অন্দরের ধর্মে কোন জবরদস্তি নাই (পর্ব-৩)

বিভিন্ন সেকুলার রাষ্ট্রে ধর্ম পালন ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে সেকুলার আইনের মডেলে যেসব পার্থক্য দেখা যায় তার মধ্যে আর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হতে পারে পাবলিক স্পেসে শিখ সম্প্রদায়ের পাঁচ চিহ্নের অন্যতম কিরপান বহন সংক্রান্ত আইনের পার্থক্য। কিরপান এক ধরণের ছোট আকারের ছুরি, শিখ ধর্মাবলম্বীরা যা বহন করা নিজেদের ধর্মীয় দায়িত্ব বলে বিশ্বাস করে। শিখ ধর্ম তুলনামুলকভাবে নতুন ধর্ম। ধর্মটির জন্ম হয়েছিল ১৫ শতকে, ভারতবর্ষের পাঞ্জাব অঞ্চলে। যে বিশেষ ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে এই ধর্মের অনুসারীদের যেতে হয়েছে তার কারনেই ছুরি বহন করাও তাদের কাছে ফরজ হয়েছে। ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলাম ধর্মের আবির্ভাবের প্রভাবে ও প্রতিক্রিয়ায় বিভিন্ন ধর্মীয় ও সমাজ সংস্কারমূলক আন্দোলনের সুচনা হয়েছিল। শিখ ধর্ম এমনি একটি আন্দোলন হিসাবে জন্মলাভ করেছিল। এই ধর্মে ইসলাম এবং ভারতীয় ধর্মীয় ঐতিহ্যের সংমিশ্রন লক্ষ্য করা যায়। সংমিশ্রন বা সিংক্রেটিজম জাতীয় শব্দ ব্যবহারের কিছু সমস্যা আছে, এই ধরণের শব্দের ব্যবহার ধর্মীয় ইতিহাসের সীমাবদ্ধ ধারণা দেয় এবং ধর্মসমূহের এসেনশিয়ালিস্ট ব্যাখ্যাগুলো স্বীকার করে নেয়। আপাতত আলোচনার প্রয়োজনে এই জাতীয় শব্দ আমরা ব্যবহার করবো।

মূলত ১৬ শতকে শিখদের প্রথম ধর্ম গুরু নানকের নেতৃত্বে এই ধর্ম উত্তর পশ্চিম ভারতে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ১৬ শতকের যেই সময়টায় ফ্রান্সে ক্যাথলিক বনাম প্রটেস্ট্যান্ট ধর্ম যুদ্ধ (রিলিজিয়াস ওয়ার অফ ফ্রান্স) চলছিল সেই সময়টাতে ভারতবর্ষের শাসক ছিলেন মুঘোল সম্রাট মহান আকবর। ভারতবর্ষের ইতিহাসে ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং ভিন্ন মতের প্রতি সহনশিলতাকে সাম্রাজ্যের পলিসি হিসাবে ব্যবহারের ক্ষেত্রে সম্রাট আকবরের নাম সবার আগে আসে। আকবর ১৫৫৬ সালে সম্রাট হিসাবে অভিষিক্ত হন। দিল্লীর সুলতানদের সময় থেকে চলে আসা অমুসলিমদের উপর জিজিয়া কর আরোপের রীতি তিনি ১৫৬৪ সালে বাতিল করে দেন। আকবরের শাসনামলে ধর্ম পালনের স্বাধীনতাকে উচ্চ মর্যাদা দেয়া হতো এবং প্রাশাসনিক কাজে ও সেনাবাহিনীতে শিয়া, সুন্নি, হিন্দু ইত্যাদি সব ধর্মের অনুসারীদেরকেই সমান সুযোগ দেয়া হতো। ধর্মীয় সহনশিলতার এই যুগেই একটি জনপ্রিয় ধর্ম হিসাবে উত্তর পশ্চিম ভারতে শিখ ধর্ম বিকাশ লাভ করেছিল। সম্রাট আকবরের সাথে শিখদের সম্পর্ক ভালো ছিল বলে জানা যায়। কিন্তু পরবর্তি মুঘোল সম্রাটদের সাথে শিখদের সম্পর্ক মধুর ছিল না। এর অন্যতম কারন, বহু মুসলমান স্বধর্ম ত্যাগ করে শিখ ধর্ম গ্রহণ করছে বলে আকবর পুত্র সম্রাট জাহাঙ্গিরের কাছে মুসলিম নেতারা অভিযোগ করতেন। এক পর্যায়ে জাহাঙ্গির শিখদের পঞ্চম গুরু অর্জন দেবকে তলব করেন এবং তিনি হাজির হওয়ার পর তাকে মৃত্যুদন্ড দেন। নবম গুরু তেঘ বাহাদুরকেও একি ভাগ্য বহন করতে হয়, তিনি নিহত হন সম্রাট আওরঙ্গজেবের নির্দেশে। আওরঙ্গজেব জিজিয়া প্রথা ফিরিয়ে আনেন এবং শিখদের প্রতি তিনি যথেষ্ট অসহনশিলও ছিলেন। এই ধরণের নিপিড়নমূলক ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার ফলে শিখরা একধরণের সামরিকায়নের মধ্যে দিয়ে গিয়েছিল। গুরু তেঘ বাহাদুরের মৃত্যুর পর শিখদের দশম গুরু গোবিন্দ সিং তাদের ধর্ম বিশ্বাসের অন্যতম চিহ্ন (আর্টিকেল অফ ফেইথ) হিসাবে অনুসারিদেরকে কিরপান বহন করার নির্দেশ দেন।

বর্তমান পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পাবলিক স্পেসে অস্ত্র বহন আইনত নিষিদ্ধ। পৃথিবীর যেসব অঞ্চলে লেইসিটি সেকুলারিজমের মডেল অনুসরণ করা হয় সেসব দেশে শুধুমাত্র ধর্মীয় প্রতিক হিসাবেই পাবলিক স্পেসে কিরপান বহন বেআইনি হতে পারে। আধুনিক সেকুলার ভারতের মোট জনসংখ্যার দুই শতাংস শিখ ধর্মাবলম্বি এবং ভারতের সংবিধানের আর্টিকেল ২৫-এ শিখ সম্প্রদায়ের কিরপান বহনের বৈধতার পক্ষে আইন করা হয়েছে। ভারতে শুধুমাত্র শিখ সম্প্রদায়ের সদস্যরাই ছুরি নিয়ে ব্যাঙ্কে প্রবেশ করতে পারে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে পাশ্চাত্যের কিছু দেশে শিখ সম্প্রদায়কে কিরপান বহন করার ক্ষেত্রে কিছু সমস্যার সম্মুখিন হতে হয়েছে। কানাডায় কিরপান বহন কেন্দ্র করে একাধিক মামলা ও বিতর্ক হয়েছে। কানাডার কুইবেকে ২০০৬ সালে বারো বছর বয়সি এক শিখ ছাত্রের কাছে কিরপান পাওয়া গেলে কর্তৃপক্ষ স্কুলে কিরপান বহন নিষিদ্ধ ঘোষনা করে। ঐ ছাত্রের পরিবার বাধ্য হয়ে সুপ্রিম কোর্টে মামলা করে। মামলায় রায় দেয়া হয় যে, স্কুল কর্তৃপক্ষের কিরপান ব্যান করার স্বিদ্ধান্ত ‘কানাডিয়ান চার্টার অফ রাইটস এন্ড ফ্রিডমস’ কানাডার সকল নাগরিককে যে ধর্মীয় স্বাধীনতা দিয়েছে তার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। ফলে স্কুল কর্তৃপক্ষ কিরপান ব্যানের স্বিদ্ধান্ত তুলে নিতে বাধ্য হয়। কিন্তু আদালতের এই স্বিদ্ধান্তে কুইবেকের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ খুশি ছিল না, এবং খোলাখুলিভাবেই এর বিরুদ্ধে সমালোচনা করেছে। কানাডা রাষ্ট্রটিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো বহু স্টেটের সমন্বয়ে গঠিত এবং প্রত্যেক স্টেটের পার্লামেন্ট আইন পাস করতে পারে। উল্লেখ করা দরকার কুইবেক স্টেটটির ক্ষমতাসীন সরকার স্টেটটিতে পুরোপুরি লেইসিটি মডেলের সেকুলারিজম অনুসরণে আগ্রহি। ২০০৮ সালে জনৈক শিখ ছাত্র তার এক সহপাঠিকে কিরপান দেখিয়ে হুমকি দেয়ার পর কিরপান নিষিদ্ধ বিষয়ক বিতর্ক তুঙ্গে উঠেছিল। আদালত অবশ্য ঐ ছাত্রকে ‘হুমকি প্রদানে’র অপরাধে অভিযুক্ত করেছিল, কিরপান বহনের জন্যে নয়। তবে কুইবেকের লেইসিটে মডেলের অনুসারিরা ধর্মীয় প্রতিককেই পাবলিক স্পেসে নিষিদ্ধ করার যে তৎপরতা চালাচ্ছে তাতে ভবিষ্যতে কিরপান বহন এমনিতেই অপরাধ হিসাবে গন্য হয়ে যেতে পারে, কাউকে কিরপান দেখিয়ে হুমকি দেয়া বা শারিরিকভাবে আঘাত করার দরকার পরবে না। কিরপানতো বটেই, মাথার পাগরিও তখন ধর্মীয় প্রতিক হিসাবে নিষিদ্ধ হয়ে যেতে পারে। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, মার্কিন যুক্তরাজ্য ইত্যাদি সেকুলার রাষ্ট্রে কিরপান বহনকে ধর্ম পালনের স্বাধীনতা হিসাবে গন্য করা হয়। যেসব রাষ্ট্রে ছুরি বহন করা অস্ত্র আইনে নিষিদ্ধ, সেসব রাষ্ট্রেও ধর্মীয় স্বাধীনতা হিসাবে কিরপান বাড়তি সুবিধা পায়। কিন্তু আমাদের প্রশ্ন হলো, শিখরা যদি তাদের কিরপান দিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মানুষের উপর ঝাপিয়ে পরতো, তাদেরকে শারীরিকভাবে আহত বা নিহত করতো, তাহলে কি কিরপান বহনের ক্ষেত্রে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে শিখরা এখন যে স্বাধীনতা পাচ্ছে, তা পেতো?

মুঘোল সাম্রাজ্যের সুর্য ডুবেছে অনেক দিন হয়। এখন আর জাহাঙ্গিরও নাই, আওরঙ্গজেবও নাই। ইউরোপ আমেরিকার শিখ ধর্মাবলম্বী নাগরিকদেরকে তাদের সরকার ডেকে নিয়ে হত্যা করে না, বরঙ তাদের নিরাপত্তা দেয়াই ঐ সরকারদের কাজ। সেই হিসাবে আধুনিক শিখদের ছুরি নিয়ে ঘুরে বেড়ানো একটি অযৌক্তিক (ইর‍্যাশনাল) কাজ বলেই মনে হতে পারে, যদি আপনি শিখ ধর্মাবলম্বী না হন। কিন্তু শিখদের কাছে এটা তাদের বিশ্বাস এবং পরিচয়ের অংশ, ছুরি নিয়ে ঘুরে বেড়ানো, স্কুলে যাওয়া তার ধর্ম পালনের অধিকার। পাবলিক স্পেসে যদিও ছুরি একটি বিপদজনক বস্তু, কিন্তু এইক্ষেত্রে তা ধর্মীয় অধিকার বলেই বিবেচিত হয়। লেইসিটে মডেলের সেকুলারিজম ছারা বাকি সব মডেলের অনুসারি সেকুলার রাষ্ট্রগুলোই তার নাগরিকদের ধর্মীয় স্বাধীনতা দিতে বাধ্য, যদি না তাদের ধর্ম পালন অন্য নাগরিকদের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ না করে বা নিরাপত্তার জন্যে হুমকি না হয়। বর্তমান পৃথিবীর মানুষের কাছে শিখদের ছুরি (কিরপান) মুসলমানদের বাক্যের (তাকফির) চাইতে বেশি নিরাপদ মনে করা হয়। কিরপানের আঘাতে মানুষ মরার খবর আমরা পাই না, কিন্তু তাকফিরের সুবাদে মানুষের জান মাল ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার খবর প্রায়ই পাওয়া যায়। প্রশ্ন হলো, যদি একজন তাকফিরি মুসলমান দাবি করে যে তাকফির করা, অন্যকে কাফির বলা তার ধর্মীয় স্বাধীনতা ও বাকস্বাধীনতার অন্তর্ভুক্ত, তাহলে ‘ধর্মীয় স্বাধীনতা’ ও বাকস্বাধীনতায় বিশ্বাসী একটি সেকুলার রাষ্ট্র ‘তাকফির’ নিষিদ্ধ কিভাবে করবে? ধর্মীয় স্বাধীনতা ও বাকস্বাধীনতার এই সীমাবদ্ধতা রাষ্ট্রগুলো কিভাবে অতিক্রম করে? এসবই ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার বিষয়, যা প্রতিনিয়ত এইসব ধারণা আর মডেলগুলোকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। কানাডার শিখ ধর্মাবলম্বিরা যদি কিরপান নিয়ে প্রায়ই ভিন্ন ধর্মের বা ভিন্ন মতের মানুষের উপর ঝাপিয়ে পরতো, তাহলে শিখদের ব্যাপারে ঐ রাষ্ট্রের মানুষের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতাটাই ভিন্ন রকম হতো। তখন আর কিরপান বহন ধর্মীয় স্বাধীনতা হিসাবে সুবিধা পেতো কি না তা নিশ্চিত করে বলার উপায় নাই। ঠিক যেমন আমরা নিশ্চিত হতে পারি না যে, বাকস্বাধীনতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতার সাংবিধানিক অধিকারকে উচ্চ মর্যাদা দেয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ‘নিগ্রো’ শব্দটি যেমন একটি ট্যাবু তেমনি ‘কাফির’ শব্দটিও কখনো ট্যাবু হয়ে যাবে না। এই একি কথা গত পর্বেও বলেছি। আবারো বললাম।

আমাদের এতক্ষনের আলোচনা থেকে স্বিদ্ধান্ত নিতে পারি যে, সেকুলারিজমের একক কোন মডেল নাই, কোন মডেলে ধর্মীয় স্বাধীনতাকে সিমাবদ্ধ আবার কোন মডেলে ধর্মীয় স্বাধীনতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হয়, আর এই মডেলগুলো মূলত একটি জাতিসত্ত্বার ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার আলোকে গড়ে ওঠে ও বিকশিত হয়। এই স্বিদ্ধান্তগুলো আমাদের পরবর্তি আলোচনার জন্যে জরুরি। (চলবে)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 7 = 3