‘কাদের কুলের বউ’ কি নারীবাদী নাকি নারীবিরোধী সিনেমা?

‘কাদের কুলের বৌ গো তুমি কাদের কুলের বৌ, যমুনার জল আনতে যাচ্ছো সঙ্গে নেই তো কেউ, যাচ্ছো তুমি হেসে হেসে কাঁদতে হবে অবশেষে, আর কলসী তোমার যাবে ভেসে ঐ লাগলে প্রেমের ঢেউ।’ রাইচাঁদ বড়ালের লেখা এই গানটি একটা সময় উঠতি তরুণরা খুব গাইতেন। একটু অশ্লীল হিসেবে তখন দেখা হতো গানটিকে। সেই গানই আজ একটি সিনেমার শিরোনাম হয়ে এলো। বলছি সৌভিক কুণ্ডু পরিচালিত ‘কাদের কুলের বউ’ (২০১৫) শীর্ষক সিনেমাটির কথা। নারীবাদী সিনেমা হিসেবে এটি ইতোমধ্যে বেশ আলোচনায় এসেছে।

নারী নিপীড়নের এই যুগে এরকম সিনেমার গুরুত্ব বিরাট। ভারত ও বাংলাদেশে যে হারে ধর্ষণ বাড়ছে তাতে নারী নিপীড়নের বিরুদ্ধে সব মাধ্যমে সংগ্রামে নামাটা এখন খুবই জরুরী। সম্প্রতি একটি ভারতীয় টিভি চ্যানেলে ‘কাদের কুলের বউ’য়ের ট্রেইলার দেখে তাই মনস্থ করলাম সিনেমাটা দেখতেই হবে। আজকের নারীবাদ নিপীড়িত নারীদের কী বার্তা দিচ্ছে, তা দেখে নিতে আগ্রহী হয়েছিলাম। গভীর আগ্রহ নিয়ে পুরো সিনেমাটা দেখলাম। আমি জানি না ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী নারীবাদীরা আমাকে কি বলে আক্রমণ করবেন। তবে সিনেমাটি দেখে আমার আসলেই উদ্ভট লেগেছে! এতে অভিনয় করেছেন কনিনীকা ব্যানার্জি, অরিন্দম শীল এবং শঙ্কর দেবনাথ প্রমুখ।

ইদানীংকার কলকাতার আধুনিক বাংলা সিনেমাগুলোর পথেই হেঁটেছে এই সিনেমাটিও। যৌনতাই চাবিকাঠি। পুরো সিনেমায় একজন নারীর শক্তির পেছনের কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে তার রূপ-বর্ণ-যৌনাঙ্গকে। যেহেতু এর কাছেই পুরুষ দুর্বল, এর টানেই পুরুষ নতি স্বীকার করে! গল্পের বাঁধনের চেয়ে আমার মনে হয়েছে নির্মাতা জোর দিয়েছেন পর্দায় কি দেখা যাচ্ছে তার দিকে। ফলে গল্পটা দুর্বল হয়েছে।

সিনেমাটি দুভাগে বিভক্ত। প্রথম ভাগে গ্রামের মেয়ে রুখসার বেগমই মূল চরিত্র। গ্রাম থেকে তিনি মাদক সিন্ডিকেটের এক সদস্যকে বিয়ে করে পালান পুলিশের তাড়া খেয়ে। এরপর শহরে এসে বুদ্ধি, শরীর ও ক্ষিপ্রতাকে ব্যবহার করে তিনি নিজের উত্থান ঘটান। অনেক রক্তপাতের পর নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে হয়ে ওঠেন কোলকাতার গাঁজা সম্রাজ্ঞী। এরপর শুরু হয় দ্বিতীয় গল্প, যেখানে একজন গৃহবধুকে দেখা যায় মাঝরাতে অনেকগুলো গুন্ডা পেটাতে। শেষে দেখা যায় তার স্বামীটি সমাজে এখন নারীরা যেমন আচরণ করে, তেমন আচরণ করছে। এই হচ্ছে সিনেমার গল্প- পুরুষের জায়গা নারীর দখলে।

আর এটাকেই সিনেমাটির প্রযোজকরা ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে- This film conveys a strong message to the audience – the message of change. What happens when the power centre shifts from a man to a woman? কথাগুলো জিবাংলাসিনেমা কর্তৃপক্ষ তেমন একটা ভাবনা চিন্তা করে বলেছেন বলে মনে হচ্ছে না। কারণ আসলে পাওয়ার সেন্টার শিফ্‌ট্‌ হওয়ার মধ্য দিয়ে তো এখানে নতুন কিছু ঘটছে না। আগের অবস্থাই জারি আছে। শুধু পুরুষের জায়গায় আসছে নারী, বাকি সব একই। সেই একই নিপীড়ন! তাহলে মেসেজ অব চেইঞ্জটা কোথায়?

পুরো সিনেমা জুড়েই দ্রোহ ছিল। পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে দ্রোহ। এটা ভাল হিসেবে নিতে পারতাম বটে। আপনারাও সিনেমাটি দেখে তার মূল্যায়ন করতে পারেন। তবে আমার কাছে এই দ্রোহকে কাজের কিছু মনে হয়নি। কারণ দ্রোহের ক্ষেত্রে নৈতিকতার কোনো বালাই দেখা গেল না। নেশার দুনিয়া দখলে নেয়ার জন্য অস্ত্র, শরীর, ষড়যন্ত্র ও খুন। এই যথেচ্ছাচার নারীমুক্তিতে কোনো সহায়তা করবে কিনা জানি না, তবে সিনেমার প্রযোজক নিশ্চয়ই এর কল্যাণে অনেক কামিয়েছেন ও কামাবেন। কারণ পুরো সিনেমাজুড়ে তিনি যৌনতার আবহটা ধরে রেখেছেন।

সিনেমার প্রযোজক কোথায় গুরুত্ব দিতে চান তা ট্রেইলারের এই ডিসপ্লেও প্রমাণ করে।

দ্রোহ অনেকক্ষেত্রেই প্রকাশ পেয়েছে জিঘাংসায়, উন্মত্ততায় এবং কৌশলে। খুবই স্বাভাবিক, নিপীড়নের জবাব কতকটা এভাবে আসার কথাও বটে। তবে সিনেমার শেষাংশে দেখানো হয়েছে, নারী তার স্বামী তথা পুরুষকে বিছানায় নিয়েছে। সবল স্ত্রীকে নিচে শোয়া দুর্বল স্বামী অনুনয় করে বলছে, ‘লাগছে তো’। এটা কি নারীমুক্তির উপায়, নাকি সিনেমা হলে যাওয়া পুরুষদের বিকৃতিতে হাওয়া লাগানোর চেষ্টা?

সর্বোপরি পুরো সিনেমাতে তারা যা দেখিয়েছে বলে দাবি করেছে, তা হলো নারীর ক্ষমতায়ন। আর সেটা একেবারেই পুরুষের পাল্টাপাল্টি। পুরুষতন্ত্রের বিপরীতে যারা এভাবে পাল্টা নারীতন্ত্র গড়তে চান পুরুষকে নিপীড়নের জন্য, তারা আসলে পুরুষতান্ত্রিক। নারী কেন পুরুষতন্ত্রের একটা ছায়া বানাতে যাবে? নারীর প্রয়োজন মুক্তি। সেজন্য কেন তাকে পাল্টা নিপীড়নে যেতে হবে? নিপীড়ন ঠেকানোর জন্য অস্ত্র ধরা আর আমি নিপীড়ন চালাব কখনোই এক নয়।

অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, নারীবাদ এখন পুরুষতন্ত্রের সবচেয়ে বড় পকেট। যেখানে যৌনতাব্যবসা, সন্ত্রাসবৃত্তি আর পাল্টাপাল্টি হিংসা চরিতার্থের মতো জঘণ্য বিষয়াদিকে প্রবেশ করানো হয়েছে। নারীবাদের নামেই পুরুষতন্ত্র এখন তার বড়িগুলো বিক্রি করছে। এই সিনেমা তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

সিনেমার পেছনে একটা দর্শন থাকে। সেটা যদি শাসকদের বিরুদ্ধে যায়, তারা তাহলে ওই সিনেমাটা মুক্তি পেতে দেয় না। চাইলেই তারা তা সব সময় পারে না। অন্তত থামানোর জন্য সর্বচেষ্টা করে। এই সিনেমার বিরুদ্ধে এমনটা শোনা যায়নি। এর পেছনের দর্শনটা তাহলে কি? আমরা দেখি যে রিকশাচালকরাই এদেশে সবচেয়ে বেশি হলে গিয়ে সিনেমা দেখে। তারা যে সিনেমাগুলো দেখে সেগুলো আসলে তাদের জন্য ঘুমপাড়ানি ওষুধ। তাতে দেখানো হয় গরিব নায়ক হু হু করে টাকার মালিক হয়ে যায়। গরিব রিকশাচালকের প্রেম হয় ধনীর দুলালীর সঙ্গে। সে জানে এসব সম্ভব না, তবু সে গল্প সাজায় মাথার ভেতর। ঠিক ‘মাদার ইন ম্যানভিল’র জেরির মতো।

নারীরা এই সিনেমা দেখবেন আর শ্রমিকদের মতো গল্পের জগতে ভাসবেন। আর ওদিকে বেলা বাড়লে কাজে বেরুতে হবে। রাস্তায় আছে নিপীড়কের থাবা। কিন্তু নারীর অবস্থা আগের দিনের মতোই। ‘কাদের কুলের বউ’ তাকে কিছুই দিতে পারল না। বরং ঘুমপাড়ানি ওষুধ হয়ে নারীবিরোধী ভূমিকাতেই লিপ্ত হলো।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১০ thoughts on “‘কাদের কুলের বউ’ কি নারীবাদী নাকি নারীবিরোধী সিনেমা?

  1. রিভিউটা পড়লাম। যদিও সিনেমাটা
    রিভিউটা পড়লাম। যদিও সিনেমাটা দেখিনি, তবে রিভিউ পড়েই আর দেখার ইচ্ছা হচ্ছে না। আসলেই যদি উপস্থাপনায় এমন বিষয়গুলোই উঠে আসে তাহলে এটাকে আরেক ধরণের বিকারগ্রস্থ চিন্তার বহিঃপ্রকাশ বলতে হবে। পুরুষরা যেভাবে এতোদিন নারীদের নিপীড়ন করে আসছে, তার বিপরীতে নারীরাও পুরুষদের নিপীড়ন করবে -এমন বৈষম্যমূলক সমাজব্যবস্থা চাইনা। আমরা মানুষের মুক্তি চাই, সাম্যের সমাজ চাই। পুঁজিবাদের কোলে অপসংস্কৃতির এই ব্যাপক আগ্রাসন প্রজন্মকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। সুস্থ ধারার সংস্কৃতির চর্চা ও প্রসার না বাড়ালে এর থেকে মুক্তি নেই।

    1. এই জন্যই অসুস্থ ধারাকে
      এই জন্যই অসুস্থ ধারাকে মোকাবেলা করা দরকার। ভুল ও সঠিক সম্পর্কে নিরন্তর প্রচার চালানো দরকার। ধন্যবাদ, লেখাটি পড়ে আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দেয়ার জন্য।

  2. রিভিউটা পড়ে দেখতে ইচ্ছে
    রিভিউটা পড়ে দেখতে ইচ্ছে হচ্ছে। দেখে বলা আপনার মুভি রিভিউ লেখার হাত কেমন পাঁকা।

    1. আমি সেই অর্থে রিভিউ লিখিনি।
      আমি সেই অর্থে রিভিউ লিখিনি। রিভিউতে সিনেমার মেকিংসহ চরিত্রগুলোর চলাফেরা এবং আরও বিষয়াদি আলোচনা হয়। আমি শুধু এর মর্মার্থে ঢোকার চেষ্টা করেছি, আর যা বুঝেছি তাই বলেছি। আপনাকে ধন্যবাদ লেখাটি পড়ার জন্য। তবে হ্যাঁ, ইউটিউব থেকে ম্যুভিটি দেখে নিতে পারেন এবং আমার আলোচনার ফাঁক থাকলে ধরিয়ে দিতে পারেন, তাতে আনন্দিত হব।

  3. অনেকেই জানেন নারীবাদ অর্থই
    অনেকেই জানেন নারীবাদ অর্থই নারীর মাঝে পুরুষালী ব্যপার স্যাপার. . . . . . .সে অর্থে নারীবাদ নয়া ব্যবসার নাম ।

    1. ধন্যবাদ মতামতের জন্য। আমার
      ধন্যবাদ মতামতের জন্য। আমার কাছে মনে হয় নারিবাদী হিসেবে এই ধারাটাই এখন বিশ্বে কর্তৃত্ব করছে। যদিও মর্মমূলে এটা পুরুষতন্ত্রেরই একটা ভিন্ন রূপ।

  4. মুভিটা না দেখে কিছু বলতে
    মুভিটা না দেখে কিছু বলতে পারছিনা । তবে পড়ে যা মনে হলঃ যারা নারী মুক্তির কথা বলে তারা এখনো পুরুষতন্ত্রই বোঝে না । অথবা বুঝেও চুপ করে থাকে লাভের আশায় । অর্থাৎ শ্রেফ প্রতারনা করে ।

    1. আপনার সঙ্গে বেশ খানিকটা একমত।
      আপনার সঙ্গে বেশ খানিকটা একমত। তবে সবাই এমন নন। অধিকাংশই বরং ব্যক্তিগত জীবনের অভিজ্ঞতার ফলে অ্যারোগ্যান্ট হয়ে যান। সেই বিদ্বেষ থেকেই এ ধরনের মত বেশি আসে।

  5. সর্বোপরি পুরো সিনেমাতে তারা
    সর্বোপরি পুরো সিনেমাতে তারা যা দেখিয়েছে বলে দাবি করেছে, তা হলো নারীর ক্ষমতায়ন। আর সেটা একেবারেই পুরুষের পাল্টাপাল্টি। পুরুষতন্ত্রের বিপরীতে যারা এভাবে পাল্টা নারীতন্ত্র গড়তে চান পুরুষকে নিপীড়নের জন্য, তারা আসলে পুরুষতান্ত্রিক। নারী কেন পুরুষতন্ত্রের একটা ছায়া বানাতে যাবে? নারীর প্রয়োজন মুক্তি। সেজন্য কেন তাকে পাল্টা নিপীড়নে যেতে হবে? নিপীড়ন ঠেকানোর জন্য অস্ত্র ধরা আর আমি নিপীড়ন চালাব কখনোই এক নয়। সহমত

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

13 + = 16