জ্বালানী ও বিদ্যুৎ সঙ্কট সমাধানে নবায়নযোগ্য শক্তির সম্ভাবনা- প্রথম পর্ব

তেল গ্যাস কয়লার মত জ্বালানি গুলোর উপর বাংলাদেশের ৯৮ ভাগ বিদ্যুৎ উৎপাদন নির্ভরশীল। কৃষি সহ অন্যান্য সমস্ত উৎপাদন নির্ভরশীল আবার বিদ্যুতের উপর। বাংলাদেশ সরকার তার এই শাসনামলে জ্বালানি তেল, গ্যাস এবং বিদ্যুতের মূল্য পাঁচ থেকে সাতবার করে বৃদ্ধি করেছে। জ্বালানি তেল, গ্যাসের দাম বৃদ্ধির স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে পরিবহন, খাদ্য, কৃষিপণ্য সহ অন্যান্য সব নির্ভরশীল বাণিজ্যিক উৎপাদনের খরচ বৃদ্ধি পায়, ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যও বৃদ্ধি পায়। দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটে যখন তেল গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির কারন দেখিয়ে সরকার বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি করে। আবারও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে। রাষ্ট্রের পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে এই মূল্য বৃদ্ধির যে লাগাতার প্রতিক্রিয়া ঘটে তার মূল্য দিতে হয় জনগণকে। বছরের পর বছর ধরে জনগন এভাবে মূল্য দিচ্ছে। বেশিরভাগ মানুষের জীবনের মান নিন্ম থেকে আরও নিন্মতর হচ্ছে। ফসিল ফুয়েল কেন্দ্রিক শক্তি ব্যবহারের মূল্য বৃদ্ধিজনিত ক্ষতিকর দিক ছাড়াও আছে অপর্যাপ্ত মজুদ, সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর এই স্বল্প সম্পদের উপর দখল এবং লুটপাট, সাম্রাজ্যবাদী লুটেরাদের লুটপাটের দেশীয় সহযোগী হিসেবে রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকা, ক্ষমতায় না থাকা অবস্থায় ক্ষমতায় গিয়ে সেই লুটপাটের অংশ দখল করার প্রচেষ্টায় সমস্ত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত করা, অবাধ দুর্নীতির পরিবেশ বজায় থাকা, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত বিপর্যয়ের সম্ভাবনা বলবত থাকা। তেল গ্যাস কয়লার প্রধান ব্যবহার পরিবহন ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং গার্হস্থ প্রয়োজনে। বিদ্যুতকে মূল শক্তি বিবেচনা করে ফসিল ফুয়েল ছাড়া এর উৎপাদনের বিকল্প ব্যবস্থা করা গেলে এর ফল কি হবে সে হিসেব পাঠকই করতে পারে। উৎপাদনের সেই বিকল্প ব্যবস্থায় যাওয়া সম্ভব কিনা, বাংলাদেশের সে সমস্ত সুযোগ পর্যাপ্ত পরিমানে আছে কিনা এই সরল জিজ্ঞাসা গুলোর জবাব দেয়ার চেষ্টা করা হবে এই আলোচনায়। ধরে নেয়া যাক একটি নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে বিদ্যুতের মূল্য প্রতি ইউনিট ১০০ টাকা। অর্থাৎ প্রতি ঘণ্টায় ১০০০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহারের জন্য আমাদের খরচ করতে হবে ১০০ টাকা। ভিন্ন ভাবে বললে খুব গরমের মধ্যে একটি সিলিং ফ্যান দশ ঘণ্টা চললে কিংবা টিভিতে ভারত বাংলাদেশের একদিনের ক্রিকেট দেখতে দেখতে এই পরিমান বিল গুনতে হবে। বিদ্যুতের বিল অসহনীয় পর্যায়ে চলে যাওয়ায় ২৫/৫০/১০০/১০০০/১০০০০ টাকা প্রতি ইউনিট যাই হোকনা কেন, এই সংখ্যাগুলোর মধ্যে আসলে কোন মনস্তাত্তিক পার্থক্য নেই। তার কারন হল যেকোনো পণ্যের মূল্য ক্রমাগত বৃদ্ধি পেতে থাকলে ভোক্তা মূল্য বৃদ্ধির এই অসহনীয় অবস্থা একটা নির্দিষ্ট পর্যায় পর্যন্ত সহ্য করতে পারে। পণ্য ক্রয়ের সক্ষমতা না থাকলে ভোক্তা হয় সে পণ্য ব্যবহার কমিয়ে দেয় অথবা বর্জন করে। যার উদাহরন হিসেবে বলা যায় গত বছর ২০১২ সালে সরকার ব্যক্তি খাতের শিল্প-কল কারখানা এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে একটি প্রস্তাব দিয়েছিল যে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ১৬ টাকা করে দিলে নিরবিচ্ছিন্ন সংযোগ দিবে। কিন্তু যতদূর জানা যায়, একটি প্রতিষ্ঠানও এই প্রস্তাবে সাড়া দেয়নি। বরং তারা সরকারকে পাল্টা প্রস্তাব দিয়েছে যে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার স্বার্থে রপ্তানিমুখি শিল্পে যেন কম মূল্যে নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। শুরুতে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের যে সম্ভাব্য মূল্য দেখা গেল তা আসলে এই গ্রহের কৃষিভিত্তিক দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গরিব আর সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ বাংলাদেশের ৫৫ থেকে ৬০ ভাগ মানুষের কাছে কোন অর্থই বহন করেনা। কারন বিদ্যুতের মূল্য আটআনা হোক বা একশত টাকা প্রতি ইউনিট হোক তা বিদ্যুৎ সংযোগ এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতার অভাবে তারা ব্যবহার করতে পারেনা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর করা গার্হস্থ আয় ব্যয় এর সর্বশেষ জরিপ ২০০৫ অনুযায়ী দেশের চল্লিশ ভাগ মানুষ দরিদ্র। যে গ্রামাঞ্চলে সত্তর ভাগ মানুষের বাস সেখানে দরিদ্রের হার শতকরা চুয়াল্লিশ ভাগ। এরকম অবস্থায় জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের সাথে সংযুক্ত দেশের ৪৯ ভাগ মানুষ। গ্রামীণ এলাকায় এই সংযোগ ২৫ ভাগ(১)। যে রাষ্ট্রের এতো মানুষ দরিদ্র এবং এতো মানুষের বাস দারিদ্র্য সীমার নীচে, সেখানে ঠিক ভাবে হিসেব করলে জনগণের চার ভাগের এক ভাগ বিদ্যুৎ আর ৬ ভাগ গ্যাস পাচ্ছে। যারা বিদ্যুৎ, গ্যাসের সুবিধা পাচ্ছেনা সেটা সংযোগ কিংবা সক্ষমতা না থাকা যে কারনেই হোকনা কেন তেল, গ্যাস, বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধির পরোক্ষ প্রভাব থেকে কেউই মুক্ত নয়। মাথা নেই বলে ব্যথা নেই এমন ভাবলে কিছুদিন পর সাধারন মানুষ কার্যত লবন (৩২ টাকা প্রতি কেজি, আরও বাড়ছে) দিয়েও ভাত খেতে পারবে কিনা সন্দেহ আছে। কারন বিদ্যুৎ, গ্যাস, তেলের মূল্য বৃদ্ধির কারনে জীবন বাঁচাতে প্রয়োজনীয় অন্য সব পণ্য, পরিবহন, কৃষি ও শিল্প উৎপাদনের খরচ বাড়ে। উৎপাদক তার পণ্যের দাম পায়না। যদিওবা পায় বাড়তি উৎপাদন খরচের কারনে ভোক্তাকে বেশী দাম দিয়ে সেসব পণ্য কিনতে হয়। ফল হিসেবে সীমিত আয়ের সাধারন মানুষকে প্রতি মাসেই তাদের খাদ্য তালিকা ছোট করতে হয়, ছেলে মেয়েদের লেখাপড়া বন্ধ করে দিতে হয়, চিকিৎসা ব্যয় কমাতে হয়। এতো অসহনীয় অবস্থায় শুধুমাত্র সক্ষমতা আছে বলে দুই তিন সদস্যের কোন পরিবার যদি দশ থেকে পনের হাজার টাকা বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করে সেটা জনগনের অক্ষম অংশের সাথে ব্যঙ্গ করার সামিল। এখানেই নৈতিকতার প্রশ্ন। শুধুমাত্র সক্ষমতা থাকলেই ভোগ করা উচিত কিনা? নাকি রাষ্ট্র যে দুর্নীতি, চৌর্যবৃত্তি, লুটপাট কেন্দ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চালু রাখে তার প্রতিবাদ করা উচিত? নবায়নযোগ্য জ্বালানির আলোচনায় এই প্রশ্নগুলো একারনে সঙ্গত যে ন্যায়ের ভিত্তিতে এই রাষ্ট্র চলছেনা। বৈশ্বিক পুঁজিবাদের নিজস্ব নিয়মে চরম বিভেদ তৈরি ও বজায় রাখার মাধ্যমে অল্প কিছু শোষক লুটেরাদের নিয়ন্ত্রণে এই রাষ্ট্র ব্যবস্থা চলছে। এখানে লক্ষণীয়, যে ২৫ ভাগ মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধা ভোগ করছে এবং যারা গ্যাস সংযোগের আওতায় আছে সেটাও মূলত জনগনের বিরাট অংশকে চরমভাবে অবহেলিত ও বঞ্চিত করার মাধ্যমে। কারন কুইক রেন্টাল পদ্ধতিতে বর্তমানে যে দুই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে তার সাথে আগের হিসেব যোগ করলে সরকার বর্তমানে বছরে ৬০ লাখ টন তেল আমদানি করছে। আর তেলে ভর্তুকি কমানোর জন্য বার বার দাম বৃদ্ধি করা হয়েছে। ভর্তুকি দিলে সেটা জনগনের পকেট থেকে যায়, দাম বাড়ালেও সেটা জনগনের পকেট থেকেই যায়। আর গ্যাসের দুঃখে বাংলাদেশের মানুষের কিছুদিন পর কার্যত বঙ্গোপসাগরে ডুবে মরা ছাড়া কোন উপায় নাই। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শেভরনের এক কর্মকর্তার মতে সরকার যদি ভর্তুকি না দিত তাহলে রান্নার জন্য আমরা যে গ্যাস ব্যবহার করি তার বিল আসত মাসে ৫০০০ টাকা। তাহলে ৬ ভাগ মানুষকে গ্যাস দেয়ার জন্য যে ভর্তুকি প্রদান করা হচ্ছে সে টাকাটা আসছে মূলত জনগনের পকেট থেকে। ভর্তুকির এই গল্প মোটামুটি বিভ্রান্তিকর। রাষ্ট্র তার জনগনের সুবিধার জন্য বিভিন্ন মৌলিক চাহিদা বিনা মূল্যে সরবরাহ করবে এবং বিভিন্ন সেবায় ভর্তুকি দিবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু রাষ্ট্র যদি তেল, গ্যাস, বিদ্যুতের ক্ষেত্রে সচেতন ভাবে জনগনের ক্ষতি হয় এমন নীতি গ্রহন করে এবং তাদের পক্ষের অল্প কিছু ব্যবসায়ীদের পকেট ভারী করার জন্য অর্থ লোপাট করাকে ভর্তুকি নাম দেয় তাহলে এই অন্যায় সিদ্ধান্ত গুলোর বিরুদ্ধে জনগনের রুখে দাঁড়ানো উচিত। গত তিরিশ বছর ধরে বহুজাতিক কোম্পানি গুলোর সাথে জনগনের স্বার্থবিরোধী যেসব উৎপাদন অংশীদারিত্ব চুক্তি করা হয়েছে তার মূল্য জনগন দিচ্ছে। শাসক শ্রেণী ও তার লুটেরা গোষ্ঠীর লোলুপতার কারনে আসহায় জনগন পরিণত হয়েছে আন্তর্জাতিক বেশ্যায়। স্বাধীনতার আগে এদেশের সম্পদ লুটেপুটে খেয়েছিল পাকিস্থানি শাসকরা এখন লুটেপুটে খাচ্ছে স্থানীয় শাসক শ্রেণী ও তাদের দালাল ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এবং তাদের সাহায্যে বহুজাতিক কোম্পানি গুলো। নিজের গ্যাস বহুজাতিক কোম্পানির হাতে তুলে দিয়ে আন্তর্জাতিক দামে কিনে এখন বলা হচ্ছে গ্যাসের দাম বাড়ানো ছাড়া উপায় নাই। যদি রাষ্ট্রীয় ভাবে বাপেক্সকে শক্তিশালী করা হত, এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানায় গ্যাসের উৎপাদন ও বণ্টন হত তাহলে একথা নিশ্চিত ভাবে বলা যায় স্বল্পমূল্য গ্যাসের সুবিধাভোগী জনগন হত বর্তমানের পনের থেকে বিশগুণ। সেই একই অবস্থা বিদ্যুতের ক্ষেত্রে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের মৌলিক জ্বালানি গ্যাস, তেল, কয়লা এই তিনটির ক্ষেত্রেই সচেতন ভাবে রাষ্ট্রের নেয়া জনবিরোধী নীতির কারনে বার বার জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি করতে হয়, ফলশ্রুতিতে বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি করতে হয়। জনগনের জীবনযাত্রার ব্যয় ক্রমাগত অসহনীয় থেকে আরও অসহনীয় হতে থাকে। এছাড়াও তেল, গ্যাস, কয়লার স্বল্প মজুদ, এগুলোর মূল্য বৃদ্ধি, এবং এইসব জ্বালানি ব্যবহার করে উৎপাদিত বিদ্যুতের বেশী দাম, পরিবেশগত বিপর্যয় সহ বহুবিধ সমস্যা এমনিতেই আছে। যার সমাধানে নবায়নযোগ্য শক্তি অত্যন্ত ভাল বিকল্প হতে পারে।

বাংলাদেশ তো বটেই সারা পৃথিবীতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মূল উৎস ফসিল ফুয়েল। ফসিল ফুয়েল ব্যবহারের বিভিন্ন দিক এই লিখার পরের অংশে আলোচনা করা হবে কিন্তু বাংলাদেশের জন্য বাড়তি বোঝা হল বাংলাদেশের উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রায় ৯৮ ভাগ ফসিল ফুয়েল থেকে আসে এবং এর পুরো অংশের নিয়ন্ত্রন বিদেশীদের হাতে দুই ভাবে। প্রথমত দালাল – লুটেরা সরকার গুলো ক্রমান্বয়ে দেশের সব গ্যাস ক্ষেত্র ব্লক আকারে ভাগ করে মালটিন্যাশনাল কোম্পানি গুলোর কাছে বরাদ্দ দিয়ে দিয়েছে এবং চুক্তির শর্ত হিসেবে এই গ্যাস আন্তর্জাতিক দামে তাদের কাছ থেকে কিনতে হয়, দ্বিতীয়ত দেশের বিদ্যুতের যে অংশ তেলের মাধ্যমে উৎপাদিত তার সম্পূর্ণটাই বিদেশ থেকে কিনে আনতে হয়। ফলে ভবিষ্যতে শক্তি উৎপাদনের পদ্ধতি, উৎস এবং সম্ভাবনা এবং বিভিন্ন রকম উৎস থেকে শক্তি উৎপাদনের বর্তমান প্রেক্ষাপটের আলচনায় প্রাসঙ্গিক ভাবেই সারা পৃথিবীর কথা চলে আসে। ২০০৯ সালে সারা পৃথিবীতে উৎপাদিত মোট বিদ্যুতের পরিমান ২০,০৫৩ TWh, যা সূর্য থেকে পৃথিবীতে এক ঘণ্টায় যে পরিমান শক্তি (১৭৪,০০০ TWh) আসে তার ১১ ভাগ। ২০১১ সালে উৎপাদনের এই পরিমান ২২,১০০ TWh। যার ৬৭ ভাগ আসে ফসিল ফুয়েল জ্বালানোর মাধ্যমে। বাকি অংশ পারমানবিক শক্তি (১৩%), জলবিদ্যুৎ(১৬%), সৌর, বায়ু(৪%) এরকম বিভিন্ন নবায়নযোগ্য শক্তি থেকে আসে(২)। বৈশ্বিক এই চিত্রের সাথে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের চেহারার বেশ ভাল মিল। বিপিডিবি এর জুন, ২০১২ এর তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে বাংলাদেশের মোট উৎপাদন ক্ষমতা ৮,৭৭৬ মেগাওয়াট, অন্য একটি সুত্র মতে ৮,৩১৫ মেগাওয়াট। যার ৬৭.১১ ভাগ গ্যাস, ২১.৭০ ভাগ ফার্নেস অয়েল, ৬.১৫ ভাগ ডিজেল, ২.৪১ ভাগ কয়লা আর ২.৬৫ ভাগ জলবিদ্যুৎ থেকে উৎপাদিত হয়। অর্থাৎ ৯৭.৩৫ ভাগ বিদ্যুৎ আসছে ফসিল ফুয়েল থেকে(২.১)। দেখাই যাচ্ছে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উৎসগুলোর মধ্যে দুটি ভাগ স্পষ্ট। ফসিল ফুয়েল, পারমানবিক অর্থাৎ অনবায়নযোগ্য এবং নবায়নযোগ্য উৎস। ফসিল ফুয়েল বলতে মূলত কয়লা, গ্যাস, পেট্রলিয়ামজাত তেল কে বুঝানো হয়। বাংলাদেশের মত কোন দেশের প্রায় ৯৮ ভাগ বিদ্যুৎ ফসিল ফুয়েল থেকে আসা কয়েকটা বাস্তব এবং মনস্তাত্ত্বিক অর্থ বহন করে তা হল
• ফসিল ফুয়েলের পুরোটার যোগান দেশ থেকে হয়না। কিনতে হয়।
• দেশ থেকে যতটুকুরই যোগান হয়ে থাকুক তার নিয়ন্ত্রন রাষ্ট্রীয় ভাবে এদেশের হাতে নেই।
• বিশ্বব্যপি ফসিল ফুয়েলের মজুদ সীমিত বলে ফসিল ফুয়েলের উপর নির্ভরশীলতার নিরাপত্তাহীনতা।
• ফসিল ফুয়েল ব্যবহারের পরিবেশগত ক্ষতিকর দিক এবং বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারনে বিশ্বব্যপি যে সচেতনতা সে ব্যপারে রাষ্ট্রীয় ভাবে উদাসীন থাকা।

বিভিন্ন রকম ফসিল ফুয়েল সম্বন্ধে জেনে নেয়া যাক। ফসিল ফুয়েল ব্যবহারের ইতিহাসটা অনেক পুরনো না হলেও যিশুর জন্মের এক হাজার বছর আগে থেকেই চীনে কয়লার ব্যবহার প্রচলিত ছিল। জানা যায় তখনকার সময়ের চীনারা তামার আকরিক থেকে তামা আলাদা করার জন্য কয়লার আগুন ব্যবহার করত(৩)। ইউরোপের কয়লা ব্যবহারের ইতিহাস আরও সাম্প্রতিক। গ্রিক বিজ্ঞানী থিওফ্রাসটাস( খ্রিষ্টপূর্ব ৩৭১- খ্রিষ্টপূর্ব ২৮৭) এর লিখা শিলালিপি থেকে তখনকার সময়ের ভূতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ জানা যায় (৪,৫)
Among the materials that are dug because they are useful, those known as anthrakes [coals] are made of earth, and, once set on fire, they burn like charcoal. They are found in Liguria … and in Elis as one approaches Olympia by the mountain road; and they are used by those who work in metals.
—Theophrastus (ইংরেজিতে অনুবাদিত)

দ্বিতীয় শতাব্দীতে রোমান সাম্রাজ্যের অধিনে ব্রিটেনে কয়লা উত্তোলন শুরু হয়, তখনকার সময়ে কয়লা বাণিজ্য ইউরোপে কেন্দ্রীভূত ছিল এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এর ব্যবহার হত শস্য শুকানোর কাজে(৬)। এর পর মধ্যযুগে ইংল্যান্ডে অল্প পরিমানে কয়লার ব্যবহার বাড়ে। ব্যাপকভাবে কয়লার ব্যবহার শুরু হয় বাস্প ইঞ্জিন আবিষ্কারের মাধ্যমে ইউরোপিয়ান রেনেসার সময়ে। তখন থেকে প্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে কয়লাকে যত ভাবে ব্যবহার করা যায় মানুষ তা করেছে। বর্তমানে সারা বিশ্বে উৎপাদিত বিদ্যুতের ৪১ ভাগ আসে কয়লা পুড়িয়ে। আমেরিকার মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের ৪৬ ভাগ এবং চীনের প্রায় ৭০ ভাগ আসে কয়লা থেকে। বাংলাদেশে দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়ায় কয়লা থেকে ২০০ মেগাওয়াটের একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু আছে।

কয়লার মত তেলের ব্যবহারও সুপ্রাচীন। ৪০০০ বছরেরও বেশী আগে প্রাচীন গ্রীসে দেয়াল এবং ভবন তৈরিতে এসফালট (Asphalt) এর ব্যবহার ছিল। যা বিটুমিন নামেও পরিচিত। ইউফ্রেটিস এর আসেপাশে বসবাসকারীদের স্মৃতি কথা থেকে জানা যায় প্রাচীন পারসিয়ান এলাকায় সমাজের উচ্চ শ্রেণীর মধ্যে পেট্রলিয়ামজাত তেল চিকিৎসা এবং কুপি জ্বালানোর কাজে ব্যবহৃত হত(৭)। আর চীনে ৩৪৭ সালে বাঁশ দিয়ে খনি থেকে তেল উঠিয়ে ব্যবহার করা হত(৮)। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে স্কটিশ বিজ্ঞানী জেমস ইয়াং পেট্রোলিয়াম পরিশোধন করার পদ্ধতি আবিস্কার করলে ব্যাপক ভাবে ইউরোপে এবং উত্তর আমেরিকায় কেরোসিনের ব্যবহার শুরু হয়। কিন্তু আসল ঘটনাটা ঘটে ১৮৫৮ সালে বেলজিয়ান বিজ্ঞানী জিন জে লেনোয়ার আবিষ্কৃত ইন্টারনাল কম্বাসন ইঞ্জিন বাজারে আসার পর। পেট্রোলিয়াম ব্যাপকভাবে পরিবহন এবং ইন্ডাস্ট্রিয়াল কাজে ব্যবহৃত হতে শুরু করল। ২০১১ এর তথ্য অনুযায়ী বিশ্বে উৎপাদিত মোট বিদ্যুতের ৪ ভাগ পেট্রোলিয়াম জাত তেল থেকে আসে। কিন্তু এর বড় ব্যবহারটা মূলত পরিবহনে। বেশির ভাগ নৌ, স্থল এবং আকাশ পথের পরিবহন ব্যবস্থা তেলের উপর নির্ভরশীল। ফসিল ফুয়েল পোড়ানোর জন্য বছরে যে ২১ বিলিয়ন টন কার্বনডাইঅক্সাইড উৎপন্ন হয় তার এক পঞ্চমাংশ আসে পরিবহন খাত থেকে।

প্রাকৃতিক গ্যাস বলে আমরা যা জানি তা খ্রিষ্টপূর্ব ৬০০০ থেকে খ্রিষ্টপূর্ব ২০০০ বছরের মধ্যে ইরানে আবিষ্কৃত হয় বলে বিভিন্ন গ্রন্থে উল্লেখ আছে। অনেক প্রাচীন লেখকদের বর্ণনা থেকে মধ্যপ্রাচ্যে বিশেষ করে আজারবাইজানের বাকু এলাকায় মাটি ফুড়ে গ্যাস বের হবার কথা জানা যায়। খুব সম্ভবত বজ্রপাতের ফলে সেই বের হতে থাকা গ্যাসে আগুন লাগে এবং বহু বছর যাবত জ্বলতে থাকে(৯)। প্রাচীন পারস্যের অগ্নি উপাসকদের শিখা চিরন্তনীর আগুনের উৎস এই গ্যাসই ছিল এমন ভাবাটা খুব বোকামি হবেনা। চীনে খ্রিষ্টের জন্মেরও ৯০০ বছর আগে গ্যাসের ব্যবহার হত। চীনারাই প্রথম (খ্রিষ্টপূর্ব ২১১ সালে) কুপ খনন করে গ্যাস উত্তোলন করে(৯) এবং বাঁশের সাহায্যে সেই গ্যাস দূরে নিয়ে সমুদ্রের পানি ফুটিয়ে পান করার কাজে ব্যবহার করে। গ্যাসের প্রথম বাণিজ্যিক ব্যবহার শুরু হয় ইংল্যান্ডে আঠার শতকের শেষের দিকে। তখন কয়লা থেকে প্রাপ্ত গ্যাস দিয়ে রাস্তা এবং সমুদ্রের বাতিঘর জ্বালিয়ে রাখার কাজ করত তারা। উনিশ শতকের প্রথম দিকে আমেরিকার বালটিমোরে প্রথম প্রক্রিয়াজাতকৃত গ্যাসের সাহায্যে রাতের বেলা রাস্তা আলোকিত করা হয়। উনিশ শতকের পুরো সময় জুড়ে গ্যাস মূলত বাতি জ্বালানোর কাজে ব্যবহৃত হলেও ১৮৮৫ সালে জার্মান বিজ্ঞানী রবার্ট বুনসেনের আবিষ্কৃত বুনসেন বার্নার গ্যাস ব্যবহারের প্রচলিত সমস্ত ধারনাকে ভেঙ্গে একে ইন্ডাস্ট্রিয়াল জ্বালানিতে পরিণত করে। বিংশ শতাব্দী জুড়ে সারা পৃথিবীতে মিলিয়ন মিলিয়ন মাইল পাইপ লাইন টানা হয়েছে গ্যাসকে রান্না, ঘর গরম করা সহ সমস্ত রকম গার্হস্থ কাজে ব্যবহার এবং একই সাথে পরিবহন, শিল্প-কল কারখানা এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে ব্যবহার করার জন্য(১০)। বর্তমানে বিশ্বে মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের ২২ ভাগ এবং সারা বিশ্বে ১৫ মিলিয়নের বেশী পরিবহন গ্যাসের সাহায্যে চলছে।

দ্বিতীয় পর্বের লিংক

জ্বালানী ও বিদ্যুৎ সঙ্কট সমাধানে নবায়নযোগ্য শক্তির সম্ভাবনা- দ্বিতীয় পর্ব

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “জ্বালানী ও বিদ্যুৎ সঙ্কট সমাধানে নবায়নযোগ্য শক্তির সম্ভাবনা- প্রথম পর্ব

  1. আপনি প্রথম পাতায় পর পর পাঁচটি
    আপনি প্রথম পাতায় পর পর পাঁচটি পোস্ট দিয়েছেন, যা ইস্টিশনবিধি-৫ লঙ্ঘন করেছে। দুটি পোস্ট রেখে বাকীগুলো প্রথম পাতা থেকে সরিয়ে দেওয়া হল। পরবর্তিতে ইস্টিশনবিধি মেনে ব্লগিং করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হল।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

94 − = 86