ডিটেকটিভ থেকে পাওয়া

বাংলাদেশ আজ স্বাধীন রাষ্ট্র;-
১৯৭১সালে পাকিস্তানি হায়েনা সৈন্যদের আগ্রাসন থেকে বাংলাদেশকে স্বাধীন করতে বাঙালি জাতিকে উৎসর্গ করতে হয়েছিল ত্রিশ লক্ষ শহীদদের তাজা প্রান আর দু লক্ষ মা বোনের পবিত্র ইজ্জত।


বাংলাদেশ আজ স্বাধীন রাষ্ট্র;-
১৯৭১সালে পাকিস্তানি হায়েনা সৈন্যদের আগ্রাসন থেকে বাংলাদেশকে স্বাধীন করতে বাঙালি জাতিকে উৎসর্গ করতে হয়েছিল ত্রিশ লক্ষ শহীদদের তাজা প্রান আর দু লক্ষ মা বোনের পবিত্র ইজ্জত।

আমরা, বাঙালিরা কতো সহজেই ভুলে যাই বা গেছি সেই অমৃত সমান শহীদদের,বিড়ম্বিত মা বোনদের! এমনকি স্বাধীনতার ৪৪ বছর পর শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে নিরাপদ অবস্থানে বসে কত কথাই বলছি। কত রাজা উজির নিমিষেই মেরে ফেলছি কিছু- মুখরুচক কথায়। স্বাধীনতার বীর সৈনিক,যে বাঙালি জাতির মুক্তির নেশায় নিজের জীবনের সবটুকু সময়ই ব্যয় করে দিলেন,বিশ্ববাসি জাকে বাঙালি জাতির জনক বলে অখ্যায়িত করলো,যার জন্ম না হলে দিশেহারা বাঙালি জাতি মুক্ত হতেই পারতো না শোষণের হাত থেকে সেই বাঙালির বন্ধু- বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে আঙ্গুল তুলে অভিযোগের পাহাড় তৈরি করি।

যারা এখন না না রঙে রঙ্গিন হয়ে এই অভিযোগের আঙ্গুল তুলি,সেই আমরা নিমকহারামরা ভুলে যাই, এই আঙুল তোলার অধিকারটাও বাঙালি জাতিকে দিয়ে গেছেন শেখ মুজিব।নইলে আঙুলতো ভালো পাও তুলতে পারতেন না জনাব।

যারা রঙ্গে রঙ্গিন হয়ে হাজারও কথায় জনগনকে বিভ্রান্তির মধ্যে রাখছেন, তারা বুঝতেও পারছেন না, এই বাংলাদেশকে স্বাধীন করার যাত্রা কতো কঠিন ছিল-।কতো বন্ধুর ছিল-।কতো বিড়ম্বিত ছিল-সে সব যদি জানতেন, আমি বিস্বাস করি এই মহান লোকটির বিরুদ্ধে আঙুল তুলতে লজ্জা পেতেন। অবশ্য লজ্জা জিনিষটা আজকাল বাঙালির কাছেই লজ্জা পাছ্ছে। আর জানবেনই বা কি করে জনাব, জানবার জন্য নুন্যতম চেষ্টা থাকার দরকার হয়।সেটাই তো নেই। কিন্তু হামবড়া একটা ভাব আছে, আমি কি হনুরে!

এই আমি কি হনুদের আত্যাচারে মিথ্যাচারে গোটা দেশ- আজ টালমাটাল। ইতিহাস স্বাক্ষি বাঙালি বড় আত্মপ্রতারক, বাঙালি বড় আত্মহননে বিশ্বাসী, বাঙালি বড় পরশ্রীকাতর।

এই পরশ্রীকাতরতা প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু তার অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে বলেছেন-” আমাদের বাঙালির মধ্যে দুিট দিক আছে। একটা হল আমরা মুসলমান আর একটা হল আমরা বাঙালি।পরশ্রীকাতরতা এবং বিশ্বাসঘাতকতা আমাদের রক্তের মধ্যে রয়েছে। বোধহয় দুনিয়ার কোন ভাষায় এই কথাটা পাওয়া যাবেনা,’পরশ্রীকাতরতা’।পরের শ্রী দেখে যে কাতর হয় তাকে ‘পরশ্রীকাতর ‘ বলে। ঈর্ষা,দ্বেষ সকল ভাষায় পাবেন,সকল জাতির মধ্যেই কিছু কিছু আছে,কিন্তু বাঙালি জাতির মধ্যে আছে পরশ্রীকাতরতা।ভাই,ভাইয়ের উন্নতি দেখলে খুশী হয় না। এই জন্যই বাঙালি জাতির সকল গুন থাকা সত্বেও জীবনভর অন্যের অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছে। সুজলা,সুফলা বাংলাদেশ সম্পদে ভর্তি। এমন উর্বর জমি দুনিয়ার খুব অল্প দেশেই আছে। তবুও এরা গরিব। কারন, যুগ যুগ ধরে এরা শোষিত হয়েছে নিজেদের দোষে। নিজেকে এরা চেনে না, আর যতদিন চিনবে না এবং বুঝবে না ততোদিন এদের মুক্তি আসবে নাম।”[অসমাপ্ত আত্মজীবনী,শেখ মুজিবুর রহমান,পৃষ্ঠা-৪৭-৪৮]

শেখ মুজিবুর রহমানের এই বিশ্লেষণ ভাষ্য থেকেই আমরা আমাদের চিরতে পারি খুব সহজেই।যেমন ধরুন-যখনই কোথাও শেখ মুজিব সম্পর্কে আলোচনা হছ্ছে, বা হয়,আত্মপ্রতারক ও পরশ্রীকাতর বাঙালি টেনে আনে জেনারেল জিয়াকে।মানে, ভাবখানা দেখায় দুজনে সমানে সমান। আরে বাবা, যে মেজরের চাকরী হয়েছে শেখ মুজিবের সিগনেচারে, যে মেজর মেজর থেকে লে. কর্নেল,লে. কর্নেল থেকে পর্যায়ক্রমে মেজর জেনারেল হয়েছে, সে কি করে শেখ মুজিবের সমান হয় ?

জেনারেল জিয়া তো একটা ডাকাত ছিল-। যার দায়িত্ব ছিলো দেশকে, দেশের প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে কোন ষড়যন্ত্র হলে প্রতিহত করা, ষড়যন্ত্র উৎখাত করা। সেই অর্পিত সাংবিধানিক দ্বায়িত্ব পালন না করে জেনারেল জিয়া অপেক্ষায় থেকে, দেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতিকে স্বপরিবারে মেরে ফেলার সুযোগ করে দিয়েছে। যখন দেখেছে রাস্তা ক্লিয়ার,তখন প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হয়ে দন্ড হাতে নিয়েছে। দন্ড হাতে নিয়েই এই জেনারেল খান্ত হয়নি,মাত্র চার বছর আগে যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে, যে অপশক্তি স্বাধীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শত্রু,তাদেরকেই সাংবিধানিক ভাবে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে। জেনারেল জিয়া, স্বাধীনতা বিরুধীদের প্রতিষ্ঠার কারনে,বাঙালি জাতি-সত্তার যে ক্ষতি হয়েছে, সেটা হাজারও বছরে পূরন হবার নয়।

বাংলাদেশে প্রথম জেনারেল প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হয়ে জেনারেল জিয়া বাংলাদেশকে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অবিনাশী চেতনাকে একেবারে ব্যাগ গিয়ারে এনেছেড়ে দেয়।

সামরিক শাসক জিয়ার ক্ষমতা যারাই চ্যালেন্জ করেছিল, তাদেরই হত্যা করা হয়েছে। ক্ষমতা কুক্ষিগত পাকাপোক্ত করতে জিয়া শত শত মুক্তিযুদ্ধা ও সেনাসদস্যদের হত্যা করেছিল। তিনি রাজাকারদের পুনর্বাসনসহ স্বাধীনতার স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো ধ্বংস করেছেন। জেনেভা কনভেনশন বা দেশের আইন লঙ্ঘন করে গোপন বিচারের মাধ্যমে কর্নেল তাহের সহ ১৬ জনের মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়। জিয়া ও আবু সাদাত মোঃসায়েম সেসব বিচারের নথিপত্র ধ্বংস করেছে বলেই এখন তা খুজে পাওয়া যাছ্ছে না।

১৯৭৫ সালের ২০শে আগষ্ট সামরিক আইন জারি এবং ১৪ই জুন আরেকটি সামরিক আইন আদেশ জারি করে কর্নেল তাহেরের গোপন বিচারের জন্য সামরিক আইন আদালত গঠন করে, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে এ আদালত স্থাপন করে ১৯৭৬ সালের ১৭ই জুলাই কর্নেল তাহের সহ অন্যদের বিচার সম্পন্ন করার ৭২ ঘন্টার মধ্যেই কর্নেল তাহেরের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে।

১৯৭৭ সালে জেনারেল জিয়া ১৩ টি সামরিক আইন জারি করেন। ক্ষমতা কুক্ষিগত করতেই জেনারেল জিয়া সেই সময়ের ৮৯৬ জন সেনা সদস্যের ফাঁসি কার্যকর করে এবং হাজার হাজার সেনাসদস্যের সাজা দেওয়া হয়। দুই হাজারেরও বেশি সেনাসদস্য নিখোজ হন। এখন পর্যন্ত নিখোজ সেনাসদস্যদের পরিবার তাদের পরিনতি সম্পর্কীয় কোন তথ্যই জানে না। সে সময় রাত ১২টার পর থেকে সারা রাত চলতো ফাসি দেওয়ার কাজ। প্রতি রাতে কারা অভ্যন্তরে ৩০-৫০ জনের ফাসি কার্যকর করতেন।

জেনারেল জিয়ার সময়ে ভয়ে শেখ মুজিবের নামও নেয়া যেতো না! কি বিস্বয়কর বিশ্বাসঘাতক, যে মানুষটি তার জীবনের শ্রেষ্ঠসময়, যৌবনের চৌদ্দ বছর কারনে অকারনে পাকিস্তান জান্তার কারাগারে কাটিয়ে দিলেন, গলার সামনে অসংখ্যবার ফাঁসির দড়ি দেখেছেন, অখন্ড পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীত্বের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছেন, কেবলই মাত্র বাঙালি জাতির স্বাধীকারের তীব্র অভিপ্রায়ে, সেই মহত্তম মানুষটির বিরুদ্ধে জেনারেল জিয়ার এই নৃশংস ভূমিকা কী ইতিহাস কখনও ভুলবে-? বা ক্ষমা করবে-?

শেয়ার করুনঃ

৪ thoughts on “ডিটেকটিভ থেকে পাওয়া

  1. লেখাটি ডিটেকটিভ সংখ্যা ২০১৩
    লেখাটি ডিটেকটিভ সংখ্যা ২০১৩ এর ‘বঙ্গবন্ধুর প্রথম রাষ্ট্রীয় সফর ও আমাদের রঙিন বাঙালিগণ’নামক প্রবন্ধ থেকে নেয়া যা লিখেছেন গবেষক ও গল্পকার ‘প্রত্যয় রায়হান’

Leave a Reply

Your email address will not be published.