অভিজিৎ হত্যাকান্ডে ‘আল কায়েদা’র দায়। পর্ব- ২


২০১৩ সাল থেকে গত দুই বছরে বিভিন্ন সময়ে আনসারুল্লাহর যে সমস্ত নেতা কর্মী গ্রেফতার হয়েছে এবং তাদের কাছ থেকে প্রাপ্ত যেসব তথ্য গোয়েন্দা সূত্রে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে তাতে অনেক আগেই পরিস্কার হয়েছে যে আনসারুল্লাহ বাংলা টিম মতাদর্শের দিক থেকে আল কায়েদাপন্থী। গত দুই বছরে আল কায়েদার বিভিন্ন আপডেট ও মতাদর্শিক বয়ান তাদের ওয়েবসাইটগুলোতে প্রচারিত হয়েছে। এখানে উল্লেখ করা দরকার যে, আনসারুল্লাহর ওয়েবসাইট বলতে আমি বুঝাচ্ছি কিতালটিউব, দাওয়াহইলাল্লাহ, ইসলামেরআলো ইত্যাদি ওয়েবসাইট। কিন্তু এই সব ওয়েবসাইটকে ‘আনসারুল্লাহ বাংলা টিম’এর ওয়েবসাইট বলার চাইতে বাংলাদেশী আল কায়েদা নেটওয়ার্কের ওয়েবসাইট বলা ভালো। কারন এসব ওয়েবসাইটে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের আলাদা কোন ব্র্যান্ডিং করা হয় নাই। তার বদলে ‘তিতুমীর মিডিয়া’, ‘বালাকোট মিডিয়া’ ইত্যাদি আল কায়েদাপন্থী মিডিয়ার অনলাইন কার্যক্রম চালানোই এসব সাইটের কাজ। এসব মিডিয়া আল কায়েদার আস-সাহাব মিডিয়া ও আল কায়েদাপন্থী অন্যান্য মিডিয়ায় প্রকাশিত খবর, বক্তৃতা ইত্যাদি বাংলায় অনুবাদ করে প্রচার করে থাকে। এসব মিডিয়া থেকে ব্লগারদের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন সময়ে প্রচার চালানো হয়েছে। এসব ওয়েবসাইটের মধ্যে একমাত্র কিতালটিউবেই আনসারুল্লাহ বাংলা টিম-এর নামে আলাদা কিছু প্রচারণা আছে, সেসবও করা হয়েছে পাকিস্তানভিত্তিক আল কায়েদাপন্থী ফোরাম বাব-উল-ইসলামের ব্যানারে। আনসারুল্লাহর সবচাইতে বেশি ব্র্যন্ডিং হয়েছে বাব-উল-ইসলাম নামক সাইটেই, মূলত একটি আল কায়েদাপন্থী মিডিয়া হাউস হিসাবে। এখানে উল্লেখ করা দরকার যে তিতুমীর মিডিয়া এবং বালাকোট মিডিয়া তাদের লোগোতে যে পতাকার ব্যবহার করছে তা আল কায়েদার পতাকা। কিন্তু আনসারুল্লাহ বাংলা টিমএর যে লোগোটি পাওয়া যায় তাতে ব্যবহার করা পতাকাটি আইসিসের। এই পতাকাটি অবশ্য ২০১৩ সালে আইসিস বিখ্যাত হওয়ার আগে থেকেই আনসারুল্লাহর লোগো হিসাবে ব্যবহৃত হতে দেখা গেছে। খুব সম্ভবত ‘ইসলামিক স্টেট ইন ইরাক’ থাকাকালে তাদের পতাকা থেকে ধার করে আনসারুল্লাহ এই পতাকাটি ব্যবহার করেছে। অতীতে আইসিস আল কায়েদার প্রতিদ্বন্দী ছিল না বরং ইরাকি আল কায়েদা হিসাবেই অধিক পরিচিত ছিল তখন। এসব ওয়েবসাইটে ‘কেনো আমি আল কায়েদাহ কে বাছাই করলাম’ নামে তামিম আল আদনানীর একটি অডিও বক্তৃতা সাম্প্রতিক সময় বারবার প্রচার করা হচ্ছে। এই শিরনামের ব্যানারটিই অভিজিৎ হত্যাকান্ডের প্রথম দায় স্বীকার কারি টুইটার পেজ ‘আনসার বাংলা -৭’ এর ব্যানার হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছিল।

সমস্যা হলো বাংলাদেশের পুলিশ প্রশাসন অভিজিৎ হত্যার পর থেকে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমকে বাংলাদেশের সকল জঙ্গী সংগঠনের আমব্রেলা প্লাটফর্ম হিসাবে প্রচার করে আসছে। বাস্তবে হয়তো বাংলাদেশের বর্তমান আল কায়েদা নেটওয়ার্কের একটা প্রকাশ্য উইং হচ্ছে আনসারুল্লাহ। যে বিষয়টা খেয়াল করা দরকার তা হলো বাংলাদেশে অতীতে জেএমবি কিংবা জাগ্রত মুসলিম জনতার মত আল কায়েদাপন্থী সংগঠনগুলোর যেরকম ব্র্যান্ডিং করা হয়েছে আনসারুল্লাহর ক্ষেত্রে সেটা হয় নাই। আনসারুল্লাহর ব্র্যান্ডিং বরং করেছে বেশি পুলিশ প্রশাসন। অন্যদিকে আনসারুল্লাহর নামে পরিচিত প্রচারমাধ্যমগুলোতে ব্র্যান্ডিং করা হয়েছে আল কায়েদার, এবং সাম্প্রতিক সময় আকিসের। সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত আমরা আনসারুল্লাহ ও বাংলাদেশের বর্তমান জঙ্গি সংগঠনগুলোর ব্যাপারে যা কিছু জানতে পেরেছি তা অসংলগ্ন এবং দূর্বদ্ধ। আনসারুল্লাহর নেতা হিসাবে প্রথম যার নাম আসে তিনি হলেন মুফতি জসিম উদ্দীন রহমানী। এরপর যার নাম আসে তিনি রেদওয়ানুল আজাদ রানা, আরেকজন হলেন ইজাজ হোসেইন। ২০১৩ সালের আগস্ট মাসে জসিম উদ্দীন রহমানীকে গ্রেফতার করা হয়। এরপর তার সম্বন্ধে যেসব তথ্য পাওয়া গেছে, –
১। জসিম উদ্দীন রহমানী আনসারুল্লাহ বাংলা টিমএর নেতা/ তাত্ত্বিক নেতা।
২। তিনি আনওয়ার আল অওলাকির অনুসারী। অওলাকির মতোই ইন্টারনেট ব্যবহার করে জঙ্গীবাদের অনুপ্রেরণা ও রিক্রুটমেন্ট এর কাজে পারদর্শি ছিলেন। ইউটিউবে ও বিভিন্ন ওয়েবসাইটে তার ওয়াজ ও বক্তৃতার অডিও ভিডিও পাওয়া যায়। ইউটিউবের ব্যবহার করেছেন দক্ষভাবে। বাংলাদেশের আল কায়েদাপন্থী ওয়েবসাইটগুলো যাদের বক্তৃতা প্রচার করে তাদের মধ্যে অওলাকি, তামিম আল আদনানীর পাশাপাশি জসিম উদ্দীন রহমানী অন্যতম।
৩। ২০০৪ সাল থেকে রিসার্চ সেন্টার ফর ইউনিটি এন্ড ডেভেলপমেন্ট নামের একটি এনজিও আউটফিট ব্যবহার করে বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের নামে তিনি জঙ্গী রিক্রুটমেন্ট ও প্রশিক্ষন দেয়া শুরু করেন। এই সংগঠনের মাধ্যমে কয়েক হাজার বাংলাদেশী ইয়েমেন, পাকিস্তান, আফগানিস্তানে গেছে ট্রেনিং ও যুদ্ধে যোগ দেয়ার জন্যে।
৪। পুলিশি নজরদারীর কারনে এনজিও বন্ধ করে দিয়ে রহমানী পালিয়ে যান এবং জেএমবি পুনর্গঠনের কাজ শুরু করেন।
৫। জিজ্ঞাসাবাদে জসিম উদ্দীন রহমানী স্বীকার করেছেন যে তিনি আল কায়েদার সহযোগিতায় আনসারুল্লাহ বাংলা টিম গঠন করেছেন এবং তার লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশে আল কায়েদা নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা।
/ALTERNATES/w620/answerullah.jpg” width=”550″ />
ছবিঃ জসিম উদ্দীন রহমানী

ভিন্ন খবরে আমরা জানি, রহমানীর গ্রেফতারের পরে আনসারুল্লাহ বাংলা টিম-এর নেতৃত্ব গ্রহণ করেছে পলাতক খুনি রেদওয়ানুল আজাদ রানা। মিডিয়াতে গোয়েন্দা সূত্রে এমনো বলা হয়েছে যে রানা হলো রাজীব হত্যাকান্ডের দুই মাস্টারমাইন্ডের একজন। রাজীব হত্যার পর থেকেই সে পলাতক। সর্বশেষ গোয়েন্দা পুলিশ সূত্রে বলা হয়েছে অভিজিৎ হত্যাকান্ডের পেছনেও মূল নায়ক রানা। এমনকি ওয়াশিকুর হত্যাকান্ডের নির্দেশদাতা মাসুমই রানা এমন খবরও বের হয়েছে (প্রথম পর্ব)। আবার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, অভিজিৎ হত্যাকান্ডের দুই সপ্তাহ পরেই নাকি রানা অস্ট্রেলিয়া চলে গেছে। কিন্তু হত্যাকান্ডের দুই সপ্তাহ অতিক্রম হয়ে যাওয়ার পরে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ রানাকে ধরিয়ে দেয়ার জন্যে পুরস্কার ঘোষনা করে বিজ্ঞপ্তী জারি করে। ওয়াশিকুর বাবুর হত্যাকান্ড হয়েছে অভিজিৎ রায় হত্যাকান্ডের এক মাসের বেশি সময় পরে। তার মানে অভিজিৎ হত্যার দুই সপ্তাহের মধ্যে রানা দেশ ছেড়ে থাকলে ওয়াশিকুর হত্যার নির্দেশদাতা মাসুম একজন ভিন্ন ব্যক্তি। সব মিলিয়ে গোয়েন্দা পুলিশের বরাতে যেসব খবর আমরা মিডিয়াতে পেয়েছি তাতে এমন কিছু অসঙ্গতি রয়েছে। কিছুদিন আগে একটি খবরে এমনো দাবি করা হয় যে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমএর বর্তমান নেতা তামিম আল আদনানী, যিনি আল কায়েদার একজন নেতা ছিলেন এবং নব্বই দশকের শুরুতেই মারা গেছেন। এটা পুলিশ প্রশাসনের বরাতে আসা অসংলগ্ন তথ্যের আরেকটি উদাহরণ। কিন্তু সবচাইতে বড় প্রশ্ন যা তা হলো, রাজীব হত্যাকান্ডের পর দুই বছর পাড় হয়ে গেছে পুলিশ রানাকে গ্রেফতার করতে পারে নাই, এবং অভিজিৎকে হত্যা করার পরও সে অন্তত আরো ১৫দিন বাংলাদেশে ছিল। মাঝখানের দুই বছরেও আনসারুল্লাহর নেতৃত্বে আরো কিছু হত্যাকান্ড ঘটেছে বলে পুলিশের বরাতে আমরা জানতে পেরেছি, যেমন বুয়েটের দ্বীপ ও মাওলানা ফারুকি। এইসব কিছু পুলিশ প্রশাসনের চরম অবহেলা অথবা অযোগ্যতা অথবা এই দুইটাই নির্দেশ করছে।


আনসারুল্লাহর অপর যে নেতার নাম পাওয়ায় যায় তিনি ইজাজ হোসেইন। মুফতি জসিম উদ্দীন রহমানীর মাধ্যমে যারা পাকিস্তানে ট্রেনিং নিতে গেছে ইজাজ হোসেইন তাদের মধ্যে একজন। তার ভাই নাইমও আনসারুল্লাহর সদস্য এবং ২০১৪ সালে তাকে গ্রেফতার হয়। নাইমের মাধ্যমেই জানা যায় যে ইজাজ আনসারুল্লাহর অপারেশন কমান্ডার। এসময় পুলিশ নতুন করে জানায় যে, জসিম উদ্দীন রহমানীকে অতীতে আনসারুল্লাহর নেতা মনে করা হলেও সে আসলে আনসারুল্লাহ পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট সুরার এক সদস্য মাত্র এবং ইজাজ হোসেইন বর্তমানে সংগঠনটির আমির। ইজাজ পাকিস্তানে থাকে, কিন্তু বাংলাদেশে বছরে দুইবার আসে। নাইমের বক্তব্য অনুসারে তার ভাইয়ের সাথে আল কায়েদার যোগাযোগ আছে। পাকিস্তান থেকেই সে আল কায়েদাপন্থী এই ওয়েবসাইটগুলো চালায়। মূলত পাকিস্তানভিত্তিক হওয়ার কারনেই আনসারুল্লাহর অনেক সদস্য গ্রেফতার হওয়ার পরও, বিশেষ করে মিডিয়া হেড বলে পরিচিত মোরশেদ গ্রেফতার হওয়ার পরও তিতুমীর মিডিয়া ও বালাকোট মিডিয়ার নামে এসব ওয়েবসাইটগুলো নিয়মিত আপডেট হচ্ছে। অনলাইনকেন্দ্রীক জঙ্গী প্রচারণা ও রিক্রুটমেন্ট বন্ধ করা অথবা এইধরণের কার্যক্রমের ডকুমেন্টেশন করার ক্ষেত্রেও পুলিশ প্রশাসন ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে।

গত এক দশক ধরেই আন্তর্জাতিক ইসলামিস্ট জঙ্গীবাদী সংগঠনগুলো ইন্টারনেট কেন্দ্র করেই যোগাযোগ, প্রচার প্রচারণা এবং রিক্রুটমেন্টের কাজ চালিয়ে আসছে। আল কায়েদা নেতা আনওয়ার আল অওলাকি ইন্টারনেটভিত্তিক জঙ্গীবাদের প্রধান নেতা ছিলেন। অনারব ও ইংরেজি জানা মুসলমানদের মাঝে জঙ্গীবাদ প্রচারে তার ভুমিকা সবচাইতে বেশি। বাংলাদেশে অওলাকির অনুসারী জসিম উদ্দীন রহমানী একি কায়দায় জঙ্গীবাদ বিস্তারে কাজ করেছেন। গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে জঙ্গীবাদী ইসলামের প্রচার ও রিক্রুটমেন্টের কাজ অনলাইন কেন্দ্র করেই প্রধানত সংগঠিত হয়েছে। কিন্তু জঙ্গীবাদীদের এইসব তৎপরতা সম্বন্ধেও পুলিশ প্রশাসন অনেক আগে থেকেই অবহিত ছিল বলে আমরা জানি। ২০১১ সালের মার্চ মাসে জেএমবির প্রোপাগান্ডা প্রধান আবদুল গনি, রিক্রুটমেন্ট এবং ট্রেইনিংএর কো-অর্ডিনেটর আবু হুরাইরা ওরফে শামস এবং ট্রেইনিনগ কো-অর্ডিনেটর আশরাফুজ্জামানকে গ্রেফতার করে। এসময় তাদের কাছে বিশটি ল্যাপটপ ছিল। আবু হুরাইরা ওরফে শামসের বক্তব্য অনুযায়ি সে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে হিজবুত তাহরিরের আইটি এক্সপার্টদের সাথে কাজ করছিল অনলাইনের মাধ্যমে নতুন সদস্য রিক্রুট করার উদ্দেশ্যে। এরপর বিগত চার বছরে পরিস্থিতি ক্রমাগত খারাপই হয়েছে, পুলিশ প্রশাসন পরিস্থিতির উপর কোন নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয় নাই।

এখানে উল্লেখ্য যে, হিজবুত তাহরির নিষিদ্ধ হয় ২০০৯ সালে। নিষিদ্ধ হওয়ার পরও তারা সেনাবাহিনীর মধ্যে অভ্যুত্থান করার চেষ্টা করেছিল বলে খবরে প্রকাশিত হয়েছিল। হিজবুত তাহরির মূলত প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল। নিষিদ্ধ হিজবুত তাহরিরের অপেক্ষাকৃত কট্টরপন্থী কর্মীরা নিষিদ্ধ ঘোষিত জেএমবির আন্ডারগ্রাউন্ডের সাথে নিজেদেরকে যুক্ত করে থাকতে পারে। পুলিশের দেয়া তথ্যও এই ধরণের যোগাযোগের কথাই বলছে। ওয়াশিকুর হত্যাকান্ডে অংশ নেয়া দুইজন গ্রেফতার হওয়ার পর পুলিশ আমাদের জানিয়েছিল তারা আনসারুল্লাহ বাংলা টিম-এর স্লিপার সেলএর সদস্য। আটক হওয়া আরিফুল অতীতে জেএমবির সদস্য ছিল, পুলিশ এমন তথ্যও দিয়েছে যে এই হত্যাকান্ড ছিল আনসারুল্লাহ ও জেএমবির যৌথ প্রযোজনা। সব মিলিয়ে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনগুলো আন্ডারগ্রাউন্ডে নতুন নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে বলে আমরা ধারণা করতে পারি, সেইক্ষেত্রে আনসারুল্লাহ এই আন্ডারগ্রাউন্ড নেটওয়ার্কের একটি প্রকাশিত অংশ। আর আনসারুল্লাহ ও তৎসংশ্লিষ্ট তিতুমীর মিডিয়া, বালাকোট মিডিয়া ইত্যাদির প্রচার প্রচারণা থেকে বুঝা যায় যে তারা বাংলাদেশে তারা আল কায়েদা নেটওয়ার্কের প্রকাশিত রূপ। এসব মিডিয়া থেকে অতীতে আল কায়েদার এবং বর্তমানে আলাদাভাবে আকিসের ব্র্যান্ডিংও করা হচ্ছে।

সুতরাং যাহাই আনসারুল্লাহ, তাহাই আল কায়েদা বললে ভুল হবে কি? এই প্রশ্নের উত্তর আমরা পুলিশ প্রশাসনের কাছে রাখতে চাই। এতোদিন ধরে আনসারুল্লাহ সহ অন্যান্য জঙ্গীদের সাথে আল কায়েদার ঘনিষ্ঠতার কথা জানিয়ে আসা সত্ত্বেও বর্তমানে পুলিশ প্রশাসন এবং প্রতিমন্ত্রী ঠিক কি কারনে বাংলাদেশে আল কায়েদার কোন অস্তিত্ব, নেটওয়ার্ক বা সদস্য আদৌ আছে কি না সেই বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করছেন তা আমরা জানি না।

আগের পর্বেই উল্লেখ করেছি, সারা দুনিয়াতেই বর্তমানে আইসিসের উত্থানে ব্যাকফুটে চলে গেছে আল কায়েদা। এই অবস্থায় ভারতিয় উপমহাদেশে নিজেদের অবস্থান পোক্ত জানান দেয়ার জন্যে ব্লগার হত্যা অথবা হত্যার দায় স্বীকার করাও তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। বিগত চার দলীয় জোট সরকার এবং পরবর্তিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে বাংলাদেশের জঙ্গীবাদ দমনে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর ভুমিকা ছিল প্রশংসার দাবিদার। কিন্তু বর্তমানে সন্ত্রসীদের হাতে নাস্তিক ব্লগারদের হত্যাকান্ড ঠেকাতে পুলিশ চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। আটককৃতদের দ্রুত বিচারের মুখোমুখি করে উদাহরণ সৃষ্টির ক্ষেত্রেও বর্তমান সরকার চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। নিহত কয়েকজনের নাস্তিক পরিচয়ের কারনে সরকার ঢিলেঢালা ভুমিকা পালন করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এই অভিযোগের কারন আছে। রাজিব খুনিদের জামিন দেয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে। নাস্তিক হত্যার পক্ষে বর্তমান সরকারের আমলে যে সামাজিক ও রাজনৈতিক বৈধতা প্রদানের চেষ্টা হয়েছে বা হত্যাকারীদের ছাড় দেয়ার চেষ্টা হয়েছে তা অস্বীকার করার উপায় নাই। আর তার সুযোগ নিয়েই আরো হত্যাকান্ড ঘটেছে। জেএমবি শির্ষ নেতাদের গ্রেফতারের পর দ্রুততম সময়ে ফাঁসিতে ঝুলানো হয়েছিল। অথচ বাংলাদেশের ব্লগার হত্যাকারী, আল কায়েদাপন্থী জঙ্গী নেতা কর্মীদের বিচার কাজের অগ্রগতি এখন পর্যন্ত যৎসামান্য। রানা বা ইজাজরা তো গ্রেফতারই হন নাই, যারা গ্রেফতার হয়েছেন তাদের বিচার কবে হবে বলা মুশকিল। একদিকে বাংলাদেশের বর্তমান জঙ্গী নেটওয়ার্ক সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট ও সঠিক তথ্য জানাতে যেমন পুলিশ প্রশাসন ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে আরেকদিকে আগে থেকে তথ্য জানা থাকা সত্ত্বেও সন্ত্রাসী তৎপরতা ঠেকাতে তারা ব্যর্থ হয়েছে।

আসিম উমর যেইদিন অভিজিৎ হত্যাকান্ডের দায় স্বীকার করে ঘোষনা দিয়েছেন, সেই দিনই মধ্যপ্রাচ্যের আরেকজন আল কায়েদা মুখপাত্র ফ্রান্সের শার্লি এবদুর অফিসে হামলার ঘটনায় আল কায়েদার দায় স্বীকার করেছে। এখানে বলে রাখা ভালো যে আসিম উমর হুজির নেতা ছিলেন। বাংলাদেশে একসময় শক্তিশালী হুজি নেটওয়ার্ক ছিল। আসিম উমর যেহেতু দায় নিচ্ছে তাই বাংলাদেশের পুরনো হুজি সদস্যদের সাথে তার যোগাযোগ থাকা এবং এই সদস্যরাও বর্তমানে বাংলাদেশের আল কায়েদা নেটওয়ার্কের অংশ হওয়া অস্বাভাবিক নয়। পতনশীল আল কায়েদা এখন ব্লগার ও কার্টুনিস্ট খুনের মাধ্যমে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। বাংলাদেশের নাস্তিক ব্লগাররা স্বাভাবিক ভাবেই পরিণত হয়েছে সবচাইতে সহজ টার্গেটে। আর কিছুদিন পরে হয়তো আল কায়েদার সাথে প্রতিযোগীতা করতে বাংলাদেশে আইসিস নেটওয়ার্কের কর্মীরা নাস্তিক ব্লগার হত্যা করা শুরু করবে।

তথ্যসূত্রঃ
No al-Qaeda existence in Bangladesh’, Dhaka Tribune, May 4, 2015
Al-Qaeda network in Bangladesh!, DailySun

আনসারুল্লাহর লক্ষ্য ‘আল কায়দা’ নেটওয়ার্ক গড়া, সমকাল, ১৪ আগস্ট ২০১৩
DB: Mastermind of Avijit-Rajeeb killing fled the country april 3, 2015
আনসারুল্লাহর ‘তালিকায়’ মন্ত্রীসহ ১২ জনের নাম, বিডিনিউজ২৪ডটকম, ১৪ আগস্ট ২০১৩
RAB Arrests 4 Suspected JMB Operatives in City, New Age, April 1, 2011

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “অভিজিৎ হত্যাকান্ডে ‘আল কায়েদা’র দায়। পর্ব- ২

  1. সাম্প্রতিক বছরগুলোতে
    সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আল-কায়দা, আইসিসসের বিস্তার মারাত্নকভাবে বেড়েছে। তার কারনগুলোর মধ্যে একটি হতে পারে- তারা বুঝতে পেরেছে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়ার মত পরাশক্তিগুলোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে টিকে থাকা যায়।জনবল বা ফ্র্যাঞ্চাইসির অভাব হয় না। কার্যত সি- আই- এ , এফ -বি -আই আল-কায়দাকে সামলাতে ব্যর্থ হয়েছে। তাছাড়া ছড়িয়ে পরা আল-কায়দা , আইসিস কে সামলানোর জন্য যে অর্থনৈতিক শক্তির দরকার , সেটা এখন আসলে যুক্তরাষ্ট্রের নেই।

    সারা পৃথিবীতে অর্থনৈতিক মন্দা , কমতি তেলের দাম আর রাশিয়া বনাম যুক্তরাষ্ট্রের স্নায়ূ যুদ্ধ – এ সব কিছুই এখন এর আল-কায়দা আর আইসিসের মত জিহাদী দলগুলোর বিরুদ্ধে বড় ধরনের যুদ্ধ পরিচালনা করার অনুকূলে নয়। এসব তথ্য আল-কায়দা খুব ভাল ভাবেই যানে।তাই তারা সারা পৃথিবীতে চারন ভূমি খুজে ফিরছে।

    আমি বাংলাদেশ নিয়ে শংকিত। কারন বাংলাদেশের মত দূর্বল অর্থনিতীর দেশ , নখ-দন্তহীন গোয়েন্দা আর পুলিশের পক্ষে কোনদিনই আল কায়দাকে সামলাতে পারা সম্ভব নয়। তাছাড়া এদেশে প্রচুর আল-কায়দা সমর্থক আছে।

    জানিনা অল-রেডি আল- কায়দার হিট লিস্টে নামটা উঠে গেছে কিনা। মালেশিয়ার সেকেন্ড হোমের জন্য এপ্লাই করেছি। বউ বাচ্চা নিয়ে দ্রুত বাংলাদেশ থেকে সটকে পড়তে হবে……….

  2. অভিজিৎ হত্যাকান্ডের সঙ্গে
    অভিজিৎ হত্যাকান্ডের সঙ্গে এফবিআইয়ের যোগসূত্র তৈরি হবার পরই বুঝেছিলাম, এখানে আল কায়েদা বা তেহরিক-ই-তালেবান যুক্ত হতে খুব বেশি দেরি নেই।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 3 = 5