২৫০০ বছরের তামিল-সিংহলা দ্বন্দ্বের ইতিহাস

?oh=b539e9e90c859ca39aba56369afe3577&oe=560FCB2F” width=”400″ />

প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান থেকে জানা যায়, লংকাদ্বীপে মানুষের বাস শুরু হয়েছিল প্রায় চৌত্রিশ হাজার বছর আগে। আন্দাজ করা হচ্ছে, বালানগোড়া অঞ্চলে গুহাবাসী শিকারী মানুষের বাস ছিল। অগ্নিপুরাণ, রামায়ণ, ভাগবত, বৃহৎসংহিতা, মহাভারত এবং পালিভাষায় বৌদ্ধভিক্ষুদের দ্বারা লিখিত রচনায় এই দ্বীপের কথা জানা যায়। এছাড়া টলেমি, চীনা পর্যটক ফা হিয়েন ও হিউ-এন সাঙের বর্ণনায় এই দ্বীপের কথা বলা হয়েছে।

এই দ্বীপ সম্পর্কে প্রথম বর্ণনা পাওয়া যায় পুরাকাহিনী রামায়ণে। রামায়ণে ‘লংকাকাণ্ড’ নামক একটি অধ্যায়ও রয়েছে। লংকার রাজা রাবণের হাত থেকে রামের সীতা উদ্ধারের কাহিনী আমরা সকলেই জানি। তবে গবেষকদের মধ্যে এমনও একটি ধারণা রয়েছে যে, এই কাহিনী হল ভারতীয় উপমহাদেশের ব্রাহ্মণ্য সভ্যতার ক্রমাগত দক্ষিণমুখী অভিযানেরই এক কাব্যিক বর্ণনা।

‘মহাবংশ’ হল শ্রীলংকার সবচেয়ে পরিচিত উপাখ্যান। বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের দ্বারা এটি পালি ভাষায় লেখা হয়েছিল ষষ্ঠ শতকে। চতুর্থ শতকে রচিত ‘দ্বীপবংশ’ নামক উপাখ্যান বা গাথারই পরিমার্জিত সংস্করণ মহাবংশ। নামের মধ্যেই রয়েছে এর বংশগত ধারাবিবরণীর চরিত্রের পরিচয়। এর কেন্দ্রীয় নায়কের নাম বিজয়। তিনি বুদ্ধের মৃত্যু বা নির্বাণের দিন দ্বীপে এসে পৌঁছেছিলেন। সিংহলা (স্থানীয় উচ্চারণ) এবং তামিল বসতি প্রথম কবে গড়ে উঠেছিল, তা নিয়ে ঐকমত্য নেই। তবে উভয় সম্প্রদায় বাইরে থেকে দ্বীপে এসেছিল। সিংহলারা অনেকেই ‘মহাবংশ’-কে সূত্র হিসেবে মনে করে। তামিল সাহিত্যে খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে দক্ষিণ ভারতে বাণিজ্য কেন্দ্র গড়ে ওঠার ঘটনাকে সিংহলের উত্তরাঞ্চলে তামিল বসতি গড়ে ওঠার যোগসূত্র হিসেবে পেশ করা হয়ে থাকে।

খ্রিস্টপূর্ব ২৩৭ সাল নাগাদ দক্ষিণ ভারত থেকে সেনা ও গুত্তিকা নামে দুই অভিযাত্রী অনুরাধাপুরার সিংহাসন দখল করেন। সম্ভবত এটাই ছিল এই দ্বীপের কৌমগত বিরোধ এবং অশান্তির সূত্রপাত। ২০০১ সালের জনগণনা অনুযায়ী শ্রীলংকায় ৮১.৯% সিংহলা, ৫.১% ভারতীয় তামিল, শ্রীলংকান তামিল (২০০১-এর আগেকার সরকার নিয়ন্ত্রিত এলাকায়) ৪.৩%, মুর (আরব থেকে আগত তামিল ভাষাভাষী মুসলমান) ৮% এবং সামান্য বার্গার (ইউরোপীয় বংশধর) ও আদিবাসী ভেদ্দা।
আমরা প্রাক-ঔপনিবেশিক পর্ব থেকেই ইতিহাসের মধ্যে এই বিরোধের ধারাকে সন্ধান করতে চেয়েছি। লংকাদ্বীপ এর প্রাচীন নাম, ঔপনিবেশিক আমলে নাম হয়েছিল সিলন এবং ১৯৭২ সালে নামকরণ হয় শ্রীলংকা। সূত্র : উইকিপিডিয়া, কে.এম.ডি সিলভা লিখিত হিস্ট্রি অফ শ্রীলংকা। পশ্চিমবঙ্গের ‘মন্থন সাময়িকী’ এই প্রবন্ধটি ‘সিংহলা-তামিল বৈরিতার কালপঞ্জি’ শিরোনামে তাদের ২০০৯ সালের সেপ্টে-অক্টো সংখ্যায় প্রকাশ করে। যাতে আরও কিছু তথ্য যোগ করে এখানে উপস্থাপন করা হয়েছে।

প্রাক ঔপনিবেশিক পর্ব
———–
খ্রিস্টপূর্ব ৫৪৩-৫০৩ : বিজয়ের রাজত্বকাল।
খ্রিস্টপূর্ব ৫০৪-৪৭৪ : বিজয়ের ভ্রাতুষ্পুত্র পাণ্ডুবাসদেবের রাজত্বকাল।
খ্রিস্টপূর্ব ৪৭৪-৪৫৪ : পাণ্ডুবাসদেবের পুত্র অভয়ের রাজত্বকাল।
খ্রিস্টপূর্ব ৪৫৪-৪৩৭ : অভয়ের ছোটোভাই তিসসো-র রাজত্বকাল।
খ্রিস্টপূর্ব ৪৩৭-৩৬৭ : অনুরাধাপুরায় অভয় ও তিসসোর ভ্রাতুষ্পুত্র পাণ্ডুকাভয়ের রাজত্বকালে কৃষির জন্য প্রথম সেচ ব্যবস্থা গড়ে ওঠে।
খ্রিস্টপূর্ব ৩৬৭-২৪৭ : পাণ্ডুকাভয়ের পুত্র মুতাশিবের, এবং তার দুই পুত্র তিসসো উত্তীয় ও মহাশিবের রাজত্বকাল।
খ্রিস্টপূর্ব ২৪৭-২৩৭ : পাণ্ডুকাভয়ের পুত্র সুরাতিসসোর রাজত্বকাল।
খ্রিস্টপূর্ব ২৩৭-২১৫ : সুরাতিসসোকে যুদ্ধে পরাজিত করে দুই চোলা রাজা সেনা ও গুত্তিকা রাজত্ব করেন। তিনটি প্রাচীন ভারতীয় তামিল রাজ্যের মধ্যে অন্যতম চোলা রাজবংশ।
খ্রিস্টপূর্ব ২০৫-১৬১ : এরপর খ্রিস্টপূর্ব ২১৫ থেকে ২০৫ পর্যন্ত রাজত্ব করেন আসেলা। খ্রিস্টপূর্ব ২০৫ সালে দক্ষিণ ভারতের চোলা রাজা এলারা এসে আসেলাকে পরাজিত ও হত্যা করেন। এলারা শ্রীলংকার উত্তরে মহাভেলি অঞ্চলে রাজত্ব করেন খ্রিস্টপূর্ব ১৬১ পর্যন্ত।
খ্রিস্টপূর্ব ১৬১-১০৩ : এলারার রাজত্বকালে বৌদ্ধ রাজাদের কয়েকটি অপেক্ষাকৃত ছোটো রাজ্য গড়ে উঠেছিল। এর মধ্যে রুহুনার রাজা কাভান তিসসার জ্যেষ্ঠ পুত্র দত্তগামিনী অভয় এলারাকে পরাজিত করেন।
খ্রিস্টপূর্ব ১০৩-৮৯ : এইসময় পরপর পাঁচ দ্রাবিড় রাজার রাজত্বের কথা জানা যায়।
খ্রিস্টপূর্ব ৮৯ থেকে ৬৬ খ্রিস্টাব্দ : অনুরাধাপুরায় বৌদ্ধ রাজা ভট্টগামিনী অভয় ক্ষমতায় আসেন। এই সময়কালে একই রাজবংশের পরপর উনিশজন রাজা এবং একজন রাণী ক্ষমতায় আসেন।
৬৬-৪৩৬ খ্রিস্টাব্দ : লম্বকর্ণ প্রজাতির ছাব্বিশজন রাজা রাজত্ব করেন। এঁদের মধ্যে মহানামার পুত্র সোত্তিসেনা এক তামিল মায়ের গর্ভে জন্মগ্রহণ করেছিলেন।
৪৩৬-৪৬৩ খ্রিস্টাব্দ : পাণ্ডু নামে এক তামিল যোদ্ধার আবির্ভাব ঘটে। পরপর ছ’জন দ্রাবিড় রাজা রাজত্ব করেন।
৪৬৩-৬৮৪ খ্রিস্টাব্দ : মৌর্য রাজবংশের উনত্রিশজন রাজা রাজত্ব করেন। ৬৮৩-৬৮৪ সালে তামিল ব্যক্তিদের এই রাজ্যে উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি ছিল।
৬৮৪-৭৭৭ খ্রিস্টাব্দ : পল্লব রাজবংশের সহায়তায় ছ’জন লম্বকর্ণ রাজা রাজত্ব করেন।
৭৭৭-১০০৭ খ্রিস্টাব্দ : রাজারাতার কুড়িজন রাজা অনুরাধাপুরা এবং অন্য রাজধানী থেকে রাজত্ব করেন। সর্বশেষ রাজা মাহিন্দ (পঞ্চম) চোলা রাজা রাজারাজার হাতে পরাজিত হয়ে রুহুনাতে পালিয়ে যান। পরে ভারতে এসে তাঁর মৃত্যু হয়।
৯৮৫-১১২০ খ্রিস্টাব্দ : সাতজন চোলা তামিল রাজা রাজত্ব করেন।
১০২৯-১০৫৫ খ্রিস্টাব্দ : রাজারাতায় আট তিতুলার রাজা রাজত্ব করেন।
১০৫৫-১২৩৬ খ্রিস্টাব্দ : রাজারাতার সাত বৌদ্ধ রাজা পোল্লোনারুভা থেকে রাজত্ব করেন।
১১৮৭-১২১২ খ্রিস্টাব্দ : কলিঙ্গ রাজবংশের আট রাজা এবং তিনজন রাণী রাজত্ব করেন।
১২১২-১২১৫ খ্রিস্টাব্দ : দক্ষিণ ভারতের পরাক্রম পাণ্ড্য এসে রাজ্যস্থাপন করেন।
১২১৫-১২৫৫ খ্রিস্টাব্দ : জাফনায় কলিঙ্গ যুবরাজ কুলিঙ্গাই চক্রবর্তী রাজত্ব করেন।
১২৫৫-১২৬২ খ্রিস্টাব্দ : তাম্রলিঙ্গ বংশের চন্দ্রভানু রাজত্ব করেন।
১২৬২-১৪৫০ খ্রিস্টাব্দ : আর্যচক্রবর্তী বংশের দশজন রাজা রাজত্ব করেন।
১৪৫০-১৪৬৭ খ্রিস্টাব্দ : কোট্টেতে ভুবনেকাবাহু (ষষ্ঠ) রাজত্ব করেন।
১৪৬৭-১৬১৯ খ্রিস্টাব্দ : পুনরায় আর্যচক্রবর্তী বংশের আট রাজা রাজত্ব করেন।
১২২০-১২৭০ খ্রিস্টাব্দ : দাম্বোদেনিয়া থেকে তিন সিংহলা রাজা রাজত্ব করেন।
১২৭২-১২৮৬ খ্রিস্টাব্দ : ইয়াপাহুভা থেকে তিন সিংহলা রাজা রাজত্ব করেন।
১২৮৭-১২৯৩ খ্রিস্টাব্দ : পোল্লোনারুভা থেকে সিংহলা রাজা পরাক্রমবাহু (তৃতীয়) রাজত্ব করেন।
১২৯৩-১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দ : কুরুনাগালা থেকে পাঁচ সিংহলা রাজা রাজত্ব করেন।
১৩৪৪-১৩৫৯ খ্রিস্টাব্দ : দেদিগামা থেকে পরাক্রমবাহু (পঞ্চম) রাজত্ব করেন।
১৩৫৭-১৪০৮ খ্রিস্টাব্দ : গামপোলা থেকে দুই সিংহলা রাজা রাজত্ব করেন।
১৩৯২-১৪২৩ খ্রিস্টাব্দ : রাইগামা থেকে তিন সিংহলা রাজা রাজত্ব করেন।
১৪১২-১৫৯৭ খ্রিস্টাব্দ : কোট্টে থেকে ন’জন সিংহলা রাজা রাজত্ব করেন।
১৫২১-১৫৯৪ খ্রিস্টাব্দ : সিতাওয়াকা থেকে দুই সিংহলা রাজা রাজত্ব করেন।
১৫৯১-১৭৩৯ খ্রিস্টাব্দ : কান্ডি রাজ্যে কোন্নাপু বান্দারা রাজবংশের পাঁচ সিংহলা রাজা রাজত্ব করেন।
১৭৩৯-১৮১৫ খ্রিস্টাব্দ : কান্ডি রাজ্যে নায়াকার রাজবংশের চার রাজা রাজত্ব করেন।

ঔপনিবেশিক পর্ব
———–
১৫৮০-১৬৫৮ খ্রিস্টাব্দ : পর্তুগিজ ঔপনিবেশিক শাসন।
১৬৪০-১৭৯৬ খ্রিস্টাব্দ : ডাচ ঔপনিবেশিক শাসন।
১৭৯৬ খ্রিস্টাব্দ : ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকেরা ডাচেদের কাছ থেকে উপকূলভাগের নিয়ন্ত্রণ দখল করে নেয়।
১৮১৫ খ্রিস্টাব্দ : কান্ডিয়ান কনভেনশনে ইংল্যান্ডের রাজাকে কান্ডির রাজা হিসেবে মেনে নেওয়া হয়।
১৮৩০-১৮৭০ : ব্রিটিশেরা কফি প্ল্যান্টেশন শুরু করে। কান্ডিয়ান অঞ্চলের চাষিরা দারিদ্র্য সত্ত্বেও মজুরি-শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে অস্বীকার করে। ব্রিটিশেরা দক্ষিণ ভারত থেকে তামিল এবং অন্যান্যদের নিয়ে এসে ঠিকা প্রথায় কাজে লাগায়। ১৮৭০-এর দশকে এই কফি-অর্থনীতি ভেঙে পড়ে।
১৮৮০-র দশক : ব্রিটেনের বড়ো বড়ো ইংরেজ কোম্পানিরা ব্যাপক আকারে চায়ের প্ল্যান্টেশন শুরু করে।
১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দ : ব্রিটিশ শাসকেরা সেমি-ইউরোপীয় বার্গারদের কিছুটা স্বশাসনের অধিকার দেয়। শাসনকার্যে ব্রিটিশ গভর্নরকে পরামর্শ দেওয়ার জন্য লেজিসলেটিভ কাউন্সিল গঠন করা হয়। এতে তিনজন ইউরোপীয় এবং একজন করে সিংহলা, তামিল ও বার্গার প্রতিনধি রাখা হয়।
১৯০৯ খ্রিস্টাব্দ : পার্টি-নির্বাচিত অ্যাসেম্বলির মাধ্যমে এই স্বশাসন সাংবিধানিক অধিকার পেল।
১৯১৩ খ্রিস্টাব্দ : তামিল নেতা পুনমবালাম অরুনাচলম ন্যাশনাল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলে সিংহলা ও তামিলদের সমর্থনে প্রতিনিধি নির্বাচিত হন।
১৯২৪ খ্রিস্টাব্দ : ‘জাফনা স্টুডেন্টস কংগ্রেস’ গঠিত হয়। উল্লেখ্য, জাফনা হচ্ছে তামিল অধ্যুষিত অঞ্চল। যেখানে ২০০০ সালে একজনও সিংহলা বাসিন্দা ছিল না। এটা ছিল শতভাগ তামিল বসতি অঞ্চল।
১৯৩১ খ্রিস্টাব্দ : সার্বজনীন ভোটাধিকার স্বীকৃত হলে তামিল, সিংহলা ও বার্গার এলিটরা প্রতিবাদ করল।
১৮৮৮ খ্রিস্টাব্দ : তামিল নেতা পুনমবালাম রামানাথন একটা পত্রিকা প্রকাশ করে তাতে লেখেন, মুসলমানরা জাতি হিসেবে তামিলদের অন্তর্ভুক্ত।
১৯১৫ খ্রিস্টাব্দ : কলম্বোতে মুসলমানদের বিরুদ্ধে দাঙ্গায় নামে ক্রিশ্চান ও বৌদ্ধরা।
১৯১৯ খ্রিস্টাব্দ : অধিকতর স্বশাসনের দাবি নিয়ে ‘সিলন ন্যাশনাল কংগ্রেস’ গড়ে ওঠে। কিন্তু জাতিগত বিরোধে এই দল ভেঙে যায়।
১৯২৬ খ্রিস্টাব্দ : নেহরু, সরোজিনী নাইডু ইত্যাদি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস নেতারা দ্বীপে আসেন এবং সেখানে ‘কলম্বো ইয়ুথ লিগ’, ‘জাফনা ইয়ুথ কংগ্রেস’ এবং গুনসিঙ্গে-র শ্রমিক সংগঠন পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি তোলে।
১৯৩১ খ্রিস্টাব্দ : সংবিধান সংস্কারের জন্য ডোনাওমোর কমিশন গঠিত হয়।
১৯৩৪-৩৫ : ম্যালেরিয়ার মড়কে ১০ লক্ষ মানুষ আক্রান্ত হয় এবং ১,২৫,০০০ মানুষ মারা যায়।
১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দ : স্বাধীনতার দাবি নিয়ে ট্রটস্কিপন্থী ‘লংকা সম সমাজ পার্টি’ গঠিত হয়।
১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দ : স্টেট কাউন্সিলে নির্বাচিত হওয়ার পর LSSP-র নেতা এন.এম.পেরেরা ও ফিলিপ গুনবর্ধেনা সরকারি ভাষা হিসেবে ইংরেজির বদলে সিংহলা ও তামিলের স্বীকৃতি চাইলেন। নভেম্বরে স্টেট কাউন্সিলে গৃহীত হল, মিউনিসিপাল ও পুলিশ কোর্টের বিবরণ মাতৃভাষায় লেখা হবে। সিদ্ধান্তটি লিগাল সেক্রেটারির কাছে পাঠানো হল।
১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দ : স্বতন্ত্র তামিল পরিচয়ের দাবিকে ঘিরে প্রথম সিংহলা-তামিল দাঙ্গা হয় নাভালাপিটয়া-তে।
১৯৩৯-৪০ : ব্রিটিশ মালিকানাধীন প্ল্যান্টেশন এস্টেটগুলিতে ব্যাপক ধর্মঘট সংগঠিত হয়।
১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দ : জি.জি.পুনমবালাম ‘অল সিলন তামিল কংগ্রেস’ ACTC গঠন করেন। ব্রিটিশ গভর্নর লর্ড সোলবারির নেতৃত্বে সোলবারি কমিশনের কাছে জি.জি. পুনমবালাম স্বাধীন সিলনে ৫০% সিংহলা ও ৫০% অন্য জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব রাখার প্রস্তাব দেন। এই প্রস্তাব খারিজ হয়ে যায়। জে.আর.জয়বর্ধনে স্টেট কাউন্সিলে সরকারি ভাষা হিসেবে সিংহলার সুপারিশ করলেন। ডি.এস.সেনায়েক-এর নেতৃত্বে মন্ত্রীসভা ডোনাওমোর কমিশন ও সোলবারি কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী খসড়া সংবিধান রচনা করে।
১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দ : ডি.এস.সেনানায়েক ‘ইউনাইটেড ন্যাশনাল পার্টি’ UNP গঠন করেন। ব্রিটিশরা তাঁর সঙ্গে একটা নতুন সংবিধান তৈরির ব্যাপারে একমত হয়।
১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দ : পার্লামেন্ট নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেয়ে UNP বন্দরনায়েকের ‘সিংহলা মহাসভা’ ও পুনমবালামের ACTC-র সঙ্গে জোট বাঁধে। এস.জে.ভিচেলভানায়কম পার্লামেন্টে নির্বাচিত হন। ব্রিটিশ শাসকেরা এই জোট সরকারের হাতেই ক্ষমতা তুলে দিতে প্রস্তুত হয়।

?oh=48f76c26d6b026b2506ce0320ca37e14&oe=561F9FAF” width=”400″ />

উত্তর ঔপনিবেশিক পর্ব
———–
৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৮ : ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে আলোচনার মাধ্যমে শ্রীলংকা ‘ডোমিনিয়ন অফ সিলন’ বা স্বায়ত্তশাসিত উপনিবেশ হিসেবে স্বাধীনতা পায়। জি.জি.পুনমবালামের ACTCএবছরই UNP–তে যুক্ত হয়।
১৯৪৮-এ যখন ব্রিটিশরা চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল, তারা কিন্তু তামিল ও সিংহলা দুটো সত্ত্বার কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করল না। তারা ক্ষমতা হস্তান্তর করল সিংহলা বৌদ্ধ কমিউনিটির হাতে ক্ষমতা অর্পণের মধ্য দিয়ে। সিংহলা বৌদ্ধ এলিটরা ব্রিটিশ আমলে ছিল সকলে ক্রিশ্চান, ব্রিটিশরা চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা সব বৌদ্ধ হয়ে গেল। ব্রিটিশ এ অঞ্চল থেকে যাওয়ার সময় পাঞ্জাবি, তামিল ও বাঙ্গালী, এই তিন জাতিকে দুই দেশে বিভক্ত করে রেখে যায়। আঞ্চলিক পরাশক্তি হওয়ার ক্ষমতা আছে মনে করে এই তিন জাতিকে খন্ডিত করে শক্তিহীন করার চেষ্টা চালায় তারা।
১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দ : মোট জনসংখ্যার ১০% প্ল্যান্টেশন এস্টেটের তামিল শ্রমিকদের সরকার ভোটাধিকার না দেওয়ায় এস.জে.ভি.চেলভানায়কম ACTC থেকে বেরিয়ে ‘ফেডারেল পার্টি’ গঠন করেন। এই দলের লক্ষ্য ছিল শ্রীলংকায় এক যুক্তরাষ্ট্রীয় সংবিধান রচনা করা।
১৯৫১ খ্রিস্টাব্দ : সলোমন বন্দরনায়েক UNP থেকে বেরিয়ে এসে ‘শ্রীলংকা ফ্রিডম পার্টি’ SLFP গঠন করেন। এ বছরই সংবিধান রচিত হয়। সিংহলা জনসংখ্যা ৭০%, তারা সবসময় সংখ্যাগুরু, সুতরাং সংবিধান পরিবর্তন করা তাদের কাছে কঠিন কিছু নয়। প্রথম যেটা তারা করল, ১০ লক্ষ মানুষের, যাদের ইন্ডিয়ান তামিল বলা হয়, তাদের ভোটাধিকার রদ করল। এদের ইন্ডিয়ান তামিল বলা হয়, কারণ ১৮৩০ সাল থেকে এদের এখানে আনা হয়েছিল ব্রিটিশ প্ল্যান্টেশনের কাজে। এরা ওখানে বসবাস করেছে, ছেলেপুলে হয়েছে। ওখানেই থিতু হয়েছে। এদেরই ইন্ডিয়ান তামিল বা প্ল্যান্টেশন তামিল বলা হয়, ওখানকার ছ’হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে বসবাসকারী দেশীয় তামিলদের থেকে আলাদা করার জন্য।
১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দ : নির্বাচনে তামিল অঞ্চলগুলিতে জয়লাভ করে ফেডারেল পার্টি মূল তামিল পার্টি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। SLFP ও UNP-র মদতে পার্লামেন্টে ‘সিংহলা অনলি অ্যাক্ট’ পাশ হয়। LSSP, কমিউনিস্ট পার্টি (সিলন) এবং তামিল জাতীয়তাবাদী দলগুলি এই আইনের বিরোধিতা করে। তামিলদের বিক্ষোভের পাশাপাশি এর বিরুদ্ধে চেলভানায়কম সত্যাগ্রহ শুরু করলে এক সিংহলা জনতার আক্রমণে তা ভেঙে যায়। গাল ওয়া ও পাদাভিয়া অঞ্চলে সিংহলা কর্মীরা ওই এলাকার তামিলদের ওপর হামলা করে।
১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দ : সিংহলা-তামিল দাঙ্গার জন্য ফেডারেল পার্টিকে সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করা হয়। ১৫০-২০০ তামিল দাঙ্গায় নিহত হয়, ২৫ হাজারের বেশি তামিল শরণার্থীকে দ্বীপের উত্তরে পুনর্বাসন দেওয়া হয়।
৩ সেপ্টেম্বর ১৯৫৮ : ‘তামিল ল্যাঙ্গুয়েজ (স্পেশাল প্রভিসন্স) অ্যাক্ট’-এর মাধ্যমে তামিল ভাষাকে সীমাবদ্ধ কিছু ছাড় দেওয়া হয়।
১৯৬০ খ্রিস্টাব্দ : ব্রিটিশরা যখন চলে গেল, সিভিল সার্ভিসে ৯০% ছিল তামিল। কিন্তু ষাটের দশকের শুরুতেই সিংহলা সরকার তামিলদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে দেখতে বদ্ধপরিকর ছিল। এ সময় শিক্ষা ব্যবস্থায় তারা ‘স্ট্যান্ডার্ডাইজেশন’ আমদানি করল। এর ফলে একজন তামিল যদি কলেজে ভর্তি হতে চাইত, তাকে অন্য সিংহলা প্রার্থীর তুলনায় ১৫% নম্বর বেশি পেতে হবে বলে আইন হলো। শ্রীলংকায় কলেজের সংখ্যা ছিল কম। পেশাগত কলেজের সংখ্যা ছিল আরও কম। অতএব নতুন প্রজন্মের পক্ষে, যারা ১৯৫০-এর পরে জন্মেছে হাইস্কুলের পাঠ শেষ করে কলেজে ঢোকা তাদের অসম্ভব হয়ে পড়ল। তামিলরা উচ্চশিক্ষায় পিছিয়ে গেল এবং সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ সব মাত্রা অতিক্রম করে গেল।
১৯৬২ খ্রিস্টাব্দ : ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রীর সঙ্গে শ্রীলংকার প্রধানমন্ত্রী সিরিমাভো বন্দরনায়েকের একটি চুক্তি হয়।
১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দ : ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে শ্রীলংকার প্রধানমন্ত্রী সিরিমাভো বন্দরনায়েকের আর একটি চুক্তি হয়। এই দুই চুক্তি মারফত সিদ্ধান্ত হয়, ১৫ বছরের মধ্যে ছ’লক্ষ এস্টেট তামিলকে ভারতে চলে যেতে হবে এবং বাকি ৩ লক্ষ ৭৫ হাজার এস্টেট তামিলকে নাগরিকত্ব দেওয়া হবে।
৫-১০ এপ্রিল ১৯৭১ : ৫ এপ্রিল রাত এগারোটায় এক সশস্ত্র অভ্যুত্থান শুরু করে ‘জনতা বিমুক্তি পেরামুনা’ JVP। ১৯৬০-এর দশকে রোহানা উইজিউইরার নেতৃত্বে এই গোষ্ঠীটি প্রথমে গড়ে উঠেছিল নিম্নবর্গ কারাভা ও দুরাভা গোষ্ঠীর মধ্যে। পরে ছাত্র ও বেকার যুবকেরা, এমনকী দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিত ছেলেমেয়েরাও এই গোষ্ঠীর দিকে এগিয়ে আসে। ১০ এপ্রিলের মধ্যে মাতারা জেলা এবং গল্লে জেলার আম্বালানগোড়া শহর বিদ্রোহীদের দখলে আসে। ভারতীয় বিমান বাহিনীর সাহায্য নিয়ে শ্রীলংকার সরকার দু’সপ্তাহে প্রায় ১০ হাজার কিশোর-তরুণ অভ্যুত্থানকারীকে হত্যা করে এই বিদ্রোহ দমন করে।
১৯৭২ খ্রিস্টাব্দ : ফেডারেল পার্টি, সিলন ওয়ার্কার্স কংগ্রেস ও ACTC ‘তামিল ইউনাইটেড ফ্রন্ট’ গঠন করে। ১৯৬০-এর দশকে ভেলুপিল্লাই প্রভাকরণ সহ কিছু যুবকের সশস্ত্র কার্যকলাপের মধ্য থেকে ১৯৭২ সালে ‘তামিল নিউ টাইগার্স’ TNT গঠিত হয়। প্রথম সহস্রাব্দে চোলা সাম্রাজ্যের প্রতীক ছিল বাঘ। TULF এদের ‘আমাদের ছেলেরা’ বলে সমর্থন করত।
২২ মে ১৯৭২ : শ্রীলংকা প্রজাতন্ত্রের মর্যাদা লাভ করে।
১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দ : ‘পলিসি অফ স্ট্যান্ডার্ডাইজেশন’-এর মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে সিংহলা ছাত্রদের সুবিধা দেওয়া হয়। এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে তামিল ছাত্রসংখ্যা লক্ষণীয়ভাবে কমে যায়। এইবছরই ফেডারেল পার্টি আলাদা তামিল রাষ্ট্রের দাবি তোলে।
১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দ : ফেডারেল পার্টি অন্য তামিল পার্টির সঙ্গে মিলিতভাবে ‘তামিল ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট’ TULF গঠন করে। প্রভাকরণ জাফনার মেয়র আলফ্রেড দুরিয়াপ্পাকে হত্যা করেন।
১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দ : এই প্রথম তামিলরা একই দ্বীপের অভিন্ন পরিচয়ে বাস করতে অস্বীকার করে। TULF-এর ভাত্তুকোত্তাই জাতীয় কনভেনশনে ‘তামিল ইলম’ (তামিল শ্রীলংকা) অনুমোদিত হয়। TNT থেকেই এইসময় ‘লিবারেশন টাইগার্স অফ তামিল ইলম’ LTTE-র জন্ম হয়। এর প্রধান তাত্ত্বিক ছিলেন আন্তন বালাসিঙ্গম নামে কলম্বোর ব্রিটিশ হাই কমিশনের এক প্রাক্তন কর্মী, পরে তিনি ব্রিটেনে চলে গিয়েছিলেন।
১৯৭৭ খ্রিস্টাব্দ : নির্বাচনে স্বাধীন তামিল রাষ্ট্রের পক্ষে প্রচার করে TULF বেশিরভাগ তামিল আসন জিতে নেয়। সিংহলা-প্রধান এলাকায় সুসংগঠিত আকারে কয়েকটি সিংহলা-তামিল দাঙ্গা হয়। প্রভাকরণ তামিল এমপি এম.কানাগারত্নম-কে হত্যা করেন।
১৯৮০ : এই দশকের গোড়ায় ‘ইলম রেভোলিউশনারি অর্গানাইজেশন অফ স্টুডেন্টস’ EROS নামে এক তামিল জঙ্গি গেরিলা গোষ্ঠী গড়ে ওঠে।
১৯৮১ : LTTE থেকে বেরিয়ে আসে মার্ক্সবাদী মনোভাবাপন্ন সিংহলা ভেল্লালা (চাষি) জাতের অধিক উপস্থিতি নিয়ে ‘পিপলস লিবারেশন অর্গানাইজেশন অফ তামিল ইলম’PLOTE। ১৯৫০ থেকে শুরু করে ১৯৮১ সালের মধ্যে পূর্ব প্রদেশে সিংহলা জনসংখ্যা দাঁড়াল ১৫%, স্বাধীনতার সময় তা ছিল মাত্র ৪%।
৩১ মে : ২ জুন ১৯৮১ জাফনা পাবলিক লাইব্রেরি, তামিল সংবাদপত্রের দপ্তর এবং জাফনার পার্লামেন্ট সদস্যের বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়। চারজন মারা যায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণে জানা যায়, উর্দিধারী পুলিশ অফিসারেরা এতে যুক্ত ছিল।

?oh=fbdef00b1f21c32af542f072d943a633&oe=5617E7BF&__gda__=1444378095_36bb928706445ea9dad4382922e33b76″ width=”400″ />

গৃহযুদ্ধ পর্ব
———–
১৯৮৩ : ১৯৪৮ সালে স্বাধীনতার আগে তামিলরা জনসংখ্যার ১৫% হওয়া সত্ত্বেও প্রায় ৬০% সরকারি চাকরি তাদের হাতে ছিল। এবার স্বাধীনতার পর রাজনৈতিক ক্ষমতা হাতে পেয়ে সিংহলারা সেই জায়গাগুলো দখল করতে শুরু করল। এরপর ১৯৭৩ সালে ‘পলিসি অফ স্ট্যান্ডার্ডাইজেশন’-এর মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাক্ষেত্রেও তামিলরা পিছু হটল। আরও গুরুত্বপূর্ণ হল, বার্গার (যাদের পূর্বপুরুষ ইউরোপ থেকে এসেছিল, কিন্তু পরবর্তীকালে দ্বীপের স্থায়ী বাসিন্দা) এবং তামিলরা মিলে মোট জনসংখ্যার ২০% হওয়া সত্ত্বেও ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীতে অফিসার পদে এরা ছিল ৪০%। স্বাধীনতার পরে সিংহলাদের সামরিক বাহিনীতে অংশগ্রহণ বেড়ে গেল। ১৯৮৩ সালে এসে তা ৯৫% পেরিয়ে গেল। যা গৃহযুদ্ধের প্রেক্ষাপটকে বাস্তবে রূপান্তরিত করে।
২৩ জুলাই ১৯৮৩ : জাফনায় মিলিটারি কনভয়ের ওপর LTTE–র অতর্কিত আক্রমণে ১৫জন সৈন্য মারা যায়।
২৪-২৯ জুলাই : ২৪ জুলাই সন্ধ্যায় কলম্বোর কানাট্টে কবরস্থানে এই ১৫জন সৈন্যকে সমাধিস্থ করতে গেলে এক সিংহলা জনতা সংগঠিতভাবে সরকারি সহায়তায় দাঙ্গা শুরু করে। ২৯ জুলাই পর্যন্ত এই দাঙ্গায় ৪০০ থেকে ৩০০০ তামিল মারা যায়, ১০ হাজার ঘর ধূলিসাৎ হয়, অসংখ্য তামিল পরিবার অন্যান্য দেশে পালিয়ে যায়। শরণার্থীর সংখ্যা ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার হয়ে গেলে সরকার ভারতের সাহায্য নিয়ে জাহাজে তাদের উত্তরাংশে পাঠানোর ব্যবস্থা করে।
৩০ নভেম্বর ১৯৮৪ : উত্তর-পূর্বের মুল্লাইতিভু জেলার দুটি গ্রামে LTTE হত্যাকাণ্ড চালায়।
১৪ মে ১৯৮৫ : সরকারি বাহিনী কুমুদিনী নামে নৌকা হামলায় ২৩জনের বেশি তামিলকে হত্যা করে। এর প্রত্যাঘাতে অনুরাধাপুরায় আক্রমণ চালিয়ে LTTE সিংহলা শিশু, মহিলা সহ মোট ১৪৬জনকে হত্যা করে।
১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দ : ভুটানের থিম্পুতে LTTE-র সঙ্গে সরকারের শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হয়।
১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দ : ফের সংঘাতে বহু সাধারণ নাগরিকের মৃত্যু হয়।
১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দ : শ্রীলংকার সেনাবাহিনী LTTE যোদ্ধাদের জাফনা শহরে কোণঠাসা করে ফেলে। লড়াই তীব্রতর হয়ে ওঠে। সংশোধিত সংবিধানের অধ্যায়-৪ অনুযায়ী সিংহলা ও তামিল উভয় ভাষা সরকারি ও জাতীয় ভাষার মর্যাদা পায়। সেনাবাহিনী তামিল জঙ্গিদের ঘাঁটি জাফনা শহর অবরুদ্ধ করে। এতে বহু মানুষ হতাহত হয়। ভারতের প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী শ্রীলংকার আক্রমণ বন্ধ করার আবেদন করেন এবং ব্যর্থ হন।
২ জুন : ভারত তামিলদের সাহায্যের জন্য শ্রীলংকার উত্তরদিকে জাহাজ পাঠায়। শ্রীলংকার নৌবাহিনী এগুলিকে বাধা দেয়।
৪ জুন : তামিলদের জন্য ভারত আকাশপথে ২৫ টন খাদ্যসামগ্রী অবরুদ্ধ অঞ্চলে নিক্ষেপ করে।
২৯ জুলাই : শ্রীলংকার প্রেসিডেন্ট জে.আর.জয়বর্ধনে ভারতের এই হস্তক্ষেপের ফলে ভারতের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেন। ২৯ জুলাই একটা ভারত-শ্রীলংকা চুক্তি হয়। এতে সিদ্ধান্ত হয় : প্রদেশগুলির হাতে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করা হবে; তামিল ভাষাকে সরকারি মর্যাদা দেওয়া হবে এবং উত্তর ও পূর্বে আইন-শৃংখলা ফিরিয়ে আনতে ভারত থেকে ‘ইন্ডিয়ান পিস কিপিং ফোর্স’ IPKF পাঠানো হবে। শ্রীলংকার সেনাবাহিনী উত্তরাঞ্চলের অপারেশন বন্ধ করে। LTTE ছাড়া বেশিরভাগ তামিল গোষ্ঠী অস্ত্র ছেড়ে দিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে একমত হয়। এইসময় দ্বীপের দক্ষিণাংশে JVP বিদ্রোহ শুরু করে।
২৬ সেপ্টেম্বর : ভারত সরকার তামিলদের রাজনৈতিক দাবিকে গুরুত্ব না দেওয়ায় LTTE নেতা লেফটেনান্ট কর্নেল থিলীপান অনশন করে মৃত্যুবরণ করেন। এই ঘটনা তামিল যোদ্ধাদের খুব নাড়া দিয়েছিল যে, আধুনিক ভারত অনশনে মৃত্যু মানে, কিন্তু দাবি মানে না।
৪ অক্টোবর : শ্রীলংকার নৌবাহিনী পয়েন্ট পেড্রোর কাছে LTTE–র বোট আটক করে।
৮-১০ অক্টোবর : IPKF-এর ওপর আক্রমণ শুরু করে LTTE। LTTE-র ঘাঁটিগুলিতে পাল্টা আঘাত হানে IPKF। ভারতীয়দের অপারেশন চলতে থাকে।
নভেম্বর ১৯৮৮ : LTTE-র সঙ্গে সংঘাত শুরু হওয়ায় ভারত সরকার বিকল্প তামিল গ্রুপ ‘ইলম পিপলস রেভোলিউশনারি লিবারেশন ফ্রন্ট’ EPRLF–কে মদত দেয়। এই গোষ্ঠী নির্বাচনে ব্যাপকভাবে আত্মপ্রকাশ করে।
১৯৮৯ : ২ জানুয়ারি রনসিংঘে প্রেমাদাসা প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তিনি তিনমাসের মধ্যে IPKF–কে দ্বীপ ছেড়ে চলে যেতে বলেন। রাজীব গান্ধী এই দাবি নাকচ করে দেন এবং নিজের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনেন। ডিসেম্বরে ভি.পি.সিং ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর সিদ্ধান্ত বদল হয়।
২৪ মার্চ ১৯৯০ : দীর্ঘ সময় ধরে IPKF–কে দ্বীপ ছেড়ে যাওয়ার দাবি করার পর ২৪ মার্চ IPKF–এর শেষ জাহাজ দ্বীপ ছাড়ে। IPKF-এর ৩২ মাস থাকাকালীন ১১০০ IPKF এবং ৫০০০-এর বেশি শ্রীলংকাবাসী মারা যায়।
১০ জুন : LTTE-র সঙ্গে প্রেমাদাসা সরকারের শান্তি আলোচনা ভেঙে যাওয়ার পর সাময়িক যুদ্ধবিরতির অবসান হয়। ৬০০জন তামিল ও মুসলমান পুলিশ-কর্মচারীকে LTTE হত্যা করে।
অক্টোবর : ২৮ হাজার মুসলমান বাসিন্দাকে LTTE জাফনা ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য করে।
মে ১৯৯১ : তামিলনাড়ুতে LTTE-র আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণে রাজীব গান্ধীর মৃত্যু হয়।
জুলাই : ইয়াপানায়া (জাফনা) উপদ্বীপের এলিফ্যান্ট পাস সামরিক ঘাঁটি ঘিরে রাখে ৫০০০ LTTE যোদ্ধা। এক মাস ব্যাপী সংঘর্ষে দু’পক্ষের ২০০০-এর বেশি মানুষ মারা যায়।
অক্টোবর : পাল্লিয়াগোড়েল্লা হামলায় LTTE–র হাতে ১০৯জন সাধারণ মুসলমান নাগরিক নিহত হয়। শ্রীলংকা সরকার তামিল গ্রামগুলির ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য মুসলমান হোম গার্ডদের প্রশিক্ষণ এবং অস্ত্র দেয়।
ফেব্রুয়ারি ১৯৯২ : বারবার আক্রমণ করেও শ্রীলংকার সামরিক বাহিনী LTTE–র হাত থেকে জাফনা উদ্ধার করতে ব্যর্থ হয়।
মে ১৯৯৩ : LTTE-র আত্মঘাতী হামলায় শ্রীলংকার প্রেসিডেন্ট রণসিংহে প্রেমাদাসা নিহত হন।
নভেম্বর : পুনেরিন-এর যুদ্ধে LTTE জয়লাভ করে।
১৯৯৪ : পার্লামেন্ট নির্বাচনে UNP–কে হারিয়ে ‘পিপলস অ্যালায়েন্স’ ক্ষমতায় আসে। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়লাভ করেন এই জোটের পক্ষে চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গা। তাঁর বিরোধী প্রার্থী গামিনী ডিসসানায়েকে LTTE–র হাতে নিহত হন।
১৯৯৫ : জানুয়ারিতে দু’পক্ষের যুদ্ধবিরতি ঘোষিত হয়। ১৯ এপ্রিল LTTE যুদ্ধবিরতি ভঙ্গ করে। সরকার ফের LTTE–র হাত থেকে জাফনা পুনরুদ্ধারের অভিযানে নামে। ৫ ডিসেম্বর প্রতিরক্ষা মন্ত্রী অনুরুদ্দা রাতওয়াত্তে জাফনায় জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। সরকারি হিসেবে দু’পক্ষ মিলিয়ে ২৫০০ জন নিহত হয়, ৭০০০জন আহত হয়। LTTE সহ সাড়ে তিন লক্ষ সাধারণ নাগরিক জাফনা ছেড়ে ভান্নি অঞ্চলে পালিয়ে যায়।
১৯৯৬ : জানুয়ারিতে কলম্বো সেন্ট্রাল ব্যাঙ্কে LTTE-র আত্মঘাতী হানায় ৯০জন নিহত এবং ১৪০০ মানুষ আহত হয়। LTTE ‘অপারেশন আনসিজিং ওয়েভস’ শুরু করে। জুলাইয়ে মুল্লাইতিভুর যুদ্ধে তারা জয়ী হয়। আগস্টে সরকার পাল্টা আক্রমণ করে। দু’লক্ষ সাধারণ বাসিন্দা পালিয়ে যায়। ২৯ সেপ্টেম্বর সামরিক বাহিনী কিলিনোচ্চি শহর দখল করে।
১৯৯৭ : ১৩ মে ২০ হাজার সরকারি ফৌজ LTTE নিয়ন্ত্রিত ভান্নি অঞ্চলে একটা সরবরাহ লাইন খুলতে গিয়ে ব্যর্থ হয়। অক্টোবরে LTTE শ্রীলংকান ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে বোমা বর্ষণ করে।
১৯৯৮ : জানুয়ারিতে LTTE কান্ডিতে বোমা বর্ষণ করলে বিখ্যাত বৌদ্ধ সমাধি ‘টেম্পল অফ দ্য টুথ’ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ২৭ সেপ্টেম্বর তারা ‘অপারেশন আনসিজিং ওয়েভস ২’ শুরু করে। কিলিনোচ্চির যুদ্ধে তারা জয়ী হয়।
১৯৯৯ : মার্চে সামরিক বাহিনী দক্ষিণ থেকে ভান্নিতে আক্রমণ করে। সেপ্টেম্বরে গোনাগালা-তে LTTE ৫০জন সাধারণ নাগরিককে হত্যা করে। ২ নভেম্বর শুরু হয় ‘অপারেশন আনসিজিং ওয়েভস থ্রি’। ডিসেম্বরে LTTE–র আত্মঘাতী হামলায় প্রেসিডেন্ট চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গার একটা চোখ নষ্ট হয়ে যায়।
২০০০ : ২২ এপ্রিল LTTE এলিফ্যান্ট পাস মিলিটারি কমপ্লেক্স দখল করে নিলে জাফনা উপদ্বীপের সঙ্গে ভান্নির মূল ভূখণ্ড বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ডিসেম্বরে LTTE একতরফাভাবে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে। কিন্তু সরকার রাজি হয় না, আক্রমণ জারি রাখে।
২০০১ : ২৪ এপ্রিল LTTE যুদ্ধবিরতি তুলে নেয় এবং উত্তরের দিকে অভিযান করে। জুলাই মাসে বন্দরনায়েক ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে আত্মঘাতী হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। ৫ ডিসেম্বর নির্বাচনে UNP–র রানিল উইকরেমাসিংঘে জয়ী হন। ১৯ ডিসেম্বর নরওয়ের মধ্যস্থতায় দু’পক্ষের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়। LTTE ৩০ দিনের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে।
২০০২ : ২২ ফেব্রুয়ারি শ্রীলংকা সরকার এবং LTTE এক স্থায়ী যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। এরপর আলোচনা চলতে থাকে। আগস্টে সরকার LTTE–র ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে রাজি হয়। পাঁচদফা আলোচনার পর দু’পক্ষ এক যুক্তরাষ্ট্রীয় সমাধানে সম্মত হয় এবং LTTE আলাদা রাষ্ট্রের দাবি থেকে সরে আসে।
২০০৩ : ২১ এপ্রিল আলোচনা ভেঙে যায়। ৩১ অক্টোবর LTTE নিজস্ব শান্তি প্রস্তাব পেশ করে। এতে ‘অন্তর্বর্তীকালীন স্বশাসন কর্তৃত্ব’ চেয়ে উত্তর ও পূর্ব শ্রীলংকায় তাদের হাতে ব্যাপক ক্ষমতা দাবি করা হয়। দক্ষিণে তাঁর নিজের দলে বিক্ষোভ দেখা দেওয়ায় প্রধানমন্ত্রী উইকরেমাসিংঘে জরুরি অবস্থা জারি করেন। তিনি JVP–র সঙ্গে মিলে নতুন জোট ‘ইউনাইটেড পিপলস ফ্রিডম অ্যালায়েন্স’ UPFA গঠন করেন।
২০০৪ : ৮ এপ্রিল নির্বাচনে জিতে UPFA–র মাহিন্দ রাজাপাকসে প্রধানমন্ত্রী মনোনীত হন। নির্বাচনের পর ত্রিঙ্কোমালির দক্ষিণের যুদ্ধে LTTE পিছু হটে। LTTE–র ইস্টার্ন কমান্ডার ভিনায়াগামুর্থি মুরলীথর ওরফে করুণাসহ অন্য বন্দীদের শাসক পার্টির সইদ আলি জাহির মৌলানা পালিয়ে যেতে সাহায্য করেন। ধারণা করা হয় এর পেছনে চক্রান্ত ছিল। কারণ ছাড়া পেয়েই করুণা ৫ হাজার ক্যাডারসহ LTTE ছেড়ে ‘তামিলএলা মাক্কাল ভিদুথালাই পুলিকাল’ TMVP গঠন করেন।
২৬ ডিসেম্বর ২০০৪ : ভারত মহাসাগরে সুনামির আঘাতে ৩০ হাজারের বেশি মানুষ নিহত এবং আরও বেশি মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়ে।
২০০৫ : ১২ আগস্ট শ্রীলংকার বিদেশমন্ত্রী তামিল লক্ষণ কাদিরগামার LTTE–র হাতে নিহত হন।
২০০৬ : পূর্ব ত্রিঙ্কোমালি জেলায় মাভিল আরু অঞ্চলের জলাধারের স্লুইস গেট বন্ধ করে দেওয়ায় ১৫০০০ গ্রামের ধানখেতে জলের সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। ফের যুদ্ধ শুরু হয় ২১ জুলাই।
২০০৭ : ১১ জুলাই সামরিক বাহিনী থোপ্পিগালা দখল করে পূর্ব প্রদেশে তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। এই যুদ্ধের ফলে পূর্ব প্রদেশের ১০ হাজার পরিবারের ৩৫ হাজার মানুষ গৃহহীন হয়ে অন্যত্র পালিয়ে যায়। ২৯ ডিসেম্বর ডিফেন্স সেক্রেটারি গোটাবায়া রাজাপাকসে ২২ ফেব্রুয়ারি ২০০২-এর চুক্তিবদ্ধ যুদ্ধবিরতি তুলে নেওয়ার দাবি করেন।
২ জানুয়ারি ২০০৮: সরকার যুদ্ধবিরতি সরকারিভাবে প্রত্যাহার করে। আমেরিকা, কানাডা, নরওয়ে এবং ভারত এই প্রত্যাহার নিয়ে প্রশ্ন তোলে। তবে প্রচার আছে, ভারতের মদত ছিল তামিলদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক অভিযান পরিচালনার ব্যাপারে। রাজীব গান্ধী হত্যার রেশ ভারতীয় আমলাতন্ত্রে দীর্ঘদিন ধরে জিঁইয়ে ছিল।
১০ জানুয়ারি : LTTE বিবৃতি দিয়ে জানায়, সরকারের এই সিদ্ধান্ত অযৌক্তিক। তারা আন্তর্জাতিক সমাজকে তাদের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে বলে। ১০ মার্চ বাত্তিকালোয়া জেলার ৯টি ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিল আসনে TMVP জয়লাভ করে।
২৩ এপ্রিল : ১৮৫ জন সৈন্যকে জাফনা থেকে কিলিনোচ্চি যাওয়ার পথে LTTE হত্যা করে।
৯ মে : আদামপান শহর দখল করে শ্রীলংকার সেনারা।
১০ মে : ইস্টার্ন প্রভিন্সিয়াল কাউন্সিল নির্বাচনে TMVP শাসক UPFA–র প্রার্থী হিসেবে দাঁড়ায় এবং এতে UPFA জয়লাভ করে।
১৬ জুলাই : উত্তর-পশ্চিম উপকূলভাগের শহর ভিদাত্তালতিভু এবং মূল সী টাইগার ঘাঁটি সেনারা দখল করে।
২০ জুলাই : ইউপ্পাইক্কাদাভাই শহর দখল করে সেনারা।
২১ জুলাই : LTTE ঘোষণা করে যে তারা ২৮ জুলাই থেকে ৪ আগস্ট কলম্বোতে সার্ক সম্মেলন উপলক্ষ্যে একতরফা যুদ্ধবিরতি পালন করবে। সরকার LTTE–র ঘোষণা প্রত্যাখ্যান করে এবং আক্রমণ জারি রাখে।
২ আগস্ট : মান্নার জেলায় ভেল্লানকুলাম শহরে LTTE–র শেষ শক্ত ঘাঁটির পতন হয়।
২ সেপ্টেম্বর : সেনাবাহিনী প্রচণ্ড সামরিক সংঘর্ষের মধ্যে মাল্লাভি শহর দখল করে।
৯ সেপ্টেম্বর : LTTE আচমকা ভাভুনিয়া বিমান ঘাঁটিতে আক্রমণ করে।
১৫ সেপ্টেম্বর : কিলিনোচ্চির কাছে আক্কারায়ানকুলাম-এ প্রচণ্ড লড়াই শুরু হয়।
৩ অক্টোবর : রাষ্ট্রসংঘের ৫১টি ট্রাকের কনভয় ৬৫০ টন খাদ্য নিয়ে কিলিনোচ্চি জেলায় প্রবেশ করে। কিলিনোচ্চি শহরে কাউকে পাওয়া যায়নি।
১৭ অক্টোবর : সেনাবাহিনী নাচ্চিকুদা-র উত্তরে মান্নার-পুনেরিন রোডের সংযোগ কেটে দেয়। এর ফলে দু’লক্ষের বেশি গৃহহীন সাধারণ মানুষের জীবন বিপন্ন হয়। তামিল সমর্থক জনগোষ্ঠীকে শায়েস্তা করা হয় এর মাধ্যমে।
২৯ অক্টোবর : পশ্চিম উপকূলে LTTE-র নাচ্চিকুদা ঘাঁটির পতন হয়।
১৫ নভেম্বর : সেনাবাহিনীর টাস্ক ফোর্স LTTE–র রণনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ শক্ত ঘাঁটি পুনেরিনে প্রবেশ করে।
১৭ নভেম্বর : সেনাবাহিনী মানকুলাম এবং আশপাশের এলাকা দখল করে।
৪ ডিসেম্বর : সেনাবাহিনী মুল্লাইতিভু-র ১০ কিমি দক্ষিণে আলামপিল-এ প্রবেশ করে।
১ জানুয়ারি ২০০৯ : সেনাবাহিনী কিলিনোচ্চির উত্তরে পারানথান দখল করে।
২ জানুয়ারি : প্রেসিডেন্ট মাহিন্দ রাজাপাকসে ঘোষণা করেন এক দশক ধরে LTTE–র প্রশাসনিক রাজধানী হিসেবে খ্যাত কিলিনোচ্চি সেনাবাহিনী দখল করে নিয়েছে।
৮ জানুয়ারি : টাইগাররা জাফনা উপদ্বীপ ছেড়ে মুল্লাইতিভুর জঙ্গলে সরে যায়।
২৫ জানুয়ারি : সেনাবাহিনী LTTE–র শেষ ঘাঁটি মুল্লাইতিভু দখল করে।
৩ ফেব্রুয়ারি : আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, জাপান, নরওয়ে এক যুক্ত বিবৃতিতে LTTE–কে অস্ত্র নামিয়ে নিয়ে সংঘর্ষের অবসান ঘটাতে বলে। যদিও ইতোমধ্যে তারা অধিকাংশই মরে ভূত, আবার অস্ত্র-ক্ষমতা তেমন কিছুই অবশিষ্ট নেই। এ অবস্থায় রাষ্ট্রকে থামতে না বলে সভ্য দুনিয়া বিদ্রোহীদের অস্ত্র ছাড়তে বলে।
৫ ফেব্রুয়ারি : সেনাবাহিনী চালাই-তে শেষ ‘সী টাইগার বেস’ দখল করে নেয়।
২০ ফেব্রুয়ারি : LTTE-র দুই বিমান কলম্বোতে আত্মঘাতী হানা দেয়। ২ জন নিহত এবং ৪৫ জন আহত হয়। বিমান দুটিকে গুলি করে নামানো হয়।
২৬ মার্চ : সামরিক বাহিনী জানায়, ‘নো ফায়ার জোন’-এর বাইরে মাত্র ১ বর্গ কিমি অঞ্চলে LTTE–র নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। তিন বছর আগে ১৫০০০ বর্গ কিমি তাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল।
৫ এপ্রিল : সেনাবাহিনী পুথুক্কুদিইরিপ্পু দখল করে LTTE–কে নাগরিকদের বসতি ‘নো ফায়ার জোন’-এ ঠেলে নিয়ে যায়।
২০-২১ এপ্রিল : সেনাবাহিনী ‘নো ফায়ার জোন’-এ প্রবেশ করে বহু সাধারণ মানুষকে হত্যা করে। তামিলরা দলবদ্ধভাবে পালিয়ে যেতে থাকে।
২২ এপ্রিল : LTTE–র মিডিয়া কো-অর্ডিনেটর ভেলেউথান থায়ানিথি এবং টপ ইন্টারপ্রেটার কুমার পঞ্চরত্নম সেনাবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পন করে।
মে : ‘ইউএন অফিস ফর দ্য কো-অর্ডিনেশন অফ হিউমেনিটেরিয়ান অ্যাফেয়ার্স’ জানায়, ১,৯৬,০০০ মানুষ পালিয়ে গেছে এবং উত্তর-পূর্বের উপকূলভাগের সংঘর্ষ-এলাকায় আরও ৫০,০০০ মানুষ আটকে রয়েছে। ‘দ্য টাইমস’ পত্রিকা জানায়, ‘সেফ জোন’-এ ২০,০০০ নাগরিককে হত্যা করা হয়েছে।
১৬ মে : সেনাবাহিনী উপকূলভাগের শেষ যে অংশে LTTEআশ্রয় নিয়েছিল, তা দখল নেয়। প্রেসিডেন্ট মাহিন্দ রাজাপাকসে বিজয় ঘোষণা করেন।
১৭ মে : LTTE-র চিফ অফ ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনস সেলভারাসা পাথমানাথান পরাজয় স্বীকার করে নেন।
১৮ মে : উত্তর-পূর্বাঞ্চলের এক ছোট্ট জঙ্গলে সকালে LTTE নেতা ভেলুপিল্লাই প্রভাকরণকে হত্যা করা হয়। এর মধ্য দিয়ে নিশ্চিতভাবেই এই যুদ্ধ স্থগিত হয়, কিন্তু শেষ হয় না। ইতিহাসবিদরা মনে করেন, তামিলদের অধিকারের দাবি না মিটিয়ে তাদের বিদ্রোহকে শ্রীলঙ্কা সরকার ও তার মিত্রবিশ্ব যেভাবে দমন করেছে, তা নিশ্চিতভাবেই এই যুদ্ধকে দীর্ঘস্থায়ী করেছে। পাল্টাপাল্টি হিংসা জারি রয়েছে। যার অর্থ হচ্ছে, নতুন এক LTTE-র উত্থান খুব বেশি দূরে নয়!

———– ০০ ———– ০০ ———– ০০ ———– ০০ ———–

প্রয়োজনে আরও দেখুন : এক ভারতীয় তামিলের চোখে শ্রীলংকার তামিল সমস্যা এবং সমাজ-বিবর্তনের পথ ধরে সিংহলা-তামিল

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১১ thoughts on “২৫০০ বছরের তামিল-সিংহলা দ্বন্দ্বের ইতিহাস

  1. অসাধারণ একটি লেখা। সবার কাছে
    অসাধারণ একটি লেখা। সবার কাছে অনুরোধ, লেখাটি সর্বত্র ছড়িয়ে দিন। সবাই মনোযোগ দিয়ে পড়ুন। তামিলদের দীর্ঘ লড়াই সম্পর্কে জানুন।

    সিংহলা-তামিল দ্বন্দ্বের কথা আমরা অনেকদিন থেকেই জানি। এমনকি তামিলদের মূলোৎপাটনের খবরও গণমাধ্যম আমাদের কানে জোর করে ঢুকিয়ে দিয়েছে। কিন্তু এমন পূর্ণাঙ্গ ধারণা এর আগে ছিল না। খুব একটা বড় না, কিন্তু খুবই তথ্যনির্ভর। তামিলদের লড়াইয়ের এই ইতিহাস জানাটা আমাদের জন্য খুব জরুরী। প্রতিবেশীদের লড়াই ও শাসকদের ঐক্যের ইতিহাস সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা দরকার।

  2. পড়ার সময় করে উঠতে পারলাম না।
    পড়ার সময় করে উঠতে পারলাম না। দ্রুতই পড়ে মতামত দিব। তবে আমার অবাক লাগছে এইটুকু দেখে যে, এত কম তামিলরা কিভাবে এত বেশি সিংহলীদের সঙ্গে ফাইট করল?

    1. ধন্যবাদ দাদা। যা পড়েছেন তাতেই
      ধন্যবাদ দাদা। যা পড়েছেন তাতেই সঠিক সিদ্ধান্তের কাছে পৌঁছে গেছেন বলে মনে হচ্ছে। আশা করি পড়া শেষ করে পূর্ণাঙ্গ মতামত দিবেন।

  3. এই লেখাটা আমাদের অঞ্চলে
    এই লেখাটা আমাদের অঞ্চলে আদিবাসীদের লড়াইয়ে একটা শক্তি জোগাবে। কিন্তু আমার প্রশ্ন হচ্ছে, জাতীয় মুক্তির প্রশ্নটা কি এখন শ্রেণীর মুক্তির সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে যায়নি? এলটিটিই-র পরাজয় কী শিক্ষা দেয়? গণমুক্তি না ঘটাতে পারলে শত্রুর আক্রমণ থেকে পার্টিকে জনগণ বাঁচাবে না। তাই নতুন রাষ্ট্রের বা দখলীকৃত এলাকার নিরাপত্তার চাবিকাঠি অস্ত্র বা কোনো বিদেশী বন্ধু/শক্তি নয়, বরং ওই অঞ্চলের জনগণ। তাদের হাতে ক্ষমতা গেলেই কেবল তারা ওই ক্ষমতা রক্ষার জন্য শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করবে।

  4. পুরোটা কাল ও আজ মিলে বার
    পুরোটা কাল ও আজ মিলে বার চারেক পড়েছি, নিজের লিংক দুটোও পড়লাম ।
    এতো কিছু জানতাম না, ধন্যবাদ লেখককে

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 66 = 72