একটি স্মরণীয় বাংলা কবিতা | সরোজ দত্ত

১৯২৪ সালের এপ্রিল মাসের শেষাশেষি মৈমনসিং জেলার গৌরীপুর স্টেটের সদর নায়েব শ্রীযতীন্দ্রপ্রসাদ ভট্টাচার্য এক দুঃসাহসিক কাণ্ড করিয়া বসিলেন। মাত্র মাস দুই আগে রয়টার প্রদত্ত লেনিনের মৃত্যু সংবাদ সংবাদপত্রে প্রকাশিত হইয়াছিল। এই সংবাদ পড়িয়া নায়েব মশাই অস্থির হইয়া উঠিলেন। জমিদারী স্টেটের সদর নায়েব তো দূরের কথা, তখনকার দিনে কোন রাজনৈতিক নেতা বা কর্মীর পক্ষেও লেনিনের মৃত্যু সংবাদে বিচলিত হওয়া কঠিন ছিল। কারণ রয়টার ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী প্রচারের কল্যাণে রুশ বিপ্লব ও লেনিন এদেশে প্রায় অপরিচিতই ছিলেন। এবং যেটুকু পরিচিত ছিলেন তাহা অপপ্রচারেরর মিথ্যায় রঞ্জিত।

আজ একথা বিশ্বাস করা কঠিন যে, লেনিনের মৃত্যু সংবাদ ‘স্টেটস্‌ম্যান’ পত্রিকায় শুধু এইটুকু প্রকাশিত হইয়াছিল : ‘The notorious Bolshevik leader Lenin has died.’ (‘কুখ্যাত বলশেভিক নেতা লেনিনের মৃত্যু হইয়াছে।’) অমৃতবাজার পত্রিকায় পুরানো ফাইল প্রায় ঘণ্টাচারেক তন্ন তন্ন করিয়া খোঁজার পর, হঠাৎ মাঝের পাতায় একটি কোণে চোখে পড়িয়াছিল অস্বাভাবিক ছোট হরফে ছাপা একটি সংবাদ : ‘London, January 21, Lenin is dead – Reuter.’ অমৃতবাজার পত্রিকায় এ সংখ্যাটিতে প্রথম পাতা জুড়িয়া ছিল দুইটি সংবাদ : জেলে গান্ধিজীর পেটে অস্ত্রোপচার এবং ব্রিটেনে র‍্যামজে ম্যাকডনাল্ড কর্তৃক প্রথম লেবার পার্টির গভর্নমেন্ট গঠন। পূর্বেই বলিয়াছি, ঐ কাগজে লেনিনের মৃত্যু সংবাদটি খুঁজিয়া বাহির করিতে আমার পুরা চারটি ঘণ্টা লাগিয়াছিল।

এই যখন অবস্থা, তখন লেনিনের মৃত্যু সংবাদ পড়িয়া বাংলাদেশের সুদূর মফঃস্বলের জমিদারী স্টেটের একজন নায়েবের বিচলিত হওয়াটা অদ্ভুত, অস্বাভাবিক, এমনকি অবিশ্বাস্যও মনে হয়। কিন্তু ঘটনাটি সত্য। তিনি এতই বিচলিত হইয়া পড়িয়াছিলেন যে, রাত্রি জাগিয়া লেনিনের মৃত্যু সম্পর্কে তিনি এক সুদীর্ঘ কবিতা রচনা করিলেন। কবিতা রচনা শেষ হইলে তাহার মনের ভার কিছুটা লাঘব হইল, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে এক দৃঢ় সংকল্প তাহার মনে দানা বাঁধিয়া উঠিল। এই কবিতা ছাপিতে হইবে এবং যতক্ষণ পর্যন্ত না এই কবিতা ছাপা হইতেছে, ততক্ষণ তাহার মনে স্বস্তি নাই।

‘লেনিন’ কবিতাটি অবশ্য তাহার প্রথম কবিতা নহে। ইতিপূর্বেই কলিকাতার প্রথমশ্রেণীর কয়েকখানি মাসিক পত্রিকায় তাহার কবিতা ছাপা হওয়ার ফলে যতীন্দ্রপ্রসাদ কবিখ্যাতি লাভ করিয়াছিলেন। কিন্তু যতীন্দ্রপ্রসাদ চিন্তিত হইলেন এই ভাবিয়া যে, লব্ধপ্রতিষ্ঠ কাগজগুলি তাহার এই কবিতাটি নিশ্চয়ই ছাপিতে রাজী হইবে না। এমন সময় এক অভাবনীয় সুযোগ উপস্থিত হইল। স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের ছেলেরা তখন ‘বঙ্গবাণী’ নামে নূতন মাসিক পত্রিকা বাহির করিয়াছেন। তরুণ কবি হিসাবে যতীন্দ্রপ্রসাদের নিকট রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের অনুরোধ পত্র আসিল, কবিতা পাঠাইবার। একে নূতন কাগজ, তাতে উগ্র স্বদেশিয়ানার ঝাঁঝালো গন্ধ [স্মরণ থাকিতে পারে, এই পত্রিকাতেই শরৎচন্দ্রের ‘পথের দাবী’ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হইয়াছিল]। যতীন্দ্রপ্রসাদ কালবিলম্ব না করিয়ে তাহার ‘লেনিন’ কবিতাটি ‘বঙ্গবাণী’তে পাঠাইয়া দিলেন এবং ‘বঙ্গবাণী’র পরবর্তী সংখ্যাতেই ঐ কবিতা প্রকাশিত হইল।

কবির মনস্কামনা পূর্ণ হইল বটে, কিন্তু তখনও তিনি বুঝিতে পারেন নাই অজ্ঞাতসারে কী কাণ্ড তিনি করিয়া বসিয়াছেন। বুঝিলেন কয়েকদিন পরে, যখন গৌরীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত অফিসার পূর্ণচন্দ্র ঘোষাল আসিয়া তাহাকে মৈমনসিং-এর ইংরাজ জিলা ম্যাজিস্ট্রেটের হুকুমনামা দেখাইলেন, সঙ্গে এক কপি ‘বঙ্গবাণী’ এবং ‘লেনিন’ কবিতাটির একটি অংশের পাশে ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবের স্বিহস্তের লাল পেন্সিলের দাগ। ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব হুকুম দিয়াছেন, কে এই লেখক এবং কেন তিনি লেনিন সম্পর্কে এই কবিতা লিখিয়াছেন তদন্ত করো এবং যদি বিন্দুমাত্র সন্দেহের কারণ থাকে, তাহা হইলে সঙ্গে সঙ্গে কবিকে গ্রেপ্তার করিয়া মৈমনসিং-এর জেল হাজতে পাঠাও।

হুকুম দেখিয়া কবির চক্ষুস্থির। তিনি তখনও বুঝিতে পারেন নাই, লেনিন গান্ধী বা কামাল পাশা নহেন, লেনিনের নামে ইংরাজ আতঙ্কে উন্মাদ হইয়া উঠে। গৌরীপুর স্টেটের সদর নায়েব তখনও বুঝিতে পারেন নাই, কাব্য-সরস্বতীর ঠেলায় পড়িয়া তিনি এমন এক কার্য করিয়া বসিয়াছেন, যাহার ফলে তাহার জীবন ও জীবীকা দুই বিপণ্ণ হইতে পারে। থানা অফিসার ঘোষাল মশাই ছিলেন যতীন্দ্রপ্রসাদের খুবই পরিচিত। প্রায় বন্ধুস্থানীয়। কারণ, গৌরীপুর স্টেটের সদর কাছারীর এলাকার মধ্যেই ছিল থানা অবস্থিত এবং জমিদারের সদর নায়েব হিসাবে যতীনবাবুর ওপর জমিদার ব্রজেন্দ্রকিশোর আচার্য চৌধুরীর নির্দেশ ছিল থানা অফিসারের সহিত হৃদ্যতা রক্ষা করিয়া চলা। এই সুবাদেই পূর্ণবাবুর সহিত যতীনবাবুর অর্থাৎ দারোগার সহিত নায়েব মশাইয়ের ঘনিষ্ঠতা হইয়াছিল।

দারোগা পূর্ণবাবু বলিলেন, ‘এ কী কাণ্ড করেছেন মশাই! কাব্যচর্চা করেন ভালো কথা, কিন্তু এ সব কি লিখেছেন! এখন দেখুন দেখি আপনিও বিপদে পড়েছেন, আমিও ফ্যাসাদে পড়েছি!’ তারপর অনেকক্ষণ ধরিয়া দারোগা-নায়েব কথাবার্তা হইল। দারোগা জানাইলো যে, তিনি বন্ধুত্বের অমর্যাদা করিবেন না। এবং ম্যাজিস্ট্রেটকে বুঝাইবার চেষ্টা করিবেন যে, তরুণ কবি ভাবাবেগের ঠেলায় হঠাৎ এই কাজ করিয়া ফেলিয়াছেন : তিনি নিজেই ইহার গুরুত্ব সম্পর্কে অবহিত নন এবং ভবিষ্যতে আর এই কাজ করিবেন না, তাহা ছাড়া কবির চৌদ্দ পুরুষে কেহ কখনও পলিটিক্স করেন নাই।

দারোগা বিদায় লইলেন, কিন্তু ফলাফল সম্পর্কে আশ্বাস দিয়া যাইতে পারিলেন না। কবির পরিবারে ভয় ও বিষাদের ছায়া নামিয়া আসিল। কবির বিধবা জননী আকুল হইয়া কাঁদিতে লাগিলেন, কবির স্ত্রীও মুষড়াইয়া পড়িলেন। কবি তাহাদের আস্বাস ও সাহস দিতে লাগিলেন বটে, কিন্তু ভয়ে ও উদ্বেগে রাত্রে তাহারও ঘুম হইল না। ইতিমধ্যে সারা গৌরীপুর শহরে খবর রটিয়া গিয়াছিল, রাজরোষে পড়িয়াছেন বলিয়া আত্মীয় বন্ধুবান্ধব অনেকেই কবিকে এড়াইয়া চলিতে লাগিলেন। জমিদার ব্রজেন্দ্রকিশোর কবির শুধু মনিবই ছিলেন না, সম্পর্কে কাকাও হইতেন। তিনি তাহাকে ডাকিয়া তীব্র তিরস্কার করিলেন; বলিলেন, একে স্বদেশী-জমিদার বলিয়া ইংরাজের দরবারে তাহার বদনাম রহিয়াছে, তাহার উপর সদর নায়েবের যদি এই কীর্তি হয়, তবে জমিদারী রক্ষা করাই তাহার পক্ষে কঠিন হইয়া দাঁড়াইবে।

দিন কয়েক পরে পূর্ণ দারোগা আসিয়া সুসংবাদ দিলেন। অতি কষ্টে বুঝাইয়া শুঝাইয়া তিনি হাকিমকে শান্ত করিয়াছেন। তবে ভাবাবেগে লিখিয়া ফেলিয়াছেন, এই যুক্তি সাহেব ম্যাজিস্ট্রেট এখনও পুরোপুরি গ্রহণ করিতে পারিয়াছেন বলিয়া মনে হয় না। কারণ, হাকিম বারবার তদন্তকারী অফিসারকে জিজ্ঞাসা করিয়াছেন, ‘সবই বুঝিলাম, কিন্তু সে এই লাইনগুলি লিখল কেন?’ নিজের হাত লাল পেন্সিলে দাগ দেওয়া লাইনগুলির দিকে দারোগার দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়াছেন ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব।

?oh=cb08230fb44ef019a28d181866760987&oe=563E2125″ width=”500″ />

কলিকাতার বাসভবনে বসিয়া আমাকে এই বিচিত্র কাহিনী শুনাইয়া, সত্তর বৎসরের বৃদ্ধ কবি যতীন্দ্রপ্রসাদ ভট্টাচার্য বলিলেন, ‘দারোগা পূর্ণচন্দ্র ঘোষালের নামটা একটু লিখবেন। তিনি আমায় সেদিন সত্যিই বাঁচিয়েছিলেন। তাছাড়া সাহেবম্যাজিস্ট্রেটের মন থেকে সন্দেহ একেবারে দূর করার জন্য তিনি আমাকে এক পরামর্শ দিয়েছিলেন। সেই পরামর্শ মতোই আমি ‘ব্রিটন বীর্য’ কবিতা লিখি। প্রাণের আবেগে লিখেছিলাম ‘লেনিন’ কবিতা, আর আত্মরক্ষার জন্য লিখতে হল ‘ব্রিটন বীর্য’ কবিতা, নিছক প্রাণের দায়ে তোষামোদ ছাড়া আর কিছুই নয়।’

বৃদ্ধ কবি আমাকে ‘রামধনু’ কাব্যগ্রন্থখানি উপহার দিয়াছিলেন। ইহাতে ‘লেনিন’ ও ‘ব্রিটন বীর্য’ দুইটি কবিতা পাশাপাশি ছাপা হইয়াছিল। কবিতার নিচে লেখা রচনা তারিখ অনুসারে ‘ব্রিটন বীর্য’ আগে লেখা; এই দিকে কবির দৃষ্টি আকর্ষণ করিলে তিনি হাসিয়া জানান যে, ম্যাজিস্ট্রেটকে ধাপ্পা দিবার জন্য পূর্ণবাবুর পরামর্শেই ‘ব্রিটন বীর্য’ কবিতার তারিখ পাল্টাইয়া দিতে হইয়াছিল।

‘স্বাধীনতা’র পাঠকদের কৌতূহল চরিতার্থ করার জন্য আমরা ‘লেনিন’ কবিতাটি তুলিয়া দিলাম। পাঠক লক্ষ্য করিবেন, কবিতাটি নিছক উচ্ছ্বাসের কবিতা নহে এবং সাহেব ম্যাজিস্ট্রেটের সন্দেহ অমূলক ছিল না; ইহাতে লীনিনের জীবন ও নীতি সম্পর্কে এমন সব পঙ্‌ক্তি ও কথা রহিয়াছে, যাহা তখনকার দিনে বাংলাদেশের সুদূর মফঃস্বলবাসী কবির পক্ষে জানা প্রায় অসম্ভব। বৃদ্ধ কবিকে জিজ্ঞাসা করিলাম, তখন তিনি এত কথা জানিলেন কি করিয়া। কবি জানাইলেন, বরিশাল নিবাসী অনুশীলন দলের রমণীমোহন দাস তখন গুপ্ত বিপ্লবী কাজকর্মে লিপ্ত ছিলেন এবং তিনি কবিকে অত্যন্ত স্নেহ করিতেন। কবি তাহার নিকট হইতেই রুশ বিপ্লব ও লেনিনের কাহিনী শোনেন।

লেনিন সম্পর্কে প্রথম বাংলা কবিতা হিসাবে যতীন্দ্রপ্রসাদের এই কবিতাটির একটি ঐতিহাসিক মূল্য রহিয়াছে, সন্দেহ নাই। তাহা ছাড়া কালের দূরত্ব বিবেচনায় কবিতাটির বক্তব্যের মধ্যেও কিছু অভিনবত্ব রহিয়াছে, যাহা সেদিন ইংরাজ শাসকদের বিচলিত করিয়াছিল। কিন্তু মজার কথা হইতেছে এই যে, বাংলা ভাষায় সর্বপ্রথম লেনিনের ওপর কবিতা লিখিলেন একজন জমিদারী স্টেটের নায়েব এবং রাজরোষের হাত হইতে তাহাকে রক্ষা করিলেন একজন দারোগা। সত্যিই Life is stranger than fiction.

?oh=626606dfd5291872c921e2fc104f8c37&oe=563AD015&__gda__=1447596339_5fe19b1de7dbcb7c174f46e398e6ec1b” width=”350″ />

এই প্রসঙ্গে একটি কথা আবার মনে হইতেছে। ১৯২৬ সালে প্রকাশিত কবির ‘রামধনু’ কাব্যগ্রন্থের ভূমিকাটি পড়িয়া মনে হয় যতীন্দ্রপ্রসাদের ‘লেনিন’ কবিতাটি নিছক ভাবাবেগের কবিতা নয় এবং আকষ্মিক ও স্বতস্ফূর্তও নয়। তাহার কবিতা কে পড়িবে, এই প্রশ্নের জবাবে কবি লিখিতেছেন : ‘পড়বে, ওই যারা মোটামুটি পড়েই পেটের দায়ে অফিসে অফিসে সকাল সন্ধ্যা খেটে মরছেন; মোটরগাড়ী চালাচ্ছেন; ঝড়-বাদলে রোদ্দুরে ক্ষেতে হালের মুঠা কষে ধরছেন; শহরগুলির বুকের ওপর বাড়ী বাড়ী ঘুরে বারোমাস ছাত্র পড়াচ্ছেন…; ওই সব তরুণ-তরুণী, কিশোর-কিশোরী, যুবক-যুবতী, যারা স্কুল-কলেজে ক্রমশ ফুটে উঠছেন… রেল-ষ্টীমারের স্টেশনগুলিতে, একঘেয়ে খাটনিতে যারা ভগ্নস্বাস্থ্য হয়ে পড়েছেন; ওই সব পথভ্রষ্টা পতিতারা, যারা অনুশোচনায় দগ্ধ হচ্ছেন; ভবঘুরে গুন্ডা পাজীরা, যারা পান্থশালায় শব সৎকারে, দরিদ্র্য নারায়ণের সেবায় আত্মসমর্পণ করছেন- তারাই কবিতা পড়বেন।’ সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের প্রভাব এখানে অত্যন্ত সুস্পষ্ট। ‘বন্ধুবর সত্যেন্দ্রনাথে’র নাম কবি ভূমিকায় বারম্বার উল্লেখ করিয়াছেন এবং ব্যক্তিগত হৃদ্যতার কথাও বলিয়াছেন।

১৯২৬ সালে মাত্র ৪০ বৎসর বয়সে সত্যেন্দ্রনাথের মৃত্যু হয়। সকলেই জানেন, সমসাময়িক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ঘটনাবলীতে সত্যেন্দ্রনাথের মন ও মস্তিস্ক কি তীব্র অনুভূতিপ্রবণ ছিল। সত্যেন্দ্রনাথই মনে হয়, বাংলায় সর্বপ্রথম ধর্মঘট ও ধর্মঘটীদের লইয়া কবিতা লেখেন এবং মানুষের সর্বপ্রকার বৈষয়িক ও আত্মিক সম্পদের মহিমাময় স্রষ্টারূপে শ্রমিকশ্রেণীর বন্দনায় কবিতা লেখান (রাজা-কারিগর)। অথচ, সত্যেন্দ্রনাথের কাব্যে কোথাও লেনিন, রুশবিপ্লবের উল্লেখ পাওয়া যায় না। ইহার কারণ কি?

কারণ মনে হয় এই যে, তখনকার দিনে রুশবিপ্লব ও লেনিনের নামে কবিতা রচনায় যে গুরুতর ব্যক্তিগত বিপদের সম্ভাবনা ছিল, শহরের কবি সত্যেন্দ্রনাথ তাহা ভালোভাবেই জানিতেন, যাহা সুদূর পল্লীগ্রামে বসিয়া যতীন্দ্রপ্রসাদ বুঝিতে পারেন নাই। কবি ও সাহিত্যিকের বৈপ্লবিক রাজনৈতিক অভিব্যক্তি বন্ধ করিবার জন্য তৎকালীন পুলিশি-সন্ত্রাসের পটভূমিকাটি স্মরণে রাখিলে অনেক জিনিস আমাদের কাছে সহজ হইয়া যাইতে পারে বলে আমার বিশ্বাস। ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য বঙ্কিমচন্দ্রকে আনন্দমঠের প্রথম সংস্করণের ব্রিটিশবিদ্বেষী সুর দ্বিতীয় সংস্করণে ব্রিটিশ প্রশস্তিতে পরিণত করিতে হইয়াছিল এবং ‘ঝাঁসির রাণী’কে লইয়া উপন্যাস লেখার পরিকল্পনা পইত্যাগ করিতে হইয়াছিল; পঞ্চম জর্জের ভারত আগমন উপলক্ষ্যে তীব্র জাতীয়তাবোধের কবি ও নাট্যকার দ্বিজেন্দ্রলাললে সম্রাট প্রশস্তিতে সঙ্গীত রচনা করিতে হইয়াছিল; বালক রবীন্দ্রনাথের তীব্র ব্রিটিশবিরোধী কবিতাকে মোগলবিরোধী রূপ দিয়া ছাপিতে হইয়াছিল, এই ঘটনাগুলি যেন আমরা বিস্মৃত না হই।

?oh=dad14b0ed0c64561a35a4fdf5984d3a4&oe=564A0AE4&__gda__=1447605301_995d714e54eb943d134c640031a2bb99″ width=”400″ />

লেনিন
যতীন্দ্রপ্রসাদ ভট্টাচার্য

বারংবার মৃত্যুবার্ত্তা রটায়েছে ‘বিশ্বদূত’,
হয়নি সে কাল-অঙ্কে লীন;
এইবার মরেছে লেনিন!
রুশের গগনসূর্য্য অস্তমিত আজ!
জনগণ-মনঃ-অধিরাজ!
পৃথিবীর প্রান্তে প্রান্তে বিচ্ছুরিয়া রশ্মি অ’র,
নাশি’ অন্ধকার,
জাগ্রৎ করেছে কোটি উপেক্ষিত নরনারী,
অন্ন দিয়া মুছাইয়া নয়নের বারি!
শ্রমিক-কৃষকসঙ্ঘ গড়িয়া তুলেছে বিশ্বে;
ধনী নিঃস্বে,
ঘুচাইয়া মিলনের সর্ব্ববিধ বাধা ব্যবধান
বাড়ায়েছে আত্মার সম্মান;
সঙ্গে সঙ্গে করিয়াছে জগতের অপূর্ব্ব কল্যাণ!
হয়ে ক্ষোভে একান্ত অধীর,
বিচূর্ণিত করিয়াছে আভিজাত্য-গর্ব্বোন্নত শির!
শেষে পুনরায়,
বুভুক্ষিত বিদলিত বিশ্বমানবের,
দুর্ব্বল দেহের
সঞ্চারিয়া দেহে সর্ব্ব শিরায় শিরায়,
তাজা উষ্ণ অতি তীব্র ফুটন্ত রুধির!
নিপীড়িত যে ছিল যেথায়,
সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে আজ দাবি করে সমতা ধারায়।
চির-আচরিত যত রাজ্য ও সমাজনীতি,
যার ভারে ভারাক্রান্ত রহিত এ-ক্ষিতি,
শৃঙ্খলে আবদ্ধ রহি’ মানবাত্মা করিত ক্রন্দন,
সকাতরে স্বাধীনতা-তবে;
দিবানিশি দিশি-দিশি ধ্বনিত বন্দন,
বাহিরে ভিতরে;-
ফুৎকারে উড়ায়ে দেছে, অকষ্মাৎ পোড়ায়েছে সবি;
বিশ্বব্যাপী বিপ্লবের লোলবহ্নি-মুখে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৫ thoughts on “একটি স্মরণীয় বাংলা কবিতা | সরোজ দত্ত

  1. গল্পটা দেশব্রতীর পুরনো একটি
    গল্পটা দেশব্রতীর পুরনো একটি সংখ্যায় পড়েছিলাম। ইতিহাসভিত্তিক এক দুর্দান্ত গল্প। ধন্যবাদ গল্পটি সবার সামনে টেনে আনার জন্য। জানার আছে অনেক কিছু। এই মিডিয়া কি খবর দেবে, তা তো তাদের আঁতুড়ঘরের এই চেহারাই প্রকাশ করে দিচ্ছে।

  2. আনিস ভাই@ অনেক অনেক ধন্যবাদ
    আনিস ভাই@ অনেক অনেক ধন্যবাদ আপনাকে এমন অজানা তথ্য শেয়ার করার জন্য। :তালিয়া: :থাম্বসআপ: বার কয়েক পড়িলাম আগে জানতামনা এই ইতিহাসটা।
    বারংবার মৃত্যুবার্ত্তা রটায়েছে ‘বিশ্বদূত’,
    হয়নি সে কাল-অঙ্কে লীন; :থাম্বসআপ:

    1. এই লাইনগুলো মারাত্মক
      এই লাইনগুলো মারাত্মক অ্যাটাকিং

      চির-আচরিত যত রাজ্য ও সমাজনীতি,
      যার ভারে ভারাক্রান্ত রহিত এ-ক্ষিতি,
      শৃঙ্খলে আবদ্ধ রহি’ মানবাত্মা করিত ক্রন্দন,
      সকাতরে স্বাধীনতা-তবে;
      দিবানিশি দিশি-দিশি ধ্বনিত বন্দন,
      বাহিরে ভিতরে;-
      ফুৎকারে উড়ায়ে দেছে, অকষ্মাৎ পোড়ায়েছে সবি;
      বিশ্বব্যাপী বিপ্লবের লোলবহ্নি-মুখে।

  3. এক কথায় তুলনাহীন। এত পুরনো
    এক কথায় তুলনাহীন। এত পুরনো ভাষা, তবু বুঝতে এক সেকেন্ডও বেশি লাগে না। এটাকেই বলে কনটেন্টের জোর। অনেক ধন্যবাদ। এমন একটি লেখা পড়ার সুযোগ করে দেয়ার জন্য।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

89 − 88 =