ব্রাহ্মণ পুত্র রাজা রামমোহন রায় এখন বাংলাদেশের কওমি মাদ্রাসার “ব্র্যান্ড এম্বাসেডর” । কিস্তি – ১

রাজা রাম মোহন রায় ছিলেন একজন কুলীন ব্রাহ্মণ পুত্র। পিতা এবং তাঁর পাঁচ পুরুষ মুঘল শাসকদের চাকুরে ছিলেন। জন্মের পর থেকেই মুসলিম আবহ দেখেছেন পাশ থেকে। প্রভাবশালী মুসলিমদের কে দেখেছেন খুব আছ থেকে। রাজা রাম মোহন রায় কে বাঙ্গালী জানে তাঁর বহুমাত্রিকতার জন্যে। তাঁর অনেকগুলো জীবনীর যেকোনো একটি পাঠ করলেই তাঁর বহুমাত্রিকতার পরিচয় পাওয়া যায়। পাঠের প্রতি ও নতুন বিষয় শেখার প্রতি এই রকমের অনুরাগ খুব কম বাঙ্গালীর দেখা গেছে।

বাংলা ব্লগ ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, সাম্প্রতিক সময়ে রাজা রাম মোহন রায় আবারো আলোচনায় উঠে এসেছেন। ইদানিং আমরা লক্ষ্য করছি বাংলাদেশের কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা কে জায়েজ করার জন্যে রাজা রামমোহন রায়ের নাম ব্যবহার করা হচ্ছে। অনেক টা “ব্র্যান্ড এম্বাসাডর” এর মতো। বাজার অরথনীতির এই যুগে, বোধ করি “ব্র্যান্ড এম্বাসাডর” এই বিষয়টি প্রায় সবাই জানেন। বিশেষ করে ব্লগ এর পাঠক সমাজ নিশ্চয়ই এই বিশয়টির সাথে পরিচিত। তবুও যদি দুই একজনের জানা না থাকে তাই বলছি। বাজার অর্থনীতিতে যখন কোনও পণ্য তাঁর নিজ গুনে বা নিজ বৈশিস্টের কারনে আর অধিক বিক্রি হতে চায়না বা যখন কোনও পণ্য তাঁর গ্রহণযোগ্যতা হারায় কিম্বা প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে, তখন সেই পণ্যটির জন্যে আলাদা করে সাপোর্ট দরকার হয় যেন তা বিক্রি করা সহজ হয়। প্রায়শই দেখা যায় প্রশ্নাতীত জনপ্রিয়তা বা পরিচিতি বা গ্রহণযোগ্যতা আছে এমন মানুষ কে বা আইকন কে যুক্ত করা হয় সেই পণ্যের সাথে। তাতে করে, সেই মানুষটির ইমেজ এর উপরে ভর করে আপাত অচল বা স্থির হয়ে থাকা পণ্যটি বাজারে আবারো গতি লাভ করে এবং মূল প্রতিযোগিতায় ফিরে আসে। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে কওমি মাদ্রাসার প্রাসঙ্গিকতা যখন বহু প্রশ্নে জর্জরিত, এই রকমের একটি সময়ে কওমি মাদ্রাসার কো-ব্র্যান্ডিং খুবই জরুরী। সেই জন্যেই দরকার হয় শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে প্রশ্নাতীত গ্রহণযোগ্যতা আছেন এমন কাউকে ট্যাগ করা এর সাথে। আমাদের কতিপয় বিশিষ্ট কওমি মাদ্রাসা প্রেমিক মানুষ এই কাজটি খুব নিষ্ঠার সাথে করে যাচ্ছেন। আর তাঁরা ব্র্যান্ড এম্ব্যাসাডর হিসাবে বেছে নিয়েছেন, বাংলার রেনেসাঁর অগ্রদূত রাজা রাম মোহন রায় কে।রাজা রামমোহনের যেহেতু কপিরাইট এর প্রশ্ন নেই, সুতরাং সমস্যা কোথায় তাঁকে ব্যবহার করতে?

প্রথম প্রসঙ্গ

মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা, বিশেষ করে কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা কি সার্বজনীন? অংশগ্রহন মূলক? মুসলমান – হিন্দু – বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ধর্ম নির্বিশেষে সবাই কি এই শিক্ষা ব্যবস্থায় পাঠ গ্রহন করতে পারেন?

সাম্প্রতিক মাদ্রাসা প্রেমীদের যুক্তি হচ্ছে – রাজা রামমোহন রায় যেহেতু পাটনা মাদ্রাসায় পড়েছিলেন, সেহেতু আজো বাংলাদেশের কওমি মাদ্রাসা গুলোতে হিন্দু – বৌদ্ধ-খ্রিস্টান বা বিধর্মীদের পড়তে কোনও বাধা নেই। এদের যুক্তি হচ্ছে – পাটনা মাদ্রাসায় পড়ার কারনেই রাজা রাম মোহন রায় এই রকমের জ্ঞানী-গুনী-মুক্তমনা – অগ্রসর সমাজ সংস্কারক হতে পেরেছিলেন। এদের যুক্তি হচ্ছে পাটনা মাদ্রাসায় পড়ে বাংলার রেনেসাঁর নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। এদের যুক্তি হচ্ছে হিন্দু ব্রাহ্মণ পুত্র রাজা রাম মোহন রায় যেহেতু পাটনা মাদ্রাসায় পড়েছিলেন, পাটনা মাদ্রাসা যেহেতু সেকুলার ও সবার জন্যে উন্মুক্ত ছিলো ছিলো সেহেতু আজকে ২০১৫ সালে কওমি মাদ্রাসাগুলোও দারুন সেকুলার ও উন্মুক্ত।

পাঠকের কাছে প্রশ্ন, রাজা রামমোহন রায় ১৭৮০ সালে পাটনা মাদ্রাসায় পড়েছিলেন, এটা কি প্রমাণ করে যে, আজকে ২০১৫ সালেও বাংলাদেশের কওমি মাদ্রাসা গুলোতে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ছেলে মেয়েদের পড়ার সুযোগ আছে? কিম্বা আজকের কওমি মাদ্রাসা গুলোতে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ছেলে মেয়েরা কি পড়ে?

আমার ধারনা, বেশীর ভাগ পাঠক হয়ত আমার প্রশ্ন টা শুনে হাসাহাসি করবেন, ভাববেন আমি প্রলাপ বকছি। কিন্তু আমি তা করছি না। আমি সত্যিই এই প্রশ্নটি করেছিলাম। বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও ব্লগার পিনাকী ভট্টাচার্য কে – “বাংলাদেশের মাদ্রাসা গুলোতে কি হিন্দু ছাত্ররা পড়তে পারে?”

এই প্রশ্নটি আমি করেছিলাম, মাদ্রাসা শিক্ষা বা যেকোনো ধর্মভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা যে সার্বজনীন বা inclusive নয় সেই বিষয়টি তুলে ধরার জন্যে। কিন্তু পিনাকী ভট্টাচার্য যেহেতু পন্ডিত মানুষ, তিনি তো একজন সাধারণ মানের পাঠকের প্রশ্নে বিহ্বল হবার পাত্র নন, তাই তিনি আরেকজন পন্ডিত মানুষের শরণাপন্ন হন এই প্রশ্নের উত্তর খোজার জন্যে।তিনি এবং আরেকজন পন্ডিত মানুষ বিশিষ্ট লেখক, শিক্ষক সৈয়দ মবনু মিলে এর একটি উত্তর বাতলে দেন আমাদেরকে।

তাঁদের উত্তরটি ছিলো এরকমেরঃ

হ্যা, বাংলাদেশের কওমি মাদ্রাসা গুলোতে হিন্দু ছাত্ররা পড়তে কোনও বাধা নেই, কারন রাজা রাম মোহন রায় এক সময় পাটনা মাদ্রাসায় পড়েছিলেন। যেহেতু রাজা রামমোহন রায় এক সময় ১৭৮০ সালে পাটনা মাদ্রাসায় পড়েছিলেন, সেহেতু আজো বাংলাদেশের কওমি মাদ্রাসায় হিন্দু ছাত্ররা পড়তে পারে।

কওমি মাদ্রাসায় হিন্দু ছাত্ররা পড়তে পারে কিনা সেই প্রশ্নে পিনাকী ভট্টাচার্য ও সৈয়দ মবনু এই রকমের একটা উত্তর নিয়ে আসতে পারতেন – “হ্যা হিন্দু ছাত্ররা কওমি মাদ্রাসায় পড়তে পারে, দেশের ৫০ হাজার মাদ্রাসার মধ্যে তিন হাজার মাদ্রাসায় মোট সাত হাজার চারশো হিন্দু ছেলে মেয়ে পড়াশুনা করছে”। অর্থাৎ বাস্তব তথ্যভিত্তিক উত্তর দিতে পারতেন। তা না দিয়ে তাঁদের কে ফিরে যেতে হয়ে ১৭৮০ সালে, রাজা রামমোহন রায়ের কাছে।

পাঠকের কাছে প্রশ্ন, কেনও এই প্রশ্নটির উত্তর দেবার জন্যে পিনাকী ভট্টাচার্য ও সৈয়দ মবনু কে ১৭৮০ সালে ফিরে যেতে হলো? কেনও ২০১৫ র তথ্য দিয়ে উত্তর টা দেয়া গেলোনা?

পাঠক ভেবে দেখবেন। আপাতত আমার ভাবনা টি লিখি – কারন তাঁদের জন্যে ১৭৮০ সালে ফিরে যাওয়াটাই আরামদায়ক ছিলো। আমি জানিনা যে তাঁরা ২০১৫’র তথ্য দিয়ে এর উত্তর দিতে পারেন কিনা। তাঁরা উত্তরটি দেন নি, এটাই হচ্ছে সত্য ঘটনা এবং তাঁদের কস্ট করে স্বর্গ থেকে রাজা রামমোহন রায় কে টেনে মর্তে নামাতে হয়েছিলো। তবুও যদি উত্তর টা সৎ ও সত্যনিষ্ঠ হতো, তাহলেও একটু সস্তি পেতাম, উত্তর টি চতুর, কৌশলী। কেনও তাঁদের উত্তরটিকে চতুর ও কৌশলী বলছি, নিচের দুই সেট প্রশ্ন তা ব্যাক্ষা করবে।

১ – জমিদারপুত্র রাজা রাম মোহন রায় যখন পাটনা মাদ্রাসায় গিয়েছিলেন, তিনি কি কি পড়তে গিয়েছিলেন সেখানে? কেনও পড়তে গিয়েছিলেন সেখানে? সেই প্রেক্ষিত ও শর্তগুলো কি আজো আমাদের কোমলমতি মাদ্রাসাগামী বাচ্চাগুলোর জন্যে প্রযোজ্য? আজো কি জমিদারপুত্র রা কওমি মাদ্রাসাতেই পড়তে যাচ্ছেন? না যেয়ে থাকলে, কেনও যাচ্ছেন না?

২ – রাজা রামমোহন রায় পাটনা মাদ্রাসায় গিয়েছিলেন। প্রাতিষ্ঠানিক চরিত্র, গুনগত দিক ও শিক্ষা দর্শনের দিক থেকে সেই সময়ের পাটনা মাদ্রাসা আর আজকের কওমি মাদ্রাসা কি একই ধরনের প্রতিষ্ঠান? আজকের কওমি মাদ্রাসা কি আদৌ ভারতবর্ষের মূল ধারার মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতিনিধিত্ব করে?

পিনাকী ভট্টাচার্য বা সৈয়দ মবনুর মতো পণ্ডিতবৃন্দ এই সকল প্রসঙ্গ চেপে যান, চেপে যেতে ভালোবাসেন, চেপে গিয়ে ভয়ংকর অতি সরলীকরন করেন এই ভাবে যে – যেহেতু রাজা রামমোহন রায় এক সময় মাদ্রাসায় পড়েছিলেন, সুতরাং আজো হিন্দু – বৌদ্ধ- খ্রিস্টান সহ বিশ্বাস নির্বিশেষে সকল বিধরমীরা কওমি মাদ্রাসায় পড়তে পারে। ভয়ংকর সরলিকরন এর আরেকটা ফর্ম হচ্ছে – যেহেতু রাজা রাম মোহন রায় পরবর্তীতে বাংলা রেনেসাঁর নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাঁর এই নেতৃত্বের কারন হিসাবে যুক্ত মাদ্রাসা শিক্ষাকে যুক্ত করে দেয়া, অর্থাৎ মাদ্রাসায় পড়ার কারনেই রামমোহন রায় হয়ে উঠেছিলেন সমাজ সংস্কারক রাজা রামমোহন রায়।

আমরা এই দুইটি ক্ষতিকর সরলীকরন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবো।

ব্লগে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বার বার করে তাঁদের এই যুক্তিগুলো ঘুরে ফিরে বেড়াচ্ছে। কখনো নাস্তিক ঠ্যাঙ্গানোর জন্যে, কখনো সেকুলার লেখকদের কে বাঁশ দেবার জন্যে আবার কখনো বা রিজওয়ানা চৌধুরী বন্যার মতো গুনী শিল্পীদের হেনস্থা করবার জন্যে।

আমি এই ব্লগ পোস্ট টি লিখতে শুরু করলাম তিনটি উদ্দেশ্য নিয়ে –

১ – রামমোহন রায় ও মাদ্রাসা শিক্ষা নিয়ে এই সকল ভয়ংকর ও চতুর সরলীকরন কে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করা, এ প্রসঙ্গে সত্যনিষ্ঠ গবেষকবৃন্দ কি বলেন তা উল্লেখ করা।

২ – মাদ্রাসা শিক্ষার “ঐতিহ্যের” কথা বলে যারা এই শিক্ষা ব্যবস্থার মহিমা গাইছেন, এবং প্রায় ৫০ লক্ষ্ হতদরীদ্র শিশুকে এই অচল শিক্ষা ব্যবস্থার নিগড়ে বেঁধে রাখছেন, তাঁদের শ্রেনী চরিত্রটি ব্যাক্ষা করা।

৩ – মাদ্রাসা শিক্ষার ইতিহাসের তিনটি কাল পর্ব – প্রাক-কলোনিয়াল, কলোনিয়াল এবং আধুনিক সময়ের মাদ্রাসা শিক্ষার বিবর্তন সম্পর্কে লেখা। এর মধ্যে দিয়ে দেখা যাবে কি করে এক সময়ের অত্যন্ত অগ্রসর একটি শিক্ষা ব্যবস্থা পসচাদপদতার গহ্বরে বিলীন হয়ে গেলো।
সকল প্রশ্ন, সংশয়, মন্তব্য কে স্বাগত জানাচ্ছি।

যেহেতু প্রসঙ্গটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও ব্লগ এলাকার, তাই লিংক, স্ক্রিনশটস ব্যবহার করা হবে যথাযথ প্রসঙ্গে।

(চলবে)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৮ thoughts on “ব্রাহ্মণ পুত্র রাজা রামমোহন রায় এখন বাংলাদেশের কওমি মাদ্রাসার “ব্র্যান্ড এম্বাসেডর” । কিস্তি – ১

  1. খুব ভাল লেখা।যদ্দুর জানি-
    খুব ভাল লেখা।যদ্দুর জানি- রামমোহব রায় জাতপ্রথাবিরোধি আন্দোলনের অন্যতমম পুরোধা।কোরান পড়ার পর এর বিষয়বস্তু তার আগ্রহ জন্মালে তিনি ইসলাম সম্পর্কে জানেন।তাছাড়া তিনি ছোটবেলায় মক্তবে পড়েছিলেন।কিন্ত তিনি তীব্রভাবেই হিন্দুধর্ম মানতেন।কিন্ত এর কুসংস্কার গুলো মানতেন না।আর পিনাকি সাহেবকে নতুন করে চিনার কি দরকার? ইস্টিশনে উনি লেখেন কিনা জানি না।উনি নিজে আলোচনায় অংশ নিলে আলোচনা জমত।পরবর্তী পর্বের অপেক্ষায় রইলাম

  2. পিনাকি হইল কাইক্ক্যা মাছের
    পিনাকি হইল কাইক্ক্যা মাছের মত। তারে ধরার জন্য সুন্দর উপস্থাপনা। পরবর্তী পর্বের অপেক্ষায় থাকলাম।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 33 = 34