এই মৃত্যু কি বৃথা যাবে?

নিলয় নীল-কে আমি চিনতাম। দেখতে শুনতে শান্ত ও ভদ্র একটা ছেলে। তাকে দেখে কখনো মনে হয় নাই একটা মাছিও তার হাতে খুন হতে পারে। আজকে তাকে ঘরে ঢুকে জবাই করে হত্যা করা হয়েছে। প্রথম তাকে দেখেছিলাম ২০১১ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি। সেদিন আরজ আলী মাতুব্বর পাঠাগার, মুক্তমনাডটকম আর ছাত্র ইউনিয়নের কিছু বন্ধু মিলে আমরা টিএসসিতে ‘ডারউইন দিবস’ উদযাপন করেছিলাম। নিলয় নীল সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। ব্লগার হোরাস সূর্যদেবের একটা লেখা তার অনুপস্থিতিতে নীল পাঠ করেছিল। ঐ অনুষ্ঠানের উদ্যোক্তাদের মধ্যে অভিজিত রায়ও ছিলেন, তবে দেশে ছিলেন না বলে স্বশরীরে উপস্থিত থাকতে পারেন নাই। তিনি এখন আর দেশ অথবা বিদেশ, কোথাও নাই। কারন গত ফেব্রুয়ারিতে দেশে এসে ঐ টিএসসি এলাকাতেই তিনি লাশ হয়ে গেছেন। ঐদিনই জীবনে প্রথম আমি তাকে স্বশরীরে দেখেছিলাম। ঐদিনই শেষ। অনন্ত বিজয় দাসের সাথে কখনো দেখা হয়েছে কি না মনে করতে পারি না, কিন্তু তাকে আমি প্রচন্ড রকম অনুভব করি। সে বয়সে আমার চাইতে সামান্য বড় ছিল। একেবারেই সমাজের মধ্যে থাকা একজন লড়াকু মানুষ ছিলেন। নিজের এলাকাতেই তরুণদের নিয়ে কাজ করতেন, পত্রিকা বের করতেন। তার পত্রিকা আমাদের পাঠাতেন, আমাদের পত্রিকা তাকে পাঠাতাম। ব্যক্তিগত পরিচয় না থাকলেও তাই একটা আত্মিক যোগাযোগ ছিল বলা যায়। তাকে খুন করা হলো অফিসে যাওয়ার পথে। ওয়াশিকুর বাবুকেও আমি চিনতাম। ছবির হাটে দেখেছি বহুবার, বয়সে জুনিয়র ছিল, নিজের বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতো। আমাকে সে খুব একটা পছন্দ করতো না। ধর্ম, নাস্তিকতা ইত্যাদি বিষয়ে আমার অবস্থান তার ভালো লাগতো না। ফেসবুকে কয়েকবার বেশ শক্তভাবেই আমার সমালোচনা করেছে। সামনাসামনি দেখলে খুবি চাপা স্বভাবের মনে হতো। এই ছেলেটিকেও খুন করা হলো অফিসে যাওয়ার পথে। চোখ বন্ধ করলেই ছেলেটার চেহারা দেখতে পারি, খুবি মায়া ভরা এবং নিস্পাপ একটা চেহারা। এই ছেলেটাকে এমনভাবে কোপানো হলো যে তার চেহারা চেনা সম্ভব ছিল না। জনতা তার দুইজন হত্যাকারীদের ধরে পুলিশে দিয়েছিল। কিন্তু পুলিশ আর কাউকে আজ অবধি গ্রেফতার করতে পারলো না। করতে পারলে হয়তো নিলয় নীলকে আজ খুন হতে হতো না। এদের সবাইকে নিয়ে আমার লিখতে ইচ্ছা করে। লেখার চেষ্টাও করেছি। কিন্তু লিখতে পারি না। এক ধরনের অপরাধবোধ কাধে চেপে আছে। লিখে হবেই বা কি? এরা কেউ জীবিত হয়ে যাবে না। তাই স্মৃতিচারণ করে কিছু লিখি না। বিচার চেয়ে লেখি। তাতেও নূন্যতম কোন লাভ হচ্ছে বলে মনে হয় না। সরকার নিত্য নতুন জঙ্গী সংগঠনের গল্প শোনাচ্ছে, দেদারসে জঙ্গী গ্রেফতার করছে। কিন্তু ব্লগার হত্যাকারী একজনও গ্রেফতার হচ্ছে না, বিচার হচ্ছে না, হত্যাকান্ডও তাই বন্ধ হচ্ছে না।

নিলয় নীল একটা সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছিল – ‘বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সংগঠন’। যুক্তিবাদ তথা র‍্যাশনালিজমের প্রতি তার অগাথ আস্থা ছিল। অনন্ত বিজয় দাস ‘যুক্তি’ নামে একটি পত্রিকা বের করতেন। বাংলাদেশের অধিকাংশ নাস্তিকরাই যুক্তিবাদের প্রতি বিশ্বস্ত থাকার চেষ্টা করেন। ইউরোপের সেকুলারিজমের অভিজ্ঞতা থেকে বলা হয়, সমাজের সেকুলারাইজেশনের গোড়ার কথা হলো জনপরিসরে নাগরিকদের মধ্যে র‍্যাশনাল মতবিনিময়ের সুযোগ থাকতে হবে। কারণ বিভিন্ন মতাদর্শ ও ধর্মের মানুষকে যদি একটি সমাজ ও রাষ্ট্রে বসবাস করতে হয়, তাহলে খুনাখুনি নয় বরং যৌক্তিক আলাপচারিতার মধ্য দিয়েই নিজেদের দ্বন্দগুলোর সমাধান করতে হবে। কোন কোন জায়গায় একমত হওয়া যাবে, আর কোন কোন জায়গায় দ্বিমত থাকতে একমত হবে, সেই বোঝাপড়া এই ডিসকাশনের মাধ্যমেই হতে হয়। কিন্তু যুক্তিবাদ তথা র‍্যাশনালিজমের রূপ বড় বিচিত্র। মানুষের শিক্ষা দিক্ষা, সামাজিক অবস্থান, স্বার্থ ইত্যাদি কারণে র‍্যাশনিলজমের রূপ পালটায়, হয়ে পরে ব্যক্তি ও গোষ্ঠির পার্সপেক্টিভ নির্ভর। র‍্যাশনালিজমের উপর তাই আস্থা রাখা গেলেও তার সীমাবদ্ধতা ও বৈচিত্রগুলো সম্বন্ধে পরিস্কার ধারণা থাকা জরুরি। দুইজন মানুষের যুক্তি প্রয়োগের যদি সমান ক্ষমতা না থাকে, তাহলে এই ধরণের ডিসকাশন কখনোই সম্ভব হয়ে ওঠে না। তখন সমাজে শান্তিপূর্ণ সেকুলারাইজেশনও হয় না, তার বদলে বিভিন্ন মতাদর্শের মধ্যে সহিংস দ্বন্দ সংঘাত চলে। যারা ব্লগারদের হত্যা করছে তাদের সাথে কখনো কোন ডিসকাশন হতো না নিশ্চয়, সামান্য মানবিক যুক্তি প্রয়োগ করার মতো বিচার বুদ্ধি যাদের নাই তারাই খুন খারাবির পথ বেছে নেয়। এরা অপরাধী, এদের সাথে ডিসকাশন করার কথা বলছি না। কিন্তু যারা কিছু না কিছু হলেও যুক্তি দিয়ে কথা বলতে চায়, সেই যুক্তি যদি মুক্তমনা র‍্যাশনালিস্টদের কাছে খুবি দুর্বল ও হাস্যকর যুক্তিও মনে হয় তাহলেও ঐ যুক্তিবাদীতাকে তার উৎসাহিত করা উচিত, অনুৎসাহিত নয়। আমরা যদি দার্শনিক ইউর্গেইন হাবেরমাসের কথা মেনে নেই, তাহলে শুধু উৎসাহিত করাই কাজ হতে পারে না। হাবেরমাস বরং তাদেরকে যুক্তি প্রয়োগে সহযোগিতা করার কথা বলেছেন। এমন কি, হাবেরমাসের মতে, যারা ধর্মের ভাষা ছাড়া অন্য কোন ভাষায় কথা বলতে পারে নয়া, তাদেরকে সেকুলার আরগুমেন্ট শেখানো সেকুলারদের দায়িত্ব। যতক্ষন পর্যন্ত পাবলিক স্ফিয়ারে দুই পক্ষই সেকুলার আরগুমেন্ট নিয়ে হাজির হতে না পারবে, ততক্ষন পর্যন্ত সমস্যার কোন সমাধান হবে না। রিলিজিয়াস আরগুমেন্ট বনাম রিলিজিয়াস আরগুমেন্টের ফলাফল হয় ধর্মযুদ্ধ আর রিলিজিয়াস বনাম সেকুলার আরগুমেন্টের কোন ফলাফলই হয় না। হাবেরমাসের মতে, রিলিজিয়াস আরগুমেন্টকে যদি ধার্মিকরা সেকুলার ভাষায় তরজমা করার মতো যুক্তিবাদে পারদর্শি না হয়, তাহলে সেই তরজমা করার দায়িত্ব সেকুলারদের ঘাড়েই বর্তায়। এমন কি সেটাই যথেষ্ট না, প্রয়োজনে সেকুলার আরগুমেন্টকে রিলিজিয়াস আরগুমেন্টের ভাষায় তরজমা করাও সেকুলারদের কাজ। কারন যতোই আমরা যুক্তি প্রয়োগ করি না কেনো, তা যদি বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে কমিউনিকেট করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে সেই যুক্তিবাদের কোন ফল হয় না। হাবেরমাস এই কারনে ‘কমিউনিকেটিভ র‍্যাশনালিজমে’র কথা বলেন, যা ছাড়া আমাদের ভবিষ্যত অন্ধকার। যারা খুনি তাদের সাথে বোঝাপড়ার কিছু নাই, কিন্তু যারা খুনি নয় তাদের সাথে যদি আপনার বোঝাপড়া না থাকে, তাহলে কে দাঁড়াবে আপনার হত্যাকান্ডের বিচারের দাবিতে?

ব্যক্তিগতভাবে আমি ‘কমিউনিকেটিভ র‍্যাশনালিজমে’ ভরশা রাখি। বাংলাদেশ এখন যেই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে তাতে এই ‘তরজমা’র কাজের কোন বিকল্প নাই। যেহেতু খুব বেশি কেউ এই ধরণের জরুরি কাজে হাত দিচ্ছে না, তাই আমি বাধ্য হয়ে চেষ্টা করছি। এক পক্ষের আরগুমেন্ট আরেক পক্ষের ভাষায় তরজমা করে যাচ্ছি। তাতে আমার এই কূল এবং ঐ কূল, সব কূলই গেছে বলা যায়। আমার অনেক বন্ধু ভুল বুঝেছেন, প্রচার করেছেন আমি নাকি কল্লা বাঁচানোর জন্যে লেখি। যদিও আমার কল্লার সামান্যতম নিরাপত্তা কোন লেখার মাধ্যমে নিশ্চিত করতে পারি নাই, তবুও তাদের এই ভুল বুঝায় আমি খুব বেশি কিছু মনে করি না। মৃত্যুভয়ের সাথে মোকাবেলা যা করার করে ফেলেছি বয়স বিশ পেরোবার আগেই। তারপরও নিলয় নীল-এর মতো জবাই হয়ে মরতে চাই না। তার মানে এই না যে যা কিছু লিখে যাচ্ছি তা বন্ধ হবে বা পরিবর্তিত হবে। অথবা আমি মরলেও এই লেখাগুলো অন্য কেউ লিখবে না, বা কেউ এই কাজে নামবে না সেই ভয় এখন আর পাই না। তাকিয়ার যুগ শেষ হয়ে গেছে। যারা এতোদিন চুপ করে ছিলেন, তারাও এখন মুখ খোলা শুরু করেছেন। কয়জনের মুখের কথা বা হাতের লেখা বন্ধ করা যাবে? তবে যে নাস্তিকরা মারা গেছেন, তাদের ‘র‍্যাশনালিটি’ যোগাযোগময় ভাষায় তরজমা করে মানুষের কাছে হাজির করাই জীবিত নাস্তিকদের কাজ হওয়া উচিৎ। সেটা না পারলে তাদের মৃত্যু বৃথা যাবে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “এই মৃত্যু কি বৃথা যাবে?

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

98 − 89 =