জ্বালানী ও বিদ্যুৎ সঙ্কট সমাধানে নবায়নযোগ্য শক্তির সম্ভাবনা- শেষ পর্ব

পূর্বের পর্ব

সোলার পাওয়ার বা সৌর শক্তি
পৃথিবী নামক এই গ্রহের জন্ম থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত যত ধরনের বিকাশ, বিবর্তন, অগ্রগতি, ধ্বংস সব কিছুর জন্য দায়ী এক অদ্বিতীয় ভাবে সূর্য। প্রান ধারন করার জন্য, কাজ করার জন্য, বিনিময়, অর্থনৈতিক, সামাজিক বিভিন্ন প্রক্রিয়া চালু রাখার জন্য শক্তি ব্যবহার করা লাগে। শক্তি ব্যবহারের যতগুলো রূপ আছে (আলো, তাপ, শব্দ, চৌম্বক, যান্ত্রিক, বিদ্যুৎ, রাসায়নিক) তার প্রায় সবই তাপ উৎপাদনের সাথে সম্পর্কিত। আর পৃথিবীতে তাপের একমাত্র উৎস হল সূর্য। এক অর্থে মানুষ যে সৌর শক্তির ব্যবহার করছে তার সবচেয়ে বড় প্রমান হল মানুষ বেঁচে আছে। কিন্তু পুরো মানবজাতি সৌর শক্তিকে যতভাবে ব্যবহার করতে পারতো তার খুব ক্ষুদ্রতম অংশও করছেনা। সূর্য ছাড়া মানুষ তাপের নিয়ন্ত্রন হাতে পায় আগুন জ্বালাতে শিখার পর। আগুন জ্বালাতে শিখে যাবার পর তা দিয়ে নিজেদের গরম রাখা, কাঁচা খাবার পুড়িয়ে খাওয়া, বন্য পশুদের ভয় দেখিয়ে দূরে রাখা সহ অনেক রকমের কাজ করতে শুরু করে মানুষ। এক সময় আগুন মানুষের উপাসনার বস্তুতে পরিণত হয়। সভ্যতার অগ্রগতির সাথে সাথে প্রযুক্তি উন্নত হয়েছে। শুরুতে সূর্যের তাপের উপর নির্ভরশীল থাকলেও ক্রমান্বয়ে বনবাদাড়ের আগুন, পরে মানুষ আগুন জ্বালানো শিখার পর শুকনো গাছ, কাঠ ব্যবহার করে আগুন জ্বালিয়ে তাপ উৎপাদন করত। কিন্তু বিদ্যুৎ ব্যবহার উপযোগী প্রযুক্তি আবিষ্কার হবার পর মানুষ এই শক্তিকে বিভিন্ন রকমে ব্যবহার করতে শুরু করে। বিভিন্ন রকম শক্তিকে বিদ্যুৎ শক্তিতে রূপান্তর এবং সেই বিদ্যুৎ শক্তিকে আবার বিভিন্ন শক্তিতে রূপান্তর করতে পারার সুবিধার কারনে শক্তি ব্যবহারের ধরন হিসেবে বিদ্যুৎ খুব দ্রুত সভ্যতার উন্নয়ন এবং পরিবর্তনের নিয়ামক হয়ে উঠেছে। বর্তমানে তাপ কে মূল শক্তি হিসেবে পুঁজি করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয় বটে, আগে বর্ণনা করা পদ্ধতিগুলো আমাদের কিছু ভিন্ন ধারনাও দেয় এবং গ্রাহক পর্যায়ে উৎপাদিত বিদ্যুৎকে ব্যবহার করে তাপ উৎপাদন সহ করা হচ্ছেনা এমন কাজ খুঁজে বের করা মুশকিল। সুতরাং বিদ্যুৎ আমাদের লাগবে। তা হোক জীবনের মান উন্নয়নের জন্য কিংবা কলকারখানার উৎপাদনশীলতা বজায় রাখা, বৃদ্ধি করা কিংবা ক্রমবর্ধিত নগরায়নের জন্য। আলোচনার এই অংশটি সৌর শক্তি নিয়ে। সৌর শক্তির ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করাটা নতুন কিছু নয়। দেশের অনেকাংশের মানুষই সোলার হোম সিস্টেম ব্যবহার করছেন বা করতে দেখেছেন। সোলার পাওয়ারের সাহায্যে বাতি, ফ্যান, টেলিভিশন, ফ্রিজ থেকে শুরু করে মোটর চালিয়ে পানি তোলার কাজ করা যাচ্ছে অনায়াসেই। প্রযুক্তিটি মোটামুটি পরিচিত। সে কারনে পদ্ধতিগত বর্ণনা বাদ দিয়ে এর ব্যবহারগত ও সম্ভাবনার দিক আলোচনা করা যাক। সোলার সেলের সাহায্যে ঘড়ি, ক্যালকুলেটর, খেলনা চালায়নি এমন মানুষ এই প্রজন্মে খুঁজে পাওয়া মুশকিল হবে। দিনে দিনে সৌর শক্তি ব্যবহারের বিভিন্ন ধরন এবং নানান প্রযুক্তির আগমনের ফলে এর ব্যবহারের ক্ষেত্র ক্রমেই বেড়ে চলেছে। বর্তমানে উড়োজাহাজ, ভু-উপগ্রহ, সামুদ্রিক প্রমোদতরী, রেসিং কার থেকে শুরু করে গার্হস্থ সমস্ত প্রয়োজনে যে বিদ্যুৎ, তাপ অথবা যান্ত্রিক শক্তি দরকার তা সৌরশক্তির সাহায্যে উৎপাদন করা যাচ্ছে। সৌর শক্তিকে বিদ্যুৎ শক্তিতে রূপান্তরের যান্ত্রিক দক্ষতা বৃদ্ধি পেলে বাণিজ্যিক ভাবে তো বটেই শিল্প কল-কারখানার বিপুল পরিমান উৎপাদন সৌরশক্তি নির্ভর হয়ে পড়াটা সময়ের ব্যপার। এককভাবে সৌর শক্তি পৃথিবীর তাবৎ বিদ্যুৎ শক্তির চাহিদা মেটাতে পারে। কারন শুধু মাত্র এক বছরে যে পরিমান সৌরশক্তি পৃথিবীতে আসে তা দিয়ে সারা পৃথিবীর বর্তমান চাহিদা অনুযায়ী ৮০০০ বছর চলবে। সেটা পুজিবাদি অর্থনীতির যে বিশ্বব্যবস্থা তার প্রয়োজনের অতিরিক্ত উৎপাদন এবং ভোগের হিসেবকে বিবেচনা করেই। যদি বিশ্বব্যপি এই প্রয়োজনহীন অতি উৎপাদনশীলতা এবং ভোগ না থাকে তাহলে এই ৮০০০ বছর নিশ্চিতভাবেই ১১০০০ থেকে ১২০০০ বছরে গিয়ে ঠেকবে। ১৯৯৮ সালের উৎপাদন এবং ভোগ আমাদের যে পরিমান বিদ্যুৎ খরচ করায় তার হিসেবেই সূর্য থেকে পৃথিবীতে আসা এক বছরের সৌরশক্তি দিয়ে ১১০০০ বছর চলা সম্ভব(৭২)।
সারা পৃথিবীতে প্রতি বর্গমিটারে গড়ে ১০৬৫ ওয়াটের সমপরিমান সৌরশক্তি আসে। আর বর্তমানে ২০% যান্ত্রিক দক্ষতার সোলার প্যানেল বাজারে পাওয়া যায়। এই দুটি তথ্যই বাংলাদেশে সৌরশক্তির সম্ভাবনা বুঝতে সাহায্য করবে। বাংলাদেশ ২০.৩০ থেকে ২৬.৩৮ ডিগ্রী উত্তর অক্ষাংশ এবং ৮৮.০৪ থেকে ৯২.৪৪ ডিগ্রী পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অবস্থিত। যা সৌরশক্তি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করার জন্য অত্যন্ত সুবিধাজনক ভৌগলিক অবস্থান। সৌরশক্তি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য কিছু কিছু ব্যাপার খুব গুরুত্বপূর্ণ। যেমন প্রতি বর্গমিটারে কি পরিমান সৌরশক্তি আসে এবং বছরে কত দিন নিশ্চিতভাবে এই শক্তি পাওয়া যায়, আকাশ কি পরিমান পরিস্কার থাকে এবং দিনের উজ্জ্বল অংশের গড় দৈর্ঘ্য কত। এখানে বছরে ৩০০ দিন প্রতি বর্গমিটারে গড়ে ৩৫০০ থেকে ৬৫০০ ওয়াটের সমপরিমান সৌর শক্তি আসে। ক্লিয়ারিং ইনডেক্স বা দিনেরবেলা আকাশ কতটা পরিষ্কার থাকে তাকে ০ থেকে ১ এর মধ্যে সুচক দ্বারা প্রকাশ করা হয়। সেই ক্লিয়ারিং ইনডেক্স অল্প কিছু দিন বাদ দিয়ে বছরের বেশিরভাগ সময় ০.৫০ থেকে শুরু করে এর উপরে থাকে। কার্যকর দিনের দৈর্ঘ্য জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত একটু কম থাকে কিন্তু সেটাও যথেষ্ট।
দেশের তিনটি স্থানের সূর্যরশ্মির বিকিরণ(কি.ওয়াট- ঘণ্টা/ব.মি)
মাস ঢাকা রাজশাহী সন্দীপ
জানুয়ারি ৪.৩৬ ৪.৩২ ৪.৪২
ফেব্রুয়ারি ৪.৯২ ৫.২৫ ৪.৯৮
মার্চ ৫.৫৯ ৫.৯৫ ৫.৪৪
এপ্রিল ৫.৭৬ ৬.৩৩ ৫.৫১
মে ৫.৩০ ৫.৭৪ ৫.১১
জুন ৪.৫৩ ৫.০৪ ৪.১৬
জুলাই ৪.২৩ ৪.৪১ ৪.০৪
অগাস্ট ৪.২৯ ৪.৩৬ ৪.১৮
সেপ্টেম্বর ৪.০২ ৪.০৩ ৪.০১
অক্টোবর ৪.৩২ ৪.৪২ ৪.২৮
নভেম্বর ৪.২৮ ৪.৪৬ ৪.২৫
ডিসেম্বর ৪.২১ ৪.২১ ৪.৫৫

সুত্রঃ বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর, নাসা সারফেস মেটেরিওলজি এবং এস এস ই ডাটাবেজ।

উপরে তিনটি স্থানের সূর্য রশ্মির বিকিরনের পরিমান এবং গড় কার্যকর দিনের দৈর্ঘ্য দেখানো হল যা প্রকারান্তরে সারা দেশের প্রতিনিধিত্ব করে। এই তিনটি স্থানের কার্যকর দিনের দৈর্ঘ্য, পরিস্কার আকাশ থাকার সম্ভাবনা, বিকিরনের পরিমান বিশ্লেষণ করলে একথা পরিস্কার বোঝা যায় যে বাংলাদেশ প্রাকৃতিক ভাবে সৌরশক্তি উৎপাদন ও ব্যবহারের জন্য পৃথিবীর অন্য অনেক দেশ থেকে সুবিধাজনক স্থানে আছে। তুলনা করার জন্য পুরো জার্মানির সৌর বিকিরন ও গড় কার্যকর দিনের দৈর্ঘ্য দেয়া হল(৭৭)।
জার্মানির সূর্যরশ্মির বিকিরণ(কি.ওয়াট- ঘণ্টা/ব.মি) ও কার্যকর দিনের দৈর্ঘ্য
স্থান সূর্যরশ্মির বিকিরণ(কি.ওয়াট- ঘণ্টা/ব.মি) কার্যকর দিনের দৈর্ঘ্য (ঘণ্টা)
ষ্টুটগার্ট ৩.০৯-৩.৪০ ৪.৯৩-৫.২০
নুরেমবার্গ ২.৯০-৩.০৯ ৪.৬৫-৪.৯৩
হামবুর্গ ২.৯০-৩.০৯ ৪.৬৫-৪.৯৩
বার্লিন ২.৯০-৩.০৯ ৪.৬৫-৪.৯৩
ড্রেসডেন ২.৭৪-২.৯০ ৪.৩৮-৪.৬৫
হ্যানোভার ২.৭৪-২.৯০ ৪.৩৮-৪.৬৫
ফ্রেইবার্গ ২.৭৪-২.৯০ ৪.৩৮-৪.৬৫
ফ্রাঙ্কফুট ২.৭৪-২.৯০ ৪.৩৮-৪.৬৫
মিউনিখ ২.৫৫-২.৭৪ ৪.১১-৪.৩৮
ডর্টমুণ্ড ২.৫৫-২.৭৪ ৪.১১-৪.৩৮
এসেন ২.৫৫-২.৭৪ ৪.১১-৪.৩৮
ডুইসবার্গ ২.৫৫-২.৭৪ ৪.১১-৪.৩৮
ডুসেলডর্ফ ২.৫৫-২.৭৪ ৪.১১-৪.৩৮
ওলডেনবার্গ ২.৪০-২.৫৫ ৩.৮৩-৪.১১
ওসনাব্রুক ২.৪০-২.৫৫ ৩.৮৩-৪.১১
কোলন্ ২.১৪-২.৪০ ৩.৫৬-৩.৮৩

ষ্টুটগার্ট, নুরেমবার্গ, ফ্রেইবার্গ, মিউনিখ, ফ্রাঙ্কফুট, ওলডেনবার্গ, হামবুর্গ, ড্রেসডেন, বার্লিন, ডর্টমুণ্ড, এসেন, ডুইসবার্গ, ডুসেলডর্ফ, হ্যানোভার, ওসনাব্রুক, কোলন্ এই জায়গাগুলো পুরো জার্মানির প্রতিনিধিত্ব করে। দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশের সর্বনিন্ম সৌর বিকিরণ জার্মানির সর্বোচ্চ সৌর বিকিরনের চেয়েও বেশী এবং বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সৌর বিকিরণ জার্মানির সর্বোচ্চ সৌর বিকিরনের দ্বিগুণের সমান। জার্মানির সর্বোচ্চ কার্যকর দিনের দৈর্ঘ্য ৫ ঘণ্টা ১২ মিনিট/ যা বাংলাদেশের শীতকালের কার্যকর দিনের দৈর্ঘ্যের সমান। যেখানে বাংলাদেশের তুলনায় এতো দুর্বল সৌর বিকিরণ এবং কার্যকর দিনের দৈর্ঘ্য নিয়ে জার্মানি উইন্ড এবং সোলার পাওয়ারের বিনিয়োগ বাড়িয়ে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ করে দেয়ার পথে সেখানে এতো ভাল অবস্থানে থেকেও বাংলাদেশের কেন বিদ্যুৎ সমস্যা সমাধান করার জন্য উত্তরবঙ্গ, সুন্দরবন ধ্বংস করে কয়লা, দেশের মানুষের কষ্টার্জিত টাকা দিয়ে কুইক রেন্টাল, আর ব্যপক বিশাল মানবিক ও পরিবেশ বিপর্যয়ের ঝুকি নিয়ে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র করতে হয় সেটা একটা বিরাট রহস্য। উদাহরন হিসেবে ঢাকা শহরের কথা বলা যায়। ঢাকা শহরের ২০০০ মেগাওয়াটের চাহিদার বিপরীতে এখানে সরবরাহ করা হয় ১০০০ থেকে ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ(৭৩)। এই ১২০০ মেগাওয়াটের ৪৫ ভাগ খরচ হয় আবাসিক এলাকায়। ৪৬ ভাগ কল কারখানায়, ৭ ভাগ বাণিজ্যিক এবং ২ ভাগ অন্যান্য খাতে(৭৪)। ঢাকা শহরের সিটি কর্পোরেশনের আওতায় থাকা ১৩২ বর্গ কিলোমিটার যায়গার কংক্রিটের দালানগুলোর অব্যবহৃত ছাদের পরিমান যদি ১.৩২ বর্গকিলোমিটারও হয় (প্রকৃত পরিমান এর চেয়ে অনেক অনেক বেশী), তাহলে বর্তমানে বাজারে প্রচলিত ২০% যান্ত্রিক দক্ষতার সোলার প্যানেল ব্যবহার করে ১১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। একই হিসেব চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট সহ সব শহরের জন্যই করা সম্ভব। এভাবে পুরো দেশের মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের যে ৬৩ ভাগ আবাসিক, বাণিজ্যিক, কৃষি ও অন্যান্য খাতে এবং খরচ হয় তার পুরোটা অথবা বেশ কিছু অংশ সোলার পাওয়ার থেকে এখনই পাওয়া যেতে পারে। কারন সব শহরেই দালান আছে। দালানের অব্যবহৃত ছাদও আছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলতে পারেন যে শহর এলাকায় পরিবার গুলোর মধ্যে ফ্রিজ, ওভেন, শিততাপ নিয়ন্ত্রন যন্ত্রের মত বেশী পাওয়ারের যে যন্ত্রগুলো আছে সেগুলো সোলার পাওয়ারে চলার মত প্রযুক্তি এখনো অত প্রচলিত নয়, রাতের বেলা সোলার পাওয়ার পাওয়া যায়না, ছাদগুলোও হয়ত সোলার প্যানেল বসানোর মত নয় কিংবা ব্যাপক হারে সোলার পাওয়ার ব্যবহার করার জন্য অর্থনীতি, সমাজ প্রস্তুত নয়। পরীক্ষাগারে সোলার পাওয়ারের বর্তমান সর্বোচ্চ যান্ত্রিক দক্ষতা ৩৩%(৮০)। যা যেকোনো ফসিল ফুয়েলের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের যে যান্ত্রিক দক্ষতা তার চেয়ে বেশী। এই ক্ষমতা প্রতি বছরই বাড়ছে। সোলার পাওয়ার ব্যবহার করার জন্য সম্পর্কিত যন্ত্রাংশ যেমন ব্যাটারি, চার্জ কন্ট্রোলার, ইনভারটার এগুলোর যান্ত্রিক দক্ষতাও বাড়ছে। সেকারনে এটা আশা করা যায় যে প্রযুক্তির অগ্রগতির সাথে সাথে এই সব সমস্যাও হারিয়ে যাবে। যদি সদিচ্ছা থাকে এবং সঠিক পরিকল্পনা করে তা বাস্তবায়ন করা যায় তাহলে এসব সমস্যার কার্যকর সমাধান করা সম্ভব। ঢাকার বাইরের সোলার পাওয়ার ব্যবহারের চিত্র আরও চমকপ্রদক। বিপিডিবি এর মতে বর্তমানে বাংলাদেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ৬০০০ মেগাওয়াটের মত(৭৩) । কিন্তু চাহিদা এর চেয়ে অনেক বেশী। উৎপাদিত বিদ্যুতের ৫ ভাগ খরচ হয় কৃষি কাজে। যেসব স্থানে বিদ্যুৎ আছে সেখানেত বটেই এবং যেখানে বিদ্যুৎ পৌঁছেনি সেখানে ডিজেল মেশিন চালিয়ে ভূগর্ভস্থ পানি তোলা হয় সেচের কাজে। অর্থাৎ কৃষি কাজে বিদ্যুতের মূল ব্যবহার হল সেচের কাজ করার জন্য যে মোটর চালাতে হয় তা। সেচের কাজে সৌর শক্তি ব্যবহার কোন নতুন ব্যপার নয়। এমনকি প্রয়োগও তেমন জটিল নয়। মানিকগঞ্জ, বগুড়া সহ বেশ কিছু জেলায় সৌর শক্তির সাহায্যে প্রচলিত বিদ্যুৎ এবং ডিজেলের চেয়ে কম খরচে সেচের কাজ হচ্ছে(৭৫)। সেসব প্রকল্পে কোন ধরনের ব্যাটারি ব্যবহার না করে দিনের বেলা যতক্ষন(৫ থেকে ৮ ঘণ্টা) কার্যকর সৌর শক্তি পাওয়া যায় ততক্ষনে এক একটি পাম্প সাড়ে পাঁচ থেকে ছয় লক্ষ লিটার পানি উত্তোলন করে(৭৯)। এই প্রযুক্তি যদি রাষ্ট্রের উদ্যোগে সারা দেশের কৃষি কাজে ব্যবহার করা যায় তাহলে এর লাভ হবে দ্বিমুখী। প্রথমত কৃষি কাজে ডিজেল এবং গ্রিড লাইনের সরবরাহকৃত বিদ্যুতের ব্যবহার উঠে যাবে, রাষ্ট্রের সাশ্রয় হবে, দ্বিতীয়ত কৃষককে সেচের পানির জন্য বাড়তি কোন টাকা খরচ করতে হবেনা। উৎপাদন খরচ অনেকাংশে কমে যাবে। উৎপাদন খরচ কমে গেলে যথারীতি কৃষক ফসলের ভাল দাম পাবে এবং ভোক্তারাও বর্তমানের চেয়ে কম দামে কৃষি পণ্য কিনতে পারবে। কিন্তু শুধুমাত্র সেচের কাজে সোলার পাওয়ার ব্যবহার করা হলে ডিজেলের তুলনায় খরচ বেশী পড়বে। কারন সেচ কাজ বছরে তিন থেকে চার মাস চলে। মজার ব্যপার হল এই তিন চার মাসে সূর্যের বিকিরণ বছরের অন্যান্য সময়ের চেয়ে ২৫ ভাগ বেশী থাকে। ফলে এমনভাবে ঐ স্থানের সোলার পাওয়ার এর ডিজাইন করতে হবে যেন উৎপাদিত বিদ্যুৎ সেচ ছাড়াও অন্যান্য কাজে লাগানো যায় এবং সর্বোচ্চ ব্যবহার হয়।
পরিবহন ব্যবস্থায় সৌরশক্তির ব্যবহারের কয়েকটি উদাহরন দেয়া যাক। বৈদ্যুতিক গাড়ির প্রযুক্তি উন্নততর হবার সাথে সাথে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বৈদ্যুতিক গাড়ি আস্তে আস্তে পরিবহন ব্যবস্থার মূল জায়গাটি দখল করে নিচ্ছে। কারন এধরনের গাড়িতে কোন দূষণ হয়না, রক্ষনাবেক্ষন খরচ কম, যান্ত্রিক দক্ষতা বেশী। ফলে বাংলাদেশে অতি অল্প পরিমানে হলেও বিভিন্ন যায়গায় ব্যাটারি চালিত গাড়ি দেখেননি এরকম মানুষ খুঁজে পাওয়া মুশকিল হবে। সুইজারল্যান্ডের একদল গবেষকের তৈরি করা সৌরচালিত উড়োজাহাজ উড্ডয়নের পর ২৬ ঘণ্টা আকাশে ছিল(৮১)। গত বছর ২০১২ সালে ফ্রান্সের মোনাকো থেকে একটি সামুদ্রিক প্রমোদতরি বিশ্ব ভ্রমন করে এবং শ্রীলঙ্কা ভারত হয়ে বাংলাদেশেও এসেছিল(৮২)। কিছুদিন আগেই ব্রিটেনের তৈরি করা ইলেকট্রিক গাড়ি ঘণ্টায় ২৩৯.২৫ কিমি গতিতে চলে রেকর্ড করেছে(৮৩)। এই তিনটা উদাহরন দেয়া হল একারনে যে বাংলাদেশেও এই সবের ব্যবহার সম্ভব। সেদিন দূরে নয় যখন আমাদের নৌকা, ট্রলারগুলো সৌরশক্তিতে চলবে, রাস্তায় পেট্রোল, ডিজেল চালিত গাড়িগুলো বৈদ্যুতিক শক্তিতে চলবে এবং রাস্তার মোড়ে মোড়ে অকটেন, পেট্রোল, ডিজেল বা গ্যাসের পরিবর্তে বৈদ্যুতিক গাড়ির চার্জ স্টেশন তৈরি হবে। সৌরচালিত ইলেকট্রিক চার্জ স্টেশনে গাড়িগুলো গিয়ে শুধু মাত্র তাদের ব্যাটারি পাল্টে নিবে। বৈদ্যুতিক গাড়ির রিচার্জ স্টেশন জিনিসটি ভিন্ন গ্রহ থেকে উঠিয়ে আনা হয়নি। বিভিন্ন দেশে চলছে। বাংলাদেশেও করার জন্য এর সাথে সম্পর্কিত লোকজন গবেষণা কাজ পরিচালনা করছেন(৭৬)। এভাবে সৌর শক্তি ব্যবহারের আরও অনেকগুলো দিক দেখানো সম্ভব। যার বিস্তারিত এই আলোচনায় না গিয়ে শুধু এটুকু বলা যায় যে উপরে আলোচিত সবগুলো নবায়নযোগ্য শক্তির সম্মিলিত সম্ভাবনার চেয়েও সৌরশক্তির সম্ভাবনা অনেক অনেক বেশী। কার্যত শুধুমাত্র সৌর শক্তি দিয়ে দেশের মোট চাহিদার সবটুকুই মেটানো সম্ভব। বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবার জন্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষমাত্রা ঠিক করেছে ৩৪ গিগাওয়াট(৭৩)। যা বছরে হয় ১২,৪১০ গিগা ওয়াট-ঘণ্টা। কিন্তু দেশের মোট আয়তনের এক ভাগ ব্যবহার করে ২০% যান্ত্রিক দক্ষতায় এক বছরে সৌর শক্তির বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব ১০,৪০০ গিগাওয়াট-ঘণ্টা(৭৮)। যেখানে বর্তমানে দেশের চাহিদা প্রতিদিন ৭.৫ গিগাওয়াট হিসেবে ২,৭৩৭.৫ গিগাওয়াট-ঘণ্টা। অর্থাৎ বর্তমানে বাজারে যে ধরনের সোলার প্যানেল পাওয়া যায় তা দিয়ে এখনই চাহিদার প্রায় চারগুন বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায় এবং যা ২০৩০ এর লক্ষমাত্রার প্রায় সমান। ভবিষ্যতে আরও উন্নত প্রযুক্তি আসলে এই সক্ষমতা নিশ্চিতভাবেই আরও বাড়বে।

একটি কাল্পনিক ছবির কথা ভাবি। ধরা যাক দিনাজপুরের ফুলবাড়িতে উম্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা খনি এবং তা থেকে ১০০০-১৫০০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্র হল, ঈশ্বরদীর রূপপুরে ২০০০ মেগাওয়াটের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র হল, বাঘেরহাটের রামপালে সুন্দরবনের ৯ কিলোমিটারের মধ্যে ১৩২০ মেগাওয়াটের দুটি ইউনিটে ২৬৪০ মেগাওয়াটের বিদ্যুতকেন্দ্র হল। তাহলে মোট উৎপাদন ক্ষমতা দাঁড়ায় ৬১৪০ মেগাওয়াট। উদ্দেশ্য বিদ্যুতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করা, উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানো, রপ্তানি বাড়ানো, জনগনের ক্রয় ক্ষমতা বাড়ানো এবং দেশের সামগ্রিক অবস্থার উন্নয়ন। কিন্তু বাস্তবে এর কিছুই হবেনা। এই বিদ্যুৎ উৎপাদনের সামগ্রিক প্রভাবে লক্ষ কোটি মানুষ গৃহহীন হবে, দেশের বেশিরভাগ অঞ্চল কৃষি উৎপাদনের সক্ষমতা হারাবে, খাদ্য নিরাপত্তা বলতে কিছু থাকবেনা, পরিবেশ বিপর্যয়ের কারনে ঝড়, বন্যা, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, মরুকরন সহ মহামারী আকারে ক্যান্সার ও অন্যান্য প্রাণঘাতী রোগের বিস্তার হবে। উৎপাদিত বিদ্যুতের ব্যবহারকারী শ্রেণী হবে মূলত ব্যবসায়ী গোষ্ঠী। বাকি জনগনের ব্যপক বিশাল অংশ নিজের জমি থেকে উচ্ছেদ হয়ে, কৃষি উৎপাদন হারিয়ে, বিভিন্ন রকম রোগে অক্রান্ত হয়ে শুধুমাত্র একটি চাকুরির জন্য তাদের কৃতদাসে পরিণত হবে। অনেকেই বলেন বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়লে দেশে শিল্প কল-কারখানা বাড়বে, উৎপাদন বাড়বে, কর্মসংস্থান বাড়বে, বেকারত্ব থাকবেনা। কিন্তু যে মানুষ ফুলবাড়ি কয়লা খনির কারনে জমি হারাবে, বাসস্থান হারাবে, ফসলের উৎপাদন ধ্বংস হয়ে যাবে, তার এই সম্পত্তি হারিয়ে শিল্প কারখানায় চাকুরি পাবার তেমন কোন উপকারিতা আছে বলে মনে হয়না। অথবা যে মানুষ কৃষি কাজের সাথে সম্পৃক্ত তার এবং সম্পর্কিত ভাবে আরও অনেকের খাদ্য নিরাপত্তা নষ্ট করে তাকে একটি চাকুরি প্রদান করলে কিংবা কিছু ক্ষতিপূরণ দিলে অবস্থাটা কি হবে সেটাও একটু চিন্তা করা যাক। বাংলাদেশের মালিক শ্রেণীর শ্রমিকের প্রাপ্য মুজুরি শোষণ করাটা নতুন কিছু নয়, একটা ব্যপক রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সামজিক পরিবর্তন ছাড়া এটা ঠিক হয়ে যাবে এটা মনে করার কোন কারন নেই। কোন একটি অবস্থায় যদি শ্রমিককে তার প্রাপ্য মুজুরি দেয়াও হয় তাহলেও তাকে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা সহ বেঁচে থাকার সমস্ত উপাদান ক্রয় করতে হবে। ফলে উৎপাদনের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত থেকে স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকা একটি বিশাল জনগোষ্ঠী মালিক শ্রেণীর ক্রীতদাসে পরিণত হবে। অবশ্য এখনই এরকম অবস্থা চলছে। আর একটি ব্যপার থেকে যায়। ধরা যাক বিদ্যুতের সক্ষমতার কারনে দেশের মোট উৎপাদন বেড়েছে, বেকারত্ব কমেছে, মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বেড়েছে। কিন্তু কয়লা এবং পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের অত্যন্ত নিশ্চিত বিষক্রিয়া ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা এবং সম্পর্কিত পরিবেশগত বিপর্যয়ের কারনে যে সমস্ত রোগ মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়বে তার ফলে শারীরিক ও মানসিকভাবে বিকলাঙ্গ একটি জাতীর অর্থনৈতিক ভাবে সক্ষম হওয়া কিংবা বেকারত্ব না থাকার কি উপকারিতা আছে তা পাঠক বিবেচনা করবেন। এটি কোন দৃষ্টিকোণ থেকেই সামগ্রিক উন্নয়ন হতে পারেনা। ফসিল ফুয়েল এবং পারমাণবিক বিদ্যুৎ ব্যবহারের একটি যুক্তি দেখানো হয় এই বলে যে যেহেতু আমাদের তেল, গ্যাস, কয়লার সঙ্কট আছে তাই বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য যত বেশী বৈচিত্র্যময় উৎসের ব্যবহার করা যায় ততই ভাল। অর্থাৎ শুধুমাত্র গ্যাস অথবা কয়লার প্রতি নির্ভরশীল না হয়ে পারমাণবিক বিদ্যুতের দিকে গেলে আমাদের ফসিল ফুয়েল নির্ভরশীলতা কমবে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের উৎস শক্তির নিরাপত্তা বাড়বে। ব্যপারটা অনেকটা শুধু ডান হাত দিয়ে বিষ না ঘেঁটে দুই হাত দিয়ে বিষ ঘাঁটার মত। তাহলে দীর্ঘদিন ধরে বিষ ঘাঁটা যাবে এবং তুলনা মুলকভাবে দুই হাতের ক্ষতি কমে আসবে। সরাসরি সৌরবিদ্যুৎ প্রযুক্তির সাথে সম্পৃক্ত কিছু প্রযুক্তিবিদের মুখে একথা বলতে শোনা যায় যে বাংলাদেশ সৌরবিদ্যুৎ ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহারের জন্য উপযুক্ত নয়। সচেতন ভাবে তারা এধরনের মিথ্যাচার কেন করেন তার দুটি কারন হতে পারে। প্রথমত ফসিল ফুয়েল এবং পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র করার জন্য যারা উৎসাহী, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী, কমিশনখোর, মুনাফার ভাগীদার তাদের চাপ, তাদের কাছ থেকে সুবিধা গ্রহন। দ্বিতীয়ত নবায়নযোগ্য বিভিন্ন পদ্ধতিতে মানুষের এবং পরিবেশের ক্ষতি না করে যে কার্যকর ভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায় তা জনগনের কাছে গোপন করে প্রযুক্তিটিকে কুক্ষিগত করে রাখা এবং এগুলো নিয়ে বহুদিন একচেটিয়া ব্যবসা করে যাওয়ার আকাংখা। এই সব প্রযুক্তিবিদেরা বিদেশ থেকে নবায়নযোগ্য শক্তি বিষয়ে বড় বড় ডিগ্রী নিয়ে এসেও বিভিন্ন সভা, সেমিনার, আড্ডায় এমনভাবে বিষয়গুলো এমন বিভ্রান্তিকর ভাবে বর্ণনা করেন যেন এটা পূর্ণিমার আগের বারোদিন বয়সী চাঁদ নিয়ে দুই বন্ধুর একটি গল্প, যেখানে দুই বন্ধু রিক্সায় করে রাতের বেলা যাচ্ছিল। সামনে খোলা আকাশে বারো দিনের চাঁদ দেখে দুই বন্ধুরই ভাল লাগছে। কিন্তু এদের মধ্যে চতুর বন্ধুটি তার ভাল লাগাটা অন্যজনকে বুঝতে দিতে চায়না। বলল দেখ চাঁদের কি অবস্থা। অন্যজন ভাবল কি মজা তার অনুভূতির সাথে বন্ধুর অনুভূতি মিলে গেছে। খুশী মনে জিজ্ঞাসা করল, কেন কি হয়েছে? উত্তরে প্রথমজন বলল- মনে হয় চাঁদটাকে উপর থেকে কেউ হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে থেঁতলে দিয়েছে।

সমুদ্রের ঢেউ, জোয়ার, বায়ু, জৈব বর্জ্য এবং নগরের আবর্জনা এবং সৌর শক্তি সবকিছুর সম্ভাবনাই ব্যপক। কিন্তু সম্ভাবনা গুলোকে প্রয়োগের মাধ্যমে এর ফল জনগনের দূয়ারে নিয়ে আসার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম যে মহান চেতনায়, মুক্তিযুদ্ধের সেই চেতনাকে পুঁজি করে কিছু মানুষ জনগনেকে বঞ্চিত করে ক্রমাগত সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছে। অল্প কিছুসংখ্যক লোক পর্যায়ক্রমে ক্ষমতায় এসেছে। ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় জনগণের উপর ব্যয়ের বাড়তি বোঝা চাপানো, অত্যাচার, নিপীড়ন, শোষণ লুণ্ঠন চালিয়ে নিজেদের সম্পদ বাড়ানো আর ক্ষমতায় না থাকলে ক্ষমতায় যাবার জন্য পাগলা কুকুর হয়ে থাকা সহ ক্ষমতার আসেপাশে লুটপাটকারী একটি শ্রেণী তৈরি করা, সাম্রাজ্যবাদী দেশ গুলোর কাছে নিজেদের মুনাফা লাভের জন্য জাতীয় সম্পদ তুলে দেয়া, দেশীয় শিল্প কল কারখানা বন্ধ করে আমদানি নির্ভর অর্থনীতি তৈরি করা, জনগনের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়া, বেকার সমস্যা বেড়ে চলা এসবই চলছে গত ৪২ বছর ধরে। কিন্তু এই সময়ের মধ্যে একটি সরকারও পাওয়া যাবেনা যারা প্রকৃত অর্থে দেশপ্রেমিক এবং জনগনের প্রতিনিধিত্ব করে। ফলে অনেক অনেক সম্ভাবনার দেশ হয়েও এখনো এদেশের গড় আয় ৭৫০ থেকে ৮০০ ডলার। এই রাষ্ট্রে ক্ষমতার চর্চা করা দলগুলো ক্ষমতায় যেতে চায় একটি সুন্দর সমৃদ্ধ রাষ্ট্র গঠনের জন্য নয়। সাম্রাজ্যবাদী প্রভুদের সহায়তায় দেশের সম্পদ লুটপাট করে তাদের জীবনের সুখ সমৃদ্ধি বাড়ানোর জন্য। ফলে তাদের পরিকল্পনায় থাকে কিভাবে মাটির নিচের গ্যাস, কয়লা দ্রুত তুলে ফেলে বিদ্যুৎ কেন্দ্র করার নামে অর্থ লোপাট করা যাবে, কিভাবে বিদেশীদের হাতে স্থল ভাগের এবং সমুদ্রের গ্যাস ব্লক ইজারা দিয়ে কমিশন পাওয়া যাবে কিংবা পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নামে নতুন চমক দিবে। এখানে শেয়ার মার্কেট থেকে একটি পুরো বাজেটের সমান টাকা লোপাট হয়ে যাবে কিংবা ডেসটিনি, হলমার্কের মত জোচ্চোররা এক বাজেটের ৬ শতাংশের সমান টাকা চুরি করে নিয়ে যাবে। অথচ বিশ্ব বাজারে তেলের দাম কম থাকা এবং ভারত পুরো বাংলাদেশকে কাটাতার দিয়ে ঘেরাও করে রাখা সত্ত্বেও – বিশ্ব বাজারে তেলের দাম বেড়েছে, সীমান্ত দিয়ে তেল পাচার হয় এইসব অজুহাত দেখিয়ে জ্বালানির দাম বাড়াবে, তাদের ঘনিষ্ঠ কুইক রেন্টাল কম্পানিকে সমৃদ্ধ থেকে সমৃদ্ধতর করে তুলবে। এখানে সমুদ্র বিজয়ের মিথ্যা সংবাদকে আনন্দের খবর বলে লক্ষ কোটি মানুষকে নিয়ে বিজয় মিছিল করা হবে অথবা দুর্নীতিবাজদের দেশপ্রেমিক আখ্যা দিয়ে পুরস্কৃত করা হবে। কিন্তু উত্তরবঙ্গ ধ্বংসকারী ফুলবাড়ির কয়লা উত্তোলন, ব্যপক বিশাল মানবিক ও পরিবেশগত বিপর্যয় ঘটার সম্ভাবনা নিয়ে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন, সুন্দরবন তথা পুরো বাংলাদেশ ধ্বংসকারী রামপাল বিদ্দুতকেন্দ্র স্থাপন করার জন্য বিদেশি প্রভুদের সাথে ষড়যন্ত্র করার সময় এরা মাটির কথা, দেশের জনগনের কথা, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা ভাবেনা। সাম্রাজ্যবাদী প্রভুদের পা চেটে দেশের ক্ষতি করার সময় এদের ন্যূনতম আত্মসম্মান বোধ থাকেনা কিংবা মুক্তিযুদ্ধের বিশাল ত্যাগ, চেতনা প্রাপ্তি কিছুই এদের স্পর্শ করেনা। সেজন্য অনেক অনেক সম্ভাবনা থাকলেও এরা দেখেও না দেখার ভান করে। কারন জনগনের সুখ, সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে গেলে এদের আখের গোছানো হবেনা। ফলে মাটি, মানুষ, পরিবেশ বাঁচানো একই সাথে প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহন করে দেশকে উন্নয়নের দিকে ধাবিত করাটা একটি রাজনৈতিক আকাংখায় পরিণত হয়, বঞ্চিত জনগনের মুক্তির সংগ্রামে পরিণত হয়। কারন ক্ষমতা দখল করে রাখা জোট, মহাজোট, দুই দলের রাজনীতি প্রকৃত অর্থে মাটি, মানুষ পরিবেশের রাজনীতি নয়। জনগনের নিজস্ব রাজনৈতিক শক্তি গড়ে উঠার মাধ্যমে এদেশ থেকে দুর্নীতি সমূলে উৎপাটিত হবে, জনগন তার নিজের স্বার্থে অর্থনীতিকে ঢেলে সাজাবে, শিল্প কলকারখানা তৈরি হবে, বেকারত্বের অবসান হবে, জাতীয় সম্পদের সুবিবেচিত ব্যবহার নিশ্চিত হবে এবং ফসিল ফুয়েল সহ শক্তির পুরো উৎপাদন পরিকল্পনা এমন ভাবে হবে যাতে এই দেশ, মানুষ ও পরিবেশ বাঁচে।
চূড়ান্ত বিবেচনায় আমাদের প্রধান দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায় সেই ধরনের রাজনীতি শক্তিশালী করা যা এই মাটির, মানুষের ও পরিবেশের কথা ভাববে, ফসিল ফুয়েল এবং পারমাণবিক শক্তি বাদ দিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহারের মাধ্যমে খুব সহজেই শক্তি ব্যবহারের সঙ্কট কাটিয়ে উঠতে চিন্তা করবে, পরিকল্পনা করবে একইসাথে বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করবে। আমরা সকলে যদি সচেতন থাকি এবং চেষ্টা করি তাহলে খুব সহজেই আমাদের নিজেদের জন্যতো বটেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ পৃথিবী নির্মাণ করতে পারি।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 6 = 7