নাস্তিক-মুরতাদ বেঁচে থাকতে পারবে না

গফুর রিক্সা থামালো কবিরের দোকানের সামনে, থামিয়েই চাকাটা একটু দেখে নিয়ে সামনের বেঞ্চিতে বসে পড়লো। একটা ভারী ভাড়া মেরে খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছে তাই শরীরে বাতাস লাগাতেই শার্টের বোতাম খুলে দিলো সাথে লুঙ্গিটাও হাঁটু পর্যন্ত উঠিয়ে দিয়ে কবিরের উদ্দেশ্যে বলল ” ভাই একটা চা দেন “, কবির চায়ের কাপ হাতে নিয়ে ধুতে লাগলো আর তার মাথার উপরে চৌকোণা বক্স থেকে আওয়াজ এলো ” রেটিনা সন্ধ্যার সংবাদে আপনাদের স্বাগতম ” শুনেই গফুরের সামনের দিকে বসা মোল্লা সাহেব কবিরকে আওয়াজটা বাড়িয়ে দিতে বললো, চায়ের লিকার ঢালা বাদ দিয়েই কবির টিভি’র আওয়াজটা বাড়িয়ে দিলো।

সংবাদ পাঠিকা বলছেন ” এদিকে আজ মহানগরী ঢাকাতে গতরাতে মহানগর গোয়ান্দা বিভাগের একটি দল ব্যাপক তল্লাশির পর আলুপট্টি থেকে একটি কম্পিউটারসহ গ্রেফতার করা হয় কুখ্যাত নাস্তিক রণি মজুমদারকে। এরপরে তাকে নিয়ে আরো দুইজন নাস্তিককে ধরতে যায় গোয়েন্দা বিভাগ সেখানে গ্রেফতার করা হয় এলভিন গনসালভেস এবং সুকমল বড়ুয়া নামে আরো দুই কুখ্যাত নাস্তিককে, এসময় তাদের থেকেও কম্পিউটারসহ বিভিন্ন নাস্তিকীয় পণ্য জব্দ করা হয়।”

এটুকু বলে শেষ না করতেই মোল্লা সাহেব গর্জে উঠলেন, “শালা মালুয়ানের বাচ্চারা কাইট্টা ফালামু তোগো, এই দেশে নাস্তিকতা চু**, মাইরা হালানি দরকার তোগো। এবার বুঝবি মজা।”

গফুর এদিকে চা খেতে খেতে আগা-মাথা কিছুই বুঝতে না পেরে একবার কবিরের দিকে তাকায় আরেকবার মোল্লার দিকে তাকায়। এরই মাঝে মোল্লার চেঁচামেচিতে জড়ো হয়ে যান কয়েকজন, “কিছে মোল্লা সাব চিল্লান ক্যান? কুনু সমইস্যা? ”
গম্ভীর কন্ঠ অথচ রাগান্বিত সুরে বললেন, “নাস্তিক মুরতাদে দ্যাশটা ভইরা গ্যাছে এর একটা বিহীত করা দরকার, খাড়ান কাইল নিজামী সাহেবের সাথে কথা কইয়া লই। যোহরের সময় থাইকেন সকলে, সবাইরে জানাইয়া দিয়েন।”

পরদিন যোহরের নামাযের পর একটা আলোচনা সভা বসল মসজিদের পাশের মাঠেই কিন্তু ইমাম সাহেবের অনুমতি ছাড়াই। নিজামী সাহেব একটু কেশে উঠে বলা শুরু করলেন, ” শোন মিয়ারা, দ্যাশটাতে আর থাকা যাইবো না মনে অইতাছে। পুরা শ্যাষ হইয়া গেলো দ্যাশটা। নাস্তিক মুরতাদে ভইরা গ্যাছে দ্যাশটা। তারা বেয়াদব, নবীরে লইয়া মস্করা করে মালাউনের বাচ্চারা। আমি আপনেগো জিগাই দ্যাশটা কি আমাগো নাকি তাগো? তাগো দ্যাশ ইন্ডিয়া, এইটা তাগো দ্যাশ না। ঐ ইন্ডিয়াই তাগো এই দেশে রাইখ্যা ধর্মের বিরুদ্ধে কথা কওয়াইতাছে, এমন যদি চলতেই থাকে তাইলে এই দ্যাশ থিক্ক্যা ধর্ম উইঠ্যা যাইবো। আপনারা কি ঐদিন শুনেন নাই জামায়াতের ওয়াজে, আমাগো ধর্ম নিয়া যেই বেয়াদবিই করবো তাগো কতল করা ফরজ কাম। ভাইসকল ধর্ম বাচান লাগবো, নইলে আমাগো অস্তিত্ব থাকবো না… ”
মাঝ থেকেই একজন অতি উৎসাহী মুজাহিদ চিল্লায়ে উঠলো ” এই বাংলায় নাস্তিকগো রাখা যাইবো না, জিহাদ করা লাগবো তাগো বিরুদ্ধে, এইডা আমগো দ্যাশ সব কডা নাস্তিক মুরতাদরে মাইরা ফালান লাগবো, এই দেখেন খবরের কাগজে কি ছাপছে… মালাউনের বাচ্চারা আমাগো নবী, ধর্ম নিয়া তামাশা করছে, গালি দিছে।”
হঠাৎই তার সাথে সুর মেলালেন কঠিন কন্ঠে মোল্লা সাহেব, “হ কাইল রাতে আমিও কবিরের দুকানে বইসা দিগন্ত টিভিতে দেখছি, কবিররে জিগান..” দূরে দাঁড়িয়ে থাকা কবিরকে দেখিয়ে তিনি আবারো বলে উঠলেন, “কি রে কবির তুইও দেখছস না?” কবিরা মাথা নাড়িয়ে সায় জানালো।

দাঁড়িয়ে থাকা সকলেই ততক্ষনে একটা জিহাদী প্রস্তুতি নিজেদের মাঝেই নিয়ে ফেলেছেন। মুজাহিদ সাহেব কিছু বলতে যাবেন হাত উঁচিয়ে তার আগেই পিছন থেকে একজন চিল্লায়ে উঠলেন, ” আরে কি মিয়ারা, তোমরা কি মুসলমান না মালাউন!!! এতো কিছুর পরেও চুপ কইরা খাড়াইয়া থাকো ক্যামনে??? আরে জিহাদ করা লাগবো… চলো সবাই আইজ এই গেরাম থেইক্যা মালাউনগো খেদাই…”
ব্যস সকলেই হইহই আওয়াজ তুলে চিল্লাতে লাগলো আর দৌড়াতে লাগলো।

মালো পাড়াতে ঢুকেই শুরু করে দিলো ভাঙ্গাভাঙ্গি। মন্দির জ্বালালো, প্যাগোডা ভাঙ্গলো, গীর্জাতে হামলা করলো। মালো পাড়ায় হিন্দু মহিলাদের কয়েকজন মুজাহিদ বললো “হাতের শাঁখা কপালের সিঁদুর মুইছ্যা ফালা বাঁচতে চাইলে”, প্রাণ বাঁচাতে তাই করলো।

ধ্বংস এলাকায় বসে নির্বাক হয়ে বসে রয়েছেন মরিয়ম আর তার কোলেই তার ছেলে বসে রয়েছে। ছেলে তার মা’কে প্রশ্ন করে বসলো ” মা.. মা.. ওরা এসব কেন করিছে মা? বইতে তো পড়ছিলাম এক দুষ্ট বুড়ি নবীর চলার পথে কাঁটা বিছায়া রাখতো কিন্তু নবী তারে কুনুদিন কিচ্ছু কয় নাই উল্টা বুড়ি যেকালে জ্বরে মরতাছিল নবী যাইয়া তারে সেবা করছিলো আর এরা কি করতাসে এইসব? “…. ছেলের কথার জবাব না দিয়ে নির্বাক হয়ে বসে রইলেন মরিয়ম।

পরদিন ঐ এলাকার হামলার খবর নিয়ে তামিম একটি রিপোর্ট করলো। নিজ ইচ্ছাতেই সে আরো ব্যাপক তথ্য নিয়ে তৈরী করলো রিপোর্টটি, সেখানে সেই চ্যানেলের খবর, পত্রিকার খবরের কথাও এলো। এদের তথ্যে নিয়ে কারা উস্কে দিলো সেটিও লেখা হলো। আধুনিক যুগের ছেলে তামিম তাই সে সেটি ফেসবুকেও ছড়িয়ে দিলো। একটা প্রতিবাদ শুরু হলো। চারিদিকেই ঐ মিডিয়াগুলোর নামে ছি ছি রব উঠলো।

পরদিন সেই মিডিয়াগুলোতে একসাথে তামিমের বিরুদ্ধে খবর প্রকাশ হলো, খবর পেয়ে মোল্লারা সকলকে আবারো ডাকলো। আন্দোলন করতে চাইলো, সভা হলো, আলোচনা হলো অবশেষে সিদ্ধান্ত হলো এই অঞ্চলে সামনের জুমা বারে আবারো সমাবেশ হবে। রাতের আঁধারে একটি সাদা রঙের মাইক্রো এসে থামলো তামিমদের বাসায়। সাদা পোশাকের দশ জনের একটি দল সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে তামিমকে ধরে ফেললো তারপর মাইক্রোতে তুলে নিয়ে গেলো। পরদিন আবারো সেইসব মিডিয়াগুলোতে খবর প্রকাশিত হলো একইভাবে। খবরে খুশিতে ফেটে পড়লো নিজামী, মোল্লাসহ সকলেই। তারা মিষ্টি বিতরণ করতে থাকলো। সকলেই উল্লসিত হলো।

এলাকার এমপি সাহেব এলাকার পরিস্থিতি দেখতে এলেন, তিনি পরিদর্শনে গেলেন মালো পাড়া। সেখানের সকলের সাথে তিনি কথা বললেন। দুঃখ প্রকাশ করলেন, কথা দিলেন দোষীদের তিনি শাস্তির ব্যবস্থা করবেন। এদিকে মরিয়ম ফ্যালফ্যাল নয়নে তাকিয়ে রইলেন এমপি সাহেবের দিকে কেননা তার পিছনেই দাঁড়িয়ে ছিলো নিজামী আর মোল্লা দুজনেই।
মালো পাড়া পরিদর্শন করে সেখানে কিছু দান খয়রাত করে চলে গেলেন এলাকার মসজিদে, নামায আদায় শেষে এমপি সাহেব সকলের উদ্দেশ্যে বললেন, “ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের এই দেশে কোন নাস্তিক, মুরতাদ বেঁচে থাকতে পারবো না। তাদের বিচার হইবই, শাস্তি তাগো পাইতেই হইব। সে যেই হউক এইখানে তার ঠাই নাই। আমি কথা দিতাছি ঐ নাস্তিকদের কঠিন শাস্তি যাতে হয় সেইজন্যই ব্যবস্থা করুম।” চারিদিকে করতালি ফুটতে থাকলো।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৭ thoughts on “নাস্তিক-মুরতাদ বেঁচে থাকতে পারবে না

  1. চমৎকার। গল্পের ছলে বললেও এটাই
    :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:
    চমৎকার। গল্পের ছলে বললেও এটাই বাস্তবতা। এমনই হচ্ছে বর্তমানে।

  2. আগের স্লোগান সব ভুইলা, নতুন
    আগের স্লোগান সব ভুইলা, নতুন স্লোগান মুখস্ত করা লাগবে। অনেক কাম। আপনার এইসব বালছাল লেখা পড়ার টাইম নাই।

    “আমরা সবাই তালেবান, বাংলা হবে পাকিস্থান”
    “শিবির করি, জীবন গড়ি”

    মাথা দুলায়ে দুলায়ে সুমিত, ডাঃ আতিক স্লোগান মুখস্ত করিতে লাগিল। :কেউরেকইসনা:

      1. দেশটা পাকিস্তান হয়ে গেছে বলেই
        দেশটা পাকিস্তান হয়ে গেছে বলেই আমি মনে করছি। দেশটা আর দেশ নাই। বঙ্গবন্ধু কবরে শুয়ে তার গড়া দলের কর্মকান্ড দেখে জাতির কাছে লজ্জ্বায় অবনত হয়ে আছে।

        বঙ্গবন্ধু…. তোমার স্বপ্নের দেশটাকে কতগুলো ক্ষমতা লিপ্সু চরিত্রহীন রাজনীতিবিদদের সাথে নিয়ে তোমার মেয়ে পাকিস্তান বানাচ্ছে। আমাদের কণ্ঠরোধ করছে; লেখার অপরাধে, মুক্ত চিন্তার অপরাধে আমাদেরকে পেশাদার অপরাধীদের মত বেঁধে নিয়ে যাচ্ছে। আমরা হাল ছাড়িনি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় তোমার স্বপ্নের বাংলাদেশ আমরা গড়বই। ৭২-এর সংবিধানে আমরা আবার ফিরে যাবই। তোমার দুঃখিনী দেশটা আজ বড়ই কাঁদছে……।

        1. প্লীজ বঙ্গবন্ধুর কথা এখন টেনে
          প্লীজ বঙ্গবন্ধুর কথা এখন টেনে এনে উনার আত্মাকে লজ্জা দিবেন না। আমি শতভাগ নিশ্চিত আজ উনি বেঁচে থাকলে এই সকল ধর্ম ব্যবসায়ীরা পালিয়ে পাকিস্তান চলে যেতো।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

67 + = 77