সরদার ফজলুল করিমকে অপমানিত করেছেন এম এম আকাশ

‘ড. এম. এম. আকাশ… সরদার ফজলুল করিমকে নিঃসন্দেহে অপমান করেছেন।… অনেক উঁচুতে থাকা সরদার ফজলুল করিমকে টেনে নিচে নামিয়ে আনার অপচেষ্টা বললে অত্যুক্তি হবে না।’ লেখক, গবেষক ও বিশিষ্ট সংস্কৃতি কর্মী মাযহারুল ইসলাম বাবলা সম্প্রতি দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত তার এক কলামে এমন মন্তব্য করেছেন। বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও বুদ্ধিজীবী সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সম্পাদিত ‘ত্রৈমাসিক নতুন দিগন্ত’ পত্রিকার ব্যবস্থাপনা সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন বাবলা।

ড. এম. এম. আকাশ বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) বুদ্ধিজীবী-নেতা হিসেবে পরিচিত। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধাপক। সম্প্রতি ওই ক্যাম্পাসেরই সাবেক জনপ্রিয় অধ্যাপক ও দেশবরেণ্য বুদ্ধিজীবী সরদার ফজলুল করিমের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকি উপলক্ষ্যে দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় একটি কলাম লেখেন আকাশ। ওই কলামে তিনি সরদার ফজলুল করিমের আদর্শের বিরুদ্ধে গিয়ে তাকে চিত্রিত করার চেষ্টা চালিয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন বাবলা। ২০ জুন, ২০১৫ তারিখে ইত্তেফাকে প্রকাশিত তার এ বিষয়ক প্রতিক্রিয়া প্রবন্ধটি এখানে হুবহু তুলে দিচ্ছি।

সরদার ফজলুল করিম : এক চলন্ত বিশ্ববিদ্যালয়

আমৃত্যু বিপ্লবী, নীতি-আদর্শে অবিচল অধ্যাপক সরদার ফজলুল করিমের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে গত ১৬ জুন দৈনিক ইত্তেফাকের উপসম্পাদকীয়তে প্রকাশিত ড. এম. এম. আকাশের লেখাটি পড়ে বেশ ভালোই ঝাঁকুনি খেয়েছি। আকাশ থেকে মর্ত্যে পড়ে যাবার উপক্রম বোধ করেছি। বিশেষ করে ড. আকাশ সরদার ফজলুল করিমের নিকটতম উদাহরণ হিসেবে যে দু’টি নাম উল্লেখ করেছেন, তার একটি নামে। অভিমতটি ড. আকাশের ব্যক্তিগত নিশ্চয়, যার সঙ্গে বাস্তবতার সামান্যতম মিল নেই, রয়েছে অপ্রতুল অমিল। প্রচলিত লোকজ ভাষায় বলা যায়—কোথায় আগরতলা আর কোথায় চকিরতলা।

আমাদের ক্ষমতার রাজনীতির দ্বিদলীয় ব্যবস্থার ন্যায় আমাদের বুদ্ধিজীবীরাও দুই প্রধান দলে ভাগ-বাঁটোয়ারা হয়ে আছেন। সে কারণেই বুদ্ধিজীবীদের দেখতে পাই শত নাগরিক, সহস্র নাগরিক পৃথক ফোরামের পতাকাতলে। রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধার টানে আমাদের বুদ্ধিজীবীরা এখন দলীয় বুদ্ধিজীবীতে পরিণত হয়ে গেছেন। দলনেতা-দলকর্মীর ন্যায় দল বন্দনায় তাদের আমরা অহরহ দেখে থাকি। এই মেরুদণ্ডহীন ঘাস সমতুল্য বুদ্ধিজীবীদের কাছে দেশ-জাতি কিছুই আশা করতে পারে না। আমরা করিও না।

সরদার ফজলুল করিম সারাটি জীবন আদর্শে অবিচল থেকে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। নিজেকে কখনো রাষ্ট্রীয় আনুকূল্যের আশায় বিকিয়ে দেননি। নিজেকে কখনো দার্শনিকরূপে পরিচয়ও দেননি। মার্কসীয় দর্শনের অনুসারীরূপে সেই দর্শন প্রচার ও প্রসারে আমৃত্যু তত্পর থেকেছেন। অনুবাদ করেছেন দর্শনের গ্রন্থসমূহ, মতাদর্শিক অভিপ্রায়ে। জাতীয়তাবাদী ছিলেন না। ছিলেন আমৃত্যু কমিউনিস্ট। তিনি বামপন্থি, বুদ্ধিজীবী এবং মার্কসীয় দর্শনের অনুসারী-অনুগামী ছিলেন। সবকিছুর মূলে ছিল রাজনীতি। মানবমুক্তির রাজনীতি। শত প্রতিকূলতা-প্রলোভন তাঁকে আদর্শচ্যুত করতে পারেনি। কমিউনিস্ট পার্টির নির্দেশে বিলেতে স্কলারশিপ পরিত্যাগ করা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের প্রভাষকের পেশায় ইস্তফা দিয়ে কৃষকদের সংগঠিত করার সংগ্রামে যোগ দিতে প্রত্যন্ত গ্রামে চলে যাওয়া, রাষ্ট্র ভাঙার অভিপ্রায়ে মধ্যবিত্ত সীমা-সুবিধা ছেড়ে বিপ্লব সংঘটনে কৃষকের কাছে যাওয়া একমাত্র তাঁর পক্ষেই সম্ভব হয়েছিল। সে কারণে পাকিস্তানের ২৩ বছরের শাসনামলের ১১ বছর বিভিন্ন মেয়াদে তাঁকে কারাভোগ করতে হয়েছিল। আমাদের রাজনীতিকদের মধ্যেও এমন দৃষ্টান্তের কাউকে সহজে খুঁজে পাওয়া যাবে না। বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে তো অবান্তর।

নিজেকে সারা জীবন কৃষকের সন্তান বলে দাবি করেছেন। তিনি জানতেন তাঁর শিক্ষা, সামাজিক-প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠা-মর্যাদায় কৃষকের মুক্তি আসবে না। আসবে মার্কসীয় মতাদর্শ প্রতিষ্ঠার বদৌলতে। রামকৃষ্ণ, স্বামী বিবেকানন্দের ন্যায় মোটেও প্রচলিত মানবতাবাদী ছিলেন না। ছিলেন বিপ্লবী। জানতেন একমাত্র বিপ্লবেই মুক্তি সম্ভব। অন্য কোনো বিকল্প পথে নয়। তাঁর সমস্ত কর্মের মূলে ছিল বিপ্লবের ক্ষেত্র প্রস্তুত-নির্মাণ। একাত্তরে যদি কারারুদ্ধ হয়ে কেন্দ্রীয় কারাগারে না থাকতেন, তাহলে তাঁকে নির্ঘাত আল-বদরদের শিকার হতে হত। ১৯৬৩ থেকে ১৯৭১ কেবল জীবিকার তাড়নায় বাংলা একাডেমিতে সংস্কৃতি ও অনুবাদ শাখায় কাজ করেছেন। অথচ যোগ্যতা ছিল তাঁর গগনস্পর্শী। আই.এ. পরীক্ষায় বৃহত্তর ঢাকা বোর্ডে দ্বিতীয় হয়েছিলেন। অনার্স ও এম.এ-তে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে হয়েছিলেন প্রথম শ্রেণিতে প্রথম।

স্বাধীনতার পর যোগ দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তবে দর্শন বিভাগে নয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে। অপরিসীম জ্ঞান-পাণ্ডিত্যের কারণে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সফল ও জনপ্রিয় শিক্ষকরূপে সকল শিক্ষার্থীর প্রিয় শিক্ষক সরদার স্যার হতে পেরেছিলেন। অথচ কী ভবিতব্য যোগ্যতায়— পাণ্ডিত্যে অসামান্য সরদার ফজলুল করিমকে অবসরে যেতে হয়েছে সহযোগী অধ্যাপকরূপে। পূর্ণাঙ্গ অধ্যাপকের মর্যাদা তাঁকে দেয়া হয়নি। এই ব্যর্থতার দায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিশ্চয়। তবে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানের অমর্যাদার দায় জাতিও এড়াতে পারে না। তাঁকে রাষ্ট্র জাতীয় অধ্যাপকের মর্যাদা যথাসময়ে দিতেও ব্যর্থ হয়েছে। দিয়েছে কিন্তু বহু বিলম্বে। সকল যোগ্যতার পরও তাঁকে নানাক্ষেত্রে বঞ্চিত করা হয়েছে, তাঁর অবিচল মতাদর্শ এবং শক্ত মেরুদণ্ডের কারণে। এনিয়ে তিনি কখনো ক্ষোভ-আক্ষেপ প্রকাশ করেননি। এনিয়ে তিনি কখনো ভেবেছেন— তেমনটিও কখনো প্রকাশ পায়নি।

এমন একজন ত্যাগী মহাপুরুষের নিকটতম উদাহরণ হিসেবে ড. এম. এম. আকাশ যে একজনের নাম বলেছেন তাতে সরদার ফজলুল করিমকে নিঃসন্দেহে তিনি অপমান করেছেন। জীবনাচারে, সুবিধাবাদিতায় এবং সরকারি দলের বুদ্ধিজীবীদের পালের গোদা খ্যাত ব্যক্তির সঙ্গে নিকটতম উদাহরণ; অনেক উঁচুতে থাকা সরদার ফজলুল করিমকে টেনে নিচে নামিয়ে আনার অপচেষ্টা বললে অত্যুক্তি হবে না। তাঁর থেকে সরদার ফজলুল করিমের দূরত্ব যোজন-যোজন দূর।

—-
লেখকের সঙ্গে যোগাযোগ : জিমেইল
লেখার লিঙ্ক : ইত্তেফাক । ২০ জুন, ২০১৫

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “সরদার ফজলুল করিমকে অপমানিত করেছেন এম এম আকাশ

  1. বাবলা ভাইয়ের লেখার বিষয়বস্তু,
    বাবলা ভাইয়ের লেখার বিষয়বস্তু, ফোকাস পয়েন্ট তথা আকাশের বক্তব্যের ফাঁক ধরার জায়গাটার সঙ্গে আমি সম্পূর্ণ একমত। তবে কিছু বিষয় এই লেখায় বাদ পড়েছে। সরদার ফজলুল করিমের মধ্যে উদারতাবাদ ছিল, শেষ জীবনে সিপিবিতে যোগ দেন, আবার আন্তর্জাতিক মতাদর্শগত মহাবিতর্কে নিজ অবস্থান সুস্পষ্ট করেননি- এই দুর্বলতাগুলো একেবারেই চাপা পড়ে গেছে। যখন আমরা এই দুর্বলতাসমেত একজনকে ‘আমৃত্যু বিপ্লবী, নীতি আদর্শে অবিচল’ বলব তখন আসলে এসব দুর্বলতাই নীতি আদর্শে অবিচলতার উদাহরণ হয়ে যাবে। লেখাটিতে এক্ষেত্রে দ্বান্দ্বিকতার অভাব আছে। আকাশরা কোন বিপ্লবীকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরে না। তারা সরদার ফজলুল করিমের দুর্বলতাগুলোর জন্যই তাকে গ্রহণ করেছে। প্রকৃত বিপ্লবী হলে তাকে আকাশরা গ্রহণ করতে পারবে বলে মনে হয় না। তাছাড়া আকাশ সাহেব কেন সরদার ফজলুল করিমের উদাহরণ হিসেবে আওয়ামী বুদ্ধিজীবীদের টেনে এনেছেন, এই কারণটাও কিছুটা ব্যাখ্যা করা দরকার ছিল। সেটাই মূল রাজনৈতিক জায়গা।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

74 − = 73