আদি, নারী ও অনাদি | শারঙ্গীর দুঃখগাঁথা

?oh=c0fbcebfc0a713b2b247d75bd5c4300f&oe=55C083DE&__gda__=1440444384_dab32af18fb07a061d3633db8d2f0b6c” width=”400″ />
“য্‌ৎ কথ্যতে হি হৃদয়োগময়োপয়মান, যুক্ত্যা গিরা মধুরযুক্ত পদার্থয়া চ। শ্রোতু স্তদঙ্গ হৃদয়ং পরিতো বিসারি, ব্যাপ্নোতি তৈলমিব করিণি বার্য শংকাম।” (যোগবাশিষ্ঠ‚ তৃতীয় প্রকরণ)। এর অর্থ হচ্ছে, উপমানযুক্তি দ্বারা হৃদয়গ্রাহী ও অনুভূতিগ্রাহ্য কথা ও কাহিনীর মাধ্যমে যে তত্ত্ব বোঝানো হয় তা জলের মধ্যে তেলের ফোঁটার মত শ্রোতার হৃদয়ে সহজে ছড়িয়ে পড়ে।

অর্থাৎ নারী নিপীড়ন বা অন্য যে প্রশ্নই হোক, তত্ত্বকথার তোপ দেগে দিলেই হলো না। শ্রোতার মনে ছড়িয়ে পড়তে হলে সত্যকে প্রকাশ করতে হবে সহজ ‘কথা ও কাহিনী’ বা আখ্যানের মাধ্যমে। প্রমাণ‚ উদাহরণ‚ দলিলনথি‚ খনন‚ সাংবাদিকের খবর‚ প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ- এর সবই জড়ো করতে হবে। ইতিহাসকে সজল করে তুলতে হবে‚ যাতে ভবিষ্যৎকে কল্পনা করার বীজ অঙ্কুর মেলতে পারে। মন যাতে তৈরি হয়ে উঠতে পারে ‘সত্য’কে উদঘাটনের জন্য‚ অনুধাবনের জন্য। ‘কথা ও কাহিনী’র কয়েকটি উদাহরণ দিলাম।

?oh=bd2c7d26246c0f84f6ca02d1edc9375a&oe=55CBE930″ width=”400″ />

| এক |
স্থান : মেসোপটেমিয়া
সময় : খৃষ্টপূর্ব ১১-১২ শতক
হলুদ ফসলে ভরা মাঠ আর আলপথ পেরিয়ে‚ ইউফ্রেটিসের ধার বরাবর‚ দুর্দান্ত টাইগ্রিস যেখানে বাঁক নিচ্ছে‚ শিকারের মাঠকে পিছনে রেখে‚ পাটল খড়ের স্তুপ পায়ে মাড়িয়ে পৌঁছতে হয় সেই গ্রামে। উৎসবের গ্রাম। আজ বছরকার দিন! প্রতি বছর এই একটি দিন ভোর হতে না হতেই আসিরিয়া ব্যাবিলনিয়া‚ সুমের’র প্রতিটি গ্রাম, জনপদের প্রতিটি ঘরে ঘরে হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়ে সম্রাটের প্রতিভূরা। গায়ে রোদে শুকোনো পশুচামড়ার কঠিন আঙরাখা।
বেজি বা শশকের আস্ত লোমশ শরীর ফর্দাফাঁই করে তারপর পেট থেকে নাড়িভুঁড়ি বের করে নিয়ে তাই দিয়ে তৈরি হয়েছে কোমল ও আরামপ্রদ পাদুকা। হাতের বর্শায় ঝকঝক করছে তামার ফলা। ওরা ঘরে ঘরে ঢুকে পড়ছে‚ আজ কোনও ওয়ারেন্টের বালাই নেই। তারপর ঘর থেকে টেনে বার করে আনছে জনপদের সমস্ত অবিবাহিতা ও কুমারীদের। স্বেচ্ছায় ধরা দেওয়া প্রথাবিরুদ্ধ।
নিয়ম হলো– নিতম্বে ঢেউ তুলে মেয়েরা পালাবে‚ নতুবা পালাতে বাধ্য হবে বল্লমের মুখে। ঝুলন্ত করুণ স্তনগুলো লাফাবে তালে তালে। আর শেষপর্যন্ত পালাতে পালাতে কোণঠাসা হয়ে যাওয়া তৃষ্ণার্ত কুমারীদের বল্লমের খোঁচায় জ্যান্ত বন্দি করবে সম্রাটের প্রতিভূরা। এরপর নগ্নিকাদের সার বেঁধে নিয়ে আসা হয়ে উৎসবের মাঠে এবৎ নীলামে তোলা হবে। সেরা তনুবল্লবী যার সে সবচেয়ে বেশি দামে বিকোবে। যে ব্যাবিলনীয় পুরুষ সবচেয়ে বেশি ধনী সে সবচেয়ে সুন্দরীকে কিনে ফেলবে এবং হ্যাঁ‚ বিয়ে করবে। যাদের ট্যাঁকের জোর কম তারা ক্রমশ কুৎসিতদের কিনতে পারবে। সাম্রাজ্যের অধীনস্থ যে কোনও স্বাধীন নাগরিক (পুরুষ) এই নীলামে অংশ নেওয়ার অধিকারী ‚ যদিও বিক্রির টাকা রাজকোষে জমা পড়বে।
(কোথাও কোথাও কোনও কোনও কালক্ষেপে এই মুনাফার হকদার অবশ্য রাষ্ট্রের বদলে পরিবার) বিয়ে বা যৌনতা এখানে রাষ্ট্রের সঙ্গে ব্যক্তির একটি আর্থিক চুক্তি।
(সূত্র : Handbook to life in Mesopotamia. Stephen Bertman)

?oh=d92b577d607d206651b321e8b3c8bb66&oe=55D426D3&__gda__=1439114455_acb3de041b52276e5746524bf9451c8b” width=”400″ />

| দুই |
স্থান : মসুল | ইরাকের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর
সময় : জুন | ২০১৪
সম্প্রতি কট্টরপন্থী ইসলামি সামরিক সংগঠন আইএসাঅইএস‚ (ইসলামিক স্টেট অফ ইরাক অ্যান্ড সিরিয়া) মসুল-সহ ইরাকের বিস্তীর্ণ এলাকা দখল নেওয়াল পর একটি প্রকাশ্য বিজ্ঞপ্তিতে ইরাকি জনগণের উদ্দেশে ‘জিহাদ – আল্-নিকাহ’-য় অংশগ্রহণ করার আদেশ জারি করে। মসুল শহরের বিভিন্ন রাস্তায় ও জনবহুল অঞ্চলে এই মর্মে পোস্টার পড়ে।
পোস্টার বিজ্ঞপ্তিতে আবেদন জানানো হয়- “দেশের সমস্ত ধার্মিক ইসলামি জনসাধারণের উদ্দেশে আবেদন জানানো হচ্ছে যে‚ তারা নিজ নিজ পরিবারের অবিবাহিতা তরুণী মেয়েদের আইএস আইএস-এর হাতে তুলে অর্পণ করুন‚ যাতে তারা (মেয়েরা) তাদের জিহাদি যোদ্ধা ভাইদের যৌন চাহিদা মেটানোর পবিত্র কর্তব্য পালন করতে পারে। যারা এই কর্তব্য পালন করবেন না তাদের শরিয়তি আইন অনুযায়ী ন্যায়সঙ্গত বিচার ও উচিত শাস্তি দেওয়া হবে।”
(সূত্র : আল মাসরিয়ালুম। একটি বহুল প্রচলিত দৈনিক সংবাদপত্র‚ কায়রো থেকে প্রকাশিত)

?oh=662cb89ace67da471336dbb317bdcc9f&oe=55C3542F&__gda__=1439295910_402b402d272d1a91a5de7b47f7050769″ width=”400″ />

| তিন |
স্থান : নদিয়া | পশ্চিমবঙ্গ
সময় : জুন | ২০১৪
‘সোমবার বৈদ্যুতিন মাধ্যমে তাপসের একটি ফুটেজ বিতর্কের ঢেউ তোলে। সেখানে দেখানো হয় নদিয়ার চৌমাহা গ্রামে গাছতলায় দাঁড়িয়ে তাপস পাল (সাংসদ ‚ কৃষনগর কেন্দ্র ‚ পশ্চিমবঙ্গ) হুমকি দিচ্ছেন ‚ দরকারে তিনি বিরোধীদের এই রাজ্যে রিভলবার বের করে গুলি করে খুন করবেন ‚ নয়তো ছেলে পাঠিয়ে সি পি এম বাড়িতে ‘রেপ’ করাবেন…”
(সূত্র : বাংলালাইভ | ০১.০৭.১৪)

?oh=4b66223e10ec7eefdd99c472ac5b8323&oe=55C4B158″ width=”400″ />

| চার |
স্থান : গাঙ্গেয় অববাহিকা | উত্তর ও পূর্ব অঞ্চল
সময় : ৩ য় থেকে ৫ম খৃষ্টাব্দ
পুরাকালে বৃহস্পতি নামে এক প্রবল তেজসম্পন্ন ঋষি ছিলেন। বৃহস্পতির দাদা ছিলেন ঋষি উতাথ্য ও উতাথ্যের প্রিয়তমা পত্নী মমতা। একদিন উতাথ্যের অনুপস্থিতিতে মমতাকে দেখে বৃহস্পতির মনে কামনার জন্ম হয়। মমতা নিষেধ করলেও বৃহস্পতি নিজের কামনা সংবরণ করতে ব্যর্থ হন ও মমতাকে ধর্ষণ করেন। কালে কালে মমতার গর্ভে বৃহস্পতির ঔরসে এক জন্মান্ধ শিশুপুত্রের জন্ম হয়। তাই তার নাম রাখা হয় দীর্ঘতামস। দীর্ঘতামস তার পিতা বৃহস্পতির মতই তেজোসম্পন্ন ও শ্রুতিধর ছিলেন। তিনি অনেক জ্ঞান অর্জন করেন ও অনেকগুলি ঋগ্বেদীয় সূত্রের প্রণয়ন করেন।
যুবক দীর্ঘতামসের সঙ্গে এক পরমাসুন্দরী ব্রাহ্মণ কন্যা প্রদ্বেষীর বিয়ে হয় এবং তাদের অনেক গুলি পুত্রসন্তান লাভ হয় ‚ তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় পুত্রটির নাম গৌতম। জন্মান্ধ ঋষি দীর্ঘতামস নিয়ম প্রণয়ন করেন যে একজন নারী কেবলমাত্র একজন পুরুষের সঙ্গেই লিপ্ত হবেন। কিন্তু প্রদ্বেষী এই নিয়ম মানতে রাজি ছিলেন না ‚ তিনি দীর্ঘতামসের ওপর প্রচণ্ড রেগে যান ও পুত্র গৌতমকে বলেন স্বামীকে গঙ্গায় ভাসিয়ে দিয়ে আসতে। একটা কাষ্ঠখণ্ডে বাঁধা অবস্থায় বৃদ্ধ ঋষি নদীর স্রোতে ভেসে চলেন।
ভাসতে ভাসতে কত না দেশ – গ্রাম শহর – রাজত্ব পেরিয়ে শেষে বৃদ্ধ দীর্ঘতামসের ভেলা গিয়ে থামে পূর্বদেশের প্রবল পরাক্রান্ত রাজা অজেয় বলির রাজত্বের সীমায়। বেদজ্ঞানী পুণ্যবংশজাত মহর্ষি দীর্ঘতামসকে উদ্ধার করে সসম্মানে রাজগৃহে নিয়ে যান মহারাজা বলি। এবং তারপর নিজের বংশধারায় পূত ও উন্নত রক্তধারার মিশ্রণ ঘটানোর জন্য বলি রাজা নিজের রাণী সুদেষ্ণাকে ঋষি দীর্ঘতামসের অঙ্কশায়িনী হতে আদেশ দেন। সুদেষ্ণার গর্ভে ও দীর্ঘতামসের ঔরসে ৬ পুত্রের জন্ম হয় – অঙ্গ ‚ বঙ্গ ‚ কলিঙ্গ ‚ পুন্ড ‚সূক্ষ্ম ও ঔড্র ! এই ৬ পুত্র ও তাহাদের বংশধরদের বাসস্থানগুলো পরবর্তীকালে তাহাদেরই নামাঙ্কিত হয়েছিল।
(সূত্র : মহাভারত | আদিপর্ব)

?oh=b9fb5ffad9a53a12c8eb30d5e6846ad4&oe=55CDEE67&__gda__=1443710190_8b76c25934c53236654740518098e762″ width=”400″ />
শারঙ্গীর অনাদি নয় তো আজিকার দুঃখ!

| পাঁচ |
স্থান : নাগরিক অববাহিকা, গুরু-শিষ্য কেন্দ্র | নগর কোতোয়াল দপ্তর, আংরেজ সড়ক
সময় : খ্রিষ্ট পরবর্তী ২০০০ এবং ১৫ বছর
নগরীতে সেদিন নববর্ষের সূর্য! চারদিকে ঢোল তবলা আর মাদঙ্গের হাঁক। নগরের আত্মবিস্মৃত অধিবাসীরা রঙ মেখে, সেজেগুজে বেরিয়ে পড়েছে। মহাসড়কের নানা প্রান্তে চলছে মেলা। প্রধান মেলাটি হবে গুরু-শিষ্য কেন্দ্রে। প্রতি বছরই এ উৎসব হয়। আর এর আরেকটি আকর্ষণ হচ্ছে সেই আদিম কালের মতোই নারীদের ছুটানো। এবার উৎসবের রঙে নগর কোতোয়ালদের হামকি ধামকি বেশি। তাই পুরুষ সমাজের প্রতিরোধটাও হলো ব্যাপক। মাফ পেলো না মা, বা শিশু! পুরুষের দঙ্গল লাখো মানুষের ভীঁড়ের মধ্যেই নারীদের বিবস্ত্র করল, নিজের আচ্ছাদন আলগা করে বের করল যৌনদন্ড! ঠিক তখন কেউ কেউ বাধা দিতে এলো, তবু মঞ্চায়ন চলল সেই দ্রৌপদীর অনিচ্ছার!
নগর অববাহিকায় ঝড় উঠল। মাঝারি গোত্রের মানুষগুলোর মেরুদন্ড ভেঙে গেল। মেয়েগুলো ভয় পেতে লাগল সন্ধ্যের অন্ধকার দেখলে। কিছু মানুষ বলে উঠল, কোতোয়ালের দল কি করে। কোতোয়ালের দল, শুনল এবং সরকার মহাশয়ের আজ্ঞা জেনে নিল। কিছুদিন পর যখন মানুষেরা বিচার চাই, অপরাধীদের শাস্তি চাই বলে রাস্তায় নামল, কোতোয়াল দল তখন জয় বাংলা বলে ঝাঁপিয়ে পড়ল, গলা টিপে ধরল রাস্তায় নামা নারী-পুরুষদের!
(সূত্র : সমস্ত বাংলা বার্তা)

?oh=8ea8a7c4354922617008cc8c651fcb69&oe=55C33F38&__gda__=1440423762_ff9cc97fd53bd67610eb41bdf6683ab7″ width=”400″ />
নগর কোতোয়ালের নারী নিপীড়ন দমন!

‘কথা ও কাহিনী’র এ পর্বগুলো থেকে নারীর অবস্থান ও ক্রিয়াকান্ড সম্পর্কিত কী ধারণা পেলেন? নারী নিপীড়ন সম্পর্কেই বা কি বুঝলেন? একটু চিন্তা করে দেখুন, আপনার মনে সত্যের যে ছায়া রেখাপাত করেছে, ঠিক কোন পথে তাকে রক্ত-মাংসের রূপ দিতে পারেন, অন্যের কাছে তুলে ধরতে পারেন। সেটা খুবই জরুরী। তাহলে আপনি ‘পুরাণ’ থেকে নতুনে অনায়াসে ছুটে বেড়াতে পারবেন। আর তার মধ্যেই বলে যেতে পারবেন নিজের কথাগুলো!

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১১ thoughts on “আদি, নারী ও অনাদি | শারঙ্গীর দুঃখগাঁথা

  1. শারঙ্গী অর্থ যে নারী, এটা আগে
    শারঙ্গী অর্থ যে নারী, এটা আগে জানা ছিল না। লেখাটার মধ্যে একটা পশ্চিমবঙ্গীয় টোন আছে। লেখককে ধন্যবাদ ভালো একটি লেখা উপহার দেয়ার জন্য।

  2. চমৎকার একটা লেখা পড়লাম।
    চমৎকার একটা লেখা পড়লাম। বাংলাব্লগে এই ধরনের লেখা এখন চোখে পড়ে না। লেখাটির জন্য ধন্যবাদ আপনাকে।

    1. আপনাকে অনেক ধন্যবাদ লেখাটি
      আপনাকে অনেক ধন্যবাদ লেখাটি পড়ার জন্য। আমি দেখাতে চেয়েছি যে, সবকালেই নারী একই পরিস্থিতি পার করেছে। আধুনিকতা কিংবা সভ্যতা আসলে এক ধরণের মুখোশমাত্র!

  3. চমৎকার একটি লেখা। বাংলা
    চমৎকার একটি লেখা। বাংলা ব্লগের প্রথমদিকে এমন মানসম্পন্ন লেখা বেশি পাওয়া যেত। অনেক দিন পর এই ধরণের একটি লেখা পেয়ে খুব ভাল লাগলো। ইষ্টিশন মাস্টারকে ধন্যবাদ লেখাটিকে স্টিকি করবার জন্য।

  4. চমৎকার একটি লেখা।
    উপমানযুক্তি

    চমৎকার একটি লেখা।
    উপমানযুক্তি দ্বারা হৃদয়গ্রাহী ও অনুভূতিগ্রাহ্য কথা ও কাহিনীর মাধ্যমে যে তত্ত্ব বোঝানো হয় তা জলের মধ্যে তেলের ফোঁটার মত শ্রোতার হৃদয়ে সহজে ছড়িয়ে পড়ে। // আপনার উদ্দেশ্য পুরোপুরি সফল হয়েছে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 85 = 91