বামপন্থীদের মেয়র নির্বাচনঃ সমর্থক ভাবনা

আমার এক বন্ধু ঢাকা উত্তর মেয়র নির্বাচনে কাফি রতনরে ভোট দিসেন। গতকাল বিকালের মধ্যে বিএনপি, গণসংহতি আন্দোলন ও সিপিবি-বাসদ নির্বাচন বয়কট করার পর ফলাফল নিয়া আগ্রহ কম থাকলেও ফলাফল জেনে মন্তব্য করলেন – “কাফি রতন যদি লাল পাঞ্জাবিটা আর কয়দিন আগে কিনতেন তাইলে জোনায়েদ সাকির সাথে আরেকটু কনটেস্ট দিতে পারতেন” (লাল পাঞ্জাবি পরিহিত পোস্টার প্রসঙ্গে)। ভাইবা দেখলাম কথাটা একেবারে মিথ্যা বলে নাই। তরুণ নেতা হিসাবে জোনায়েদ সাকির একটা কারিসমাটিক ইমেজ আছে, অনেক দিন ধরেই এটা একটু একটু করে তিনি তৈরি করেছেন। কাফি রতন সেই হিসাবে ঢাকার মানুষদের কাছে অনেকটাই অপরিচিত। বামপন্থী নেতা হিসাবেও তার পরিচিতি সাধারণ মানুষের কাছে জোনায়েদ সাকির চাইতে কম। বাংলাদেশের বামপন্থী পার্টি ও সংগঠনগুলো প্রত্যেকেরই নিজস্ব কিছু সমর্থক গোষ্ঠি আছে। কিন্তু এর বাইরেও বিগত কয়েক বছরে বাংলাদেশে বামপন্থী সমর্থক ও সিম্পেথাইজার মিলে একটা সমর্থক গোষ্ঠি তৈরি হয়েছে যারা বিশেষ কোন পার্টির সমর্থক নয়। এরা সিপিবি-বাসদ আর গণসংহতির ফারাক বোঝে না, কে কোন পার্টির নেতা সেই বিষয়েও অনেকের কোন ধারণা নাই। এই বৃহত্তর সমর্থকগোষ্ঠির কাছে বাংলাদেশের ‘বামপন্থী রাজনীতি’ একটা ফেনোমেনা। এরা সিপিবি বা গণসংহতি নয়, বরং এই ফেনোমেনার সমর্থক। পার্টি সমর্থকদের বাইরে বাংলাদেশের এই বৃহত্তর ‘বামপন্থী সমর্থক গোষ্ঠি’ সাম্প্রতিক মেয়র নির্বাচনে বামপন্থী প্রার্থী বলতে মূলত জোনায়েদ সাকিকেই বুঝেছে এবং রেকগনাইজ করেছে। জোনায়েদ সাকিকে তারা ভোটও দিয়েছে, তারপক্ষে প্রচারও চালিয়েছে। নির্বাচন সুষ্ঠু হলে তিনি আরো অনেক ভোট পাইতেন।

সর্বশেষ পাওয়া খবর থেকে দেখলাম যে সিপিবি, বাসদ এবং গণসংহতির তিন প্রার্থি মিলে ভোট পাইছেন দশ হাজারের বেশি। এরমধ্যে জোনায়েদ সাকি দুই তৃতীয়াংশ ভোট পাইছেন। বাংলাদেশের বামপন্থী সমর্থক গোষ্ঠির একজন মানুষ হিসাবে এই সংখ্যাটায় আমি তেমন দুঃখিত নই। বিশেষ করে, যে ধরণের নির্বাচন হয়েছে তাতে ভোট সংখ্যা নিয়ে খুব বেশি দুঃখিত হওয়া উচিৎও না। এমনিতেই মিডিয়া, অর্থ, বাহুবল সবকিছুতেই ডানপন্থী প্রার্থীরা অনেক এগিয়ে ছিলেন। সরকারের সমর্থন পাওয়া প্রার্থীরা যে ছলে বলে কৌশলে যেভাবেই হোক জেতার কৌশল গ্রহণ করলেন এবং নির্বাচনের দিন যা করলেন তাতে এই নির্বাচনের ফলাফল কোনভাবেই একটি অবাধ ও সুষ্ঠ নির্বাচনের ফলাফল হিসাবে গণ্য হতে পারে না। প্রচার প্রচারণার ক্ষেত্রে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তো কখনোই ছিল না। তারপরও জোনায়েদ সাকি এবং কাফি রতন দুইজনের প্রচারকাজেই বাধার সৃষ্টি করা হয়েছে, হামলা করা হয়েছে। আর নির্বাচনের দিন তো সবকিছুই ছিল আওয়ামী লীগের দখলে। এবং প্রতিটা ক্ষেত্রেই জয় তারা আদায় করে নিয়েছে। দিনশেষে এই নির্বাচনটি ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের বিভিন্ন পদে আওয়ামী লীগের একটি দখলাভিজান হয়ে গেলো। এই অবস্থায় বামপন্থীরা যে দশ হাজার ভোট পাইছে তার দাম আমার কাছে এক লাখ ভোটের সমান। তবে কেউ ভাববেন না যে আমি বলছি সুষ্ঠ নির্বাচন হলে বামপন্থীরা এক লাখ ভোট পাইতো। প্রকৃত সংখ্যা যদিও নিশ্চিত হয়ে বলা সম্ভব না, কিন্তু আমার ধারণা সিপিবি-বাসদ এবং গণসংহতি মিলে যদি নির্বাচনে প্রার্থী দিতো এবং নিজেদের সকল রিসোর্স ব্যবহার করতে সক্ষম হতো এবং নির্বাচন ফ্রি ও ফেয়ার হইতো তাইলে হয়তো তারা পঞ্চাশ হাজারের বেশি ভোট পাইতো। তাতে মেয়র হওয়া যেতোনা বটে, কিন্তু ঢাকা শহরে বামপন্থীদের অবস্থানটা আরো পোক্ত হতো। এক লাখ সংখ্যাটি বললাম এক ধরণের নৈতিক সমর্থন ও উৎসাহ দেয়ার জন্যে। সংখ্যাটি অনাগত ভবিষ্যতের তাকে তুলে রাখলাম।

যেই বন্ধুর গল্প দিয়ে শুরু করেছিলাম। স্বভাবতই কাফি রতন জোনায়েদ সাকির চাইতে কম ভোট পাওয়ায় তিনি একটু হতাশ। তিনি বললেন, ‘জোনায়েদ সাকি হলো বামপন্থীদের আনিসুল হক’। আমি ভেবে দেখলাম এই কথাটিও একদিক থেকে ঠিক। ডানপন্থী প্রার্থীদের মধ্যে যেমন সবচাইতে বড় মিডিয়া ব্যক্তিত্ব হলেন আনিসুল হক, বামপন্থীদের মধ্যে তেমনি জোনায়েদ সাকি। কিন্তু মনে প্রশ্ন জাগলো যে জোনায়েদ সাকি যদি বামপন্থীদের আনিসুল হক হয় তাইলে ক্ষতি কি? তাই বন্ধুকে বললাম, ‘আনিসুল হক মালিক শ্রেনীর মানুষ, জোনায়েদ সাকি শ্রমিক শ্রেনীর মানুষ না হইলেও শ্রমিক শ্রেনীর পক্ষে রাজনীতি করেন। মালিক শ্রেনীর মিডিয়া ব্যক্তিত্ব আর শ্রমিক শ্রেনীর পক্ষের মিডিয়া ব্যক্তিত্বের মধ্যে মৌলিক ফারাক আছে নিশ্চয়। বামপন্থীদের কি আনিসুল হক থাকতে নাই? আমি তো বলি আলবৎ থাকা উচিৎ’।

সবশেষে জোনায়েদ সাকিকে অভিনন্দন। কাফি রতনকেও অভিনন্দন। আপনারা প্রবল বিরুদ্ধ শ্রোতেও নিজেদের চেহারা ও জাত জনগণকে চিনাইতে পারছেন। ভবিষ্যতে আপনারা আরো অনেক ভোট পাইবেন। সেই অনাগত দিনের অপেক্ষায় থাকলাম।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “বামপন্থীদের মেয়র নির্বাচনঃ সমর্থক ভাবনা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 43 = 52