ব্রিটিশ আমলের জেলখানা | কমরেড সত্য মৈত্র’র স্মৃতিচারণ

সম্প্রতি অগ্নিযুগের বিপ্লবীদের শেষ সেনানী কমরেড সত্যরঞ্জন মৈত্র’র কথা ও আরো কিছু তথ্যকে গ্রন্থনা করে একটি বিশেষ রচনা লিখেছিলাম সাপ্তাহিক-এর ঈদ সংখ্যায়। ওই লেখায় ব্রিটিশ যুগের জেলখানার বিভিন্ন ঘটনা ও কিছু বৈশিষ্ট্য উঠে এসেছে। ব্রিটিশ আমলের জেলখানা সম্পর্কে জানলে আমরা আজকের জেলখানার সঙ্গে তুলনা করতে পারব। সে হিসেবে এবিষয়টা আমার মতে, খুবই গুরুত্বপূর্ণ!

১৯ বছর জেল খেটেছেন শ্রমিক নেতা সত্যরঞ্জন মৈত্র। ১৯৭৪ সালে পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির (এম-এল) ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হন। ভারতবর্ষের কমিউনিস্ট আন্দোলনের উত্থান, পতন ও ভাঙা-গড়ার প্রত্যক্ষ এই সাক্ষীর বয়স আজ ৯৩ বছর। অনেক বিষয়েই আলাপ করেছেন তিনি। আজ কেবল ব্রিটিশ আমলের জেল জীবনের স্মৃতি সংক্রান্ত ঘটনাগুলোই তুলে ধরছি। তবে তার সূত্র ধরে চলে এসেছে ইতিহাসের আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়!


কমরেড সত্যরঞ্জন মৈত্র

====================



কলেজ জীবনের স্মৃতিটা তার এখনও তরতাজা। বলেন, ‘১৯৪০ সালে মেট্রিক পাস করি। স্কুলে পড়ার সময় আমি ছিলাম সব ডিভিশনের ছাত্রনেতা। আর কলেজে উঠে কাজ শুরু করলাম জেলা শাখায়। ভর্তি হয়েছিলাম ফরিদপুর শহরের রাজেন্দ্র কলেজে। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় কমিউনিস্ট পার্টি স্থানীয় জনগণের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির শিক্ষা ছড়িয়ে দিতে বলে। কমিউনিস্ট পার্টির নেতাদের তখন কৃষকের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক। অন্যদের সঙ্গে আমিও বিভিন্ন এলাকার কৃষকদের মধ্যে যেতাম। কৃষকদের অবস্থা তখন খুব খারাপ। গরিব কৃষকদের কিছুই ছিল না। জমিদার প্রধান এলাকা হওয়ায় জমিদারদের নিপীড়ন ছিল মাত্রা ছাড়া। কৃষকদের সঙ্গে আমরা তখন গভীর রাত পর্যন্ত বৈঠক করতাম।

এর মধ্যেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। আমি তখন ছাত্র ফেডারেশনের জেলা শাখার সম্পাদকের দায়িত্বে চলে আসি। কমিউনিস্ট পার্টি তখন এই সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বযুদ্ধকে বিরোধিতা করছে। ছাত্র সংগঠনের নেতা হিসেবে সে সময় জেলার বিভিন্ন এলাকার স্কুল কলেজে গিয়েছি, বক্তৃতা দিয়েছি। সেসব বক্তৃতায় প্রায়ই ব্রিটিশবিরোধী বক্তব্য থাকত। এ কারণে ওই বয়সেই আমার নামে মামলা হয়ে যায়। এক পর্যায়ে ধরাও পড়ি। ১৯৪০ সালেই জেলে যেতে হয় আমাকে। মাত্রই তখন রাজেন্দ্র কলেজে ভর্তি হয়েছি। ফরিদপুর শহরে তখন ছোট্ট একটা ঘরে আমি থাকতাম। তখন ওই ঘরে বসে সাংগঠনিক কাজ, পড়ালেখা সবই হতো। সে সময় গান্ধীবাদকে বিরোধিতা করে একটা লেখা লিখেছিলাম। তখন যা বুঝতাম, তার প্রেক্ষিতেই লেখা। আমাদের কার্যক্রমের প্রধান দিক ছিল, দেশমাতৃকার মুক্তি, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রাম। মামলা হতে সময় লাগেনি। একদিন শেষরাতে জনা ত্রিশেক পুলিশ এসে আমাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়।’

গান্ধীর সমালোচনাটা তখন কি ছিল? আগ্রহ নিয়ে প্রশ্ন করি। তিনি হাত নেড়ে উঁড়িয়ে দিতে চান, ‘তখন যা বুঝেছি, তাই লিখেছিলাম। জনগণের মুক্তির পথ কোনটি? স্বাধীনতার জন্য কোন পথে আমরা হাঁটব? আপসকামী শান্তিবাদী পথে নাকি সশস্ত্র সাম্রাজ্যবাদী শত্রুকে সশস্ত্র কায়দায়ই মোকাবেলা করতে হবে? এ বিষয়ে ছিল লেখাটা। গান্ধীর অহিংসার নীতিকে আমরা বিরাধিতা করতাম। কমিউনিস্ট পার্টির লাইন তখন এটা ছিল, জনগণের মুক্তির পথ সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়েই বেরিয়ে আসবে। এটাই আমরা পার্টির বিভিন্ন সংগঠনের মধ্য দিয়ে প্রচার করতাম। তখন ব্রিটিশবিরোধী কর্মসূচির সুবাদে জনগণের মধ্যে আমাদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছিল। স্থানীয়ভাবে ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামের সামনের সারিতে চলে আসলাম আমরা। এর মধ্যেই তো গ্রেপ্তার হয়ে যাই।’

জেলখানায় যাওয়ার মাধ্যমে সত্য মৈত্র’র জীবনে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে। প্রথমত পরিবার তার ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে একপ্রকার যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। দ্বিতীয়ত জেলখানাকে তখন বলা হতো পলিটিকাল ইউনিভার্সিটি। অনিশ্চয়তার রাজনৈতিক জীবনে বাধা পড়ার পাকা বন্দোবস্ত হতে লাগল। তিনি বলেন, ‘কলেজে ভর্তি হওয়ার পর মাত্র ১১ দিন কলেজ করতে পেরেছিলাম। এরপর মামলায় আমার এক বছরের সাজা হয়ে যায়। সে সময়, আমার গ্রেপ্তারের কিছু আগে ও পরে মিলিয়ে, জেলার অধিকাংশ নেতাকেই গ্রেপ্তার করা হয়। জেলে তাদের সঙ্গে পরিচিত হই। অনেককেই আগে দেখিনি। জেলে আমি সাধারণ কয়েদির মতোই ছিলাম। নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসতাম। জেলার ২৩ জন নেতা তখন জেলে। আমি ছিলাম সবার ছোট। অবনী লাহিড়ি, অমল দা সবাই জেলে। তারা আমাকে জেলে বসে পড়াতেন, কিভাবে আলোচনার নোট নিতে হয়, কিভাবে আলোচনা করতে হয়, কি পড়তে হবে, এসব শিখিয়েছেন।

এক বছর জেল খাটা হয়ে গেল। কিন্তু জেল থেকে আমি ছাড়া পেলাম না। মুক্তির দিন আবার আমাকে গ্রেপ্তার করা হলো জেলগেট থেকেই। তখন আর মামলা দিল না। ডিটেনশন দিয়ে আটকে রাখল। জেলেই থাকতে লাগলাম। ভবানী সেনসহ পার্টির গুরুত্বপূর্ণ নেতারা তখন জেলে ছিলেন। তাদের পরামর্শে জেলে থেকেই পড়াশোনা করতে লাগলাম। সে সময় বিভিন্ন জেলে ছিলাম। ফরিদপুর, রাজবাড়ী, কুমিল্লা, আলীপুর সেন্ট্রাল জেল, প্রেসিডেন্সি জেলেও ছিলাম। আমার বয়স কম হওয়ায় তখন তারা আমাকে বিশেষ যত্ন করতো। বিশেষ অনুমোদন নিয়ে আমি জেলে বসেই উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দেই। পার্টির নেতারা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার নামে একটি পিটিশন করে। তাতে আমার ব্রিটিশ বিরোধিতার দায়ে জেলজীবনের ঘটনা উল্লেখ করে বলা হয়, ৪২ সালে আমার পরীক্ষা দেয়ার কথা! আমি জেলে বসে পরীক্ষায় অংশগ্রহণের অনুমতি চাই। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়েও তখন দেশপ্রেমিকরা ছিলেন নিশ্চয়ই। নইলে এরকম সাজা খাটা আসামিদের তারা পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দিতেন না। পরীক্ষায় অংশগ্রহণের অনুমতি পাওয়ার পর দেখি আর মোটে চার মাস বাকি আছে। কমরেডরা করলেন কি, তারা অধ্যাপক বন্ধুদের কাছে চিঠি লিখলেন সব বিষয়ের প্রশ্নপত্রের সাজেশন দেয়ার জন্য। একেক বিষয়ে কয়েকজন অধ্যাপকের কাছে প্রশ্ন চাওয়া হলো। সেগুলো সংগ্রহ করে, প্রশ্ন বাছাই করে তার উত্তর লিখে আমাকে দিয়ে পড়ালেন। পরীক্ষা দেই, পাসও করি। অধিকাংশ প্রশ্নই কমন পড়েছিল। এরপর ১৯৪২ সালে জেল থেকে বের হই।’

জেলখানার এই যে পার্টি স্কুলিং ও পার্টি নেতা-কর্মীদের মধ্যেকার আন্তরিকতা, এটাই তখন একজন মানুষকে বদলে দিত। সত্য মৈত্রও বদলে গেলেন। তার জীবন দর্শন ঠিক হয়ে গেল। নিপীড়িত মানুষের মুক্তির আন্দোলনে নিজেকে নিয়োজিত রাখার পণ করেই জেল থেকে ফিরেছিলেন। যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়ে পরিবার এর গতি খানিকটা বাড়িয়ে দিয়েছিল। শুধু তাই নয়, আইএ পাস করে যখন জেল থেকে ফিরে মামা বাড়ি গিয়েছিলেন, স্বয়ং পিতা নিত্য গোপাল মৈত্র সেখানে হাজির হলেন। ওই গ্রামে তখন কমিউনিস্ট নেতাদের একটি বৈঠক ছিল। সবাইকে তিনি বাড়িতে ডাকলেন। ভরা মজলিসে তিনি নিজের বড় ছেলেকে তুলে দিলেন কমিউনিস্ট পার্টির নেতাদের হাতে। সঙ্গে একটা দাবি রাখলেন। বললেন, আমি চাই ছেলেটা পড়াশোনা করুক। আমার মতো একজন ডাক্তার হোক। তা সে আর হবে না। রাজনীতি সে করুক, কিন্তু আপনারা তার পড়ালেখার দিকে খেয়াল রাখবেন। পড়াটা যেন সে শেষ করে। আমার আর কোনো দাবি নেই। এরপর সে যা খুশি করবে, আপনাদের যেমন ইচ্ছে তাকে কাজে লাগান। বাবার এই সম্মতি সত্য মৈত্রকে পেশাদার রাজনৈতিক কর্মীতে রূপান্তরিত করে।

‘পড়াশোনা চলতে লাগল’, বলেন সত্য মৈত্র, ‘বিএ ভর্তি হলাম রাজেন্দ্র কলেজেই। ১৯৪২ সালের ডিসেম্বরে পার্টির সদস্য পদপ্রার্থী হলাম। পরের বছরের ফেব্রুয়ারি মাসেই সদস্যপদ লাভ করি। এর কয়েক মাস বাদেই পার্টির জেলা কমিটির সম্মেলন হয়। আমাকে জেলা কমিটির সদস্য করা হয়। এটা ছিল অবাক করা ঘটনা, একেবারে কল্পনার বাইরে। ১৯৪৩ সালে পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সম্মেলন হয়। তার প্রস্তুতি হিসেবেই জেলা কমিটি ও প্রাদেশিক কমিটিগুলো করা হচ্ছিল। যাই হোক, ১৯৪৪ সালে বিএ পরীক্ষা দেয়ার কথা। কিন্তু অসুস্থতাজনিত কারণে পরীক্ষায় অংশ নিতে পারলাম না। এ সময়েই পরিবারের অধিকাংশ সদস্যরা কলকাতায় স্থায়ীভাবে পাড়ি জমাল। এমনকি কোড়কদির অনেকেও। মামাবাড়ির ছোট যারা ছিল, আমার কারণে তারা ওই এলাকায় থেকে পড়ালেখা করতে পারেনি। জমিদার বাড়ির এই সন্তানদের মানুষের বাড়িতে লজিং থেকে দূর-দূরান্তের স্কুলে পড়ালেখা করতে হয়েছে। অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছে তারা আমার জন্য। পরের বছর বিএ পরীক্ষা দেয়ার কথা, কিন্তু পার্টি থেকে ডাক পড়ল শ্রমিক এলাকায় কাজে যোগ দেয়ার।’

এর মধ্য দিয়েই সত্য মৈত্র’র পড়ালেখা স্থগিত হলো। দেশে তখন বিরাট শোরগোল। এগিয়ে আসছে দেশবিভাজন। এর মধ্যেই জানা গেল কমিউনিস্ট পার্টির নেতা জ্যোতি বসু রেল থেকে নির্বাচন করবেন। পাকশি থেকে ভাটিয়াপাড়া হয়ে গোয়ালন্দ পর্যন্ত বিরাট এলাকা নিয়ে রেলওয়ের পাকশি ডিভিশন। রেলশ্রমিকদের ঘাঁটি ছিল এ অঞ্চল। পার্টির প্রাদেশিক শাখা সিদ্ধান্ত দিল, জেলা কমিটি থেকে একজনকে বাছাই করে রেলশ্রমিকদের মধ্যে পাঠাতে হবে। নির্বাচন হবে ৪৬ সালে। এর আগেই যা করার করতে হবে। জ্যোতি বসুর পক্ষে ভোট টানতে হবে। জেলা শাখা সত্য মৈত্রকে নির্বাচন করলেন রেলশ্রমিকদের মধ্যে কাজ করতে যেতে। তিনি এর আগে শ্রমিকদের মধ্যে কাজ করেননি। তাছাড়া রেলওয়েতে তখন অবাঙালি শ্রমিকই বেশি। তিনি অবাঙালিদের কথা বুঝতেন না। কিন্তু নিপীড়িত জনতার ঐক্যে ভাষা কোনো বাধা নয়।

সত্য মৈত্র বলেন, ‘আমি রাজবাড়ীতে গিয়ে এক কর্মকার বন্ধুর বাড়িতে উঠলাম। অবাঙালি শ্রমিকদের কথা বুঝি না। কিন্তু মুখভঙ্গী দিয়েই শ্রমিকদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে উঠতে লাগল। ওই এলাকায় প্রথম যিনি সেক্রেটারি হলেন রেলওয়ের, তার নাম ছিল হিতাইনুনিয়া। একবারে অজগ্রাম থেকে আসা এক বিহারি। নিজের ভাষা ছাড়া আর কিছু জানেন না। সাধারণ একজন শ্রমিক হলেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত ডায়নামিক একজন শ্রমিক নেতা। আমরা একে অপরের কথা ঠিকমতো বুঝতাম না। কিন্তু এর মধ্য দিয়েই একত্রে আন্দোলন গড়ে তুলতে লাগলাম। হিতাইনুনিয়া খড়ম পরে হেঁটেই ১২/১৪ মাইল পেরিয়ে গোয়ালন্দ চলে যেতেন। শ্রমিকদের সংগঠিত করতেন। জ্যোতি বাবু সেই ভোটে জিতেছিলেন। কলকাতা গিয়ে ভোটের কাগজ নিয়ে এসে শ্রমিকদের দিয়েছিলাম।

পার্টিতে তখন আমি সার্বক্ষণিক। জেলার সম্পাদক মণ্ডলীতে দায়িত্ব পালন করছি। পার্টি তখন পত্রিকা বের করবে। তহবিল গঠনের কাজ শুরু হলো। বাড়ি গেলাম। মা, বাবাসহ ভাই, আত্মীয়দের সামনে বক্তৃতা দিলাম। সহযোগিতা চাইলাম। নারীরা গহনা দিলেন, টাকা দিলেন, বাবা গোলা থেকে ধান দিলেন। এভাবে পরিবারের সঙ্গেও সম্পর্কটা হয়ে গেল রাজনৈতিক। এর মধ্যে ৪৪ সালে পরিবার ভেঙে গিয়েছিল। বাবা নওগাঁতেই ডাক্তারির জন্য রয়ে গেলেন। মা ও ভাইরা এবং মামা বাড়ির অনেকেই চলে এলেন কলকাতায়। যাই হোক, রেলওয়েতে শ্রমিকদের দাবি-দাওয়ার প্রশ্ন ছিল। গণসংগঠন, শ্রেণী সংগঠনের কাজ ছিল। পাশাপাশি মূল কর্মসূচিটা সবখানেই ছিল ব্রিটিশবিরোধী। শ্রমিকদের রাজনৈতিক প্রশ্নে শিক্ষিত করা হতো। সেখানে আমি কাজ করার জন্য খুব বেশি সময় পাইনি। তবে এক বছরের মধ্যে আমাদের ওখান থেকে ২৭ জন সাধারণ শ্রমিক পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন। বছরখানেক বাদে আবার জেলে যাই। দেশভাগের কিছু পরেই পাকিস্তান আমলের শুরুতে আমাকে রেলওয়ের পাকশি ডিভিশন থেকে সরকার বহিষ্কার করল। ওই এলাকায় ঢুকলেই গ্রেপ্তার হব। তখন থেকে শুরু হলো আমার আন্ডারগ্রাউন্ড জীবন।’

১৯৪৮ সালে কমিউনিস্ট পার্টির দ্বিতীয় কংগ্রেস আহ্বান করা হয় কলকাতার মোহাম্মদ আলী পার্কে। ঐতিহাসিক সেই কংগ্রেসে সত্য মৈত্র অংশগ্রহণ করেন। ওই কংগ্রেস দেশভাগের পরে হলেও তা আদৌ বিভক্ত ছিল না। ভারত ও পাকিস্তান, উভয় অংশের নেতারাই এই কংগ্রেসে অংশগ্রহণ করে এবং সর্বভারতীয় পার্টি তখনও অটুট। কেন্দ্রীয় কমিটিও গঠিত হয়ে গেছে। কিন্তু কংগ্রেসে উপস্থিত পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের পার্টি ডেলিগেটদের মধ্যে একটা বিষয়ে বিতর্ক চলছিল। যা কেন্দ্রীয় কমিটিকেও প্রভাবিত করে। প্রশ্নটা ছিল, দুই দেশ তো এখন আলাদা। রাষ্ট্র ভাগ হয়ে গেছে। এখনও কিভাবে এক পার্টি থাকে? দুই পাকিস্তানের ডেলিগেটরা মিলে আলাদা বৈঠক হলো। তাতে সিদ্ধান্ত হলো পার্টি আলাদা হওয়াটাই যৌক্তিক। সদ্য নির্বাচিত কেন্দ্রীয় কমিটি এটা মেনে নিল। পাশাপাশি এ অঞ্চলে যেহেতু পার্টির কার্যক্রম দুর্বল, তাই কয়েকজনকে দায়িত্ব দেয়া হলো এর দেখভাল করার জন্য। এর মূল দায়িত্বে ছিলেন ভবানী সেন। যদিও পার্টি আলাদা হয়ে যায় এবং ৯ সদস্যের পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি গঠিত হয়। এই কমিটিতে ছিলেন সাজ্জাদ জহির, খোকা রায়, নেপাল নাগ, জামাল উদ্দিন বুখারি, আতা মোহাম্মদ, মণি সিংহ, কৃষ্ণবিনোদ রায় ও মনসুর হাবিবউল্লাহ। সাজ্জাদ জহির কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। একই দিনে পূর্ববঙ্গের কাউন্সিলরগণ ১৯ সদস্যের পূর্ববঙ্গ প্রাদেশিক কমিটি গঠন করেন। এ কমিটির সম্পাদক নির্বাচিত হন কমরেড খোকা রায়। ওই কংগ্রেসেই পার্টি নেতা বিটি রণদিভের লাইন গৃহীত হয়। যা দুই দেশের পার্টি একইসঙ্গে গ্রহণ করে।

শুরুতে পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টির আলাদা কোনো রণকৌশল ছিল না। অধিকাংশই রণদিভের লাইনের পক্ষেই দাঁড়ান। পরবর্তীতে উপমহাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনে এই লাইন ‘হঠকারি’ হিসেবে অভিহিত হয়। সত্য মৈত্র নিজেও তা মনে করেন, ‘১৯৪৮ সালে বিটি রণদিভের লাইন কমিউনিস্ট পার্টিতে গৃহীত হয়। সেখানে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল গুরুত্ব পেয়েছিল। কিন্তু সেটা সময়োপযোগী ছিল না। মাত্রই ব্রিটিশ গেল। মানুষ স্বাধীনতা পেয়ে কিছুটা যেন মুক্তির স্বাদ পাচ্ছে। অনেকে কংগ্রেসের মাধ্যমে পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখছেন। অনেকে ভাবত, এখন উচিত সবাই মিলে দেশ পুনর্গঠন করা। আবার দেশভাগ হয়ে গেছে। এটা নিয়ে মানুষ অস্থির। মোটকথা, ১৯৪৭ সালে যে নতুন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল রণদিভের লাইনে তা গুরুত্ব পায়নি। রণদিভের লাইন ১৯৪৭ সালে আসে, গৃহীত হয় ১৯৪৮ সালে। তখন যোশী লাইনের বিপরীতে রণদিভের লাইন আসে। যোশী লাইনকে সংশোধনবাদী লাইন হিসেবে আমরা চিহ্নিত করি। যোশী লাইনে ছিল কংগ্রেসের সঙ্গে খোলামেলা ঐক্যের ডাক। এর দুর্বলতা আমরা বুঝতে পারি। কিন্তু রণদিভের লাইন যে নতুন পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে সক্ষম নয়, এটা আমরা বুঝতে দেরি করি। তখন আমরা ইয়ে আজাদি ঝুটা হ্যায়, লাখো ইনসান ভুখা হ্যায়, এই স্বাধীনতা অর্থহীন বলে স্লোগান দিয়েছি। এর সব যে ভুল ছিল তা নয়, কিন্তু সদ্যই ২০০ বছরের ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটেছে, মানুষ স্বাধীনতার অর্থ খুঁজছে, এরকম সময়ে এই লাইন কাজ করে না। বিশেষ পরিস্থিতির বিশেষ বিশ্লেষণ করতে আমরা ব্যর্থ হই।’

কিছুটা যৌথ, কিছুটা বিভক্ত, আলাদা পার্টি, কিন্তু লাইন এক, এরকম একটা মিশ্র কংগ্রেস সেরে ডেলিগেটরা আবার যার যার এলাকায় ফিরলেন। পাকিস্তানে তখন নয়া সরকার, নয়া ব্যবস্থা। ধর্মভিত্তিক জাগরণের ডাক। সরকারের মূল শত্রু হয়ে গেল কমিউনিস্টরা। অন্য নেতাদের মতো সত্য মৈত্রও পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। এর মধ্যেই তিনি গ্রেপ্তার হলেন। ঘটনার বর্ণনা দেন তিনি, বলেন, ‘শ্রমিকদের একটা সভা হচ্ছিল গোপনে। রাজবাড়ী শহরের পাশেই ছিল সভাস্থল। আমার বিরুদ্ধে তখন হুলিয়া ছিল। আমি লুকিয়ে সেই সভায় অংশ নেই। পুলিশ এটা টের পেয়ে যায়। সেখান থেকে আমি গ্রেপ্তার হয়ে যাই। রেলশ্রমিক আন্দোলনের কারণে ওই এলাকায় আমার তখন প্রবেশ নিষেধ ছিল। সারা ভারত ও পাকিস্তানে রেলশ্রমিকদের একটা ধর্মঘট সংঘটনের জন্য আমরা তখন কাজ করছিলাম। পুলিশ আমাকে টার্গেট করেছিল। ওই গোপন সভা থেকে বের হওয়ার পর কেবল আমাকেই গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়। ওই বৈঠকে সেদিন ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী আশু ভরদ্বাজও উপস্থিত ছিলেন। গ্রেপ্তারের পর আমার সাজা হয় এক বছর। একটানা সেবার ৮ বছর জেলে ছিলাম। বাকি সময়টা ডিটেনশনে ছিলাম। ১৯৫৬ সালে ছাড়া পাই।’

এদিকে তখন চলছে তুলকালাম। পরিবারের সদস্য থেকে শুরু করে অধিকাংশ আত্মীয় স্বজন ও পরিচিতরাই পাকিস্তান ছেড়ে ভারত চলে গেলেন। এমনকি পূর্ব পাকিস্তানে তখন যে ১২ হাজার পার্টি সদস্য ছিলেন, তাদের মধ্যে ১০ হাজারেরও বেশি ভারতে চলে গেল। কৃষক-শ্রমিকসহ হাজার দুয়েকর মতো পার্টি কমরেড থেকে গেলেন। নেতাদের অধিকাংশই চলে গেছেন ওপারে। সত্য মৈত্র পড়ে রইলেন জেলখানায়। পাকিস্তান আমলে জেল কোডে পরিবর্তন আসে। রাজনৈতিক আসামিদের অপরাধী হিসেবে সাব্যস্ত করা হয়। ডিটেনশনে থাকলেও বন্দীদের প্রাপ্য সুযোগ সুবিধা কেড়ে নেয়া হয়। আলাদা করে রাখা ছাড়া আর কিছু থাকে না। সাধারণ অপরাধীদের মতোই কম্বল আর থালা বাটি তাদের সম্বল হয়।

কমিউনিস্টদের তখন বিশেষ নেতিবাচকভাবে দেখা হতো। পাকিস্তান সরকারের বাহিনীগুলো বলতো, এরা ভারতের চর। এর বিরুদ্ধে কমিউনিস্ট কর্মীরা তখন অনশন ধর্মঘট করে। এ ধরনের জেলভিত্তিক আন্দোলনকে তখন বলা হতো হাঙ্গার স্ট্রাইক। বিপ্লবী ভগৎ সিং ইতিহাসের সর্ববৃহৎ অনশন ধর্মঘট সংগঠিত করেছিলেন তার সাথীদের নিয়ে। তিনি ১১৬ দিন টানা অনশন করেন। তাদের দাবিও ছিল রাজনৈতিক বন্দীদের সঙ্গে রাজনৈতিক আচরণ করা এবং ব্রিটিশ ও ভারতীয় বন্দীদের সমান সুযোগ সুবিধা দেয়া। পাকিস্তান আমলে ঢাকা জেলে প্রায় ৮০ জন কমিউনিস্ট কর্মী অনশন শুরু করলে সত্য মৈত্রও তাতে যোগ দেন। সেই অনশন একটানা না হলেও দিনের হিসাবে অন্য হিসাবগুলোকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল। প্রথম দফায় টানা ২৪ দিন ধরে চলেছিল এ অনশন। সরকারের পক্ষ থেকে তখন এক মাসের মধ্যে সব দাবি মেনে নেয়ার আশ্বাস দিয়ে অনশন ভাঙানো হয়। কিন্তু মাস পেরিয়ে গেলেও অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয় না। সাত দিনের মাথায় আবার শুরু হয় অনশন। এবার চলে টানা ৪০ দিন। প্রথম ১০ দিনের পর থেকে জোর করে এক বেলায় কিছু একটা খাওয়ানো হতো। এটাকে বলা হতো ফোর্স ফিডিং। এর মধ্যেই একজন মারা যান। তিনজন অপ্রকৃতিস্থ হয়ে পড়েন। ৪০ দিনের মাথায় ছিল ঈদ। সরকার আবার দাবি মানার প্রতিশ্রুতি দিয়ে চুক্তি করলে আবারও অনশন থামানো হয়। আবার এক মাসের সময় নেয় তারা। এক মাস সাত দিন গেলে তৃতীয় দফায় অনশন শুরু হয়ে চলে ৬০ দিন। এই দফায় মারা যান তিনজন। আর অপ্রকৃতিস্থ হয়ে পড়েন সাতজন। শেষ পর্যন্ত সরকার অনশনকারীদের দাবি মেনে নেয়। সত্য মৈত্র বলেন, ‘এই যে আমরা অনশন করেছি, তখন বাইরের অবস্থা তেমন জানি না। দেশ ছাড়ার কথা কোনোদিন ভাবতেও পারিনি। আমরা বরং পার্টি লাইন প্রয়োগের সংগ্রামে নেমেছি।

এই অনশনের পেছনেও পার্টি লাইনের ভূমিকা ছিল। রণদিভের লাইনে জেলবিপ্লবের স্লোগান দেয়া হয়েছিল। এই লাইনের প্রভাবেই তখন আমরা জেলখানায় আন্দোলন করেছিলাম। পার্টির এই লাইন এবং ঢাকা জেলে আমাদের এই অনশন অন্যান্য জেলের বন্দীদেরও প্রভাবিত করে। তারাও একই দাবিতে অনশন করে। রাজশাহী জেলে এমনই এক ঘটনায় সরকারি বাহিনীর গুলিতে আমাদের সাতজন কমরেড শহীদ হন। এই ঘটনা খাপড়া ওয়ার্ডের জেলহত্যা নামে পরিচিতি পায়।’

এ বিষয়ক আগের পোস্ট : পূর্ব বঙ্গের বিলুপ্ত ঐতিহাসিক গ্রাম | অগ্নিযুগের বিপ্লবীর স্মৃতিচারণ

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৩ thoughts on “ব্রিটিশ আমলের জেলখানা | কমরেড সত্য মৈত্র’র স্মৃতিচারণ

  1. অনেক ধন্যবাদ লেখাটা শেয়ার
    অনেক ধন্যবাদ লেখাটা শেয়ার করার জন্য :তালিয়া: এই ধরণের লেখা সত্যিই দরকার এখন, এতে প্রাণশক্তি পাওয়া যায়

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 22 = 23