পুরান ঢাকার ইফতারি বসুন্ধরায়!

বসুন্ধরার কাছাকাছি অনেক দিন ধরে থাকি। কাল পহেলা রোজা উপলক্ষ্যে বিকেলে গেলাম বসুন্ধরার ভেতরে। বিকেলে অনেকক্ষণ আড্ডা দিলাম বন্ধুরা সবাই। কিছু কাজও ছিল। সেগুলো সেরে নেয়ার পর বন্ধু মুহিব বলে উঠলো, পুরান ঢাকার ইফতারি খেতে মন চাচ্ছে। কিন্তু ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখা গেল, মোটর সাইকেল নিয়েও পুরান ঢাকা পৌঁছানো এখন সম্ভব না। আমার খুব বিরক্ত লাগল। প্রথম রোজা, তার ওপরে শুক্রবার। তার চেয়েও বড় বাংলাদেশের জয়। সব মিলিয়ে সেলিব্রেশনের ইচ্ছা ছিল। কিন্তু বিধি বাম।

যারা ঢাকার মানুষ, আর যারা উত্তরের এবং কিছুটা সিলেট-চাঁটগাঁয়ের লোকেরাও পুরান ঢাকার ইফতারি খুব পছন্দ করেন। আহা! কীসব পদবৈচিত্র্য। খাওয়ার কথা মনে হলো, কিন্তু পুরান ঢাকা যেতে যেতে ইফতারির সময় পেরিয়ে যাবে। এ সময় যে পরিমাণ যানজট। আমরা যারা এ অঞ্চলে থাকি, তারা পুরান ঢাকা যাওয়া ছাড়া কোনোভাবেই ঐতিহ্যবাহী ইফতারি সারতে পারি না। একবার বাবা কিছু নিয়ে এসেছিল। কিন্তু আসতে আসতে সব ঠান্ডা হয়ে যায়, ফলে স্বাদ থাকে না।

এর মধ্যেই হাজির হলো আমাদের সবজান্তা আশরাফ। সবার বিমর্ষতার কারণ শুনে সে হাসতে লাগল। তারপর চেঁচিয়ে বলল, সুতি কাবাব, জালি কাবাব, শাকপুলি, টিকা কাবাব, ডিম চপ, মোরগ পোলাও, কাচ্চি, তেহারি, কবুতর ও কোয়েলের রোস্ট, দইবড়া, গরুর চপ, নান্না মিয়ার বিরিয়ানি, বিউটির লাচ্ছি- কে কোনটা খেতে চাস বল! ১৫ মিনিটের নোটিশে এনে দেব, কত টাকা বাজি? সবাই তো অবাক- গুল মারছে নাকি!

ঘটনা কি? জিজ্ঞেস করতেই আশরাফ আমাদের নিয়ে হাঁটা দিল বসুন্ধরা কনভেনশন সেন্টারের দিকে। কিছুদূর এগুতেই আমরা একটা পোস্টার দেখলাম এবং বুঝতে পারলাম আমাদের ইচ্ছা পূরণ হতে চলেছে। ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটির গুলনাকশা হলে ঢুকলাম সবাই। অনেক মানুষের ভীঁড়। ‘পুরান ঢাকার ইফতার বাজার’ নামে ব্যতিক্রমী ইফতারি মেলার আয়োজন করা হয়েছে। দেখেই আনন্দে মন ভরে গেল।

খোঁজ নিয়ে জানলাম, এখানে পুরান ঢাকার চকবাজার থেকে আসা বাবুর্চিদের দিয়ে স্বাস্থ্যসম্মতভাবে তৈরি ইফতারি পাওয়া যাচ্ছে। রয়েছে পার্সেলের সুব্যবস্থা। পুরো মেলায় রয়েছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত গাড়ি পার্কিং, অজু ও নামাজের ব্যবস্থা। মেলা চলবে ২৭ রমজান পর্যন্ত। পুরান ঢাকার প্রায় প্রতিটি বিখ্যাত ইফতারসামগ্রী শোভা পাচ্ছে মেলার ৫২টি স্টলে। একই নামের অনেক দোকান থাকার কারণে সৃষ্ট বিভ্রান্তি দূর করতে আয়োজকরা খোঁজখবর নিয়ে কেবল প্রকৃত বিখ্যাত দোকানগুলোকেই স্টল বরাদ্দ দিয়েছেন।

মেলায় পাওয়া যাচ্ছে বিউটির লাচ্ছি ও ফালুদা, হামদর্দের রুহ আফজা, রয়েলের লাবাং ও পেস্তার শরবত, কলকাতা কাচ্চি ও জাফরানের শরবত, বোরহানি, ফিরনি ও দই, মোরগ পোলাও, জব্বারের শাহি দইবড়া ও শাহি জিলাপি, নান্না মিয়ার বিরিয়ানি, ফখরুলের চাপ, চিকেন টিক্কা, জালি কাবাব, সুতি কাবাব, কোপ্তা, খাসির গ্লাসি, টিকা কাবাব, শাহি টুকরা, শাহি হালিম, খাসির রানের রোস্ট, মোল্লার হালিম, নুরানি লাচ্ছি, পনির, বিভিন্ন ধরনের কাটলেট, পেস্তা বাদামের শরবত, ছানামাঠা, কিমা পরোটা, ছোলা, মুড়ি, ঘুগনি, ফরমালিনমুক্ত খেজুর, ভেজালমুক্ত আলু চপ, ডিম চপ, পেঁয়াজু, বেগুনি, পাকোরা, পুরি, সিঙ্গারা, সমুচা ইত্যাদি নানা পদের খাবার। পাশাপাশি শসা, ধনেপাতা, নিমকি, চানাচুরসহ মিষ্টি জাতীয় বিভিন্ন মুখরোচক খাবার তো আছেই।

খাবার কেনার আগে আমরা খোঁজ নিলাম খাদ্যে রাসায়নিকের উপস্থিতি সম্পর্কে। মেলা কর্তৃপক্ষ জানালেন, খাবারে ভেজাল রোধ এবং মান নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়েছে কঠোর ব্যবস্থা। ইফতারি করে সবাই আনন্দ চিত্তে বাড়ি ফিরলাম এবং ব্যতিক্রিমী এই উদ্যোগের জন্য আয়োজকদের ধন্যবাদ দিলাম। বন্ধুরা সবাই বিচার বিবেচনা করে বুঝলাম, হুবহু পুরান ঢাকার এসব ইফতারির মূল্য আগের মতোই সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে। সবাই এসে এই ইফতার মেলা দেখে যান। আয়োজকরা সফল হলে এ ধরণের সেবা আরও বেশি পাওয়া যাবে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৩ thoughts on “পুরান ঢাকার ইফতারি বসুন্ধরায়!

  1. খাদ্য উৎসবের আধুনিকায়ন! পুরান
    খাদ্য উৎসবের আধুনিকায়ন! পুরান ঢাকার অলিগলি থেকে এখন কাঁচঘেরা দালানে! :মাথাঠুকি: :মাথাঠুকি: :মাথাঠুকি:

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

95 − = 88