উম্মাহঃ মৌলবাদী ইসলামের রাজনৈতিক বাসনা । পর্ব – ২

উম্মাহর জন্যে সন্ত্রাস
আবু আলা মওদুদী, সাইয়েদ কুতুব এবং হাসান আল বান্নাহ আধুনিক যুগে যে একক মুসলিম উম্মাহর স্বপ্ন দেখেছেন বর্তমানে কট্টর সালাফি জিহাদী গোষ্ঠিগুলো সেই স্বপ্নকে গণতন্ত্র ও আধুনিকতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ পর্যন্ত টেনে নিয়ে গেছে। মুসলিম ব্রাদারহুড আর জামায়াতে ইসলামী এই দুই সংগঠনের ছায়ার নিচে বিস্তার লাভ করেছে আরো কট্টর ইসলামবাদীরা। এই দুই সংগঠনের কট্টরপন্থী নেতা কর্মীরা হয় জিহাদী ইসলামবাদকে উৎসাহিত করেছে অথবা জিহাদী সংগঠনগুলোতে রিক্রুটমেন্ট জুগিয়েছে। আর এই সংগঠনগুলোর মূলধারার রাজনীতি মূলত ‘আইডিন্টিটি পলিটিক্স’ নির্ভর হওয়ায় এরা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে জনগণের সংগঠন হয়ে উঠতে পারে নাই। পাশাপাশি এসব সংগঠনের বুর্জোয়া নেতৃত্ব ক্ষমতার রাজনীতিতে ইসলামের উপর্যুপুরি ব্যবহার করে মৌলবাদী ইসলামের বিকাশে সহায়তা করেছে এবং সামাজিক সাম্প্রদায়িকতাকে উসকে দিয়েছে।

জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা আবু আল মওদুদীকে অনেকক্ষেত্রেই আধুনিক ইসলামী মৌলবাদের পিতা বলা যায়। আগেই বলেছি যে তিনি গণতন্ত্রের সমর্থক এবং ইসলাম ও গণতন্ত্রের মধ্যে সাম্য প্রতিষ্ঠাকারী ছিলেন। কিন্তু সলিমুল্লাহ খান যেমন বলেছেন, ইসলাম বলতে যারা ‘এক দেশ এক নেতা’ অর্থাৎ একক রাজনৈতিক উম্মাহর প্রচার করেন, তারা মূলত ইউরোপের অসহিষ্ণু ফ্যাসিবাদের ইসলামী সংস্করণ চালু করতে চান, এই কথাটি মৌদুদী নিজেও অস্বীকার করতেন কি না সন্দেহ আছে। কারণ, মৌদুদীর নিজের বক্তব্য অনুসারেই তার কল্পনার ইসলামী রাষ্ট্র দেখতে অনেকটা ফ্যাসসিট রাষ্ট্রের মতৈ। একক রাজনৈতিক মুসলিম উম্মাহর প্রতি তার বিশ্বাস, আধুনিকতাকে জাহেলিয়া গন্য করার তত্ত্ব এবং জাতীয়তাবাদ বিরোধীতা ইত্যাদি কনসেপ্টের কারনে তার প্রদর্শিত ইসলামবাদী রাজনীতি বিংশ শতকে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোয় জনগণের জাতীয়তাবাদী মুক্তি সংগ্রামের সাথে সহাবস্থানে যেতে পারে নাই। পরবর্তি যুগের আরো কট্টর ইসলামবাদীদেরকেও তিনি প্রভাবিত করেছেন। মুসলিম ব্রাদারহুডের নেতা সাইয়েদ কুতুব ছিলেন মওদুদীর ভক্ত। ইবনে তাইমিয়ার ফতোয়াবাজি, রশিদ রিদার সালাফিবাদ, মওদুদীর আধুনিক জাহেলিয়া কনসেপ্ট একজোট করে সাইয়েদ কুতুব তার নিজস্ব ইসলামবাদের প্রচার করেন। নাসেরের যুগে মিশরে ‘আল জিহাদ’ নামে যে ইসলামবাদী সন্ত্রাসী সংগঠনের জন্ম হয়েছিল তা মূলত মুসলিম ব্রাদারহুডের তরুণ ও কট্টর সমর্থকদের হাতে গড়ে উঠেছিল। এই তরুণরা ছিল সাইয়েদ কুতুবের ভক্ত। ‘আল জিহাদে’র অন্যতম সংগঠক ছিলেন বর্তমান আল কায়েদা আমির ‘আইমান আল জাওয়াহিরি’। জাওয়াহিরি চৌদ্দ বছর বয়স থেকে মুসলিম ব্রাদারহুড করতেন। তিনি সাইয়েদ কুতুবের ভক্ত ছিলেন। নাসের সরকার সাইয়েদ কুতুবের মৃত্যুদন্ড দেয়ার পর তিনি সাইয়েদ কুতুবের ভিশনকে একশনে পরিণত করার প্রতিজ্ঞা নিয়ে সরকার উৎখাত ও ইসলামি স্টেট প্রতিষ্ঠার জন্যে গোপন তৎপরতা শুরু করেন এবং শেষ পর্যন্ত আল জিহাদের একজন সংগঠক হয়ে ওঠেন। পরবর্তিতে তিনি ওসামা বিন লাদেনের সাথে যুক্ত হয়ে আল কায়েদার নেতা হয়ে ওঠেন এবং ওসামা বিন লাদেনের মৃত্যুর পর বর্তমানে তিনিই আল কায়েদার আমির। এখানে উল্লেখ করা দরকার যে মহানবীর সাহাবিদের মডেলে সাচ্চা মুসলিম হয়ে ওঠার যে প্রচার প্রোপাগান্ডা সাইয়েদ কুতুব চালাতেন তার মধ্যেই আইমান আল জাওয়াহিরিদের সালাফিবাদে ঝুকে পরার বিজ লুক্কায়িত ছিল। আর তরুণ বয়সের সংগঠন মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রতি এখনো তার যথেষ্ট ভালোবাসা আছে। গত বছর এপ্রিল মাসে মিশরের মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রতি সংহতি জানিয়ে ভিডিও প্রকাশ করেন জাওয়াহিরি। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশেও মুসলিম ব্রাদারহুডের সাথে আল কায়েদার আন্তঃসম্পর্কের বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। ইয়েমেনে মুসলিম ব্রাদারহুডের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ আছে। মিশরে তো সন্ত্রাসবাদের সাথে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে বর্তমানে তারা নিষিদ্ধই হয়ে আছে। মুসলিম ব্রাদারহুডের নেতা মিশরের সাবেক প্রেসিডেন্ট মুরসির বিচারের সময় মিশর সরকার আইমান আল জাওয়াহিরির সাথে তার ফোনলাপের একাধিক রেকর্ড হাজির করেছিল।

মৌদুদী থেকে জাওয়াহিরিঃ উম্মাহর রাজনীতি ও বাংলাদেশ
জাওয়াহিরির গুরুদের একজন হলেন সাইয়েদ কুতুব, আর সাইয়েদ কুতুবের গুরুদের একজন হলেন মৌদুদী। সুতরাং আল কায়েদা নেতা জাওয়াহিরির ইসলামবাদের সিলসিলা তৈরি করলে দেখা যাবে তা ভারতিয় উপমহাদেশের আবু আলা মওদুদী পর্যন্ত বিস্তৃত। এমন কি আল জাওয়াহিরি কিছুক্ষেত্রে সরাসরি মৌদুদী দ্বারা প্রভাবিত। প্রকৃত পক্ষে ‘গ্লোবাল জিহাদে’র তত্ত্ব প্রথম প্রচার করেন মৌদুদী। জাওয়াহিরি তার বই ‘দা বিটার হারভেস্টে’ সাইদ কুতুবের পাশাপাশি মৌদুদীকেও রেফারেন্স হিসাবে ব্যবহার করেছেন, বিশেষ করে গ্লোবাল জিহাদ প্রচারের ক্ষেত্রে। মৌদুদী মনে করতেন সমগ্র দুনিয়া ইসলামের অধিন আনতে হবে এবং এরজন্যে যে কোন পদ্ধতি অনুসরণ করাই বৈধ। মৌদুদীর ভাষায় – “পুরো দুনিয়া ব্যাপি একটি বিপ্লবের জন্যে যাবতীয় শক্তি ও পদ্ধতির ব্যবহার চায় ইসলাম। এই মহান লক্ষ্য অর্জনের জন্যে ইসলাম কোন পন্থাই বাদ রাখবে না। এই সর্বব্যাপী সংগ্রাম, যার জন্যে সকল শক্তি ও সবধরণের তৎপরতা ব্যয় করতে হবে, তাই জিহাদ”। অথবা –

ইসলাম পুরা দুনিয়া চায়। শুধুমাত্র এক খন্ড জমিতে ইসলাম সন্তুষ্ট নয়, ইসলাম চায় পুরো বিশ্বকে।… ইসলামিক জিহাদ একি সময়ে আক্রমনাত্বক ও রক্ষনাত্বক…। ইসলামিক পার্টি এই লক্ষ্য পুরণের জন্যে যুদ্ধ করতে ইতস্তত করে না.

মৌদুদীর এই গ্লোবাল জিহাদের কনসেপ্টই আইমান আল জাওয়াহিরি প্রচার করেন। মৌদুদী যে কোন মূল্যে ইসলামের বিজয়ের কথা বলে তার গণতান্ত্রিক ইসলামবাদের পক্ষে যেমন প্রচার চালিয়েছেন, তেমনি সশস্ত্র জিহাদের বৈধতাও দিয়েছেন। আর জাওয়াহিরি যে আন্তর্জাতিক সশস্ত্র জিহাদের প্রচার করেন তার বৈধতার জন্যে মৌদুদীকে হাজির করেন। আর জামায়াতে ইসলামীর সাথে আল কায়েদার সম্পর্ক নিয়ে অভিযোগ নতুন নয়। ২০১৩ সালে হেফাজতে ইসলামের ঢাকা অবরোধ কর্মসূচীর পরপর আইমান আল জাওয়াহিরি বাংলাদেশের মুসলিমদের উদ্দেশ্য করে একটি অডিও বার্তা প্রচার করেন। সেই অডিও বার্তায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের উদ্দেশ্য সম্পর্কে তিনি বলেন –

পাকিস্তান থেকে স্বাধীন হওয়া, বাংলাদেশের জনগণের উপর আগ্রাসন প্রতিহত করা অথবা পাকিস্তানের সামরিক শাসন উৎখাত করা তাদের (মুক্তিযুদ্ধের নেতাদের) প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল না।…আসল উদ্দেশ্য ছিল উপমহাদেশে মুসলিম উম্মাহকে দুর্বল করা। মুসলমানদের নিজেদের মধ্যে কোন্দল, আঞ্চলিক দ্বন্দ ও যুদ্ধ লাগিয়ে মুসলিম উম্মাহকে টুকরো টুকরো করে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়াই ছিল প্রকৃত উদ্দেশ্য।

পাঠক খেয়াল করবেন যে, একাত্তরে জামায়াতে ইসলামীর নেতারা মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে যে বক্তব্য দিয়েছে জাওয়াহিরির এই বক্তব্য তার অনুরূপ। একাত্তরে তারা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে মুসলিম উম্মাহ টুকরো করার এবং ইসলাম ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র বলেই প্রচার করেছে। জামাতের এই শীর্ষ নেতাদের আজ অবধি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সম্বন্ধে বিপরীত কোন নেরেটিভ হাজির করতে দেখা যায় নাই। বরং ২০১৩ সালে শাহবাগ আন্দোলনে বিপন্ন বোধ করার পর তারা আবারও ইসলাম বিপন্ন হওয়ার নেরেটিভ হাজির করেছিলেন। এই নেরেটিভের সাথে জাওয়াহিরির নেরেটিভের পার্থক্য নাই। জামায়াতে ইসলামীও মুসলিম ব্রাদারহুডের মতো আন্তর্জাতিক সংগঠন। পাকিস্তান জামায়তে ইসলামীর সাথে আল কায়েদার সম্পর্কের প্রমান পাওয়া গেছে, পাকিস্তান জামায়তে ইসলামী আল কায়েদা ও তালেবান যোদ্ধাদের বিভিন্ন সময়ে সমর্থন ও আশ্রয় দিয়েছে। বাংলাদেশের সন্ত্রাসী সংগঠন জেএমবির রিক্রুটমেন্টের অন্যতম উৎস ছিল জামাতের ছাত্র সংগঠন ‘ইসলামী ছাত্র শিবির’।

একটি দুনিয়াজোরা কাল্পনিক ও রাজনৈতিক উম্মায় বিশ্বাস আন্তর্জাতিক ইসলামী সন্ত্রাসবাদের অন্যতম মতাদর্শিক ভিত্তি। বাস্তবে যে একক কোন রাজনৈতিক ও মতদর্শিক মুসলিম উম্মাহর অস্তিত্ব দুনিয়ায় নাই, তা আগের পর্বেই আলোচনা করেছি। তবে খ্রিস্টান ধর্মের অনুসারীদের মতোই মুসলমানরাও যে পৃথিবীব্যাপী স্বধর্মের অনুসারীদের মধ্যে এক ধরণের ভাতৃত্বে বিশ্বাস করে তা সত্য, এবং এধরণের বিশ্বাস ক্ষতিকরও নয়। সমস্যা হলো একক রাজনৈতিক উম্মাহর দাবিতে। যারা রাজনৈতিক উম্মাহর স্বপ্ন দেখান, ও আন্তর্জাতিক ইসলামবাদী রাজনীতি প্রচার করেন, তারা পৃথিবীর কোন এক দেশের মুসলমান ধর্মাবলম্বী মানুষের উপর শাসক বা হানাদার শক্তির আগ্রাসন, শোষন ইত্যাদি দেখিয়ে অন্য এক দেশের মুসলমানকে রাজনৈতিক ইসলাম অথবা সন্ত্রাসী ইসলামবাদে উদ্বুদ্ধ করে থাকে। পৃথিবীর বিভিন্ন মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রের জনগণ ঔপনিবেশিক আমল থেকে দেশী ও বিদেশী শাসক ও শোষকদের বিরুদ্ধে মৌলিক মানবাধিকার, রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব, জাতীয় সম্পদের উপর অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যে যে জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম শুরু করেছিল এবং যেই সংগ্রাম এখনো জারি আছে সেই সংগ্রাম থেকে দূরে সরিয়ে মুসলিম তরুণদের একটি ফিকশনাল ধর্মযুদ্ধে নামিয়ে দিতে ভুমিকা রাখছেন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ইসলামবাদের প্রচারকরা। উল্টোদিক থেকে যে ইসলামফোবিয়ার প্রচারকরা দুনিয়ার কোন একটি দেশের মৌলবাদী অথবা সন্ত্রাসবাদীদের অপকর্মের দায় সমগ্র দুনিয়ার বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী মুসলমানদের ঘাড়ে চাপাতে চান, তারাও মূলত মৌলবাদী ইসলামবাদীদের একক ‘রাজনৈতিক উম্মাহর’ দাবির সাথেই একমত প্রকাশ করেন। বাস্তবতাকে সামনে আনার বদলে এরাও ইসলামবাদী ফিকশনের শক্তি যোগান। ফিলিস্তিনের মুসলমানদের উপর অত্যাচার নির্যাতন পুজি করে যারা বাংলাদেশের মুসলমানদের কাছে রাজনৈতিক উম্মাহর প্রচার প্রচার করেন আর যারা ইরাকের আইসিসের সন্ত্রাসকে পুজি করে বাংলাদেশের মুসলমানদেরকেও সন্ত্রাসের ধর্মের অনুসারী বলে প্রচার করেন, তারা দিনশেষে সন্ত্রাসীদের ‘উম্মাহর’ ডিসকোর্সেই বৈধতা দেন।

তথ্যসূত্রঃ
Religion and Politics: Islam and Muslim Civilization By Professor Hamadi Redissi
Islamism, fascism and terrorism (Part 4) By Marc Erikson
http://www.thedailystar.net/sites/default/files/upload-2014/gallery/pdf/transcription-zawahiri-msg.pdf

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 68 = 73