব এবং ভারতীয় উপমহাদেশের আবু আলা মওদুদী অন্যতম। বান্না মিশরে ‘মুসলিম ব্রাদারহুড’ আর মওদুদী ব্রিটিশ ভারতে ‘জামায়াতে ইসলামী’র প্রতিষ্ঠা করেন। মওদুদী পশ্চিমা উপনিবেশ বিরোধী বক্তব্য দিতেন, আবার জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে ছিলেন। মুসলমানদের একক উম্মাহর স্বপ্ন দেখতেন। তার ভাষায়-

এটা খুবি দুঃখজনক যে সকল মুসলিম দেশ এখন জাতীয়তাবাদের মতাদর্শ অনুসরণ করছে যা তারা পশ্চিমা প্রভুদের কাছে শিখেছে…তারা এমনকি ইসলামের প্রকৃত বিপ্লবী কর্তব্য সম্বন্ধে সচেতনও নয়, যেই ইসলাম তাদেরকে একে অপরের সাথে যুক্ত করেছে, যে ইসলাম মুসলিম জনগোষ্ঠিকে একজোট করে ‘উম্মায়’ পরিণত করতে পারে। -আবু আলা মওদুদী

হাসান আল বান্না কিংবা আবু আলা মওদুদী বহু দিক থেকেই আধুনিক মানসিকতার মানুষ ছিলেন। মওদুদী গণতন্ত্রের সমর্থক ছিলেন এবং গণতন্ত্র যে ইসলামের সাথে সাযুজ্যপূর্ণ এই ধারণার প্রতিষ্ঠা করেছেন। হাসান আল বান্না মিশরের জাতীয়তাবাদী স্বাধীনতা আন্দোলনকে নৈতিক সমর্থন দিয়েছেন। কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার সাথে ইসলামী রাজনীতির একটি সাম্য প্রতিষ্ঠা করতে তাদের প্রতিষ্ঠিত সংগঠনগুলো বরাবরি ব্যর্থ হয়েছে। প্যান-ইসলামবাদী স্বপ্ন, জাতীয়তাবাদ বিরোধীতা আর ইসলাম নিয়ে অতিরিক্ত রাজনীতি করার কারনে এই সংগঠনগুলো গণমানুষের সংগঠন হয়ে উঠতে ব্যর্থ হয়ে দিনশেষে ‘আন্তর্জাতিক লবি সংগঠনে’ পরিণত হয়েছে। ১৯৭১ সালে দেখা গেলো যে মওদুদী প্রতিষ্ঠিত জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের জাতীয়তবাদী ও স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরোধীতা করছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকে তারা তাত্ত্বিকভাবে মুসলিম উম্মাহ ও পাকিস্তান বিরোধী ষড়যন্ত্র হিসাবে প্রচার করেছে। তারা প্রচার করেছে ‘ইসলাম বিপন্ন’, ‘বাংলাদেশ হলে ইসলাম থাকবে না’ ইত্যাদি। সশস্ত্রভাবে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতা করতে গিয়ে তারা গণহত্যা চালিয়েছে। আজকে যখন তাদের বিচার হচ্ছে তখন তারা আবারো ‘ইসলাম বিপন্ন’ আওয়াজ তুলেছে। শাহবাগ আন্দোলনে পর যখন এই আওয়াজ উঠলো, তখন সলিমুল্লাহ খান একটি লেখায় যথার্থ প্রশ্ন তুলেছিলেন – “এখন রব উঠিয়াছে এসলাম ধর্ম বিপন্ন। আসলে কে বিপন্ন? প্রকৃত সত্য কি? এসলাম না এসলাম লইয়া যাহারা রাজনীতি করিতেছেন তাহারা”? কে বিপন্ন? ভিন্ন একটি লেখায় তিনি এই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন এইভাবে – “সত্য বলিতে বাংলাদেশে এসলাম বিপন্ন নহে, যাহারা রাজনীতিতে নিজেদের বিপন্ন দেখিতেছেন তাহারাই এসলামকে কেন্দ্র করিয়া নিজেদের পুনর্বাসিত করিবার সুযোগ খুঁজিতেছেন মাত্র”। মোট কথা মুসলমানদের একক রাজনৈতিক উম্মাহর আন্দোলন ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই থেকে গড়ে উঠলেও তা মূলত ইউরোপের ফ্যাসিবাদী রাজনীতিকেই আয়ত্ত্ব করেছে। সলিমুল্লাহ খানের ভাষায় –

যাহারা এসলাম বলিতে ‘এক নেতা এক দেশ’ শ্লোগানের মতন একটা একাট্টা আওয়াজ মাত্র মনে করেন তাহারা এয়ুরোপের অসহিষ্ণু ফ্যাসিবাদের এসলামি সংস্করণ মাত্র চালু করিতে চাহেন। তাহারা ‘এসলামবাদী’ বলিয়া পরিচয় জাহির করেন। বিন্দুমাত্র ভিন্নমত পুষিলে বলেন, ‘তুমি অমুসলমান’। আসলে ইহারা ফ্যাসিবাদী। এই এসলামি ফ্যাসিবাদীরাই আজিকালি বলিতেছেন বাংলামুলুকের মানুষ দুইভাগে ভাগ হইয়া গিয়াছে। একদল আছেন ‘বাংগালি জাতীয়তাবাদী’ আর আছেন অন্যদল ‘মুসলমান’। এইভাবে তাহারা মুসলমান জগতে গৃহযুদ্ধ বাধাইবার জন্যও কাজ করিতেছেন। তাহারা ভুলিয়া গিয়াছেন রাষ্ট্রকে আলাদা রাখিয়াও এসলামধর্ম বাঁচিয়া আছে। আর জাতীয় রাষ্ট্রের মধ্যেও তাহার কবর হইবে না। (সলিমুল্লাহ খান, এসলাম ও জাতীয়তাবাদ: একবাল আহমদের সাক্ষ্য)

(চলবে)
(নিরাপদ নাস্তিকতাবাদ, মৌলবাদের অ আ, এবং এই লেখাটি একি সিরিজের লেখা। পাঠকদের সুবিধার্থে আলাদানামে লেখা হচ্ছে)

তথ্যসূত্রঃ
Transnational Muslim Politics: Reimagining the umma by Peter Mandaville
Writing Muslim Identity By Geoffrey Nash
স্বাধীনতার সংকট: মুক্তিযুদ্ধ, মানবাধিকার ও এসলাম – সলিমুল্লাহ খান
এসলাম ও বাংলাদেশ – সলিমুল্লাহ খান
এসলাম ও জাতীয়তাবাদ: একবাল আহমদের সাক্ষ্য – সলিমুল্লাহ খান

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “উম্মাহঃ মৌলবাদী ইসলামের রাজনৈতিক বাসনা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

37 + = 42