পরমাণু চুক্তি পরবর্তী ইরান কেমন হবে!


কক্ষ নং ১০৩। প্যালাইস কোবার্গ হোটেল। ভিয়েনা, অস্ট্রিয়া। দীর্ঘ ২০ মাসের আলোচনার ইতি। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি এবং তার প্রতিপক্ষ ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ জাভাদ জারিফের কাজ অবশেষে শেষ হলো। ১৩ জুলাই ২০১৫ মধ্যরাতে সমঝোতার খুঁটিনাটি চূড়ান্ত হলো। ইরানের পরমাণু কর্মসূচী কিভাবে চলবে, তার সমঝোতা করতেই এই চুক্তি।

এক সুদীর্ঘ আলোচনার পথ পাড়ি দিতে হয়েছে এজন্য।জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, রাশিয়া ও চীন ছিল টেবিলের একপ্রান্তে। তাদের সঙ্গে আরো ছিল শক্তিধর দেশ জার্মানির প্রতিনিধিরা। আর এক পাশে বসে আলোচনা চালিয়েছে ইরান। পশ্চিমাদের চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে তারা চুক্তিতে যেত পারব কিনা, এ নিয়ে অনেকেরই সন্দেহ ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ইরান তা পেরেছ। ধর্মীয় কট্টরপন্থা, মার্কিন বিরোধিতা, পশ্চিমা শক্তিবলয়ের বিরোধিতা, সব খোলস ছেড়েই বেরিয়ে আসল ইরান।

এই ঘটনার নানামুখী মূল্যায়ন এ পর্যন্ত হয়েছে। অনেকে ইরানকে এক্ষেত্রে কৃতিত্ব দিয়েছেন। কিন্তু বাস্তবতার দিকে নজর দিলে বোঝা যায়, ইরানই এই চুক্তির জন্য পশ্চিমাদের দ্বারস্থ হয়েছিল। এমনকি নিজেদের উচ্চাভিলাষী পারমাণবিক প্রকল্প বন্ধ করে হলেও তারা এখন ইউরোপ-আমেরিকার নেক নজর চায়। আর এই নেক নজরের অর্থ হচ্ছে অর্থনৈতিক অবরোধ প্রত্যাহার। এটা না হলে যে তারা বিরাট বিপদে পড়তে যাচ্ছে, এটা ইরানী নেতৃত্ব বুঝতে পেরেছিল।

কেন ইরান চুক্তি করল?
ইরানের ইসলামি বিপ্লবের নেতারা কট্টর দমন চালিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সমাজের ভিন্নমত পোষণকারীদের দাবিয়ে রেখেছেন। সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে প্রযুক্তি ও অস্থিতির বিকাশ, তথাকথিত ‘আরব বসন্ত’, এবং যুদ্ধাবস্থা, এগুলোকে আমলে নিয়েছে ইরানী নেতারা। এভাবে চলতে থাকলে যে ক্ষমতার নাটাই ধরে রাখা কঠিন হবে এবং যেকোনো সময় খারাপ কিছু ঘটারও আশঙ্কা আছে। এ থেকে বের হতে দেশের অভ্যন্তরে কাজের ব্যবস্থা করা, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি ও শাসন ব্যবস্থার শক্তিশালীকরণ খুব জরুরী। তাছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের ক্ষমতা অর্জনের বিবেচনাও আছে। সব মিলিয়ে অর্থনৈতিক অবরোধ দূর করতে ইরান মরিয়া ছিল।

তাছাড়া ইরানের শাসকরা ভালোভাবেই জানে যে, তারা কী পরিমাণ শত্রু কর্তৃক পরিবেষ্টিত। চিরশত্রু ইসরাইল তো আছেই, মুসলিম বিশ্বের বড় দেশগুলোও তার শত্রু। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পশ্চিমা প্রজেক্ট ‘আইএস’। ইরানের অভ্যন্তরে বড় হয়ে উঠছে ইসলামি বিপ্লবের বিরোধীরা। প্রবাসী, দেশত্যাগী ইরানিদের বড় অংশ, যারা অধিকাংশই বামপন্থি, কমিউনিস্ট বা উদারতাবাদি তাদের চাপও বাড়ছে ইরানের কথিত মোল্লা সরকারের ওপর। এর বাইরে বিশ্ব পরাশক্তিগুলো তো রয়েছেই।

একসঙ্গে সব চাপ মোকাবিলার চাইতে কিছুটা কৌশলের আশ্রয় নিল ইরানের বর্তমান শাসকশ্রেণী। জনগণের অর্থনৈতিক দুরবস্থা লাঘব করে বৈষয়িক উন্নতির পথ সহজ করতে পারলে এসব চাপ মোকাবিলা সহজ হবে ভেবেছে তারা। এই বিবেচনাও কাজ করেছে পশ্চিমাদের সঙ্গে পারমাণবিক সমঝোতার পেছনে।

১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমমূল্যের ইরানি সম্পদ জব্দ আছে পশ্চিমা অবরোধে। অবরোধ উঠলে প্রতি বছর ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমমূল্যের আয় আসবে তেল রপ্তানি থেকে। লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহী, সিরিয়ায় আসাদ বাহিনী- এসব গ্রুপকে টিকিয়ে রেখে এ অঞ্চলের কর্তৃত্বের সাম্রাজ্যবাদী আকাঙ্ক্ষার খরচ মেটাতেও ইরানের দরকার প্রচুর অর্থ। সেই বিবেচনাও কাজ করেছে পারমাণবিক সমঝোতার পথে।

কেন পশ্চিমারা চুক্তিতে গেল?
অন্যদিকে প্রশ্ন উঠবে, পশ্চিমারা তাহলে এগিয়ে আসছে কেন? কারণটা হচ্ছে, জার্মানি, রাশিয়া ও চীন। নতুন করে শক্তি অর্জন করা এই পরাশক্তিগুলো মধ্যপ্রাচ্যের বিপুল সম্পদরাশির ওপর মার্কিনের একচেটিয়া দখলদারিত্বের অবসান এবং এর পুনর্বিন্যাস চাইছে। সিরিয়ায় তারা মার্কনকে যুদ্ধ করতে দেয়নি। তেমনি আইএসের জন্মদাতা হিসেবে তারা মার্কিন অক্ষকে চাপে রেখেছে। পাশাপাশি মার্কিন এই চাপেও আছে যে, বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে না পেরে ইরান যদি তড়িঘড়ি করে পারমাণবিক বোমা বানিয়ে ফেলে, তাহলে আর মধ্যপ্রাচ্য এভাবে দখলে রাখা যাবে না। তাদের জন্য দরকার ছিল, পশ্চিমা বন্ধুদের এটা আশ্বস্ত করা যে, মধ্যপ্রাচ্যের পুনর্গঠন করে তাদের পাওনা হিস্যা বুঝিয়ে দেয়া এবং ইরানের পারমাণবিক অভিলাষ বন্ধ করতে তারা সমর্থ। সে হিসেবে আলোচনার টেবিলটা মার্কিনিদের আগ্রহেই তৈরী হয়েছে।

তাছাড়া ইরান ওই অঞ্চলের শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর একটি। দীর্ঘদিন তাদের তেমন কোনো শক্তিক্ষয় হয়নি। বাদবাকি বড় শক্তিগুলোর মধ্যে ইরাক, সিরিয়া ও মিশর এখন নিজের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব নিয়েই ব্যতিব্যস্ত। সুতরাং মার্কিনের জন্য ইরানকে যুদ্ধে নামানো খুবই দরকারি। কিন্তু ইরান যদি নিজের ইচ্ছায় যুদ্ধ করে তা মার্কিনের কাজে লাগবে না। তাই ইরানকে খেলাতে হবে পরিকল্পনামাফিক। ইসরাইলের অস্তিত্ব নিরাপদ রাখার বড় কৌশল হিসেবে প্রতিপক্ষ মুসলমান দেশগুলোর মধ্যে বিভাজন ও দ্বন্দ্ব তৈরি করা। মুসলমানদের মধ্যে শিয়া ও সুন্নির দ্বন্দ্ব বাড়িয়ে তোলা সেই প্রক্রিয়াকে সহজ করে আসছে। আইএসের মুখোমুখি ইরানকে দাঁড় করিয়ে দিলে সেটা তাদের জন্য খুবই ফলদায়ক হবে। সুতরাং ইরানকে মিত্রতার জালে বেঁধে নিজেদের পরিকল্পনা অনুযায়ী খেলানোটাই মার্কিনের কৌশল। ‘শত্রুকে কাছে রাখা, চোখে চোখে রাখা ও সুযোগ বুঝে ধ্বংস করা’র বহুল প্রমাণীত ও কার্যকর সামরিক নীতির ওপর ভিত্তি করেই মার্কিন এগুচ্ছে।

বর্তমান ইরান কি পশ্চিমাপন্থী?
ইরাক যুদ্ধের সময় এ অভিযোগ উঠেছিল যে, ইরানের সঙ্গে মার্কিনের গোপন আঁতাত হয়েছে। নইলে মার্কিনের পক্ষে এভাবে ইরাক দখল করা সম্ভব হতো না। ইরান ভূমিকা রাখলে এই যুদ্ধে জয় পেতে মার্কিনের দীর্ঘ সময় লেগে যেত। ইরাকিদের পরাজয় ঘটাতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হতো। সেই থেকে ইরানের বিরুদ্ধে অভিযোগ যে, তারা গোপনে মার্কিনের সঙ্গে আঁতাত করে আসছে। এ অভিযোগ যে ভিত্তিহীন নয়, তা ইরান সরকারে দিকে তাকালেই বোঝা যায়।

কট্টরপন্থি প্রেসিডেন্ট আহমাদিনেজাদের পর ইরানের ক্ষ্মতায় আসে পশ্চিমা শিক্ষিতরা। উদারপন্থি প্রেসিডেন্ট রুহানি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী জারিফ উভয়েই তাই। ধর্মীয় শাস্ত্রবিদ হাসান রুহানি তেহরান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জুডিশিয়াল ল’তে বিএ ডিগ্রি নেন। পরবর্তীতে স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো ক্যালেডিয়ান ইউনিভার্সিটি থেকে কনস্টিটিউশনাল ল’তে এম.ফিল ও পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। ১৬ বছর ধরে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এই রাজনীতিবিদ। পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার জন্য তাকে স্থানীয়ভাবে ‘ডিপ্লোম্যাটিক শেখ’ নামে অভিহিত করা হয়।

৮ জানুয়ারি ১৯৪০ সালে ইরানে জন্ম নেয়া পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত সিনিয়র অ্যাডভাইজর টু মিনিস্টার অব ফরেন অ্যাফেয়ার্স মোহাম্মদ জাভাদ জারিফ খুব ভালো ইংরেজি বলতে পারেন। ক্যারিয়ার ডিপ্লোম্যাট জারিফ ১৯৮১ সালে ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনসে বিএ এবং ১৯৮২ সালে একই বিষয়ে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন যুক্তরাষ্ট্রের সানফ্রানসিসকো ইউনিভার্সিটি থেকে। পরবর্তীতে ১৯৮০ সালে ইউনিভার্সিটি অফ ডেনভারের গ্র্যাজুয়েট স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ থেকে ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনসে আবারও এমএ ডিগ্রি নেন। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দুটি মাস্টার্স ডিগ্রি নেয়ার পর ডেনভার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইন্টারন্যাশনাল ল অ্যান্ড পলিটিক্স বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। প্রায় অর্ধদশক ধরে জাতিসংঘে ইরানের দূত ও স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালনসহ দেশের পক্ষে অনেক গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক দায়িত্ব পালনকারী জাভাদ জারিফ তার ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা, ডিপ্লোমেটিক যোগ্যতার কারণে আন্তর্জাতিক মহলে অত্যন্ত সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানের সঙ্গে এই চুক্তির মাধ্যমে মার্কিন দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য অর্জন করতে চায়। ইরানের শাসকদের পশ্চিমা বলয়ে টানা ও আঞ্চলিক পর্যায়ে ইরানের শক্তি হ্রাস করাটা তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য। রুহানি ও জারিফ সেই চালেরই ঘুটি। এই অক্ষ কার্যকর থাকলে ও এগুলে ইরানের রূপান্তর ঘটতে খুব বেশি সময় লাগবে না।

চুক্তির ফল কী
দুই পক্ষের মধ্যে সাক্ষর হওয়া পরমাণু চুক্তির মূল দলিল ১০০ পৃষ্ঠার। সঙ্গে পাঁচ পাতার সংযুক্তি আছে। এতে বলা আছে, জাতিসংঘের পর্যবেক্ষক দলকে ইরানের সামরিক ক্ষেত্রগুলো পরিদর্শনের সুযোগ দেয়া হবে। তবে জাতিসংঘের পর্যবেক্ষণের অনুরোধ চ্যালেঞ্জ করতে পারবে ইরান। শর্ত অমান্য করলে ৬৫ দিনের মধ্যে তাদের ওপর আবার অবরোধ আরোপ হবে। অস্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যাপারে জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞাগুলো যথাক্রমে আরও ৫ ও ৮ বছর বহাল থাকবে। ইরানের শত শত কোটি ডলার মূল্যের জব্দ সম্পদ মুক্ত করা হবে। চুক্তির প্রথম ১০ বছরে ইরান উন্নত সেন্ট্রিফিউজের জন্য গবেষণা করতে পারবে।

চুক্তির আলোকে শিগগিরই মার্কিন, ইইউ ও ইরানের সংসদে প্রস্তাব পাশ হবে। জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক আণবিক সংস্থা এর অনুমোদন দিবে। তার পরই ইরানের ওপর থাকা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হবে। এরপর প্রত্যাহার হবে জাতিসংঘের অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা। চুক্তি অনুসারে ১০ বছর পর পরমাণু কর্মকাণ্ড সীমিতকরণের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে ইরান অত্যাধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে পরমাণু কর্মকাণ্ড চালাতে পারবে।

ঘটনাপঞ্জি
১৯৭৯ সালে ইরানের শাসনক্ষমতায় ছিলেন মার্কিনপন্থি রেজা শাহ পাহলভী। ১৯৭৯ সালে আয়াতুল্লাহ খোমেনীর নেতৃত্বে ইরানে যে ইসলামি বিপ্লব ঘটে, তাতে ক্ষমতাচ্যুত হয় মার্কিন সমর্থনপুষ্ট শাহ সরকার। ১৯৭৯ সালের জানুয়ারিতে রেজা শাহ সপরিবারে ইরান থেকে পালিয়ে যান। এর দুই সপ্তাহ পরে ১৪ বছরের নির্বাসিত জীবন ছেড়ে বিপ্লবের নেতা হিসেবে আয়াতুল্লাহ খোমেনী ফ্রান্স থেকে দেশে ফেরেন। অক্টোবর, ১৯৭৯তে পলাতক, দেশছাড়া শাহকে ক্যানসারের চিকিৎসার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকতে দেয়া হয়। এর দুই সপ্তাহ পরে তেহরানের মার্কিন দূতাবাসে বিক্ষুব্ধ ছাত্ররা ঢুকে পড়ে ৫০ জন মার্কিনিকে জিম্মি করে। প্রতিবাদে যুক্তরাষ্ট্রে থাকা সকল ইরানি সম্পদ জব্দ করে যুক্তরাষ্ট্র।
১৯৮০ সালে শুরু হয় ইরাক-ইরান যুদ্ধ। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ইরাকের স্বৈরশাসক সাদ্দাম হোসেনের পক্ষাবলম্বন করে।
১৯৮১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে রোনাল্ড রিগ্যান প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই মার্কিন জিম্মিদের ছেড়ে দেয় ইরান।
১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ খোমেনীর মৃত্যু হলে, আয়াতুল্লাহ আলী খামেনী নতুন সুপ্রিম লিডারের দায়িত্ব নেন।
২০০২ সালে জর্জ ডব্লিউ বুশ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্টেট ইউনিয়নের ভাষণে ইরাক, ইরান এবং উত্তর কোরিয়াকে ‘শয়তানের দোসর’ হিসেবে অভিহিত করেন। একই বছরের আগস্ট মাসে নির্বাসিত ইরানি একটি গোষ্ঠী দেশটির গোপন রাখা পরমাণু স্থাপনার তথ্য প্রকাশ করে। সপক্ষত্যাগী ইরানি ওই গোষ্ঠীর দাবি পশ্চিমা বিশ্বকে সুযোগ এনে দেয়। যুক্তরাষ্ট্র চড়াও হতে শুরু করে ইরানের ওপর।
২০০৩ সালে সন্দেহভাজন কর্মসূচি স্থগিত করতে সম্মত হয় ইরান। তবে পরের বছর প্রতিশ্রুতি থেকে সরে যায়।
২০০৪ সালে আন্তর্জাতিক আণবিক সংস্থা ইরানের গোপন পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির প্রমাণ পায়নি। প্যারিসে আলোচনা হয়। ইরান কিছু কর্মসূচি স্থগিত করে।
২০০৫ সালে ইরানেও ক্ষমতার পালাবদল ঘটে। কট্টরপন্থি মাহমুদ আহমাদিনেজাদ ইরানের প্রেসিডেন্ট হলে ইরান ও পশ্চিমা বিশ্বের বিরোধ তুঙ্গে ওঠে। ইরান ইউরোনিয়াম গ্যাস উৎপাদনের দাবি করে। আলোচনা থেকে বেরিয়ে যায় ইউরোপীয় দেশগুলো।
২০০৬ সালের ডিসেম্বরে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ইরানের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা পাস করে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নও একই ধরনের ব্যবস্থা নেয়।
২০০৭ সালের এপ্রিল মাসে ইরানের কট্টরপন্থি প্রেসিডেন্ট আহমাদিনেজাদ ঘোষণা করেন, ইরান শিল্প পর্যায়ে পারমাণবিক জ্বালানি তৈরি করছে। ইরান ইউরোনিয়াম গ্যাস উৎপাদন করছে, ইরানি প্রেসিডেন্টের এই ঘোষণা যুক্তরাষ্ট্রকে ক্ষিপ্ত করে তোলে। যুক্তরাষ্ট্র এককভাবে ইরানের ওপর অধিকতর কঠিন অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা জারি করে।
২০১১ সালে ইরানের ওপর সর্বাত্মক অবরোধ আরোপ করা হয়। মার্কিন কংগ্রেস ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে লেনদেন করা ঋণদাতাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ওই বছরের জানুয়ারিতে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সব দেশ ইরানের তেল আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে।
২০১২ সালে এসে সর্বাত্মক অবরোধ ইরানের অর্থনীতি ও সমাজকে মারাত্মক আঘাত করে। এক বছরের মধ্যে ইরানের জিডিপি মাথাপিছু প্রায় ৮ শতাংশ কমে যায়। মুদ্রাস্ফীতি বাড়ে প্রায় ১০ শতাংশ। বেকারত্ব ২০ শতাংশ ছুঁয়ে যায়। ইরানের ক্রুড তেল রপ্তানি আয় ৪০ শতাংশ কমে যায়। বাজেট ঘাটতি দাঁড়ায় জিডিপির ৩.৫ শতাংশ। শিল্প খাতে উৎপাদন ৪০ শতাংশ কমে যায়।
২০১৩ সালে ইরানে নবনির্বাচিত মধ্যপন্থি প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি আলোচনার প্রস্তাব দেন। বারাক ওবামার সঙ্গে হাসান রুহানির ফোনালাপ ঘটে। ছোটখাট নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হয়। পরমাণু কর্মসূচি স্থগিত করে ইরান।
২০১৪ সালে জুলাই-নভেম্বর সময়সীমার মধ্যে আলোচনায় সমঝোতা ব্যর্থ হয়।
২০১৫ সালের এপ্রিলে সুইজারল্যান্ডে ইরান ও ছয় বিশ্বশক্তির আলোচনা শুরু হলে সমঝোতার চূড়ান্ত রূপরেখার ব্যাপারে একমত হয় দু’পক্ষ।
জুনে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় আলোচনা ফের শুরু হয়। টানা ২০ মাস ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কূটনীতিকরা হোটেলের বন্ধ কক্ষে আলোচনা করেন।
সর্বশেষ দফা আলোচনার ১৮তম দিনে ১৮ জুলাই ২০১৫ এই ঐতিহাসিক সমঝোতা চুক্তি সম্পন্ন হয়।

নোট : লেখাটি তৈরীতে আন্তর্জালের অনেক লেখাই অনুসরণ করা হয়েছে। এই লেখাটি থেকে অনেকখানি তথ্যসাহায্য নিয়েছি, দৃষ্টিভঙ্গী নয়।

শেয়ার করুনঃ

৩ thoughts on “পরমাণু চুক্তি পরবর্তী ইরান কেমন হবে!

  1. এমন জরুরী লেখা সাধারণত ব্লগে
    এমন জরুরী লেখা সাধারণত ব্লগে আসে না। মানসম্পন্ন রাজনীতি সচেতন এত লেখা আর কোনো ব্লগে দেখিনি। ইস্টিশন এক্ষেত্রে একলাই লড়ে যাচ্ছে। হ্যাটস টু ইউ!

  2. চমৎকার বিশ্লেষন।
    ভাল রাজনৈতিক

    চমৎকার বিশ্লেষন।
    ভাল রাজনৈতিক বিশ্লেষনধর্মী লেখা অর্ন্তজালে ইস্টিশনেই দেখা যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published.