হিকিকোমরি : জাপানে ১০ লাখ তরুণ-তরুণী স্বেচ্ছানির্বাসনে

উন্নত বিশ্বকে সাইকো উৎপাদনের কারখানা হিসেবে দেখে থাকেন অনুন্নত বিশ্বের অনেকেই। আর এসব সাইকো কর্মকান্ডে সবার চেয়ে এগিয়ে থাকে আমেরিকা। এর ঠিক পরেই আছে, বিশ্বের দীর্ঘকালীন দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ জাপান! মূলত আমেরিকা ও জাপানের চলচ্চিত্রে এসব সাইকো কর্মকান্ডের ব্যাপক ছাপ রয়েছে। যা থেকে মানুষ এ ধরণের সিদ্ধান্ত টানে।

?oh=96696f1779db9a8c186a2cfd9c328a3f&oe=5611EFE3″ width=”400″ />

তবে জাপান আত্মহত্যা প্রবণতাসহ এরকম আরও কিছু ঘটনার মাধ্যমে ‘ডিস্টার্বড কান্ট্রি’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। সম্প্রতি আলোচিত হিকিকোমরি (Hikikomori) বা ‘স্বেচ্ছানির্বাসন’ রোগ জাপানের এই পরিচিতিকে আরও উষ্কে দিয়েছে। সমীক্ষায় প্রকাশ পেয়েছে, জাপানে এই রোগে আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ১০ লাখ। আর এদের বেশিরভাগই তরুণ। যুবক-যুবতীরাই এই রোগে আক্রান্ত হয়।

জানা গেছে দীর্ঘ দিন থেকেই জাপানের কিছু তরুণ-তরুণী বাইরের জগ়ৎ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে একা ঘরে আটকে ফেলছে নিজেদের। সারা সকাল ঘুমিয়ে জেগে উঠছে রাতে। এর পর গোটা রাত চোখ আটকে কম্পিউটারের পর্দায়! পরিবার, বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন— যোগাযোগ তো দূরে, বাক্যালাপ পর্যন্ত বন্ধ সকলের সঙ্গে। কেউ ছ’মাস কেউ বা দুই বছর, কেউবা আবার ৩০ বছরও পার করে ফেলেছেন, নিজের ঘরের বাইরে পা রাখেননি। এ ভাবেই সূর্যের আলো থেকে লুকিয়ে থাকার মতো করে সমাজ থেকে নির্বাসিত হয়ে দিন কাটাচ্ছে জাপানের প্রায় দশ লক্ষ মানুষ। বেশিরভাগই যুবক। জটিল এই মানসিক রোগের নাম দেয়া হয়েছে হিকিকোমরি। এর কারণ কী, প্রতিকারই বা কী— হাতড়ে বেড়াচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

তাৎপর্যপূর্ণ, হিকিকোমরি আক্রান্তদের অধিকাংশই যুবক। কেউ সদ্য কলেজ পেরিয়েছেন। কেউ একখনও কলেজের চৌকাঠও পেরোননি। এবং এটাই বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কার সবচেয়ে বড় কারণ। তাঁরা মনে করছেন, মেধাবি এবং কর্মঠ তরুণ-তরুণীরা নিজেদের সমাজ থেকে আলাদা করে নিলে তার মারাত্মক প্রভাব পরতে পারে দেশের অর্থনৈতিক পরিকাঠামোর উপরে। আক্রান্তের তালিকায় অবশ্য রয়েছেন মধ্য পঞ্চাশের প্রৌঢ়ও। যাঁদের অনেকেই ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে স্বেচ্ছা-বন্দি।

ছাত্রাবস্থায় এই জটিলতার শিকার হয়েছিলেন তাকাহিরো কাটো। এখন তিনি হিকিকোমরি বিশেষজ্ঞ। কাটোর কথায়, ‘‘জাপানের জনসংখ্যার এক শতাংশ হিকিকোমরি বা এই জাতীয় মানসিক জটিলতার শিকার। এটা অত্যন্ত দুশ্চিন্তার বিষয়। আক্রান্তরা অধিকাংশই বিশ্ববিদ্যালয় পেরনো। অনেকেই নামী প্রতিষ্ঠান থেকে পাশ করেছেন। এ ভাবে তরুণ প্রজন্ম সমাজ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলে দেশের অর্থনীতির উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। কিন্তু উঠতি প্রজন্মের মধ্যেই এর বিস্তার বাড়ছে ক্রমশ।’’

যার নজির ১৮ বছরের ইউতো ওনিশি। তিন মাস হল চিকিৎসা শুরু হয়েছে ইউতোর। তার আগের তিন বছর শোয়ার ঘরের চৌকাঠ পেরোননি তিনি। সারা সকাল ঘর বন্ধ করে ঘুমোতেন। আর সারা রাত বসে থাকতেন কম্পিউটারের সামনে। ওনিশির নিজেই বলছেন, ‘‘আমি জানি এটা অস্বাভাবিক। কিন্তু আমি এ ভাবেই থাকতে চাই। এক বার এ ভাবে থাকতে শুরু করলে বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় মানুষ।’’

জাপানি বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, হিকিকোমরি শব্দটা অসুখ এবং আক্রান্ত দু’ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। জাপানের স্বাস্থ্য, শ্রম এবং উন্নয়ন মন্ত্রীর মতে, হিকিকোমরিরা সমাজ থেকে সম্পূর্ণ সরিয়ে ফেলেন নিজেদের। কোনও কাজ বা লেখাপড়ায় যাবতীয় আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। পরিবারের ঘনিষ্ঠদের সঙ্গেও সম্পর্ক রাখেন না। কখনও ছ’মাস, কখনও আবার বছরের পর বছর ধরে চলে এই অবস্থা। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মধ্যবিত্ত পরিবারের তরুণ-তরুণীরাই এই রোগে আক্রান্ত হন। নিম্নবিত্তদের মধ্যে এর নজির প্রায় নেই বললেই চলে।

কাটোর মতে, মধ্যবিত্ত পরিবার, পরিবেশেই এই জটিলতার ঝুঁকি বেশি। কিন্তু কেন? সঠিক জবাব নেই। তবে একটা সম্ভাব্য কারণ তুলে ধরছেন কাটো। জাপানে ছেলেমেয়েদের মধ্যে, বিশেষত ছেলেদের মধ্যে সেরা কলেজে সুযোগ পাওয়া, ভালো নম্বর পাওয়া এবং পরবর্তীতে ভালো সংস্থায় চাকরি পাওয়ার চাপ থাকে অত্যন্ত বেশি। সেই মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে, তা থেকে একপ্রকার গা বাঁচাতেই সমাজ-বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন তাঁরা। অনেক সময় দেখা যাচ্ছে, ছেলে-মেয়েদের এই অস্বাভাবিক আচরণ সমর্থন করছেন বাবা-মায়েরাই।

তবে এটা একটা সম্ভাবনা মাত্র। আর তাই কাটো বলছেন, ‘‘চিকিৎসা নয়, এ রোগের কারণ খুঁজে বার করতে হবে আগে।’’ যারা এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চান, তারা আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে এ নিয়ে প্রকাশিত নিচের খবরগুলো আমলে নিতে পারেন। পাশাপাশি চিন্তা শুরু করতে পারেন, উন্নত সমাজ এসব বিকৃতিতে জড়াচ্ছে কেন? গলদটা কোথায়? ধনীরা কি এভাবে অসাম্য, বৈষম্য টিকিয়ে রেখে একতরফা উন্নতি করে এগুতে পারবে?

তথ্যসূত্র
১)
বিবিসি।
২) এবিসি।
৩) নিউ ইয়র্ক টাইমস।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৭ thoughts on “হিকিকোমরি : জাপানে ১০ লাখ তরুণ-তরুণী স্বেচ্ছানির্বাসনে

  1. ভালো লাগল পড়ে। নতুন কিছু
    ভালো লাগল পড়ে। নতুন কিছু জানলাম। আসলে অসাম্য থাকলে মানুষ কখনই মুক্তি পাবে না। তা যতই কিছু মানুষ সমৃদ্ধির চূড়োয় পৌঁছাক না কেন!

  2. অবশ্যই সম্পূর্ন নতুন একটা
    অবশ্যই সম্পূর্ন নতুন একটা বিষয়।এই যে তাদের এই আচরন,এর পেছনে কোন লিংক আছে কি?? আর এখানে সারারাত কম্পিউটারে বসার কথা বলা হয়েছে।কম্পিউটারে আসলে তারা কি করে? এসব তথ্য জানা গেলে ভাল হত।

  3. বিষয়টি কয়েকদিন আগেই পড়েছিলাম,
    বিষয়টি কয়েকদিন আগেই পড়েছিলাম, তবে এই ধরনের সমস্যা আমাদের দেশেও খুজলে বেশ পাওয়া যাবে ! যথেষ্ট হতাশা থেকে এসব হয়ে থাকে। আমি নিজেই বছর তিনেক আগে প্রায় চার মাস ঘরের দরজা পার হইনি, সারাদিন ঘরের মধ্যেই ছিলাম ! হতাশাই দায়ী প্রধানত :মনখারাপ:

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 3 = 2