রাষ্ট্রপতি কি মানসিক সমস্যাগ্রস্ত, নাকি গৃহবন্দী?

মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধান। রাষ্ট্রপতি এর মধ্যে দুইবার জনসমক্ষে তার নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে বক্তব্য রাখলেন। হাস্যরসের মধ্য দিয়ে এ সমস্ত কথা বললেও রাজনৈতিক দিক থেকে এর বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। রাষ্ট্রপতি তার নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে সম্প্রতি এমন সব মন্তব্য করেছেন, যা উদ্বেগজনক। তার বক্তব্য লিখে দেয়া হয়, নিজের থেকে কিছু বলার সুযোগ থাকে না, তিনি নিষ্কর্মা, তার আদেশে কাজ হয় না, তার বুকে-পিঠে ব্যথা হয়, তাকে সিএমএইচে নিয়ে যাবার নির্দেশ দেয়া হয়েছে, এরকম বিচিত্র সব মন্তব্য করেন তিনি।

প্রথমে রাষ্ট্রপতি এ ধরনের বক্তব্য রাখেন নিজের এলাকা কিশোরগঞ্জ সফরে গিয়ে। গত ১১ এপ্রিল শনিবার কিশোরগঞ্জ সফরে গিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন,

‘কিশোরগঞ্জ আমার জন্মভূমি, তাই এখানকার সাধারণ মানুষ, রাজনৈতিক সহকর্মী ও বন্ধুদের সাথে দেখা করতে মন চায়। কিন্তু ইচ্ছা থাকলেও আগের মতো যখন যেভাবে ইচ্ছা ঘুরতে পারি না। তবে যখনই সুযোগ পাই আপনাদের কাছে ছুটে আসি। এলেও সে ক্ষেত্রে তেমন লাভ হয় না, কারণ সরকারের বিভিন্ন বাহিনী আমাকে এমনভাবে ঘিরে রাখে যে, আপনাদের সবার সাথে দেখা-সাক্ষাৎ করতে পারি না। প্রাণ খুলে কথা বলতে পারি না।’

ওই সময় শোলাকিয়া ঈদগাহ সেতু, কিশোরগঞ্জ-করিমগঞ্জ বাইপাস নির্মাণসহ স্থানীয় বিভিন্ন দাবি-দাওয়া প্রসঙ্গে রাষ্ট্রপতির কাছে আর্জি তোলা হলে তিনি বলেন, ‘আমি নিষ্কর্মা, আমার কোনো নির্বাহী ক্ষমতা নেই। আমার আদেশে কোনো কাজও হয় না। আমি বড়জোর অনুরোধ জানিয়ে চিঠি লিখতে পারি।’ [সূত্র : এনটিভির খবর]

একজন রাষ্ট্রপতির মুখে এ ধরনের বক্তব্যের রাজনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম। রাষ্ট্রপতি এর মাধ্যমে তার নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিরুদ্ধেই মতামত দিলেন। এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে পরিবর্তন আনা দরকার। এটাকে আধুনিকায়ন করা দরকার। এর পর তিনি বললেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাগুলো। তার পদের সীমাবদ্ধতা প্রসঙ্গে! এরকম সীমাবদ্ধতার মধ্যে বাস করা, আবার রাশভারি সব পদবি দ্বারা অলঙ্কৃত হওয়াটা যে কোনো মানুষের জন্যই এক অর্থে অবমাননাকর এবং অপমানজনক। যাই হোক, সবাই একে হাস্যরস বলেই ধরে নিলেন। কিন্তু দু সপ্তাহ পেরুনোর আগেই আবারো বোমা ফাটালেন জাতীয় সংসদের সাবেক এই স্পীকার।

রাজধানীর মিরপুরে শহীদ সোহরাওয়ার্দী ইনডোর স্টেডিয়ামে গত ২৬ এপ্রিল, ২০১৫ রবিবার অনুষ্ঠিত হয় নর্দার্ন ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের (এনইউবি) তৃতীয় সমাবর্তন। বিকাল সাড়ে ৩টায় রাষ্ট্রপতির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানের মূল কার্যক্রম শুরু হয়।রাষ্ট্রপতি তার ওই ভাষণে বলেন,

‘আপনারা জানেন আমার বক্তব্য লেখাই থাকে। লেখার বাহিরে আমার বলার কোনো সুযোগ নাই। এবং আমার শরীরটা খুবই খারাপ। সময় ছিল না, যার জন্য আমার অফিস থেকে আমার উর্ধতন কর্মকর্তারা যে কী লিখেছেন, তা আমি একটা রিডিং দিয়াও দেখি নাই। সুতরাং, আমি কী বলব আমি নিজেও জানি না। তবুও, শরীর খারাপ থাকা সত্ত্বেও আসতে হয়েছে! কারণ আপনারা জানেন, রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রীর জন্য অনেক সমস্যা আছে। বাহিরে গেলে বিশেষ করে, এই যে আমার ডাইনে পেছনে দাঁড়ানো আছে, এসএসএফ, স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স। আমার আসার একটু অনীহা ছিল যে, শরীরটা ভাল না, আজ যাব না। কিন্তু সেই এসএসএফ-এর ডিজি, ডাইরেক্টর জেনারেল মেজর আমান সাহেব, উনিও বললেন, না, আসতে হবে স্যার। ভাবলাম যদি না যাই, এমনিই যে টাইট সিকিউরিটির মধ্যে উনি রাখে। এইটা কোন মহা টাইট কইরা দেয়, তার ঠিক নাই। তাই অসুস্থতার মধ্যেও আমাকে আসতে হয়েছে। এবং আসলে কথাটা যেটা বললাম, সেটাও যথার্থ প্রমাণীত হয়েছে এজন্য, কারণ এখানে দেখলাম যে, জেনারেল আমান সাহেব সস্ত্রীক উপস্থিত আছেন।
আর অসুস্থতাটা কী হয়েছে তাও বুঝি না। কারণ, এখানে আমাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এখান থেকে বক্তব্য দেওয়ার পরেই আমাকে সিএমএইচ-এ নিয়ে যাওয়া হবে। আমার সবচে’ বেশি সমস্যা উঠতে-বসতে-শুইতে। আর কাশি দিলে বুকের মধ্যে এবং পিঠেও কিছু ব্যাথা পাই। অনেকে মনে করে বুকের ব্যাথা, এটা হার্টেরও হইতে পারে! তবে আমার একটা বিশ্বাস এটা হার্টের হবে না। কারণ হল বিয়ে করেছি অনেকদিন পূর্বে। এক পঞ্চাশ বছর। বিয়ের পর থেকেই এই ভদ্রমহিলা বলে, আমি নিষ্ঠুর নির্দয় এবং ইংরেজিতে বলার সময় বলে, আমাকে হার্টলেসও বলা হয়ে থাকে। সুতরাং আমার যদি হার্ট নাই থেকে থাকে, যেখানে আমার হার্টই নাই, হার্ট নিয়ে আমার কোনো সমস্যা থাকার কথা না। আপনাদের, ইতিমধ্যে শুনছি, এই অনুষ্ঠানের পরপরই একটা নাকি কনসার্ট হবে। কনসার্টকে সামনে রেখে এই ধরনের কথা বার্তা ভাল্লাগার কথা না। তবে আমরা তো পুরনো দিনের মানষ, যার জন্য কনসার্টে বলে, মেলায় যাবে গো, যাবে গো যাবে গো। এগুলো ভালো লাগে না। আমরা, সেই পুরনো দিনের গান আমাদের কাছে ভালো লাগে। সুতরাং আপনাদের কাছে, বিশেষ করে এখন যারা ছাত্র-ছাত্রী সবাই, তাদের কাছে আবার কনসার্ট খুব ভালো লাগে। যাই হোক, আমার সাড়ে তিন পৃষ্ঠা, যেটা পাঠ করার জন্য আমি আদিষ্ট হইয়াছি, সেইটুকু আমি পড়িতেছি…।’ [সূত্র : ইউটিউব ভিডিও ফাইল]

রাষ্ট্রপতির এই বক্তব্যের ভিডিও ইউটিউব থেকে দেখতে পারেন। দেখবেন সবাই কী পরিমাণ হাসছেন। এমনকি রাষ্ট্রপতি যখন বলেন আমার বুকে-পিঠে ব্যথা, তখনও উচ্চশিক্ষিতরা হাসতে থাকেন। তারা কেউ রাষ্ট্রপতির বক্তব্যের গভীরে গেলেন না। রাষ্ট্রপতি এদিন বেশ কিছু অভিযোগ তুলেছেন। তিনি বলেছেন, তার অনিচ্ছাসত্ত্বেও তাকে এক প্রকার চাপ দিয়েই এখানে আনা হয়েছে। এমনকি তার কি হয়েছে তা তিনি স্পষ্ট না।

তিনি বলেছিলেন, তাকে সমাবর্তন শেষে সিএমএইচে নেয়া হবে। যদিও আদৌ তাকে কোথায় নেয়া হয়েছে, তার এখনো কোনো খবর নেই। শারিরীক অসুস্থতার কথা তিনি বললেও সরকারের কোনো সূত্র এখনো তাকে কোনো হাসপাতালে ভর্তির খবর জানায়নি। ওই দিনই সিএমএইচে ভর্তি হবার কথা নিজ মুখে জানিয়ে দেন তিনি। যা কারো জানার কথা না। কিন্তু পরে দেখা গেল সে সম্পর্কে সবাই চুপ মেরে গেছে। তার বুকে পিঠে ব্যথার ভিন্ন কোনো কারণ আছে কিনা, তাও পরিষ্কার নয়। রাষ্ট্রপতি কিছুটা হেয়ালির সুরেই কথাগুলো বলে গেছেন। কিন্তু দুই সপ্তাহের ব্যবধানে তিনি যে মনের সুখে দুই-দুইবার নিজের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে বিষোদগার করেননি, তা সবার কাছে স্পষ্ট। এ থেকে এটাও পরিষ্কার যে, রাষ্ট্রপতি স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারছেন না। জনসমক্ষে এর চেয়ে বেশি কড়া করে এসব কথা বলা তার পক্ষে সম্ভব নয়। এজন্যই হয়তো হাস্যরসের ছলে দেশবাসীকে নিজের গৃহবন্দীত্বের সম্পর্কে বার্তা দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি।

সমাবর্তন অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতির ভাষণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি অনুষ্ঠান। শিক্ষার্থীরা এদিন সফল কোনো মানুষের কাছ থেকে অনেক দূর যাবার প্রেরণা হিসেবে কিছু শুনতে যান। কিন্তু রাষ্ট্রপতি তার সেই শিক্ষামূলক চরিত্র থেকে বেরিয়ে ফান করার মতো করে কথা বলতে থাকেন। এটা নির্দেশ করে যে, হয়তো মানসিকভাবেও তিনি পুরোপুরি সুস্থ্য নন। নইলে এরকম গুরুত্বপূর্ণ একটা অনুষ্ঠানে এসে এসব কথা তার মতো একটা পদে বসা মানুষ কেন বলবেন? তিনি কেন খেয়াল করছিলেন না যে, ছাত্ররা তার শরীর খারাপের কথা শুনেও হাসছে! তাছাড়া ওই বক্তব্যে আরো নানা ধরনের অসুস্থতার কথা তো রাষ্ট্রপতি নিজেই বলেছেন।

অদ্ভুত বিষয় হলো বাংলাদেশের প্রধান ধারার দৈনিক পত্রিকা ও টিভি চ্যানেলগুলো রাষ্ট্রপতির এ বক্তব্য চেপে গেছে। কারণ এই খবর ব্যাপক প্রচার হলে বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থার দুর্বলতা প্রকাশ পাবে। এজন্য পত্রিকাগুলো উদ্যোগী হয়ে কিংবা হয়তো রাষ্ট্র দ্বারা আদিষ্ট হয়েই খবরটি চেপে গেছে। এমন মুখরোচক সব কথা কেন এড়িয়ে যাওয়া হলো, যে কেউই তা সহজেই বুঝতে পারার কথা। দেশের শীর্ষ দৈনিক প্রথম আলোর এ বিষয়ক খবরে দেখুন রাষ্ট্রপতির এসব কথা পুরোপুরি এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক মাধ্যমগুলোও এই খবরকে সামনে আনেনি। আর তরুণ সমাজ এটাকে নিয়েছে মজার বিষয় হিসেবে।

বাস্তবে এ ধরনের কথা পৃথিবীর অন্য কোনো দেশের রাষ্ট্রপতি বললে, সে দেশের বিচার ব্যবস্থা নিশ্চয়ই উদ্যোগী হতো। রাষ্ট্রপতির বাস্তব অবস্থা কি তা জানতে চাইতো। কিন্তু আমাদের দেশে সবাই মিলে এরকম একটা গুরুত্বপূর্ণ খবরকে চেপে যাচ্ছে। এমন হলে রাষ্ট্রপতি আসলে কি অবস্থায় আছেন, তা জানা কোনোভাবেই সম্ভব হবে না। সবাইকে রাজনৈতিক বিষয়াদিকে আরো গুরুত্বের সঙ্গে দেখার আহবান জানাচ্ছি।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৮ thoughts on “রাষ্ট্রপতি কি মানসিক সমস্যাগ্রস্ত, নাকি গৃহবন্দী?

  1. আপনি যতটা সিরিয়সলী নিছেন
    আপনি যতটা সিরিয়সলী নিছেন বিষয়টা, এটা কি আসলে অতটা? এই ধরনের হাস্য-তামাসা উনি সংসদে আগেও করেছেন। কি জানি ভাই, ঘর পোড়া গরু সিঁদূরে ভয় অবস্থা হয়ে গেল নাকি!

  2. হাস্যকর পোষ্ট। রাষ্ট্রপতির
    হাস্যকর পোষ্ট। রাষ্ট্রপতির একটা ভাষণ শোনার সৌভাগ্য একবার হয়েছিলো আমাদের একটা কনফারেন্সের চীফ গেস্ট হিসেবে উনি আসায়। সেদিনও উনি শুরুটা এভাবেই করেছিলেন। উনি মূলত এই লিখিত বক্তব্য দেওয়ার বিষয়টাকে ব্যক্তিগতভাবে খুব একটা পছন্দ করেন না বলেই মনে হয়েছিলো। কিন্তু প্রটোকল রক্ষার্থে উনাকে এটা করতেই হয়। উনার মানসিক কোন সমস্যা আছে বলেও মনে হয়নি। ইউটিউবে না শুনে অনুষ্ঠানে সামনাসামনি উপস্থিত থাকলে যে কেউই উনার চরম রসবোধের এবং সরল মনের পরিচয় পাবেন এবং নির্দোষ দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টা উপভোগ করবেন বলে আমার ধারণা। এটাকে এতো সিরিয়াসলি নিয়ে বিশাল পোষ্ট দিয়ে ফেলেছেন দেখছি।

  3. ওনার কথাবাত‍র্া (বিশেষ করে
    ওনার কথাবাত‍র্া (বিশেষ করে স্পিকার থাকাকালীন সময়ে) বেস রসালো মনে হতো আগে থেকেই, তাই বিষয়টা নিয়ে অত জটিল ভাবছি না! আবার হতেও পারে অভ্যন্তরীন কিছু, কারণ বাঙলাদেশেতো রাষ্ট্রপতিরা পুতুল টাইপেরই :কনফিউজড:

    1. আমার মনে হয়, গুরুত্বের
      আমার মনে হয়, গুরুত্বের জায়গাটা এখানে যে, তিনি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে দুই দুইবার বললেন। অসুস্থতা সত্ত্বেও তাকে এখানে আনা হয়েছে, এটা বললেন। এও দাবি করলেন যে, রাষ্ট্রপতি নিষ্কর্মা, তার কিছু করার নেই। এ বিষয়গুলো প্রমাণ করে যে, তিনি সুবিধাজনক অবস্থানে নেই। এর পেছনে কিছু আছে।

  4. কি আর বলি! হোয়াইট হাউজে থাকা
    কি আর বলি! হোয়াইট হাউজে থাকা প্রেসিডেন্ট মহাশয়রাও তাঁদের অতিরিক্ত নিরাপত্তা নিয়ে নানান সময় দুঃখ প্রকাশ করেছেন। সারাদিন কি করতে হবে, কোথায় যেতে হবে, কি খেতে হবে, কি বলতে হবে সব কিছু নাকি অন্যলোকে ঠিক করে দেয়। বড় মানুষের বড় কষ্ট! আমি সারাদিন কি বলি, না-বলি, খাই, না-খাই, করি, না-করি তাঁর খোঁজ কে নেয়!

  5. বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পুতুল
    বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পুতুল বৈ কিছু না। পুতুলের কথার কোনো মুল্য দিতে যাবেন না। আপনিও পাগলের দলে ভিড়বেন। অন্তত উপরের মন্তব্যগুলো তাই নির্দেশ করে। আমি কিছু বলবো না।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

73 + = 82