‘এটা চিটিং, তুমি ম্যাথ শেখাচ্ছো’

স্কুল থেকে বাসা একটু দূরে এমন সব মধ্যবিত্ত বাঙ্গালী পরিবারের পিতা বা মাতার অন্যতম দ্বায়িত্ব একটা হচ্ছে বাচ্চাদের স্কুলে নিয়ে যাওয়া এবং নিয়ে আসা। অন্ততঃ একটা বয়স পর্যন্ত। তারই অংশ হেসেবে আজকে আমি বাচ্চাকে আনতে স্কুলে গিয়েছিলাম। গিয়ে দেখি, দুই সন্তানের একজনের ছুটি হয়েছে, অন্যজনের হয় নি। ফলে অপেক্ষা। ছোটজন এসে বলল, আব্বু, ক্যান্টিনে আট টাকা বাকী আছে।
বললাম কি কিনেছিলি?
ও তাঁর ব্যাখ্যা শুরু করলো। ওর কাছে দশ টাকা ছিল। তা দিয়ে প্রথমে পাঁচ টাকার ঝালমুড়ি কিনেছে। এরপর আরও তিন টাকার ঝালমুড়ি কিনেছে।
আমি জিজ্ঞেস করলাম তাহলে কত খরচ করেছো?
টপাটপ বলে দিল আট টাকা।
এরপর তুমি ঝালমুড়ি ওয়ালা কে দশ টাকা দিলে ও কত টাকা ফেরত দিয়েছিল?
বলল দুই টাকা। তারপর ক্যান্টিন থেকে একটা বল কিনেছি। বলের দাম দশ টাকা।
আর তুমি কত দিয়েছ?
দুই টাকা। তাহলে বাকী থাকে আট টাকা।
আমি বললাম, এখন বল আমি যদি ক্যান্টিনে বিশ টাকার নোট দিই তাহলে কত ফেরত দিবে?
ও হিসাব করে বলল, বারো টাকা। এর পরেই বুঝতে পারলো আসল ঘটনা। বুঝে বলল, এটা চিটিং। তুমি আমাকে ম্যাথ করাচ্ছো।
রাজনীতি বিদরা আমাদের মত নির্বোধদেরকে নিয়েও এমন সব মজার খেলা খেলেন। তাঁদের বুদ্ধিমত্তা আমাদের চেয়ে অনেক বেশী বলে আমরা প্রায়ই এসব খেলা ধরতে পারি না। আমরা যেন এই খেলা ধরতে পারি তাই একটি রাজনৈতিক দল অন্য আরেকটি রাজনৈতিক দলের খেলা বুঝিয়ে দিতে এগিয়ে আসেন। একদল খেলা শুরু করেন আর অন্য দল খেলার ব্যাখ্যা দেন।
গণজাগরণ মঞ্চ যখন শুরু হল প্রথমটায় সবাই হকচকিয়ে গেল। হিসাব কিতাব শুরু হল। কিভাবে সম্ভব হল? কে আছে এর পিছনে? এদের উদ্দেশ্য কি? এরপরে চিন্তা ছিল এতে লাফ কার হবে। লাভটা সরকারী দলের পকেটে যাচ্ছে দেখে বিরোধী দলের মোহ ভঙ্গ হল। এরপর একে একে সবাই ব্যাখ্যা হাজির করতে লাগলেন। বিরোধী দলের সর্বশেষ ব্যাখ্যা ছিল, ‘এটা চিটিং। এটা আসলে সরকারী দলেরই ষড়যন্ত্র, নিজেদের দুর্নীতি দুঃশাসন থেকে মানুষের দৃষ্টি সরানোর জন্য আর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবী না মানার জন্য ইচ্ছা করেই এই আন্দোলন তৈরি করা হয়েছে।’
কিছু সময় পার হওয়ার পরে গণজাগরণের বিপক্ষে আরেকটি শক্তিকে দাঁড় করানোর জন্য ‘নাস্তিকবাদ’ ‘কটাক্ষকারী’ এসব তকমা দিয়ে আরেকটি আন্দোলন শুরু করা হল। ‘হেফাজতে ইসলাম’। দারুণ সব জ্বালাও পোড়াও হল। মসজিদের গালিচা পোড়ান থেকে পুলিশ পেটানো। এরপর একদিন চাঁদে ছবি দেখার নাম করে একরাশ গ্রামবাসীকে জড় করা হল। তারপর এদের নিয়ে থানা ঘেরাও করা হল, পুলিশ মেরে ফেলা হল। গুলি চালাতে বাধ্য করা হল। পরিণতি আরও কিছু নিরীহ গ্রামবাসীর মৃত্যু। অবশেষে সবাই বুঝলো এই চাল, ‘এটা চিটিং, এঁরা আসলে জামায়াত। হেফাজতে ইসলামের ব্যানারে জ্বালাও পোড়াও আর পুলিশ খুন করছে’।
এর কিছুদিন আগেই মঞ্চের আনুষ্ঠানিক বিরতি ঘটেছিল একটা আল্টিমেটাম দিয়ে। এরপর স্মারক লিপি। এরপর বেজায় ধীরগতির এক নখদন্ত হীন কর্মসূচী। এসব দেখে আন্দোলনের একাংশ বলতে শুরু করলো, এটা চিটিং, এঁরা আসলে সরকারের কথামত চলছে। সরকার এই ইস্যুকে বাচিয়ে রাখতে চায় কিন্তু সমাধান করতে চায় না। তাই এই আন্দোলন নির্বাচন পর্যন্ত টেনে নিয়ে যেতে এসব হালকা কর্মসূচী দিচ্ছে। যেন এই ইস্যুতে বিরোধী দলকে ঝামেলায় ফেলা যায়।
তাই এমন সময় ‘রুমী স্কোয়াডে’র ব্যানারে শুরু হল আমরণ অনশন কর্মসূচী। আবার সেই ক্ষণিকের হকচকানো অবস্থা। এরপর ফেসবুক আর ব্লগে শুরু হলে খেলা বোঝানোর খেলা। ব্যাখ্যার পরে ব্যাখ্যা। বামদলগুলো আপ্রাণ বোঝানোর চেষ্টা করছে এটা আন্দোলনেরই একটা অংশ, আন্দোলনকে বেগবান করার জন্য কঠোর কর্মসূচী প্রয়োজন তাই এই কর্মসূচী। আর সরকারপন্থী আরেক দল বোঝাচ্ছে, এটা চিটিং, আন্দোলন হাইজ্যাক করার জন্য এটা বামপন্থীদের একটা চাল।‘
খুব সম্প্রতি শুরু হয়েছে সরকারের আরেক খেলা। ব্লগ বন্ধ করার খেলা। ‘আমার ব্লগ’ বন্ধ করা হয়েছে। তিনজন ব্লগারকে আটক করা হয়েছে। ‘আপত্তিকর’ লেখা কিংবা ‘ধর্মকে কটাক্ষ করে লেখা’ এই জাতীয় কিছু অজুহাত হয়তো আনা হবে। সরকারে উদ্দেশ্য নিয়ে এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে ব্যাখ্যা দেয়ার খেলা। বলছে এটা বাক স্বাধীনতা বন্ধের সামিল। অনেকেই বলতে শুরু করেছেন, এটা চিটিং, আসলে সরকার বিরোধী লেখালেখির জন্য এই খেলা।
আমরা, জনগণ কি খুব বোকা? কে, কেন, কি করছে তা বিবেচনা করার ক্ষমতা কি সত্যিই আমাদের নেই? সেই কবে থেকে আমাদের রাজনীতির চালচিত্র শেখানো হচ্ছে। আরও কতদিন এমন চলবে কে জানে। পুলিশের মাথা থেঁতলে বলা হবে, গনতন্ত্রের জন্য এটা জরুরী ছিল। বিশ্বজিৎ কে কুপিয়ে বলা হবে শিবির সন্দেহ করলে যাকে খুশী এভাবে কোপানো যায়।
এসব মিথ্যা যুক্তি না শুনিয়ে, সত্য কথা বলা যায় না? বলা যায় না, ক্ষমতায় যাওয়ার জন্যই এসব হরতাল দিচ্ছি। গত চারটি নির্বাচনে, দারুণ জ্বালাও পোড়াও আন্দোলনের পরে যে নির্বাচন হয়েছে সেটাতে বিরোধী দল জিতেছে। তাইতো এসব হরতাল দিচ্ছি আর মানুষ মারছি, চোখ কানা করছি, মাথা থ্যাতলাচ্ছি।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “‘এটা চিটিং, তুমি ম্যাথ শেখাচ্ছো’

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 3 = 3