কোলকাতায় সাক্ষাৎকারে অর্ণব : ‘গান ছেড়ে দিচ্ছি’

সম্প্রতি কোলকাতা এসেছিলেন বাংলাদেশের জনপ্রিয় গায়ক সায়ন চৌধুরী অর্ণব। সেখানে তিনি গান করেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে। যেখানকার শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের স্লোগান ছিল তার গান- ‘হোক কলরব’। নেপালে ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য গান করতেই তিনি এ দফায় কোলকাতা আসেন। সেখানে সফরের এক ফাঁকে খ্যাতিমান ভিন্ন ধারার এই গায়কের একটি সাক্ষাৎকার নেন সাংবাদিক অলোকপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়। সেই সাক্ষাৎকারটি ছাপা হয়েছে কোলকাতার ‘দৈনিক আজকাল’ পত্রিকায়। পুরো সাক্ষাৎকারটি এখানে তুলে ধরা হলো।

অলোকপ্রসাদ : অর্ণব, আজ (১৪ জুন, রবিবার) সন্ধেবেলা ‘বৈতানিক’-এর আখড়ায় তুমি গান গাইলে, নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা কত গানের অনুরোধ জানাল, তোমার নতুন গান শুনতে চাইল, তোমার গাওয়া রবীন্দ্রসঙ্গীতের জন্যে অনুরোধ জানাল, অটোগ্রাফ নিল, তোমার অ্যালবাম কিনল৷‌ কলকাতায় এই উদ্দীপনা চলছেই তোমাকে ঘিরে৷‌ কাল ভোরে তুমি ঢাকা চলে যাচ্ছ৷‌ তোমাকে একটা প্রশ্ন শুরুতেই করতে ইচ্ছে করছে, তুমি কার? ঢাকার, না কলকাতার?

অর্ণব : খুব সুন্দর এবং খুব কঠিন প্রশ্ন৷‌ কিন্তু উত্তরটা খুব সোজা৷‌ আমি কলকাতার সায়ন, ঢাকার অর্ণব৷‌

অলোকপ্রসাদ : কিন্তু কলকাতার আজকের শ্রোতারা তো তোমাকে অর্ণব বলেই চেনে৷‌

অর্ণব : সেটা ঠিকই৷‌ এটা দু-তিন বছরের ঘটনা৷‌ তার আগে পর্যন্ত, বা, এখনও বহু মানুষের কাছে আমি সায়ন বলেই পরিচিত৷‌ কলকাতায় আমার অসংখ্য বন্ধু৷‌ আমার সেই শান্তিনিকেতনে থাকার সময় থেকেই আমি সায়ন বলেই এখানে পরিচিত৷‌ আমার পিসিরাও কলকাতায় থাকেন৷‌

অলোকপ্রসাদ : শান্তিনিকেতনে তুমি কত বছর ছিলে? ওখানে ভর্তি হলে কেন?

অর্ণব : শান্তিনিকেতনেই জীবনের ১৫টা গুরুত্বপূর্ণ বছর আমি কাটিয়েছি৷‌ আমার মা (সুরাইয়া চৌধুরি) একসময় শান্তিনিকেতনে কলাভবনের ছাত্রী ছিলেন৷‌ পরে মায়ের সঙ্গে শান্তিনিকেতনে এসে, ওখানকার পরিবেশ, গাছতলায় বসে পড়াশোনা, এই সব দেখে ওখানে ভর্তি করার জন্যে আমি আর দিদি বায়না করি৷‌ মা আমাকে পাঠভবনে ক্লাস থ্রি-তে ভর্তি করে দেন৷‌ দিদিকেও ভর্তি করে দেন৷‌ দিদি আমার থেকে পাঁচ বছরের বড়৷‌ আমি ওখানেই পরে কলাভবনে পড়াশোনা করি৷‌

অলোকপ্রসাদ : শান্তিনিকেতনে কলাভবনে পড়লে৷‌ ছবি আঁকা তোমার বিষয়৷‌ গানে এলে কীভাবে?

অর্ণব : শান্তিনিকেতনের জীবনযাত্রার সঙ্গেই তো গান মিশে আছে৷‌ চলতে, ফিরতে গান৷‌ নানা অনুষ্ঠানে গান৷‌ কিন্তু আমি গান গাওয়ার ব্যাপারে খুব আড়ষ্ট ছিলাম৷‌ সারাদিন গুনগুন করতাম, কিন্তু কারও সামনে গাইতে লজ্জা পেতাম৷‌ গানের সময়েও পেছনের সারিতে আমার জায়গা হত৷‌

অলোকপ্রসাদ : আড়ষ্টতা ভাঙল কী করে?

অর্ণব : তখন ক্লাস টেনে পড়ি৷‌ সেবার পাঠভবনে গানের কম্পিটিশনে কোনও ছেলে নাম দিচ্ছে না দেখে আমাকেই নাম দিতে হল৷‌ রবীন্দ্রনাথের বাউলাঙ্গের গান আমাকে বেশি টানত৷‌ আমি ঠিক করলাম, ‘প্রাণের মানুষ আছে প্রাণে’ গাইব৷‌ আমাদের গানের টিচার বিজয়দাকে (বিজয় সিংহরায়) বললাম, দেখিয়ে দিতে৷‌ গাইতে উঠে সব ভয় ভেঙে গেল৷‌ নিজের মতো করে গাইলাম৷‌ এবং, আশ্চর্যের ব্যাপার, আমিই ‘ফার্স্ট’ হলাম৷‌

অলোকপ্রসাদ : ওখান থেকেই গায়ক অর্ণবের যাত্রা শুরু?

অর্ণব : অর্ণবের নয় কিন্তু৷‌ সায়নের৷‌ আমি ওখানে সায়ন চৌধুরি৷‌ ঢাকায় আমাকে সবাই অর্ণব বলে চেনে৷‌

অলোকপ্রসাদ : তোমার রবীন্দ্রসঙ্গীত গাওয়ার মধ্যে বিক্রম সিংহের গায়কীর মিল আছে৷‌ তুমি কি ওঁর কাছে গান শিখেছ?

অর্ণব : বিক্রমদা ছিলেন আমার দিদির সহপাঠী৷‌ বিক্রমদার কাছে যখন-তখন গান শুনতে চাইতাম৷‌ বিক্রমদা শোনাতেন৷‌ শেখার জন্যে কখনও শিখিনি৷‌ কোনও গান শুনতে চাইলে বিক্রমদার কথাই মনে পড়ত৷‌ বিক্রমদার অকাল প্রয়াণে খুব শূন্যতা অনুভব করি আজ৷‌ বিক্রমদার সঙ্গে আমার গায়কীর মিল যেটা বলছেন, সেটা বোধহয় শান্তিদেব ঘোষের ঘরানা৷‌ যেটা বিক্রমদার বাবা মোহন সিংহের মধ্যেও আছে৷‌ আর বিক্রমদার গানে যেমন ক্ল্যাসিকালের ছোঁয়া আছে, আমার গায়কীতে লোকগানের ছোঁয়া৷‌

অলোকপ্রসাদ : সেজন্যেই তোমার গান কখনও অনুকরণ হয়নি, তোমার নিজস্বতা সেখানে স্পষ্ট৷‌ রবীন্দ্রসঙ্গীত থেকে নতুন গানে, বাংলা আধুনিক গানে কীভাবে এলে?

অর্ণব : শান্তিনিকেতনে থাকতে থাকতেই নিজে গান কম্পোজ করার চেষ্টা করতাম৷‌ ঢাকায় যখন আসতাম, বন্ধুরা একসঙ্গে হলে গানবাজনা করতাম৷‌ আমি তো ক্ল্যাসিকাল এসরাজ বাজানো শিখেছি শান্তিনিকেতনে৷‌ কিন্তু নতুন গানের জন্যে গিটারটা শেখা জরুরি ছিল৷‌ বন্ধুদের কাছে এসে দিনরাত এক করে সাতদিনে গিটার বাজানো শিখে গিয়েছিলাম৷‌

অলোকপ্রসাদ : নতুন গানে তোমার অনুপ্রেরণা কে ছিলেন?

অর্ণব : অবশ্যই প্রধান অনুপ্রেরণা ছিলেন আজম খান৷‌ তিনি মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন৷‌ বাংলাদেশে প্রথম জীবনমুখী গান, রক ফর্মের গান তিনিই তৈরি করেছিলেন৷‌ ‘রেল লাইনের ওই বাড়িতে’ বা ‘ওরে সালেকা’ আমাকে উদ্বুদ্ধ করত৷‌ পরে সুমনদার গান, অঞ্জন দত্তর গান অনুপ্রাণিত করেছে৷‌ আমার কাকা তপন চৌধুরির একটা ব্যান্ড ছিল– ‘সোল‍্স’৷‌ পরে তিনি একা গাইতেন৷‌ এই সব কিছুই আমার অনুপ্রেরণা৷‌ আমার ঠাম্মা জিন্দুপ্রভা দেবীর লেখালেখিও আমাকে উদ্দীপ্ত করেছে৷‌

অলোকপ্রসাদ : তোমার বিখ্যাত অ্যালবামের বিখ্যাত গান হোক কলরব৷‌ ‘হোক কলরব ফুলগুলো সব লাল না হয়ে নীল হল ক্যান?’ লাইনগুলো নতুন প্রজন্মের শ্রোতাদের মুখে মুখে ফেরে৷‌ যাদবপুরের আন্দোলনের স্লোগান হয়েছিল হোক কলরব৷‌ তোমার অনুভূতি কেমন ছিল তখন?

অর্ণব : এটা একটা বিরাট প্রাপ্তি নিশ্চয়ই৷‌ আসলে, এই গানটার মধ্যে একটা ইনোসেন্ট ব্যাপার আছে, যেখান থেকে প্রশ্ন উঠে আসে বারবার৷‌ তবে, গানের লিরিক রাজীব আশরাফের লেখা৷‌ কৃতিত্বটা রাজীবের৷‌

অলোকপ্রসাদ : তোমার ছবি আঁকার প্রতি টান কোথা থেকে?

অর্ণব : কলাভবনে তো পড়েইছি৷‌ টান তৈরি হয়েছে ঠাম্মার কাজ দেখেও৷‌ উনি খুব ভাল কাঁথার কাজ করতেন৷‌ আমার বাবাও (স্বপন চৌধুরি) একজন শিল্পী৷‌ মা-ও৷‌ ফলে, সব মিলিয়ে ছবির ভুবন আমার নিজস্ব ভুবন৷‌

অলোকপ্রসাদ : এখন কি তুমি ছবি আঁকায় বেশি মনোযোগী?

অর্ণব : আসলে, দিনের পর দিন গান গাইতে গাইতে, স্টুডিওয় গান তৈরি করতে করতে আমার দমবন্ধ হয়ে যাচ্ছে৷‌ আপনি প্রশ্নটা করলেন বলে আপনাকে জানাই, গান গাওয়া ছেড়ে দিচ্ছি!

অলোকপ্রসাদ : সে কি? এমন জনপ্রিয়তার মাঝখানে গান ছেড়ে দেবে? হঠাৎ কী ঘটল?

অর্ণব : এই জনপ্রিয়তাটা আমাকে একটা শেকলে বেঁধে ফেলেছে৷‌ শুধু অন্যের কথা ভেবে গাইছি৷‌ মুখোশ পরে স্টেজে উঠছি, স্টুডিওতে গান কম্পোজ করছি৷‌ শুধু অন্যের কথা ভেবে যাচ্ছি৷‌ শান্তিনিকেতনে পাঠভবনে যা গান শিখেছি, তাই ভাঙিয়ে খাচ্ছি৷‌ গানটা তো সমুদ্র৷‌ আমি তো হাঁটুজলেও নামিনি৷‌ অথচ জনপ্রিয়তার ফরমাসে আমাকে গান গেয়েই যেতে হচ্ছে৷‌ আমি পালিয়ে যেতে চাই এই চাহিদা থেকে৷‌ আমি সত্যিকারের মিউজিক করতে চাইলে এই পেশাগত মিউজিক আমাকে ছেড়ে দিতে হবে৷‌ আমার অনেক শেখার বাকি৷‌ অনেক পড়াশোনার প্রয়োজন৷‌ ফের কীর্তনাঙ্গ, ভাটিয়ালি কি লালনের গানের ভেতরে ঢুকতে চাই৷‌ কয়েকটা বছর শুধু নিজের জন্যে সঙ্গীতে ডুবে থাকব আমি, গভীরভাবে শিখব৷‌ কিন্তু মঞ্চে গাইব না৷‌ শুধু ছবি আঁকব৷‌ ছবি আঁকা আমাকে টানছে৷‌ আমি ছবি আঁকছি প্রচুর৷‌ ছবি আঁকার সময় আমি আর আমার ছবি ছাড়া আর কেউ নেই৷‌ কাউকে কৈফিয়ত দিতে হবে না আমার৷‌ কাউকে সন্তুষ্ট করতে হবে না৷‌

অলোকপ্রসাদ : তুমি তো তোমার বাবাকে নিয়ে একটা তথ্যচিত্র করেছ৷‌ নিউ ইয়র্ক ফিল্ম আকাদেমিতে পড়তেও যাচ্ছ শুনেছি৷‌

অর্ণব : হ্যাঁ, মুক্তিযুদ্ধের সময় বিভিন্ন ক্যাম্পে যেতেন আমার বাবা, মা৷‌ সে এক উদ্দীপ্ত করা ইতিহাস৷‌ সেটাকে ধরার চেষ্টা করেছি তথ্যচিত্রে৷‌ আর হ্যাঁ, ফিল্ম আকাদেমিতে একটা কোর্স করতে যাচ্ছি ডিরেকশন নিয়ে৷‌

অলোকপ্রসাদ : এবার কি ছবি পরিচালনা করবে?

অর্ণব : হ্যাঁ৷‌ স্ক্রিপ্ট লিখছি৷‌ পুরান ঢাকা নিয়ে ছবি৷‌ নাম রাখছি ‘ঢাকা পুরান’৷‌ আমাদের ওখানে ভীষণ পুরনো একটা পরিত্যক্ত শহর আছে– পানাম নগর৷‌ সেটাকে প্রেক্ষাপটে রেখে এই ছবি৷‌ এখানে বাস্তব আর মিথ মেশামেশি করে থাকবে৷‌ ম্যাজিক রিয়্যালিজম থাকবে৷‌ ছবি এঁকে এঁকে স্ক্রিপ্ট তৈরি করছি৷‌ পরের বছরেই ছবিটা তৈরি করব৷‌

অলোকপ্রসাদ : একদম নতুন যে অ্যালবামটা তুমি তৈরি করেছ, সেই ‘খুব ডুব’-এ গান লিখেছেন তোমার প্রাক্তন স্ত্রী সাহানা৷‌ গানের সূত্রেই কি তোমাদের যোগাযোগটা এখনও রয়ে গেছে?

অর্ণব : সাহানা তো আসলে আমার বন্ধু৷‌ আমরা একসঙ্গে শান্তিনিকেতনে ক্লাস থ্রি থেকে পড়েছি৷‌ খুব অল্প বয়সে বিয়ে করি আমরা৷‌ সাত বছরের বিবাহিত জীবন৷‌ কিন্তু বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের চাওয়া, পাওয়া তো পাল্টায়৷‌ সাহানা লন্ডনে পড়াশোনা করতে যায়৷‌ সাহানা এখন বিবাহিত৷‌ কিন্তু আমরা পরস্পরের বন্ধুই আছি৷‌

অলোকপ্রসাদ : ছবি আঁকা, সিনেমা তৈরি নিয়ে ব্যস্ততার জন্যে তুমি কি আর বিয়ে বা প্রেম নিয়ে ভাবার সময় পাচ্ছ না?

অর্ণব : সত্যিই পাচ্ছি না৷‌ ছবি আঁকছি৷‌ ফিল্ম নিয়ে পড়তে যাব৷‌ সিনেমা তৈরি করব৷‌ গানের গভীরে ডুব দেব৷‌ আর এখন, চিটাগাঙ মানে চট্টগ্রাম থেকে হাঁটাপথে দু’ঘণ্টা পেরিয়ে বান্দরবনের স্কুল নিয়ে ব্যস্ত আছি৷‌ ওখানকার স্কুলে দরিদ্র, আদিবাসী ছেলেমেয়েরা পড়ে এবং থাকে৷‌ হাতির পাল ওদের স্কুল ভেঙে দিয়েছে৷‌ আমার বন্ধুরা আর আমি ওই স্কুলটা গড়ব৷‌ আমার নতুন এই ‘খুব ডুব’ অ্যালবাম আর আমার ছবি বিক্রি করে টাকা তুলছি৷‌ ওই সব ছোট ছোট আদিবাসী ছেলেমেয়ের সঙ্গে আমাদের খুব বন্ধুত্ব হয়ে গেছে৷‌ ওদের স্কুল তৈরি করে ওদের মুখে হাসি ফোটানোই এখন আমার স্বপ্ন৷‌

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৩ thoughts on “কোলকাতায় সাক্ষাৎকারে অর্ণব : ‘গান ছেড়ে দিচ্ছি’

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

38 − 31 =