কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি।

ঢাকার শাহবাগে ফেব্রুয়ারী মাসের ৫ তারিখ থেকে যে আন্দোলন চলছে তা একটি দিক নির্দেশনা। একাত্তরের ক্ষত মুছে দেবার কঠিন প্রত্যয়ে এ যেন এক নতুন লড়াই। এই তরুণদের অনেকেই মুক্তিযুদ্ধ দেখেনি, কিন্তু সকলেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করে মনে প্রাণে। কলকাতা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সবথেকে বড় সহোদর, এ শহর জানে মুক্তিযুদ্ধের সবকিছু। এ শহর আগলে রেখেছিলো ওপার থেকে ভেসে আসা সব হারা স্বজনদের।

শাহবাগের আন্দোলন একটি ধর্মনিরপেক্ষ, গনতান্ত্রিক এবং মুক্তমনের তরুণ ছাত্র-যুবকদের মহা সম্মেলন। এই আন্দোলন থেকে প্রবল দাবি উঠেছে একাত্তরের ঘাতক দালাল যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায় ফাঁসি দিতে হবে। অভিযুক্তদের জন্য ফাঁসিকাষ্ঠই চূড়ান্ত বলে মনে করছেন শাহবাগের প্রজন্ম। ফাঁসির রায় ভিন্ন অন্য কোনো রায় তারা মানেন না।

বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল ১৯৭১ সালে যুদ্ধাপরাধের বিচার করছেন। এই ট্রাইবুনাল বলছেন একাত্তর সালে তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানে যে গণহত্যা হয়েছিলো তা ছিল মানবতার বিরুদ্ধে পরিকল্পিত এবং সংঘঠিত অপরাধ। তাই এর নামকরণ করা হল ‘মানবতা বিরোধী অপরাধ’। এই অপরাধে যাদের বিচার হচ্ছে তাদের কে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের জন্য বিচার করছেন বাংলাদেশের মানবতা বিরোধী অপরাধ ট্রাইবুনাল। এই ট্রাইবুনাল গঠিত হয়েছে ১৯৭৩ সালে গঠিত দালাল আইন সংশোধন করে। বলা হয় এটি একটি আধুনিক বিচার ব্যবস্থার সনদ, এখানে আপিলের সুযোগ রয়েছে উভয় পক্ষের। এই দালাল আইন রচিত হয়েছে স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে ১৯৭৩ সালে। সেই আইনে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী এবং তার দেশীয় সহযোগীদের বিচারের বিধান ছিলো। ১৯৭৩ সালে এই আইনের অধীনে ৩৬ হাজার অভিযুক্ত কারাবন্দী ছিল, তবে যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া যায়নি তাদের কে ‘সাধারণ ক্ষমা ঘোষনা’ করেছিলেন তৎকালীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছিল, হত্যা, ধর্ষণ, লুটতরাজ, অগ্নিসংযোগ তাদের সংখ্যা ছিল ১১ হাজার। এই ১১ হাজার অপরাধীর বিচার কার্য পরিচালনা করছিলেন সেই সময়ের দালাল আইন ১৯৭৩। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান সপরিবারে নিহত হলে এক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটে বাংলাদেশে এবং এই কারাবন্দী অভিযুক্তদের মুক্ত করে দেওয়া হয়। আজ যাদের বিচার চলছে এদের মধ্যে অনেকেই সেই সময় আত্মগোপন করেছিল, কেউ কেউ স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে পাকিস্তান চলে গিয়েছিল সেখান থেকে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে। ১৯৭৫ সালের এই পটপরিবর্তনের পর দেশে একটা নতুন রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় বসে। তখন আত্মগোপন করে থাকা এই অভযুক্তেরা একে একে বাংলাদেশে ফিরে আসে এবং একাত্তর সালের কর্মকান্ডের জন্য খোয়া যাওয়া বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ফিরে পায়। নিষিদ্ধ হওয়া রাজনৈতিক দল জামায়াত-ই-ইসালামী পুনরায় রাজনীতি করার অনুমোদন পায়। এমনই ছিল মানবতা বিরোধী অপরাধে বর্তমানে যাদের বিচার চলছে তাদের পুনর্বাসনের কালানুক্রম। এখানে আরো একটা বিষয় বলা খুব প্রয়োজনীয় যে, আজ যারা এই বিচারের বিরোধীতা করছে তারা প্রচারণা করে যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান ‘সাধারণ ক্ষমা ঘোষনা’ দিয়ে সবাই কে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। এত বছর পর আজ আবার কেন এই বিচার? এখানে উল্লেখযোগ্য যে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান সবাইকে ক্ষমা করেননি, বিষেষ করে সেই ১১ হাজার বিচারাধীন অভিযুক্তকে ক্ষমা করেন নি।

মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্তেরা এবং তাদের বর্তমান রাজনৈতিক দল জামায়াত-ই-ইসলামী শাহবাগের এই আন্দোলনের আগুনে ভীত। তারই ফলশ্রুতিতে হত্যা সহ নানা রকম নাশকতা শুরু করে দিয়েছে ইতিমধ্যে। চলছে হরতাল-ঘর্মঘট, ধর্মঘটীদের লাগানো আগুনে পুড়ছে ট্রেন-গাড়ি-বাস-দোকান-পাওয়ার স্টেশন। পোড়ানো হচ্ছে ঘর-বাড়ি-মন্দির-মসজিদ, সঙ্গে চলছে শারীরিক নির্যাতন, প্রকাশ্যে হত্যা এবং গুপ্ত হত্যা। গত কয়েকদিনে মৃতের সংখ্যা ৭০ ছাড়িয়ে গেছে। এর মধ্যে যেমন ধর্মঘটের সমর্থক আছে, আছেন শাহবাগ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত মুক্তচিন্তার তরুণ, তেমনই আছেন সাধারণ মানুষ এবং আইন রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।

ধর্মীয় দৃষ্টিতে এই আন্দোলনকে নাস্তিক-মুরতাদ-কাফের দের আন্দোলন বলে শাহবাগের তরুণদের বিরুদ্ধে চলছে বিষোদ্গার। কিছু দৈনিক পত্রিকা এবং টিভি চ্যানেল মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে শাহবাগের আন্দোলনের। প্রচারণা চলছে ফেসবুক টুইটারের মত সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমেও। সারাদেশে একটা ধর্মীয় উন্মাদনা জাগিয়ে তোলার জন্য হরেক কর্মসূচি নিয়েছে অভিযুক্তদের পক্ষে দাঁড়ানো জামায়াত-ই-ইসলামী এবং বাংলাদেশ জাতীয়তবাদী দল। তবে শাহবাগের তরুণ প্রজন্ম এই আন্দোলন এক অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ বুদ্ধি সম্পন্ন মানুষের অস্তিত্বের লড়াই বলে অভিহিত করেছেন। একাত্তরে ঘাতকরা যা কিছু করেছিলো, ২০১৩ তে এসেও সেই একই কাজ করছে বলে দাবি করেছেন। কলকাতার দৈনিক পত্রিকায় সে সব ছাপা হয়েছে আমরা পড়েছি।

শাহবাগের তরুণ প্রজন্ম কেন ফাঁসির দাবী নিয়ে আজ মাঠে। ফাঁসিকেই সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে বেছে নিয়েছেন কেন। এ ছাড়া আর কোনো শাস্তি হতে পারেনা মানবতার বিরুদ্ধে যারা অপরাধ করেছে তাদের জন্য। সেই দাবি কতটা যুক্তিসঙ্গত সেটা বুঝে নিতে হবে সময়ের প্রয়োজনে। তারা বলছেন ১৯৭১ সালে আমার মা-বাবাকে যারা হত্যা করেছে আমরা তাদের ফাঁসি চাই। খুবই ন্যায়সঙ্গত এই দাবি এবং যে কেউই এর সমর্থন করতে দ্বিধা করেবেন না। আবার মৃত্যুদণ্ডকে সমর্থন করা যায় না, মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে ভাবার মত বিষয়। পৃথিবীতে মৃত্যুদন্ডের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি হচ্ছে। অনেকেই আছেন এর বিলুপ্তি চায়। এটাও একপ্রকার মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ বলে মনে করছেন মানবতাবাদী জনসাধারণ। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ থেকে ১৬ই ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের যে ইতিহাস লিপিবদ্ধ হয়েছে সেখানে সংখ্যাতত্ত্ব হল ৩০লক্ষ নিরস্ত্র মানুষকে নৃশংস ভাবে হত্যা করা এবং ৪ লক্ষ নারীর উপর অমানুষিক দৈহিক নির্যাতন। এছাড়াও আছে অগ্নি সংযোগ, লুটতরাজ, জোড় করে ধর্মান্তকরণ ইত্যাদি।

শাহবাগের লাখো কন্ঠ বলছে, শাহবাগে জড়ো হবার জন্য সরকার আমাদের বলে দেয়নি। আন্দোলন করার জন্য ভারত আমাদের মদদ দেয় নি। ঘাতকের বিচারের দাবি করার জন্য কেউ আমদের অর্থ দেয়নি। তবে হ্যা আমাদের মদদ দিয়েছেন শক্তি জুগিয়েছেন ৩০ লক্ষ শহিদের বিদেহী আত্মা। আমাদের সকলের কন্ঠকে এক সুরে বেঁধে দিয়েছেন আমাদের ৪ লক্ষ মা যাদের শরীরে ১৯৭১ এর নির্যাতনের দগদগে ঘা আজও শুকায়নি। ১৯৭১ এর গণহত্যায় যারা ইন্ধন যুগিয়েছে এবং সরাসরি যুক্ত তাদের ফাঁসির দাবি শাহবাগের তরুণ প্রজন্মের প্রাণের দাবি। সেটাই নাকি একজন রক্ত-মাংসের মানুষের স্বাভাবিক আচরণ হওয়া উচিত। এটাই ঘটেছে শাহবাগের তরুণদের মধ্যে এবং ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ছে দেশের বিভিন্ন অংশে। বাংলাদেশের কয়েকটি ইসলামী সংগঠনের পক্ষ থেকে সমর্থন জানিয়েছেন শাহবাগের আন্দোলনের। প্রকাশ্যে বিবৃতি দিয়েছেন সেই সব সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। তারাও এই বিচার চায় এবং ফাঁসিই হোক বিচারের রায়। ইতিমধ্যে এই ইসলামী সংগঠনগুলোর নেতৃবৃন্দকেও হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে। এমন অবস্থায় দু-একটি ছোটো ছোটো ঘটনার মধ্যদিয়ে জেনে নেওয়া যাক ১৯৭১ সালে অপরাধের মাত্রা কেমন ছিল। এই দু-একটি অপরাধ চিত্র দিয়ে সামগ্রিক অপরাধের বিস্তারিত বিবরণ ধারনা করা সম্ভব নয়।

‘সাংবাদিক রনেশ মৈত্রের একটি অনুসন্ধান থেকে জানা যায়, রংপুর ক্যান্টনমেন্ট এবং রংপুর আর্টস কাউন্সিল ভবনটি নারী নির্যাতনের জন্য ব্যবহার করা হত। এখানে বন্দী ছিল প্রায় একশ মেয়ে এবং প্রতিদিনই চলত নির্যাতন, যারা অসুস্থ হয়ে পড়ত তাদের হত্যা করা হত সাথে সাথেই। স্বাধীনতার পর আর্টস কাউন্সিল হলের পাশ থেকে বহুসংখ্যক মহিলার শাড়ি, ব্লাউজ, অর্ধগলিত লাশ এবং কঙ্কাল পাওয়া যায়। রংপুর থেকে প্রায় তিনশ-চারশ মেয়েকে ঢাকা এবং অন্যান্য স্থানে পাচার করে দেওয়া হয়, তাদের আর কোন সন্ধান মেলেনি’।

‘ঢাকা পৌরসভার সুইপার সাহেব আলীর ভাষ্যে ২৯ মার্চ তার দল একমাত্র মিটফোর্ড হাসপাতাল থেকে কয়েক ট্রাক লাশ উদ্ধার করে। তিনি আরমানিটোলার এক বাড়িতে দশ এগারো বছরের একটি মেয়ের লাশ দেখতে পান,সমস্ত শরীর ক্ষতবিক্ষত,জমাট বাঁধা ছোপ ছোপ রক্ত সারা গায়ে, এবং তার দেহের বিভিন্ন স্থানের মাংস তুলে ফেলা হয়েছিল।ধর্ষণ শেষে মেয়েটির দুই পা দু’দিক থেকে টেনে ধরে নাভি পর্যন্ত ছিড়ে ফেলা হয়েছিল’।

‘মুক্তিযুদ্ধ শেষে রায়েরবাজার বধ্যভূমি থেকে শহীদ বুদ্ধিজীবী আবদুল আলীম চৌধুরী এবং ফজলে রাব্বির লাশ অর্ধগলিত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছিল। লাশ সনাক্ত করার পর তাঁদের স্বজনেরা দেখেন, চক্ষু বিশেষজ্ঞ আলীম চৌধুরীর চোখ উপড়ানো এবং হৃদেরাগ বিশেষজ্ঞ ফজলে রাব্বির হৃৎপিণ্ড টেনে তোলা হয়েছে’।

‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যান বিভাগের ছাত্র ছাত্রীদের একটি গবেষণায় জানা যায় রাজশাহীর জুগিসশো গ্রামে মে মাসের কোন একদিন পাকবাহিনী ১৫ জনমহিলাকে ধর্ষণ করে এবং অন্যান্য নির্যাতন চালায়।এ অঞ্চলের ৫৫ জন তরুনীকেধরে নিয়ে যাওয়া হয়।বাঁশবাড়ীয়া গ্রামে পাকবাহিনী প্রায় দেড়শো জন বিভিন্ন বয়সী মেয়েকে ঘর থেকে বের করে প্রকাশ্যে ধর্ষণ করে। এদের মধ্যে ১০ জনের তখনই মৃত্যু হয়’।

শাহবাগের আন্দোলন শুরু হবার আগেই মানবতা বিরোধী অপরাধের বিচারে অভিযুক্ত আবুল কালাম আজাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকারের ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন মানবতা বিরোধী অপরাধ ট্রাইবুনাল। বাচ্চু রাজাকার পলাতক, কথিত তিনি তার পছন্দের পাকিস্তানে পৌছে গেছেন। এ পর্যন্ত সবকিছুই ঠিক ঠিক চলছিলো কিন্তু সমস্যা বাঁধলো অন্য একজন বিচারাধীন অভিযুক্ত কাদের মোল্লা’র বিচারের রায় ফাঁসি না হয়ে যখন যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হল। এই রায় মেনে নিতে পারেননি বাংলাদেশের মুক্তমনের মানুষ। ‘বিচারের এই রায় মানিনা, ফাঁসি দিতে হবে’ দাবি নিয়ে শাহবাগে জড়ো হতে থাকলেন তরুণ প্রজন্ম। একজন দুইজন করে লাখো তরুণের কন্ঠ মিলে গেল এক সুরে। তারপরতো সকলেরই জানা শাহবাগ এক নতুন ইতিহাস।

মৃত্যুদন্ডের বিরুদ্ধে আজ সারা পৃথিবীতে জনমত তৈরি হচ্ছে। মৃত্যুদন্ডকে আর সমর্থন করা যায় না কারণ সেও এক বর্বর হত্যাকান্ড। সভ্য সমাজের জন্য এই আইন ভয়ানক এবং মধ্যযুগের বর্বরতা। পৃথিবীর অনেক দেশে মৃত্যুদন্ডাদেশ রদ হয়েছে। অনেক দেশে এখনো বহাল আছে এই আইন। বিচার বিভাগ সেই সেই দেশের আভ্যন্তরীন বিষয়। বিচারে কে কি রায় দেবেন সম্পূর্ন সেই দেশের বিচারক, বিচারের নানাবিধ উপাদান সাক্ষ্য-প্রমাণ নির্ধারক বিষয়।

শাহবাগের আন্দোলন চলাকালীন অতি সম্প্রতি বাংলাদেশের মানবতা বিরোধী ট্রাইবুনাল আরো একজন বিচারাধীন অভিযুক্ত মাওলানা দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর বিচারের রায় দিয়েছেন মৃত্যুদন্ড। একাত্তর সালে বহু হতভাগ্য মানুষ সাঈদীর কাছে জীবন ভিক্ষা চেয়েও জীবনরক্ষা করতে পারেননি। সাঈদী সেই সব নিরস্ত্র মানুষদের পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দিয়েছে অথবা নিজ হাতে নৃশংস ভাবে হত্যা করেছে। তৎকালীন পিরোজপুর মহকুমার পুলিশ কর্মকর্তা ফয়জুর রহমান আহমেদকে কর্মস্থল থেকে ধরে নিয়ে গিয়ে মাওলানা দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর উপস্থিতিতে গুলি করে হত্যা করে লাশ নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। এই পুলিশ কর্মকর্তা ফয়জুর রহমান আহমেদ হলেন বাংলাদেশের জনপ্রিয় লেখক প্রয়াত হুমায়ুন আহমেদ এর পিতা।

বিচারের রায়ে বলা হয়, ‘সাঈদীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আনা হত্যা, অপহরণ, ধর্ষণ, নির্যাতন, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ, ধর্মান্তরিতকরণ ইত্যাদি ২০টি অভিযোগের মধ্যে আটটি অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। এছাড়া তার বিরুদ্ধে আনা ৬, ৭, ১১, ১৪, ১৬ ও ১৯ নম্বর অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হলেও এসব অভিযোগে তার ৮ ও ১০ নম্বর অপরাধের তুলনায় কম দণ্ড হয়। যেহেতু তাকে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে তাই ৬, ৭, ১১, ১৪, ১৬ ও ১৯ নম্বর অপরাধের কারণে তাকে অন্য কোনো শাস্তি প্রদান থেকে ট্রাইব্যুনাল বিরত থাকছে। যে দুই অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে আনা ৮ ও ১০ নম্বর অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন, ১৯৭৩ এর ২০ (২) ধারায় মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়েছে। আট নম্বর অভিযোগে বলা হয়, ৮ মে বেলা তিনটার দিকে সাঈদী ও তার দলের সদস্যরা চিথোলিয়া গ্রামের মানিক পসারির বাড়ি লুট করেন। এখানে পাঁচটি ঘরে কেরোসিন দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। মানিক পসারির ভাই ইব্রাহিমকে সাঈদীর প্ররোচনায় পাকিস্তানি সেনারা হত্যা করে এবং এবং তার লাশ পাশের একটি ব্রিজ থেকে ফেলা দেয়া হয়। এছাড়া মফিজ কুট্টিকে সেনা ক্যাম্পে নিয়ে অত্যাচার করা হয়। হিন্দু বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়। ধর্মীয় কারণে মালামাল লুট এবং বসতবাড়িতে অগ্নিসংযোগ মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। এছাড়া অপহরণ, হত্যা ও নির্যাতনও মানবতাবিরোধী অপরাধ। এ অভিযোগ প্রমাণে রাষ্ট্রপক্ষ মোট ৯ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করেছে। রাষ্ট্রপক্ষের এসব সাক্ষীর সাক্ষ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকারদের সঙ্গে সাঈদীও মানিক পসারির বাড়িতে যায়। সাক্ষীরা দেখেছেন, পাকিস্তানি সেনাদের দেখে ইব্রাহিম কুট্টি ও মফিজ উদ্দিন পসারি পালানোর সময় তাদের ধরে পাকিস্তানি সেনাদের হাতে হস্তান্তর করা হয়। পাকিস্তানি সেনারা ইব্রাহিম কুট্টিকে গুলি করে হত্যা করে। সাত নম্বর সাক্ষী মফিজ পসারি এ ঘটনার চাক্ষুষ সাক্ষী। তিনিই বলেন, রাজাকার বাহিনীর সদস্য দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী তাদের ধরে সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করে। এ সাক্ষীর বক্তব্য অবিশ্বাস করার মতো কোনো কারণ নেই। এ অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে বলা হয়, হত্যা, অপহরণ, নির্যাতন মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। ট্রাইব্যুনাল আইনের ২০ (২) ধারায় তাকে দোষী সাব্যস্ত করে দণ্ড দেয়া হচ্ছে’।

‘১০ নম্বর অভিযোগে বলা হয়, ২ জুন সকাল ১০টার দিকে সাঈদীর নেতৃত্বে সশস্ত্র দল উমেদপুর গ্রামের হিন্দুপাড়ার ২৫টি ঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়। সাঈদীর ইন্ধনে বিসাবলী নামের একজনকে নারকেল গাছের সঙ্গে বেঁধে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ অভিযোগের ঘটনায় রাষ্ট্রপক্ষ তিনজন সাক্ষীর সাক্ষ্য প্রমাণ হাজির করে। ১, ৫ ও ৯ নম্বর সাক্ষীর সাক্ষ্য প্রমাণ বিশ্লেষণ করে বলা হয়, সাঈদীসহ স্থানীয় রাজাকাররা উমেদপুর গ্রামে হিন্দুপাড়ায় হামলা করে। মূল্যবান জিনিসপত্র লুটপাট করে এবং ২৫টি বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে। এছাড়া বিসাবলী নামে একজনকে সাঈদীর আগ্রহে রাজাকাররা হত্যা করে। ৫ নম্বর সাক্ষী মাহতাবউদ্দিন হাওলাদার এবং ৯ নম্বর সাক্ষী আফতাব হোসেন হাওলাদার চাক্ষুষ সাক্ষী হিসাবে সাঈদীর উপস্থিতিও আগ্রহের ঘটনা ঘটেছে বলে সাক্ষ্য দিয়েছেন। হত্যা ও নির্যাতনসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় সাঈদী সংশ্লিষ্ট এটা প্রমাণ হয়েছে। এ অভিযোগে সাঈদীকে দোষী সাব্যস্ত করে বলা হয়, আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন ১৯৭৩ এর ২০ (২) ধারায় সাঈদীকে সর্বোচ্চ শাস্তি প্রদান করা হচ্ছে’।

এখন স্বভাবতই একটা প্রশ্ন জাগে মৃত্যুদন্ডাদেশের বিরুদ্ধে যে বিশাল জনগোষ্ঠী, সুশীল সমাজ, মানবাধীকার কর্মীরা আছেন। তাদের বিবেচনায় একাত্তরের মনবতা বিরোধী অপরাধের বিচারে কি শাস্তির বিধান হওয়া উচিত। কেন আজ ফাঁসির দাবিতে ঘর ছেড়ে রাস্তায় লাখো মানুষের এই আন্দোলন। অনেকেই মনে করেন বিচারে সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়া উচিত। তবে একটি দেশের স্বাধীন বিচার বিভাগ বিচারে যে রায় দেবেন সেটাই হবে চূড়ান্ত। যে দেশটি ৩০লক্ষ শহীদের ভারে ন্যুব্জ, ৪লক্ষ নারীর শরীরে অমানুষিক নির্যাতনের দগদগে ঘা নিয়ে ঘষটে ঘষটে চলছে একটি দেশ। পিতা-মাতাহারা সন্তানের আর্তি, সন্তান হারা পিতা-মাতার বেদনাময় জীবনযাপন। মানবতাবাদীদের কাছে এসবের মূল্য কতটুকু। সভ্য সমাজের কোন ইস্তাহারে লেখা আছে এদের সাথে মানবিক আচরণ করতে হবে এবং এই সব ঘাতকদের মৃত্যদন্ডাদেশ অমানবিক। এমন অনেক প্রশ্ন এবং এ সব কিছুই আজ শাহবাগের তরুণ প্রজন্মের কথা। তাদের এই স্পর্ধার কাছে মানবতাবোধ এবং তার অধিকার কখনো কোথাও হয়ত কিছুটা হলেও নতজানু। কারণ, যে ভয়াল অমানবিক ইতিহাস রচনা করেছে ১৯৭১ এর নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের এক একটি দিন-রাত। যে হিংস্র নৃশংস কালো অধ্যায়ের রচনা করেছে কতিপয় ঘাতক-দালাল। তাদের অপরাধের মাত্রা এতটাই ভয়ানক যে যাবজ্জীবন কারাদন্ড সেখানে লঘু শাস্তির নতুন উদাহরণ সৃষ্টি হবে। এখানে একটি উল্লেখযোগ্য এবং সময়োপযোগী দৃষ্টান্ত দেওয়া যেতে পারে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ন্যুরেমবার্গের আদালতে যখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শেষে মৃত্যুদন্ডাদেশ দেয়া হয় তখন ব্রিটিশ দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেলকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, ‘আপনি তো মৃত্যুদন্ডের বিরোধী, তাহলে ন্যুরেমবার্গ এই রায় সমর্থন করেন কি? বার্ট্রান্ড রাসেল জবাব দিয়েছিলেন, ‘ব্যক্তিগত হত্যার ব্যাপারে আমি মৃত্যুদন্ডের বিরোধী। কারণ অনেক সময় অনেক অপরাধী সাময়িক উত্তেজনা ও ক্রোধের বশে হত্যা করে। এক্ষেত্রে আমি কঠোর শাস্তি চাই। রাগের বশে বা প্রতিশোধ কামনায় হত্যাকান্ডে মৃত্যুদন্ড নয়। কিন্তু সমষ্টিগত যে হত্যাকান্ড, যা ঠান্ডা মাথায় পরিকল্পিতভাবে ঘটানো হয় এবং যে নিষ্ঠুর নির্যাতন থেকে নারী, শিশুও বাদ যায় না, তা ব্যক্তিমানুষের বিরুদ্ধে নয়, সমগ্র মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। এই অপরাধে মৃত্যুদন্ড লঘু শাস্তি’।

সুত্র ও সৌজন্য – প্রাত্যাহিক খবর, ১২ই মার্চ ২০১৩, কলকাতা।

http://epaper.pratyahik.com/PUBLICATIONS/PRATYAHIKKHABAR/PK/2013/03/12/ArticleHtmls/12032013006012.shtml?Mode=1

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি।

  1. বাস্তব ভিত্তিক তথ্য নির্ভর
    বাস্তব ভিত্তিক তথ্য নির্ভর লেখা। ভাল লিখেছেন, মানবাধিকার কর্মী বলে যারা নিজেকে দাবী করেন, তাদের অবশ্যই এই লেখা পড়ে নতুন করে ভাবতে হবে….

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 48 = 52