মনসুর হাল্লাজের খোদায়ি ও মনসুর আহমেদের জিহাদ প্রসঙ্গে

মনুষ্য সংসারে যদি ‘মুই বলে খুদা’,
সে ক্ষণে তাহার শির ছেদি কর জুদা।
– কাজী মনসুর আহমেদ

মনসুর আহমেদ আজ থেকে তিনশ বছর আগে কক্সবাজার জেলার রামু উপজেলার একজন মানুষ ছিলেন। রামুতে তিনি কাজীর দায়িত্ব পালন করতেন, তাই তার টাইটেল ছিল কাজী। পেশাগত টাইটেল যুক্ত করে নিজের নাম লিখতেন, ‘কাজী মনসুর আহমেদ’। তবে পেশায় বিচারক হইলেও তিনি ছিলেন মূলত একজন সুফি কবি। উপরে উল্লেখ করা এই লাইন দুইটা তার লেখা সিরনামা (শ্রীনামা) কাব্যের অংশ। এই কাব্য লেখা হয়েছিলো ১৭০৩ সালে। পুরো কাব্য থেকে বিচ্ছিন্ন করে পড়লে মনে হতে পারে কেউ যদি নিজেকে খোদা বলে দাবি করে তাহলে কাজী মনসুর আহমেদ সাথেসাথেই তার কল্লা নেয়ার পক্ষে রায় দিচ্ছেন। কিন্তু আসলে তা নয়, কাব্যের বাকি অংশ পাঠ করলে তা পরিস্কার হবে।

যেই সময় কাজী মনসুর আহমেদ রামুতে বসবাস করতেন সেই সময়েও রামুতে বৌদ্ধ জনগোষ্ঠির আবাস ছিল, এখনকার তুলনায় হয়তো বেশিই ছিল। রামুতে বহু বৌদ্ধ মন্দির এবং বুদ্ধ মুর্তিও ছিল। তখন সাম্প্রদায়িক কারণে কেউ বৌদ্ধদের ঘর বাড়ি, মন্দিরে আগুন ধরাইতে কিংবা বুদ্ধ মুর্তিগুলো ভাঙতে যাইতো এমন ঘটনা ইতিহাসে পাওয়া যায় না। চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল গত সাতশ বছরে কখনো বাঙলার মুসলিম সুলতান, কখনো ত্রিপুরার রাজা আবার কখনো আরাকানের রাজার অধিনে ছিল। এই তিন শক্তির মধ্যে প্রায়ই এই অঞ্চল নিয়া নানারকম রাজনৈতিক সংঘাতের ঘটনা ঘটতো। এইসব রাজনৈতিক সংঘাত ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক সংঘাত হিসাবে বিবেচনা করা হতো না সাধারণত। ত্রিপুরার পৌত্তলিক রাজার বাহিনীতে মুসলমান পাঠান সৈন্যদের যুদ্ধ করা, আরাকানের বৌদ্ধ রাজাদের বাঙলার মুসলিম সুলতানদের অনুকরণে ‘শাহ’ টাইটেল সহকারে মুসলিম নাম ধারণ করা থেকে ‘পাঠানে ও মগে’ একযোগে কোন সাধারণ শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘটনা ইতিহাসে পাওয়া যায়। এই অঞ্চলে ধর্ম, ভাষা ও ঐতিহ্যের দিক থেকে বিভিদ ও বৈচিত্রপূর্ণ জনগোষ্ঠি পাশাপাশি বসবাস করতো। তাদের মধ্যে কখনো কোন সংগ্রাম বা সংঘাত ছিল না তা নয়, তবে তাকে সাম্প্রদায়িক সংগ্রাম অথবা সংঘাত বিবেচনা করা ভুল হবে। এখনকার দিনের মতো আরাকানে মুসলমানদের উপর হামলা হয়েছে এই গুজব তুলে বাঙলার বৌদ্ধদের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক উস্কানি দেয়া হতো না। ২০১২ সালে এই ধরণের গুজব তুলে রামুর বৌদ্ধ জনগোষ্ঠি ও তাদের উপসনালয়ের উপর যে হামলা ও লুটপাট চালানো হয়েছিল তেমন ঘটনাও অতীতে এই অঞ্চলে ঘটে নাই। এখন যে এ ধরণের ঘটনা ঘটে তার পেছনে মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যকার রাজনৈতিক জটিলতা, রোহিঙ্গা সমস্যা, গ্লোবাল জিহাদী ইসলামিজমের লোকাল বিকাশ ইত্যাদি বিষয় সামনে এনে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বিভিন্ন কারণ নিয়ে অনেকে অনেক কথা বলতে পারেন। কিন্তু এইসব সাম্প্রদায়িক গুজব, উস্কানি ও হামলা যে দিনশেষে বাংলাদেশের কিছু ক্ষমতাবানদের মাধ্যমে সংখ্যালঘু বিভিন্ন সম্প্রদায়ের অর্থ, সম্পদ ও জমিজমা লুটের প্রক্রিয়া হিসাবে ব্যবহৃত হয় এই বিষয়টি এড়িয়ে গেলে বাকিসব বিষয়ে কথা বলাই অর্থহীণ। বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক গুজব তুলে সংখ্যালঘুদের উপর হামলা করা, তাদের সম্পদ লুট করা ও তাদেরকে উচ্ছেদ করে জমিজমা দখল করার ঐতিহ্য বাংলাদেশের সবগুলো বড় রাজনৈতিক দলের নেতা কর্মীদের আছে, এই বিষয়টি বহু আগেই গবেষক ও বিশেষজ্ঞরা প্রমান করেছেন। রামুর ঘটনার তাবৎ দায়ভার কেউ কেউ রোহিঙ্গাদের উপর চাপাতে চান, কেউ আবার শুধু ইসলামিস্টদের ঘাড়ে। কিন্তু রামুতে বৌদ্ধদের উপর হামলা ও লুটপাটের সাথে যারা জড়িত ছিলেন তাদের মধ্যে সেকুলার রাজনৈতিক দলের নেতা কর্মীরাও ছিলেন। পাকিস্তান আমলে সংখ্যালঘুদের সম্পত্তি দখলে নেতৃত্ব দিতো মুসলিম লীগ, আর স্বাধীন বাংলাদেশে এই কাজে আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীরা যে পিছিয়ে ছিলেন না তা আহমদ ছফা লিখে গেছেন আশির দশকে। এই বিষয়ে ইতিমধ্যে বিশেষজ্ঞ ও গবেষকরা গুরুত্বপূর্ণ কিছু ডকুমেন্টেশনও করে রেখেছেন, যাতে সাম্প্রদায়িকতার ব্যবহার করে মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীদের হাতে সংখ্যালঘুদের সম্পত্তি দখল হয়ে যাওয়ার পরিস্কার চিত্র পাওয়া যায়। আপনারা অনেকেই হয়তো জানেন যে, এই কয়দিন আগেই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের একজন মন্ত্রী একটি হিন্দু জমিদার বাড়ি দখল করে নিয়েছেন।

ছবিঃ ‘বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের বঞ্চনা: অর্পিত সম্পত্তির সাথে বসবাস’ বই থেকে। উৎসঃ সুব্রত শুভর ফেসবুক স্ট্যাটাস।

আবার কাজী মনসুর আহমেদে ফেরত আসি। কেউ নিজেকে খোদা দাবি করলে তার কল্লা নেয়ার ঘটনা তার আমলে বাঙলায় ঘটেছে বলে জানি না। বরং মানুষ ও খোদার ভেদ অস্বীকার করার যে দার্শনিক ঐতিহ্য বাঙলায় ছিল, তা মুসলমানদের মধ্যেও বহুল প্রচলিত ছিল। বহু পীর মুরশিদকে খোদা জ্ঞান করা বা খোদার প্রতিনিধী গন্য করার প্রবনতা তো ছিলই। তাই বাঙলায় কেউ নিজেকে খোদা দাবি করলেই লোকে তার কল্লা নিতে যাইতো এমন হওয়ার কথা না। কাজী মনসুর আহমেদও কেউ নিজেকে খোদা দাবি করলে তার কল্লা নেয়ার পক্ষে উৎসাহ দেন নাই। আমাদের উল্লেখিত লাইন দুইটি তিনি লিখেছিলেন দুনিয়ার পরিস্থিতি বুঝাতে। তিনি বুঝাতে চেয়েছেন যে, নিজেকে খোদা দাবি করাটা নিরাপদ নয়। এতে কল্লা যাওয়ার ভয় আছে। তবে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার কিংবা রামুর কোন ঘটনা প্রসঙ্গে তিনি এই কথা লেখেন নাই। তিনি যেই ঘটনাটি স্মরণ করেছেন তা ঘটেছিল ইরাকের বাগদাদে। যার জীবনে ঘটেছিলো তার নাম সিরনামা কাব্যে আছে। তিনি বিখ্যাত দরবেশ মনসুর আল হাল্লাজ। ‘আনাল হক্ক’ অর্থাৎ ‘আমিই সত্য’ কিংবা ‘আমিই খোদা’ বলে শরিয়াপন্থীদের নাখোস করায় তাকে শুলে চড়তে হয়েছিল। তবে তার শুধু মাথাই নয়, হাত এবং পা’ও কেটে ফেলা হয়েছিল। তারপর টুকরো টুকরো করে আগুনে পোড়নো হয়েছিল। তিনি বাঙলায় খুবি জনপ্রিয় চরিত্র ছিলেন। কাজী মনসুর আহমেদ সিরনামায় লিখেছেন –

“মনসুর হাল্লাজ নামে আউলিয়া প্রধান,
আপনার মধ্যে মিশি পাসরি আপন,
মুই ‘হক’ হেন করি সদাএ কহিলা”।

কিন্তু কল্লা হারানের ভয় উপেক্ষা করে মনসুর হাল্লাজ কেনো ‘মুই হক’ (আনাল হক্ক) এই দাবি তুলেছিলেন? মনসুর আহমেদ প্রশ্নটি করেছেন এবং উত্তর ও দিয়েছেন। তার ভাষায় –

“কি হেতু কহিল পীরে এময় বচন,
তার রূপ ধরি কহে প্রভু নিরঞ্জন”।

অর্থাৎ, মনসুর আহমেদের মতে, পীর হাল্লাজ এই কথা বলেছেন কারণ প্রভু আল্লাহ (বাঙালি মুসলমান আল্লাহকে নিরঞ্জন ডাকতো) নিজেই তার রূপ ধরে, তার মুখ দিয়ে এই কথা বলেছেন। কিন্তু প্রভু আল্লাহ কেনো দুনিয়ায় এতো লোক থাকতে মনসুর হাল্লাজের মুখ দিয়াই কথা বলতে গেলেন? তার উত্তরও মনসুর আহমেদ দিইয়েছেন। আমরা এই লেখার শুরুতে যে দুইটি লাইন পড়েছি তার পরের দুই লাইনসহ পড়া যাক –

মনুষ্য সংসারে যদি ‘মুই বলে খুদা,
সে ক্ষণে তাহার শির ছেদি কর জুদা।
যেবা যাই চাহে সে অবশ্য সেই পাএ
সেই পাইলে সেইজন সে মত হএ।

“যেবা যাই চাহে সে অবশ্য সেই পাএ সেই পাইলে সেইজন সে মত হএ”, আমাদের এখনকার ভাষায় লিখলে হবে যে যা চায় সে তাই পায়, এবং পাইলে সে তার মতোই হয়ে ওঠে। তারমানে কেউ খোদা হইতে চাইলে খোদা তার মধ্যে হাজির হন, তার মুখ দিয়া কথা বলেন। কেউ না হইতে চাইলে তার মধ্যে হাজিরও হন না, তার মুখ দিয়া কথাও বলেন না। অর্থাৎ, মনসুর আহমেদের মতে, মনসুর হাল্লাজ খোদা হতে চেয়েছিলেন, তাই খোদার তার মাঝে হাজির হয়ে তার মুখ দিয়ে কথা বলেছিলেন।

আমাদের সময়ে ব্লগার আসিফ মহিউদ্দীন নিজেকে খোদা দাবি করেছেন এই অভিযোগটি ব্লগস্ফিয়ারে এবং এক পর্যায়ে জাতীয়ভাবে নাস্তিক বিরোধী আন্দোলনে বহুল ব্যবহৃত একটি অভিযোগে পরিণত হয়েছিল। হেফাজতের আমির আল্লামা শফি সেই সময় চিটাগাং থেকে হেলিকপ্টার যোগে দেশের বিভিন্ন স্থানে গিয়ে নাস্তিকদের কল্লার দাবিতে আন্দোলন করছিলেন। আসিফ মহিউদ্দীনের সাথে মনসুর হাল্লাজের তুলনা করছি এমন ধারণা কেউ করলে ভুল করবেন। মুলত ব্লগারদের নাস্তিকতা, আল্লাহ রাসুলের অবমাননা কিংবা শিরকের অভিযোগ তুলে যারা দেশব্যাপী নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছিলেন, মাদ্রাসা ছাত্রদেরকে বিএনপি-জামাতের রাজনৈতিক স্বার্থ ও নিজেদের ব্যক্তিগত ক্ষমতা বৃদ্ধির ঘুটি হিসাবে ব্যবহার করেছেন নাস্তিকতা বিরোধী জিহাদের নামে, তাদের ‘জিহাদ’ প্রসঙ্গে কথা বলতেই আসিফ মহিউদ্দীনের প্রসঙ্গটি অবতারণা করলাম। বাংলাদেশে যারা নাস্তিকদের বিরুদ্ধে জিহাদের ডাক দেন, যারা মিয়ানমারে মুসলমানদের উপর হামলার গুজব তুলে বাংলাদেশের বৌদ্ধদের উপর হামলার উস্কানি দেন, ফেসবুকে কোরান অবমাননার গুজব রটিয়ে হিন্দুদের বাড়িতে হামলা ও লুটপাট চালান, তাদের প্রসঙ্গে কাজী মনসুর আহমেদ কি বলতেন তার একটি ধারণা নেয়ার চেষ্টা করে এই লেখাটি শেষ করবো। জিহাদের বহু রকম সংজ্ঞা ও ব্যাখ্যা বিশ্লেষন আছে। আমাদের জন্যে দুঃখজনক যে বাংলাদেশে আজকাল সিরিয়ার কাজী ইবনে তাইমিয়ার জিহাদ ব্যখ্যা যতোটা আলোচিত হয়, বাঙলার কাজী মনসুর আহমেদ বা তার মতো কারো জিহাদ ব্যাখ্যা ততোটা আলোচিত হয় না। ইসলামের পক্ষে জিহাদ বলতে কাজী মনসুর আহমদে যা বুঝতেন তা হল রিপুর বিরুদ্ধে জিহাদ। শ্রীনামা কাব্যে এই জিহাদের পক্ষে সুন্দর কয়েকটা লাইন আছে-

“বাজায় বিয়াল্লিশ বাদ্য শ্রীগোলার হাটে
চৌকি রাখেলেন্ত নিয়া ত্রিপিনীর ঘাটে।
অনাহত শব্দ উঠে করি হুলুস্থুল
কাঁশাঁ করতাল শব্দ আনন্দ বহুল
ক্ষেমাই প্রেমাই দুই গেল রণস্থল
রিপু সৈন্য ভঙ্গ দিল না আটিয়া বল”।

ক্ষেমাই প্রেমাই, মানে ক্ষমা আর প্রেম। কাজী মনসুর আহমেদের মতে, ক্ষমা আর প্রেম দিয়েই রিপুকে পরাজিত করতে হবে। রিপুর ক্ষমতা নাই ক্ষমা আর প্রেমের সাথে গায়ের জোরে আটতে পারবে। মনসুর আহমেদ যে জিহাদের কথা বলেন তার লক্ষ্য আল্লাহকে পাওয়া। নাস্তিক, পৌত্তলিক কিংবা ‘আনাল হক্ক’ বলা সুফিদের কল্লা সে জিহাদের লক্ষ্য নয়। মনসুর আহমেদের ভাষায়, যাদের ‘কামশরে কামানলে জ্বলি যায় হিয়া’, কিংবা যারা ‘কাম ক্রোধ লোভ মোহ নিন্দাচর্চায়’ নিয়জিত, তারা কখনোই ঐ জিহাদের নাগাল পাবে না। বরং যে নাস্তিক অথবা অমুসলিমের কল্লার জন্যে জিহাদ করে, অর্থাৎ খুনের লক্ষ্যেই যার জিহাদ, সে খুনিই হয়ে উঠবে। তেমনি সংখ্যালঘুর সম্পদ দখল ও লুটপাটের উদ্দেশ্যে যে জিহাদের ডাক দেয় বা জিহাদ করে, তাকেও দিনশেষে ডাকাত, লুটেরা অথবা জুলুমবাজ দখলদারই গন্য করতে হবে, কারণ সে আসলে তাই। যেবা যাই চাহে সে অবশ্য সেই পাএ, সেই পাইলে সেইজন সে মত হএ – কাজী মনসুর আহমেদ লিখে গেছেন।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

5 + 4 =