বেহাত বিপ্লব ১৯৭১ ও বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক জটিলতা। শেষ পর্ব


ছবিঃ ফ্রানৎস্ ফাঁনো

সলিমুল্লাহ খান ২০০৭ সালে যে প্রশ্ন তুলেছিলেন – আওয়ামী লীগ অতীতে ধর্মনিরপেক্ষতা রক্ষা করতে পারে নাই ভবিষ্যতে পারবে তার নিশ্চয়তা কি? এই প্রশ্ন তার একার প্রশ্ন ছিল না, অনেকেরই মুখে অথবা মনে ছিল। বিশেষ করে বাংলাদেশে নব্বই দশকের পরে যে আদর্শিক সেকুলার মধ্যবিত্তের জন্ম হয়েছে তারা কখনোই এই বিষয়ে আওয়ামী লীগের ব্যাপারে সন্দেহমুক্ত ছিল না। সন্দেহমুক্ত ছিল না একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ক্ষেত্রেও। আওয়ামী লীগ যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘস্থায়ী করে এই বিচারটিকে নিজের রাজনৈতিক স্বার্থ উদ্ধারের একটি মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করতে পারে এই আশংকাও মানুষের মাঝে ছিল। ফলে আওয়ামী লীগের মেয়াদের একেবারে শেষদিকে এসে যখন রায় হওয়া শুরু করলো একইরকম অপরাধে পলাতক একজনকে ফাঁসি এবং আটক একজনকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেয়া হলো তখন তার মধ্যে নির্বাচনপূর্ব আপোষের ছায়াও মানুষ দেখতে পেলো। একদিকে যেখানে জামায়াত ইসলামীর ডাকা সহিংস হরতাল চলছিল আরেকদিকে পুলিশে-জামাতে ফুল দেয়া নেয়ার ঘটনাও ঘটছিল। এই পরিস্থিতিতে কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন রায় মানুষের কাছে একেবারেই ভিন্ন অর্থ বহন করেছে। মানুষ আশংকা করেছে, সরকার সেইফ এক্সিটের জন্যে আপোষ করছে এবং ভবিষ্যতে ক্ষমতার পট পরিবর্তন হলে একাত্তরের কসাই কাদের হয়তো বুক ফুলিয়ে জেলখানা থেকে বেরিয়ে আসবেন। রায়ের পর কাদের মোল্লার ভি চিহ্ন প্রদর্শন এই আশংকাকে ক্ষোভে পরিণত করেছিল। এই ক্ষোভ থেকেই শাহবাগ আন্দোলনের সূত্রপাত। কিন্তু যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ছিল নিমিত্ত মাত্র, এই আন্দোলন মূলত সাংবিধানিক ধর্মনিরপেক্ষতার নীতিকে একটি বাস্তব সামাজিক রূপান্তরের মাধ্যমে টিকিয়ে রাখতে চেয়েছিল যাতে ক্ষমতার পট পরিবর্তন হলেও রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষতা হুমকির মুখে না পড়ে। কিন্তু শাহবাগের এই বিপ্লবের মধ্যে আওয়ামী লীগ আরেক দফা ক্ষমতায় টিকে থাকার সুযোগ আবিষ্কার করেছিল। ২০১৩ সালের বিপ্লব বেহাত হওয়ার গল্প এইখান থেকেই শুরু।

একাত্তরের বিপ্লব বেহাত হওয়ার পেছনে একেবারে গোড়ার কারণ হিসাবে আহমদ ছফা চিহ্নিত করেছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সময় আওয়ামী লীগের ভারত নির্ভরতা। বাংলাদেশের কোটিখানেক মানুষসহ বাংলাদেশ সরকার ভারতের আশ্রিত হয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ভারতের রাজনৈতিক স্বার্থের মধ্যে আটকে গিয়েছিল। আহমদ ছফার মতে, ভারতের শাসক কংগ্রেস সরকার বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে তাদের স্বার্থ হাসিলের একটি উপায় হিসাবে দেখেছিল। নিজেদের স্বার্থের আওতা অনুযায়ীই তারা এই মুক্তিযুদ্ধের সহযোগিতা করেছে। ছফা দাবি করেছেন, ভারত আসলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা চায় নাই, একেবারেই বাধ্য হয়ে শেষ পর্যন্ত সমর্থন দিয়েছে এবং তাও দিয়েছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে নিজেদের স্বার্থের অনুকুলে আবদ্ধ রেখেই। ফলে ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক, বুদ্ধিজীবীসহ আপামর জনগণের বিপ্লব ভারতের শাসক কংগ্রেস এবং আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বিকশমান নতুন মধ্যবিত্তের হস্তগত হয়েছে। বিপ্লব বেহাত হয়েছে। বেহাত বিপ্লবের এই পর্ব কেন্দ্র করে আহমদ ছফা তার ‘অলাতচক্র’ উপন্যাসটি লিখেছেন। এই লেখায় সেই উপন্যাস সম্বন্ধে কিছু বলার সুযোগ আপাতত নাই।

শাহবাগ আন্দোলনের ফসল যেহেতু আওয়ামী লীগই ঘরে তুলেছে, এবং তারাই যেহেতু আন্দোলনটির উপসত্বভোগী হয়ে ক্ষমতা টিকিয়ে রেখেছে সেই হিসাবে শাহবাগের আন্দোলনটিও আওয়ামী লীগের হস্তগত অর্থাৎ ‘বেহাত বিপ্লব’ হয়েছে বলে কেউ কেউ দাবি করতে পারে। কিন্তু আমরা এখনো এই দাবি করতে চাই না। বরং আমরা কিছু প্রশ্ন রেখে যেতে চাই।

শাহবাগের পর কি?
২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে শাহবাগ আন্দোলনের সূত্রপাত। এরপর আড়াই বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। এই সময়ে বাংলাদেশে বড় ধরণের কিছু পরিবর্তন ঘটে গেছে। বাংলাদেশে একটি একদলীয় নির্বাচন হয়েছে, আওয়ামী লীগ দেশে একধরণের দলীয় একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে। জিয়াউর রহমান প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল বিএনপি শুধু সংসদীয় বিরোধী দলের পরিচয়ই হারায় নাই, কার্যত একটি বিরোধী দল হিসাবে তাদের কোন তৎপরতা এখন আর নাই। কার্যকর বিরোধী দলহীন এই শূন্যতার মাঝে বাংলাদেশে ইসলামবাদী সাম্প্রদায়িক ও সন্ত্রাসবাদী রাজনীতি বিস্তার লাভ করেছে। দেখা যাচ্ছে যে ইসলামপন্থীদের ছাড়া আর কাউকেই বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার গোনায় ধরছে না। শাহবাগ আন্দোলনের পর দেখা গেলো ইসলামবাদীদেরই ক্ষমতাবৃদ্ধি ঘটেছে। অন্যদিকে শাহবাগ আন্দোলনকারীরা রাজনৈতিক অপপ্রচার, হামলা, মামলা ও একের পর এক হত্যাকান্ডের শিকার হয়ে ক্রমাগত দুর্বল হয়েছে। কারো কারো মতে শাহবাগ বধ ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। এইখানেই আমাদের আপত্তি।

আহমদ ছফার দাবি অনুযায়ী, ভারতের হস্তক্ষেপে তড়িঘড়ি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সম্পন্ন না হলে একাত্তরের বিপ্লব বেহাত হত না। মুক্তিযুদ্ধ আরও দীর্ঘস্থায়ী হলে মুক্তিযুদ্ধের রাষ্ট্র নির্মাণ করা সহজ হতো। ছফার ভাষায় –

“বাংলাদেশের মাটিতে যদি সত্যিকার একটা দীর্ঘস্থায়ী মুক্তিযুদ্ধ অনুষ্ঠিত হতে পারত, বাংলাদেশের জনগণমাত্রকেই সে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে হত। নানা মতের, নানা ভাবাদর্শের মানুষের খন্ডিত জীবনদৃষ্টি যুদ্ধের আগুনে গলিত হয়ে একটি উদার একমুখী রূপ গ্রহণ করত। সেটা হয়নি বলেই এ সঙ্কটের উৎপত্তি ঘটেছে। এ হচ্ছে শুরু থেকেই জাতিসত্তা চিনতে না পারার মারাত্মক পরিণতি। এই জন্যই বাংলাদেশের যুদ্ধ ভারতের শাসকশ্রেণীর যুদ্ধে পরিণত হয়েছিল। এই অংশগ্রহণের তারতম্যের জন্য, অভিজ্ঞতার বৈপরীত্যের জন্যই প্রতিটি গ্রুপ ও ধর্মাবলম্বী দল একে অন্যকে সন্দেহ, অবিশ্বাস এবং ঘৃণার চোখে দেখছে” (ছফা, ১৯৭৭)।
\
ছবিঃ তরুণ আহমদ ছফা

জাতিসত্ত্বা চিনতে না পারার যে সংকট তাই আমাদের সময়ে বড়ভাবে হাজির হয়েছে। ইতিহাসের অমীমাংসিত প্রশ্নের মীমাংসার জন্যেই শাহবাগের গণআন্দোলন হয়েছে। অর্থাৎ একাত্তরের বিপ্লব বেহাত হয়েছে বলেই শাহবাগে গণআন্দোলন হয়েছে। ফানোঁ এবং ছফাকে সাক্ষী মানলে, একাত্তরের নেতৃশ্রেণীর অন্তর্গত শ্রেণীগত দুর্বলতার কারণেই বিপ্লব বেহাত হয়েছে। এই কথা অস্বীকার করার উপায় নাই যে শাহবাগ আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীরা মূলত বাংলাদেশের বর্তমান প্রজন্মের শহুরে শিক্ষিত মধ্যবিত্তের অংশ। আর সব উপনিবেশ থেকে স্বাধীনতা লাভ করা উন্নয়নশীল দেশগুলোর মতো বাংলাদেশের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর পক্ষে জনগণের জাতীয় মুক্তি সংগ্রামকে আত্মস্থ করা সম্ভব হয় নাই বলেই একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ বেহাত হয়েছিল। এই প্রজন্মের শাহবাগ আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীরা এই সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করতে পেরেছে কি? আমরা মনে করি, পুরোপুরি পারে নাই। কিন্তু একেবারেই পারে নাই তা বলাও সঠিক হবে না। যারা মনে করেন, শাহবাগ আন্দোলন একেবারেই ব্যর্থ হয়েছে, এবং এই আন্দোলনে জনগণের কোনই অর্জন হয় নাই, আমরা তাদের সাথে একমত নই। যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রক্রিয়ায় আইনগত পরিবর্তনের সফলতার কথা বাদ দিলেও বলতে হয় যে শাহবাগ আমাদের সমাজে দীর্ঘকালের জমে থাকা গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্ন মীমাংসার রাস্তা খুলে দিতে পেরেছে। সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শাহবাগ আন্দোলন মুক্তিযুদ্ধের বেশকিছু জাতীয়তাবাদী স্লোগান ও প্রতীককে তার পূর্বের সীমাবদ্ধতার খাঁচা থেকে মুক্ত করে জাতীয় চেতনায় উত্তরণ ঘটাতে সফলতা লাভ করেছে। ফলে তুমি কে আমি কে? এই প্রশ্নের পরে বাঙালির সাথে আদিবাসীও যুক্ত হয়েছে। শাহবাগে নারী সমাজের বিপুল উপস্থিতি ও নেতৃত্বও একটি গুনগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। ফ্রানৎস ফানোঁর স্মরণ আমাদের নিতেই হবে। ফাঁনো লিখেছিলেন –

“যে বুর্জোয়াতন্ত্র জনগণের খাদ্য হিসাবে কেবল জাতীয়তাবাদের যোগান দেয় সেই বুর্জোয়াতন্ত্র তার উদ্দেশ্যলাভে ব্যর্থ হয় এবং একের পর এক দুর্ঘটনায় পতিত হয়। আবার জাতীয়তাবাদকে যদি সুস্পষ্ট করে তোলা না যায়, যদি একে সামাজিক ও রাজনৈতিক চাহিদার চেতনায়, অর্থাৎ মানবতাবাদে পরিণত করে সমৃদ্ধ ও গভীর করে তোলা না হয়, তাহলে জাতীয়তাবাদের রাস্তা কানাগলিতে গিয়ে শেষ হবে। অনুন্নত দেশের বুর্জোয়া নেতারা জাতীয় চেতনাকে নিষ্ফলা রীতিরেয়াজে বন্দী করে ফেলেন। যখন সকল নারীপুরুষ একটা আলোকিত, ফলপ্রসূ কর্মে বৃহৎ মাত্রায় যুক্ত হবে, কেবলমাত্র তখনই চেতনার আকার লাভ হবে। .তখনই সরকারী প্রাসাদ ও পতাকা আর জাতির প্রতীক থাকবে না; জাতিসত্তা এইসব আলোকোজ্জ্বল, ফাঁপা খোলস ছেড়ে আশ্রয় নেবে দেশের ভেতর। সেখানে তার মধ্যে প্রাণপ্রতিষ্ঠা হবে, গতিসঞ্চার হবে। জাতিসত্তার জীবন্ত চেহারা পাওয়া যায় সমগ্র জনগণের গতিময় চেতনায়, নরনারীর সুসংবদ্ধ, সুউন্নত কর্মে। ভাগ্যগঠনের এই দলবদ্ধ প্রচেষ্টা একটি ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করার প্রচেষ্টা। এই দায়িত্ব পালন করতে না পারলে, দেখা দেবে নৈরাজ্য, নিষ্পেষণ এবং গোত্র ও গোষ্ঠিতন্ত্রের পুনরুত্থান। জাতীয় সরকার যদি প্রকৃতই জাতীয় হয়ে উঠতে চায়, তবে তাকে জনগণের দ্বারা এবং জনগণের স্বার্থে চালিত হতে হবে। বঞ্চিতের দ্বারা এবং বঞ্চিতের স্বার্থে চালিত হতে হবে। কোন নেতাই, তা সে যতোই মূল্যবান হোক না কেন, জনতার ইচ্ছার বিকল্প হিসাবে নিজেকে দাঁড়া করাতে পারবে না এবং আন্তর্জাতিক মানসম্মান নিয়ে মাথা ঘামানোর আগে একটা জাতীয় সরকারের ফেরৎ দিতে হবে তার নাগরিকের মানমর্যাদা, পূর্ণ করতে হবে তাদের মন এবং প্রাণভরে দেখতে হবে মানুষকে, আর তৈরি করতে হবে একটি মানবিক সম্ভাবনা কেননা তারমাঝেই সজ্ঞান ও সার্বভৌম মানুষের বসবাস (ফানোঁ, ১৯৬৫)।

আমরা প্রস্তাব করছি, ফানোঁর এই বক্তব্য বাংলাদেশের বর্তমান শাসক শ্রেণীর জাতীয়তবাদের বিচার এবং পাশাপাশি শাহবাগ আন্দোলনের সাফল্য ব্যর্থতা, দুর্বলতা ও সম্ভাবনা বিচারের একটি মাপকাঠি হতে পারে। আমাদের প্রশ্ন হলো, ইতিহাসের যে অজ্ঞান চেতনা থেকে বাংলাদেশের জাতিসত্ত্বার জন্ম হয়েছে, শাহবাগ আন্দোলন তার সজ্ঞান বহিঃপ্রকাশ হয়ে উঠতে পেরেছে কি না? ফরাসি বিপ্লবের মতো বুর্জোয়া বিপ্লবের অনুপস্থিতি যদি প্যাসিভ রিভোল্যুশনের কারণ হয় এবং একাত্তরে যে ধরণের মধ্যবিত্ত বুর্জোয়া বিপ্লবের অনুপস্থিতিতে বিপ্লব বেহাত হয়েছিল শাহবাগের প্রজন্ম ইতিহাসের সেই দাবীতেই উপস্থিত হয়েছে? না কি হতে চলেছে?

যে প্রজন্ম শাহবাগ আন্দোলন করেছে এই ঐতিহাসিক দায়িত্বরা পালন করতে পারবে কি না সেই প্রশ্নের উত্তর নিশ্চয় ভবিষ্যতে পাওয়া যাবে। তবে এই ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করার জন্যে এই প্রজন্মকে অবশ্যই শ্রমিকের,কৃষকের, সর্বপরি আপামর জনসাধারণের মুক্তি সংগ্রামের চেতনা ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করতে হবে। ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের জন্যে তাকে শুধু ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর নীপিড়নের বিরুদ্ধে লড়াই করলেই চলবে না, জাতিগত নীপিড়ন যা এখন সাম্প্রদায়িক নীপিড়নের মতোই নিয়মিত হয়ে উঠেছে, তার বিরুদ্ধেও শক্ত অবস্থান গ্রহণ করতে হবে। এবং তাকে অবশ্যই গণতন্ত্রের জন্যেও লড়তে হবে। সলিমুল্লাহ খান যেমন বলেছেন ‘ধর্মনিরপেক্ষতা আর গণতন্ত্রের দায় এক কথা’, আমরা তার সাথে একমত। গণতন্ত্র বিপণ্ন হলে ধর্মনিরপেক্ষতা নিরাপদ থাকবে এই ভুল যেন এই প্রজন্ম না করে। এই ভুল করলে এবং বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান তথাকথিত সেকুলার স্বৈরাচারী সরকার ও ইসলামবাদের মেরুকরণ আরো বৃদ্ধি পাবে, যা বাংলাদেশের ভবিষ্যত অস্তিত্বই হুমকির মুখে ফেলে দিতে পারে। ইতিহাসের এই দায় মেটানো সহজ কাজ নয়। তারপরও সলিমুল্লাহ খান শাহবাগ আন্দোলনের এক বছর পূর্তিতে এই প্রজন্মের উপরই ভরসা রেখেছিলেন –

“শাহবাগের তরুণজাতি কি প্রস্তুত? ভুলিলে চলিবে না বাংলাদেশ না বাঁচিলে গণতন্ত্র বাঁচিবে না। আরও বেশি মনে রাখিতে হইবে গণতন্ত্র না বাঁচিলে বাংলাদেশও জাহান্নামে যাইবে। শাহবাগের পর কী? অনেকেই এই প্রশ্ন তুলিতেছেন। আমরা বলিব শাহবাগের আর পর নাই। শাহবাগের পর শাহবাগই আমাদের জনগণের রক্ষাকবচ” (সলিমুল্লাহ খান, ২০১৪।

এই প্রস্তুতি সুসম্পন্ন হওয়ার জন্যে আহমদ ছফার স্মরণ না নেয়া ছাড়া কোন উপায় নাই। বাংলাদেশের রাজনৈতিক জটিলতা বইয়ের একেবারে শেষ লাইনে ছফা লিখেছিলেনঃ

“যাঁরা একটি নতুন জাতির জন্মের স্বপ্ন দেখে রণধ্বনি তুলেছিলেন, সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেছিলেন- সমাজের কোলে বিকশিত সেই কেন্দ্রবিন্দুটি থেকে আগামী দিনের নতুন নেতৃত্ব বেরিয়ে আসবেই আসবে” (ছফা, ১৯৭৭)।

ছফার এই ভবিষ্যদ্বাণী পুরণ করার দায় এই প্রজন্মের উপর বর্তায়, তবে তার জন্যে তার অবশ্যই বাপ দাদা চৌদ্দপুরুষের মুক্তি সংগ্রাম ও তার বিকাশের সাথে নিজেকে সংযুক্ত করে নিতে হবে। কেউ কেউ শাহবাগ আন্দোলনকে দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ অথবা মুক্তিযুদ্ধের দ্বিতীয় পর্ব বলে থাকেন। যদি তাই হয়, তবে এই প্রজন্মকে মনে রাখতে হবে যে এই যুদ্ধটি দীর্ঘস্থায়ী হতে চলেছে, সমাজের সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে জাতিসত্ত্বা গড়ে তোলার একটি সুযোগও তাদের সামনে হাজির হয়েছে। এই অবস্থায় আগের কালের কমিউনিস্টদের মতো তাদেরও বলার সময় হয়েছে – “বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক”।

তথ্যসূত্রঃ
১। বেহাত বিপ্লব ১৯৭১, সলিমুল্লাহ খান সম্পাদিত, (আগামী প্রকাশনী, ২০০৭)
২। বাংলাদেশের রাজনৈতিক জটিলতা, আহমদ ছফা, ১ম সংস্করণ, ১৯৭৭ (বেহাত বিপ্লব ১৯৭১ -বইএ প্রকাশিত, ২০০৭)
৩। The Wretched of the Earth, Frantz Fanon (Macgibbon and Kee, 1965)
৪। জাতীয় চেতনা কি পদার্থ, সলিমুল্লাহ খান, (এইদেশ, ১৫ মার্চ, ২০১৩)
৫। শাহবাগের পর, সলিমুল্লাহ খান (বিডিনিউজ২৪ডটকম, ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 5 = 4