বেহাত বিপ্লব ১৯৭১ ও বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক জটিলতা। পর্ব -৩

সবমিলিয়ে ৭২-৭৫ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগের শাসনামলেই বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি বিকাশ লাভ করে। সলিমুল্লাহ খানের ভাষায় “শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হবার আগে থেকেই দেশের মুসলমানি সম্পন্ন হয়। সাম্প্রদায়িক শক্তি স্বরূপে নতুনভাবে জেগে ওঠে। শেখ সাহেবের পতনের পরে তাদের উত্থান হয়। মুক্তিযুদ্ধের বেহাত হয়। সেই যুদ্ধের অঙ্গীকার জাতি, ধর্ম ও শ্রেণীনিরপেক্ষ রাষ্ট্র কায়েম হয় নাই বলেই শত্রুপক্ষ ক্ষমতায় ফিরে এসেছে। এই বেহাত বিপ্লবের প্রথম বলি অবশ্যই খোদ মুক্তিযুদ্ধ (সলিমুল্লাহ খান, ২০০৭)”। মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে যারা অংশগ্রহণ করেছিল তারা স্বাধীন বাংলাদেশে ক্ষমতায় ফিরে মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার অনুসারে বাংলাদেশ রাষ্ট্র গড়ে তোলা দূরে থাকুক, মূলত বাংলাদেশ নামে পাকিস্তান রাষ্ট্রটিকেই জীবিত করতে চেয়েছে। ছফার ভাষায়ঃ

“তাদের মনের মধ্যে পাকিস্তান রাষ্ট্রটির অস্তিত্ব এমনভাবে গেঁথে আছে যে সে পাকিস্তানটি ভেঙ্গে গিয়ে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটলেও অবচেতনেও তাদের স্বীকার করতে বাধে। তাই নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশের রাষ্ট্ররূপের প্রসঙ্গে, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে পাকিস্তানটিকেই তারা জীবিত করতে চায়। তাই পাকিস্তান রাষ্ট্রের অতি পরিচিত জিকিরগুলোও তাদের মুখে নতুন করে প্রাণ পেয়ে ওঠে” (ছফা, ১৯৭৭)।

ফলে মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা সুদূরপরাহত হয়ে যায়। সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতার অপসারণ তার ধারাবাহিকতা মাত্র। ‘ছফাচন্দ্রিকাঃ বেহাত বিপ্লব ১৯৭১’ নামক প্রবন্ধে সলিমুল্লাহ খান যথার্থই প্রশ্ন তুলেছিলেনঃ

“আওয়ামী লীগ ও সহযোগী রাজনৈতিক শক্তি রাষ্ট্রনীতি ধর্মনিরপেক্ষতা রক্ষা করতে পারে নাই। ভবিষ্যতে যে পারবে তার সম্ভাবনা কতখানি? ধর্মনিরপেক্ষতার দায় আর গণতন্ত্রের দায় এক কথা। মনে রাখতে হবে আওয়ামী লীগ মধ্যবিত্ত শ্রেণীর দল। ভুললে চলবে কেন একদা এই দলের নাম ছিল আওয়ামী ‘মুসলিম লীগ’?” (সলিমুল্লাহ খান, ২০০৭)

এই প্রশ্ন ২০০৭ সালে তোলা। ২০১৫ সালে এই প্রশ্নের প্রাসঙ্গিকতা কমে নাই, বরং বৃদ্ধি পেয়েছে বলা যায়। এই প্রশ্ন কেন্দ্রে রেখেই আমরা পরবর্তী আলোচনা অব্যাহত রাখবো।

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক জটিলতা
বাংলাদেশ বর্তমানে যে রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে তার বিচার করতে গেলে ছফা ৭০ দশকের মাঝামাঝি বাংলাদেশের রাজনৈতিক জটিলতার যে বিচার করেছেন তা বিভিন্ন দিক থেকে আমাদের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ। একাত্তরের বিপ্লব বেহাত হওয়ায় যেসব প্রশ্নের মীমাংসা হয় নাই, সেসব প্রশ্নই আমাদের সময়ে আরো বড় ও জটিল হয়ে হাজির হয়েছে।

প্রায় দুই বছরের সামরিক বাহিনী সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শাসনের পর ২০০৯ সালে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়ে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় ফিরে এসেছিল। বাংলাদেশের কিছু পত্রপত্রিকা সেই সময় এই বিরাট জয়কে ‘নীরব বিপ্লব’ বলে অভিহিত করেছিল। এই সরকারের অধীনেই ২০১০ সালে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে বাংলাদেশের সংবিধানে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ পদটি আবার ফেরত এসেছে। এখানে উল্লেখ করা দরকার যে যাদের চাপে ও প্রচেষ্টায় বাংলাদেশের সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা ফেরত এসেছে তারা জনসংখ্যার দিক থেকে নগণ্য হলেও সংবিধানের এই পরিবর্তন করতে আওয়ামী লীগ সরকারকে বৃহত্তর জনগণের বিরোধিতাবিরোধিতার মুখে পড়তে হয় নাই, যেমন বাহাত্তরে ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি গ্রহণ কিংবা ধর্মীয় রাজনৈতিক দলগুলো নিষিদ্ধ করতে তৎকালিন আওয়ামী লীগ সরকারের কোন বিরোধিতাবিরোধিতার মুখোমুখি হতে হয় নাই। কিন্তু সাংবিধানিক ধর্মনিরপেক্ষ নীতি বাংলাদেশের সমাজকে খোলনলচে পালটে দিয়ে একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্যে যথেষ্ট ছিল না। ভারত, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও বাংলাদেশের বামপন্থীদের (আওয়ামী লীগের ভেতর ও বাহিরের) প্রভাব ও সংশ্রবের কারণে আওয়ামী লীগ ধর্মনিরপেক্ষ নীতি সংবিধানে গ্রহণ করেছিল কিন্তু একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র গঠনের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে সেই অনুযায়ী কর্মপন্থা তারা নির্ধারণ করতে পারে নাই। ছফার ভাষায় –

“ইংরেজি ‘সেক্যুলারিজম’ শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ যদি ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ ধরে নেওয়া হয়, আওয়ামী লীগ দলটি প্রথম থেকেই ধর্মীয় ভাববাষ্পের অন্তরাল থেকে জনগণের মন মানসিকতাকে পরিচ্ছন্ন করার উদ্দেশ্যে কোন কর্মসূচিই গ্রহণ করেনি। ফলে আওয়ামী লীগের ঘোষিত কর্মকাণ্ড অসাম্প্রদায়িক হলেও তাকে ঠিক সাম্প্রদায়িকতামুক্ত রাজনৈতিক সংগঠন বলার উপায় নেই কিছুতেই। বরং বলা যায় সাম্প্রদায়িক মুসলিম লীগের গর্ভ থেকেই আওয়ামী লীগের উদ্ভব” (ছফা, ১৯৭৭)।

তাহলে দেখা যাচ্ছে যে সাংবিধানিকভাবে ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি গ্রহণ করলেও একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র গঠনের জন্যে সমাজ ও রাষ্ট্রকাঠামোর যে পরিবর্তনগুলো করা দরকার ছিল আওয়ামী লীগ তা করে নাই। এর মধ্যেই বেহাত বিপ্লবের চরিত্র প্রকাশিত হয়। সাম্প্রদায়িক পাকিস্তান রাষ্ট্রের অন্যতম বৈশিষ্ট ছিল শত্রু সম্পত্তি আইন। সাম্প্রদায়িক হাঙ্গামা এবং পরিকল্পিত ‘পোগ্রোম’-এর শিকার হয়ে বাংলাদেশ থেকে যেসব হিন্দু ভারতে চলে গেছে তাদের সম্পত্তি দখল করার বৈধতা প্রদানে এই আইন ভূমিকা রেখেছে। একাত্তরে পাকিস্তানের সামরিক জান্তার অন্যতম কৌশল ছিল বাংলাদেশকে নিহিন্দু করা, তাই হিন্দুরা ছিল তাদের অন্যতম প্রধান টার্গেট। একাত্তরে প্রায় কোটিখানেক বাঙালি ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল, যাদের বড় অংশই ছিল হিন্দু ধর্মাবলম্বী। ছফার মতে, পাকিস্তানের শাসক শ্রেণী এক ঢিলে বহু পাখি মারতে চেয়েছিল। তারা একদিকে ভারতের উপরে বাড়তি এক কোটি জনসংখ্যার বোঝা চাপিয়ে দিয়েছিল, অন্যদিকে দেশ ছেড়ে পালানো হিন্দুদের সম্পত্তি এদেশের মুসলমানদের হাতে লুটপাটের জন্যে তুলে দিয়ে একটি সমর্থকগোষ্ঠী তৈরি করে নিজেদের ক্ষমতা সংহত করতে চেয়েছিল। বলাবাহুল্য, পাকিস্তানের প্রধান উদ্দেশ্য অর্থাৎ পাকিস্তানের সংহতি রক্ষার চেষ্টা সফল হয় নাই। পাকিস্তান পরাজিত হয়েছে এবং বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে। কিন্তু হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক বিভেদ বাড়িয়ে তোলার যে কৌশল তারা গ্রহণ করেছিল তাতে তাদেরকে অনেকাংশেই সফল বলা চলে। কারণ, দেখা গেলো ধর্মনিরপেক্ষ স্বাধীন বাংলাদেশে পরিস্থিতির কোন পরিবর্তন ঘটলো না, বরং কিছুক্ষেত্রে আরো খারাপ হয়ে গেলো। ছফা লিখেছেন –

“যুদ্ধের পর নানা সম্প্রদায় মিলেমিশে এখানে একটি ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তার যে সুস্থ বিকাশক্ষেত্র রচিত হওয়ার কথা ছিল, তার সঠিক সূচনাটিও হতে পারেনি। আন্তঃসাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ এবং বিভেদরেখা না কমে আর স্পষ্ট ও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ছিল তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি সর্বস্বান্ত। তারা আশা করেছিল যে স্বাধীনতার পর তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের হাতে নিগৃহীত হবে না। সব ব্যাপারে সমান সমান সুযোগ সুবিধা লাভ করবে। কিন্তু স্বাধীনতার পর দেখা গেল, সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের মনোভাব অনেক বেশি বিষিয়ে গেছে। তারা তাদের দিকে অধিকতর সন্দেহ এবং অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকাতে আরম্ভ করেছে। যুদ্ধের সময় তারা ভারতে চলে গিয়েছিল, তাদের ঘরবাড়ি সবকিছু সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের লোকদের হাতে পড়েছে। সেগুলো দাবি করাতে অধিকতর তিক্ততার সৃষ্টি হলো” (ছফা, ১৯৭৭)।

আহমদ ছফা বহু আগেই লিখে গেছেন যে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের সম্পত্তি দখলের উৎসবে শুধু মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ধর্মান্ধরাই সামিল হয় নাই, আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীরাও অল্পবিস্তর সামিল হয়েছিল। এই লুন্ঠনযজ্ঞ আজ অবধি চালু আছে। এবং বিগত ৪৩ বছরের হিসাব করলে দেখা যাবে যে সংখ্যালঘুদের সম্পত্তি দখলের প্রতিযোগিতায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা অন্যদের চাইতে পিছিয়ে নাই। বাংলাদেশের সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার মূলনীতি ফিরে আসলেও যেসকল সামাজিক, রাজনৈতিক, রাষ্ট্রীয় ও আইনী কাঠামো বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও লুন্ঠনের শক্তি যোগায় তার কোন আমূল পরিবর্তন সাধিত হয় নাই। শত্রু সম্পত্তি আইন এখন পর্যন্ত বহাল আছে। বিগত তিন বছরে বাংলাদেশে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের উপর যে পরিমাণ হামলা ও লুন্ঠনের ঘটনা ঘটেছে তা অতীতের যে কোন সময়কে ছাড়িয়ে গেছে। ভুলে গেলে চলবে না যে ধর্মনিরপেক্ষতার রক্ষক বলে পরিচিত এই সরকারের আমলেই রামু ও সাথিয়ার মতো সাম্প্রদায়িক লুন্ঠন এখন এতোটাই নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে যে মানুষ মুখ ফুটে প্রতিবাদ করতেও প্রায় ভুলে গেছে। এসব লুন্ঠনে অন্যান্য দলের মতো আওয়ামী লীগের স্থানীয় সামন্ত ও লুটেরা শ্রেণীর নেতারাও নেতৃত্ব দিয়েছে। মনে রাখতে হবে যে এই সরকারের প্রত্যক্ষ মদদে এবং আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন ওলামা লীগের তৈরি করা লিস্ট অনুসরণ করে বাংলাদেশে এখন ব্লগার হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটছে। এই সরকারের আমলেই হেফাজতে ইসলাম জমিজমা ও ক্ষমতা লাভ করেছে এবং তাদের এক ধমকে বইমেলার একটি গোটা স্টল বন্ধ করে দিয়েছে বাঙলা একাডেমি। পুরনো সাম্প্রদায়িক আইন, সামন্ত রাজনীতি আর ধর্মীয় পুরোততন্ত্রের সাথে আপোষ করে এবং তার শক্তি বৃদ্ধি করে সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতাকে মূলনীতি করে রাখলে তাকে ‘বেহাত বিপ্লব’ ছাড়া ভিন্ন কিছু ভাবার উপায় থাকে কি? এই ‘বেহাত বিপ্লব’ কি একাত্তরের ‘বেহাত বিপ্লবের’ নামান্তর নয়? যদি তাই হয়ে থাকে তাহলে আমাদের প্রস্তাব, এই বিপ্লবকে হস্তগত করে শুদ্ধ বিপ্লবে রূপান্তরের চেষ্টা করেছিল ‘শাহবাগ আন্দোলন’।

(চলবে)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “বেহাত বিপ্লব ১৯৭১ ও বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক জটিলতা। পর্ব -৩

  1. ছফার দর্শন কী? এটা নিয়ে আলাপ
    ছফার দর্শন কী? এটা নিয়ে আলাপ করা আগে জরুরী। তার দর্শন সম্পর্কে পরিষ্কার হতে পারলে আমরা তার দর্শনের আলোকে ইতিহাসের ব্যাখ্যা নিয়ে আলাপে যেতে পারি।

    1. ছফার দর্শন কি এটা আপনি জানেন
      ছফার দর্শন কি এটা আপনি জানেন না? নিক ও আপনার পোস্ট দেখে ভেবেছিলাম আপনি অনেক কিছুই জানেন। ছফার দর্শন নিয়ে যদি সমস্যা থাকে সেটা স্পষ্ট আলোচনা করেন।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 4 = 4