পূর্ব বঙ্গের বিলুপ্ত ঐতিহাসিক গ্রাম | অগ্নিযুগের বিপ্লবীর স্মৃতিচারণ

সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে ‘সাপ্তাহিক’ এর ঈদুল ফিতর সংখ্যা ২০১৫। এতে অগ্নিযুগের বিপ্লবীদের শেষ সেনানী কমরেড সত্যরঞ্জন মৈত্র’র কথা ও আরো কিছু তথ্যকে গ্রন্থনা করে একটি বিশেষ রচনা লিখেছিলাম। ওই লেখায় ব্রিটিশ আমলের একটি গ্রামের বয়ান এসেছে, যা আমার কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে। এ ধরনের গ্রামের কথা আমি কোনোদিন শুনিনি। পূর্ববঙ্গে ব্রিটিশ আমলে এমন গ্রাম, এক কথায় অভূতপূর্ব! গ্রামের নাম কোড়কদি। এই গ্রামেই ১৯২৩ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি জন্মেছিলেন সত্য মৈত্র। এটা ছিল তার মামাবাড়ি। এখান থেকে তিনি বিপ্লবী রাজনীতির দীক্ষা পান। পরবর্তীতে কমিউনিস্ট রাজনীতিতে যুক্ত হন।
?oh=ee48402232ba141446b6386bece3d5e4&oe=561075BB” width=”400″ />
বিপ্লবী কমরেড সত্যরঞ্জন মৈত্র

১৯ বছর জেল খাটা এই শ্রমিক নেতা ১৯৭৪ সালে পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির (এম-এল) ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হন। ভারতবর্ষের কমিউনিস্ট আন্দোলনের উত্থান, পতন ও ভাঙা-গড়ার প্রত্যক্ষ এই সাক্ষীর বয়স আজ ৯৩ বছর। শেষ বছরখানেক ধরে তিনি আছেন হাসপাতালে। জীবনে দেখা অনেক কিছুই তিনি বলেছেন। মূল্যায়ন করেছেন চারু মজুমদার, খতম লাইন, আন্তর্জাতিকের প্রভাব, দুই কুকুরের কামড়াকামড়ির লাইনসহ আরও অনেক বিষয়ে। সেখান থেকে আজ কেবল ব্রিটিশ আমলের কোড়কদি গ্রামের চিত্রটাই তুলে ধরছি।

====================


… বলতে থাকেন সত্য মৈত্র, ‘এরপর আমি চলে আসি আমার মামা বাড়িতে। মামা বাড়ি ছিল ফরিদপুর জেলার গোয়ালন্দ সাব ডিভিশনে। বালিয়াকান্দি থানার মধুখালীর কাছাকাছি ছিল একটা রেল স্টেশন। তার কাছেই ছিল আমাদের কোড়কদি গ্রাম। এখানেই আমার জন্ম হয়েছিল।’ এই গ্রামে তখন বাস করত স্থানীয় উচ্চবিত্ত ব্রাহ্মণেরা। ভট্টাচার্য থেকে শুরু করে ভাদুড়ি, স্যান্যাল, লাহিড়ি- এরকম উচ্চবংশীয়রা বসবাস করত। একেক বংশের একেক বাড়ি, তখন বলা হতো পাড়া- ভাদুড়ি পাড়া, লাহিড়ি পাড়া। তবে গ্রামের আকার ছিল ছোট- মিনিট পনেরোর মধ্যে ঘুরে আসা যায়। গ্রামের এই বড় পরিবারগুলো সবই ছিল জমিদার বা তাদের সঙ্গে আত্মীয়তায় সম্পর্কিত। এর অনতিদূরেই ছিল নম-শুদ্র, নিম্নবিত্তের প্রজাদের বাস।

গ্রামটি ছিল অত্যন্ত রক্ষণশীল এবং ঐতিহ্যবাহী। গ্রামের আলোচিত মানুষদের একজন ছিলেন রামধনু তর্কপঞ্চানন ভট্টাচার্য। মামা বাড়ি গিয়ে সত্য মৈত্র এই তর্কপঞ্চাননের গল্প শোনেন। বলা হতো, ওই গ্রামে একদা বিদ্যাসাগর মশাই এসেছিলেন। তর্কপঞ্চানন ছিলেন ভারতের নাম করা পণ্ডিত, তার্কিক। বিদ্যাসাগরকে তিনি ডেকেছিলেন বিধবা বিবাহ প্রশ্নে বিতর্কে অংশ নিতে। বিদ্যাসাগর সেই বিতর্কে তর্কপঞ্চাননকে সন্তুষ্ট করতে পারেননি। তাই ওই গ্রামে তখন বিধবা বিবাহ চালু করা যায়নি। রক্ষণশীলতা ও ঐতিহ্যের একটা ধারা এভাবে ওই গ্রামে বহমান ছিল।

গ্রামে খুব স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষা দীক্ষার প্রচলন ছিল। ছেলে ও মেয়েদের জন্য পৃথক দু’টি উচ্চ মাধ্যমিক স্কুল ছিল। এমনকি কায়স্থদের কেউ কেউ লেখাপড়া শিখেছিল। তারা জমিদারদের কাছারিতে কাজ পেতো। গ্রামে তর্কপঞ্চানন ভট্টাচার্যের নামে বড় একটি লাইব্রেরি ছিল। সেই লাইব্রেরিতে তালপাতার পুস্তক থেকে শুরু করে বিভিন্ন আমলের নানা ধরনের দুর্লভ বইয়ের বিরাট সংগ্রহ ছিল। সত্য মৈত্র এই লাইব্রেরিতে পড়াশোনার সুযোগ পান। লাইব্রেরিকে কেন্দ্র করে যুবকদের ক্লাব বা সমিতি, থিয়েটার ও এরকম বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ছিল।

গ্রামটি ছোট হওয়ায় এবং পারিবারিক সম্পর্কের জেরে সবাই ছিলেন বেশ ঘনিষ্ঠ। বাড়িগুলো ছিল ইট-সুরকির দালানে গড়া। একটা পাড়া পার হয়ে যাওয়া যেত ছাদের ওপর দিয়েই। ঘর ভিন্ন ভিন্ন হয়েছে কালের পরিক্রমায়, কিন্তু সেগুলো ছিল গায়ে গায়ে। জন্মের পরই সত্য মৈত্র’র মা বেশ অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। চিকিৎসার জন্য তখন তাকে নিয়ে যাওয়া হয় কলকাতায়। ছেলেবেলায় তাই সত্য মৈত্র গ্রামের মাসি-পিসীদের অনেকের দুধ খেয়েছিলেন। মাঝে ভবানীপুরে কিছুকাল কাটিয়ে এসে আবার কোড়কদিতে ফেরার পর তিনি দেখলেন, অনেক নারীই তাকে ডেকে বলছেন, ‘আমি তোমার মা, আমাকে মা বলে ডাকবে।’ তিনি এসব তখন বুঝতেন না, অবাক হতেন। জন্মের পর তার বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে সামষ্টিক সমাজের অবদানটা ছিল বিরাট। পরবর্তীতে তিনি সেই সমষ্টির স্বার্থ রক্ষাতেই জীবন কাটিয়েছেন। এ যেন সামষ্টিক সমাজের পারষ্পরিক সহযোগিতামূলক সম্পর্কের ধারাবাহিকতার এক অনন্য উদাহরণ।

সত্য মৈত্র যখন সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র, তখন তার জীবনে উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটনা ঘটে। ওই গ্রামে বাস করতেন অমল স্যান্যাল নামে একজন, যিনি সম্পর্কে মামা হতেন। কিন্তু আর সবার মতো সত্য মৈত্রও তাকে ডাকতেন ‘অমল দা’ বলে। তিনি বিএ পাস করে গ্রামে ফিরেছিলেন। ইতিহাসের ছাত্র ছিলেন, তাই তার গল্পের ঝুলি কখনও ফুরাতো না। গ্রামের উঠতি বয়সের যুবা-কিশোরদের প্রিয়পাত্র হয়ে উঠেছিলেন অল্পদিনের মধ্যেই।

সত্য মৈত্র’র রাজনীতির হাতে খড়ি এই অমল স্যান্যালের হাত ধরেই। তার কাছেই গল্পচ্ছলে প্রথম শুনেছেন মার্কস, লেনিন, স্ট্যালিনের গল্প। নিজ গ্রাম, অঞ্চল, জাতি, দেশের অনেক কিছুর সঙ্গে পরিচয় ঘটেছিল এভাবেই। সত্য মৈত্র বলেন, ‘আমরা তখন জনা পনের কিশোর-যুবা তার একেবারে ভক্ত হয়ে গেলাম। প্রায়ই তার কাছে যেতাম। পৃথিবীর হতিহাস, মানুষের ইতিহাস, নিপীড়িত মানুষের লড়াইয়ের ইতিহাস শুনতাম। আমরা বড় হতে লাগলাম এভাবেই। আর অমল দাও তার রাজনৈতিক পরিচয় আস্তে আস্তে আমাদের কাছে প্রকাশ করতে লাগলেন।’

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি গঠিত হয়েছিল ১৯২০ সালের ১৭ অক্টোবর, সোভিয়েত ইউনিয়নে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের তৃতীয় বর্ষপূরণের প্রাক্কালে। সত্য মৈত্র যখন অষ্টম শ্রেণীতে উঠলেন অমল স্যান্যাল তখনও পার্টির সদস্য হননি। কিন্তু পার্টির সঙ্গে যোগাযোগের সূত্র ধরে মার্কসবাদ সম্পর্কে তার বেশ জানাশোনা ছিল। তিনি গ্রামের তরুণদের বিভিন্ন রাজনৈতিক পুস্তিকা দিতেন। সময় বেঁধে দিয়ে বলে দিতেন, এর মধ্যে পড়া শেষ করে এসে তার সঙ্গে আলোচনা করতে। নির্দিষ্ট দিনে সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে বসে সবার মতামত শুনতেন। যে ভালো বলতে পারতো, তাকে কিছু একটা দিয়ে পুরস্কৃত করতেন। গ্রামে তিনি ‘মশাল’ নামে হাতে লেখা একটি পত্রিকা বের করতেন। তাতে তরুণদের লিখতে হতো। এভাবে সবার মধ্যে সৃজনশীল প্রক্রিয়ায় তিনি মানব মুক্তির জ্ঞানের বিস্তার ঘটাতে থাকেন। তার লেখা একটা বইয়ের নাম ছিল ‘কনকদ্বীপ’। তাতে ওই গ্রামের আদি থেকে কমিউনিস্ট পর্ব পর্যন্ত ইতিহাস উল্লেখিত আছে।

সত্য মৈত্র জানালেন, ‘তিনি মারা গেছেন। কিন্তু তার পরিবারের কাছে এই বইটির কপি সংরক্ষিত আছে বলে জেনেছি। অমল দাসহ নেতাদের সঙ্গে যখন মেলামেশা করছি, তারা শেখালেন যে, তোমাকে ছাত্র আন্দোলনে ঢুকতে হবে। আমিও কাজ শুরু করে দিলাম হাই স্কুলেই। তখন ব্রতচারী মিত্র নামে একজন ছিলেন, যাকে ছাত্র ফেডারেশন বিরোধিতা করছিল। আমিও তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিলাম। স্কুলে যাতে এ নিয়ে ধর্মঘট ডাকা যায়, সেই কাজ করছিলাম। কিন্তু এই খবরটা রটে যায়। ম্যাজিস্ট্রেট আমাদের স্কুলে পুলিশসহ এসপি সাহেবকে পাঠিয়ে দিলেন। তিনি এসে আমাকে হেডস্যারের রুমে ডাকলেন। আমি তখন অষ্টম শ্রেণীতে। তিনি আমাকে বললেন, তুমি রাজনীতি কর। তোমাকে রাস্ট্রিকেট করা হবে। শেষ পর্যন্ত ধমক দিয়ে বলে গেলেন যে, এগুলো বন্ধ করতে হবে। নইলে ছাত্রজীবন এখানেই শেষ। তোমাকে কোথাও পড়ার অনুমতি দেয়া হবে না। এরপর আমি ক্লাসে চলে এলাম। এই এসপি ব্রিটিশ ছিলেন। ভাঙা বাংলায় কথা বলতেন। স্কুল থেকে বেরিয়ে তিনি গেলেন আমার বড় মামার কাছে। মামারা তো জমিদার ছিলেন। মামাকে তিনি শাসিয়ে গেলেন, তোমার ভাগ্নে রাজনীতি করে। তাকে যদি এখান থেকে বের করে না দাও তাহলে তোমার জামদারি থাকবে না। মামা দ্রুতই বাবার কাছে চিঠি পাঠালেন। ভাগ্নেকে আমাদের পক্ষে রাখা সম্ভব না। আমাদের জমিদারি থাকবে না। বাবা আমাকে চিঠি দিয়ে বললেন, এখনই তুমি এ বাড়ি ছেড়ে আমাদের বাড়ি চলে যাও। ওই গ্রামেই আমার বাবার মামা বাড়িও ছিল। পাশের পাড়াতে। ওই মামার সন্তান ছিল না। তাই তার সম্পত্তি আমরা পাই। বাবার চিঠি পেয়ে আমি সবকিছু গুছিয়ে ওই পাড়ায় চলে গেলাম। আমার খুব কষ্ট হয়েছিল। মেট্রিক পাস না করা পর্যন্ত আর মামা বাড়ি যাইনি। বাড়ি বদলের পর আমার রাজনীতির গতি বেড়ে গেল।’

কোড়কদি গ্রামে তখন নানা ধরনের খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হতো। মোহনবাগানের গুরুত্বপূর্ণ দুই খেলোয়াড় ছিলেন এই গ্রামেরই সন্তান। গ্রামটি অর্থ, শিক্ষা, সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাস্কৃতিক দিক থেকে অনেক উন্নত ছিল। গ্রামের যারা বাইরে থাকতো, চাকরি করতো, তারা শহর থেকে এলে গান, নাচ, থিয়েটার, নানা আয়োজন হতো। ‘এরকমই অনুষ্ঠানে আমি কবি মুকুন্দ দাসকে আমাদের গ্রামে দু’বার দেখেছি। দেখতে তিনি চমৎকার ছিলেন। তার গানও ছিল দারুণ চিত্তাকর্ষক। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে তিনি গান দিয়ে লড়াই করতেন। তিনি স্টেজে উঠলে আমরা অভিভূত হয়ে যেতাম। তার নিষিদ্ধ একটা বই ছিল, সেটিও তখন যাত্রা দলের কাছে দেখেছিলাম। এরকমই এক অনুষ্ঠান থেকে একবার তাকে পুলিশ ধরে নিয়ে যায়। তার গ্রামে আসা, ব্রিটিশের নিপীড়নের বিরুদ্ধে, গরিব মানুষের দুরবস্থা নিয়ে বলা কথাগুলো আমাকে খুব নাড়া দেয়,’ বলেন সত্য মৈত্র।

কবি মুকুন্দ দাস ১৯০৫ সালে রচনা করেন তার প্রথম পালাযাত্রা ‘মাতৃপুজা’। যাত্রার মধ্য দিয়ে স্বদেশি আন্দোলনের ধারাকে তিনি জাগরিত করেন। ওই যাত্রাপালার পাণ্ডুলিপি বাজেয়াপ্ত করে তৎকালীন ব্রিটিশ পুলিশ। যাত্রাদল গড়ে সারাদেশ ঘুরে বেড়াতে থাকেন তিনি। যাত্রা থামিয়ে মাঝেমধ্যেই বক্তৃতার ঢঙ্গে সমকালকে তুলে ধরেন। মুকুন্দ দাসের যাত্রাপালা ও গান ব্রিটিশ শাসকদের ভীত করে তুলেছিল।

১৯০৮ সালে ব্রিটিশ সরকারের রোষানলে পড়ে গ্রেপ্তার হন চারণকবি মুকুন্দ দাস। জেল খেটে ১৯১১ সালের প্রথমভাগে দিল্লি কারাগার থেকে ছাড়া পান। অল্প ব্যবধানে আবার তিনি বেরিয়ে পড়েন গান-যাত্রাপালা নিয়ে মুক্তিকামী মানুষের সঙ্গে বিপ্লবীর বেশে। এ সময়েই মুকুন্দ দাসের সাক্ষাৎ পান সত্য মৈত্র। বলেন, ‘মুকুন্দ দাসের উদাত্ত কণ্ঠের আহ্বান আমাকে দারুণভাবে প্রভাবিত করেছিল।’

তিনি বলতে থাকেন, ‘গ্রামটি যেমন একদিক থেকে রক্ষণশীল, জমিদার ও উচ্চবংশীয় সামন্তদের সব ধরনের সংস্কারের আবাস, তেমনি গ্রামের একটা বিশেষ রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্যও ছিল। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের একটা ঘাঁটি ছিল ওই গ্রাম। জমিদার পরিবারের শিক্ষিত ছেলেরাই তখন স্বাধীনতা ও মুক্তির চেতনার দিকে ঝুঁকে পড়েছিল। যুগান্তর, অনুশীলনের মতো বিপ্লবী সংগঠনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল ওই গ্রামের যুবকদের। স্বাভাবিকভাবে গ্রামের অনেকেই জেলখানায় ডিটেনশনে ছিলেন।

কমিউনিস্ট পার্টি সে সময় এরকম সব গ্রামকে আন্দোলনের ঘাঁটি হিসেবে তৈরি করছে। সত্য মৈত্র’র কাছে পার্টির তখনকার কাজের ধারা সম্পর্কে আমরা জানতে চাইলাম। তিনি বলেন, ‘পার্টির কাজ তখন প্রধানভাবে ছিল কৃষকদের মধ্যে। শহরে কংগ্রেসের আধিপত্য, মুসলিম লীগের আধিপত্য বেশি ছিল। কৃষকদের সচেতন করার জন্য তাদের পড়ালেখা শেখানো হতো। কৃষকদের মধ্যে রাত্রিকালীন স্কুল চালানো হতো। এর মধ্যেই রাজনৈতিক পাঠও দেয়া হতো। ফরিদপুর জেলায় তখন চারটি মহকুমা ছিল। তার মধ্যে গোপালগঞ্জে আমরা একটু দুর্বল ছিলাম। বাকি তিন মহকুমায় কৃষকদের মধ্যে পার্টির বেশ শক্তি ছিল। এরপরেই ছিল ছাত্র সংগঠনের কাজ। শ্রমিকদের মধ্যে কাজ তার তুলনায় কম ছিল। ব্রিটিশ আমলে আমরা ছিলাম তৃতীয় প্রধান রাজনৈতিক শক্তি। কংগ্রেস, মুসলিম লীগের পরেই আমরা। আমাদের তখন অনেক কাজ ছিল। তখন ময়মনসিংহ জেলায় সারা ভারতের কৃষক সমিতির সম্মেলন হয়। তিনদিনব্যাপী এই সম্মেলনে তিন লাখ কৃষক সমাবেশিত হয়। আমাদের তখন যে বিরাট গণভিত্তি ছিল, এর মধ্য দিয়ে তার প্রমাণ মেলে।’

বিপ্লবী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত কোড়কদি গ্রামের গুরুত্বপূর্ণ ও নামকরাদের মধ্যে ছিলেন শ্যামেন ভট্টাচার্য, অনুকূল লাহিড়ি, অনীল লাহিড়ি, মন্টু ভাদুড়ি, প্রভাত ভাদুড়ি, অমল স্যান্যাল ও আমার কনিষ্ঠ মামা অবনী লাহিড়ি। এরা সকলেই লম্বা সময় জেলে ছিলেন। জেল থেকে এরা সবাই কমিউনিস্ট হয়ে বেরিয়ে এসেছিলেন। জেলখানা তখন ছিল কমিউনিস্ট হওয়ার স্কুল। জেলফেরত এই নেতাদের সাহচর্য আমি পেয়েছি। তাদের মাধ্যমেই ধীরে ধীরে কমিউনিস্ট পার্টির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হই। সেই অর্থে বলা যায়, ছেলেবেলা থেকেই পার্টির সঙ্গে আছি। শ্যামেন ভট্টাচার্য প্রায় আট বছর ধরে জেলে ছিলেন। তার সম্পর্কে আমরা অনেক দিন ধরে শুনে আসছিলাম। সেখান থেকে একটা শ্রদ্ধাবোধ তৈরি হয়েছিল। প্রকৃতই তিনি ছিলেন একজন গণনেতা এবং অগাধ পাণ্ডিত্যের অধিকারী।’

শ্যামেন ভট্টাচার্য মূলত ছিলেন কৃষক নেতা। কোড়কদির জমিদারদের প্রজা গ্রামগুলোতেই ছিল তার বিচরণ। তিনি জেল থেকে বের হওয়ার পর সত্য মৈত্র তার ঘনিষ্ঠ হন। যখনই শ্যামেন ভট্টাচার্য কৃষকদের মধ্যে যেতেন, তিনি সঙ্গী হতেন। ফিরতেন বেশ রাত করে। স্কুলের পড়ালেখার খুব ক্ষতি হচ্ছিল তখন। ফেরার পথে শ্যামেন ভট্টাচার্য জীবনের অভিজ্ঞতা ও তার পড়া বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলতেন। ওটাই ছিল সত্য মৈত্র’র প্রকৃত পাঠশালা। তার সঙ্গে থাকার সুবাদে কৃষকদের বুঝতে শুরু করেন। কৃষকরা ছিল প্রধানত নম-শুদ্র ও মুসলমান। তাদের বাড়িতে গিয়ে হয়তো কখনও মুড়ি-চিড়া কিছু খেয়েছেন তো সেরেছে! এটা শোনার পর বাড়িতে আর ঢুকতে দিতো না। গোবর-জল এনে মেঝে ধুয়ে, স্নান করিয়ে পরে ঘরে ঢুকতে দেয়া হতো। গ্রামটিতে সংস্কারের নামে এভাবেই চর্চা হতো রক্ষণশীলতা।

অসাধারণ এই গ্রামের বর্ণনা, যেন গল্পে আঁকা ছবি। ১৯৭১ সালে এই গ্রামের চিহ্ন একপ্রকার ধুলোয় মিশে গেছে। জমিদারদের গ্রাম নামে পরিচিত এই গ্রামের সবকিছু লুট হয় মে মাসের মধ্যেই। এরপর ধীরে ধীরে দালানের ইটগুলোও খুলে নেয় এই জমিদারদেরই এক সময়ের মুসলিম প্রজারা। প্রায় ৩০০ বছরের পুরনো সমৃদ্ধ গ্রামটি এখন কেবলই ইতিহাস। সত্য মৈত্র এই গ্রাম থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বের হন মেট্রিক পাস করার পর। এর পরেও অনেক এসেছেনে। কিন্তু পরবর্তী জীবনে আর স্থায়ী হতে পারেননি কোথাও।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৮ thoughts on “পূর্ব বঙ্গের বিলুপ্ত ঐতিহাসিক গ্রাম | অগ্নিযুগের বিপ্লবীর স্মৃতিচারণ

    1. বিষাদে মন ছেয়ে যেতে পারে কারো
      বিষাদে মন ছেয়ে যেতে পারে কারো কারো। সেজন্য আগেই ক্ষমাপ্রার্থী। পাশাপাশি এ থেকে বাঙালীর জাতি চরিত্র অন্বেষণেরও আহবান জানাই। সবার মতামত কাম্য।

  1. যে গ্রামে এত এত সমৃদ্ধির
    যে গ্রামে এত এত সমৃদ্ধির শুরু,এত এত বিপ্লবীর জন্ম,সেই গ্রামটির কোন নামই শুনি নাই? কষ্ট লেগেছে একাত্তরের ঘটনাটা পড়ে।যেন রোমান রা লুট করছে গ্রীক ঐতিহ্য।সাম্প্রদায়িক চিত্রও ফুটে উঠেছে সুন্দরভাবে।অথবা প্রজাদের রাগের বহি:প্রকাশ।সে যাই হোক,লেখাটি যেন পৌরাণিক কোন গল্প,যা মন খারাপ করে দেয়।

    1. মুসলমান বাঙালীর চরিত্র বা
      মুসলমান বাঙালীর চরিত্র বা বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলাপ করা যেতে পারে। সেই আলোচনাকে আমরা বাঙালীর বৈশিষ্ট্য পর্যন্ত টানতে পারি।

  2. খুব সুন্দর প্রচেষ্টা। লেখককে
    খুব সুন্দর প্রচেষ্টা। লেখককে ধন্যবাদ জানাই। এভাবেই একটু একটু করে যদি এই অঞ্চলের বাম আন্দোলনের ইতিহাসটা লিখে ফেলা যায় তাহলে খুব দারুন হয়। লেখকের অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকুক।

  3. মুসলমান বাঙ্গালির চরিত্র আমার
    মুসলমান বাঙ্গালির চরিত্র আমার কাছে বেশ জটিল মনে হয়।আমার মনে হয়, বস্তগত ভাবে তারা বাঙ্গালি সংস্কৃতি ধারন করতে চায়,কিন্ত ভাবগত ভাবে আরবীয় সংস্কৃতি।কিন্ত দুই সংস্কৃতির কিছু বিষয়ে ফান্ডামেন্টাল পার্থক্য থাকায়,এরা সাংস্কৃতিক ডিলেমায় ভোগে।এর ফলে কেউ হয়ে যায় মডারেট মুসলমান,কেউ হয়ে যায় এক্সট্রিমিস্ট।বাকিরা মধ্যবিত্ত চক্রে আটকে পড়ে অবস্থা অনুযায়ী আচরন করে।তবে বাংলায় মুসলিম বিস্তার যযেভাবে হয়,স্পস্ট ধারনা না থাকায় এই বিষয়ে বলতে পারছি না।টুপি,পাজামার,পাঞ্জাবির মত আরবীয় কালচার কিভাবে ঢুকল জানা দরকার।

    1. একাত্তরে বাঙালী মুসলমানরা
      একাত্তরে বাঙালী মুসলমানরা এরকম একটা গ্রাম ধ্বংস করে দিল, তাদের কোনো অংশ এতে বাধাও দিল না। এর মধ্য দিয়ে শ্রেণীসংগ্রাম হয়েছে বলে মনে হয় না। বরং দখল, জ্বালাও পোড়াও, লুটকর্মের উদ্যোক্তা ছিল গ্রাম্য প্রভাবশালী ও শহর থেকে আসা ‘আধুনিক’রাই।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

93 − 88 =