পাহাড়ে সংঘটিত প্রথম গণহত্যা।

২৫ মার্চ, ১৯৮০
কমলপতি, কাউখালি, রাঙ্গামাটি।

সেনাবাহিনীর নিষ্টুরতাঃ

সেদিন কলমপতি আর্মি ক্যাম্পের ক্যাম্প কমান্ডার এক সাধারণ ধর্মীয় সভার ডাক দিয়ে কলমপতি ইউনিয়নের সকল পাহাড়ি গণ্যমান্য ব্যক্তিদের জড়ো করান। সকালে ঘোষণা দেয়া হয় পোয়াপাড়া বৌদ্ধ মন্দিরের সংস্কার কাজে এলাকার সেনাবাহিনীরা সহযোগিতা করবে। তাই এলাকার সাধারণ পাহাড়িদেরও সংস্কার কাজে অংশগ্রহণের জন্য আহ্বান হয়। সাধারণ পাহাড়িরা সেই আহবানে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাড়া দিয়ে সেনাবাহিনীর আয়োজিত সাধারণ সভায় উপস্থিত হয়। কিছুক্ষন কথা বলার পর উপস্থিত সবাইকে এক লাইনে দাঁড়াতে বলা হয়। লাইনে দাঁড়ানোমাত্র সেনা সদস্যরা তাদের ওপর উপর্যুপরি গুলিবর্ষণ শুরু করে। এতে ঘটনাস্থলেই সঙ্গে সঙ্গে মারা যায় এলাকার বাজার চৌধুরী, কুমুদ বিকাশ তালুকদার, স্থানীয় স্কুল কমিটির সাধারণ সম্পাদক শরহিদর চাকমাসহ প্রায় একশ ব্যক্তি। গুরুতর আহত হন ইন্দু কুমার চাকমা, পিটিয়া চাকমাসহ প্রায় ১২ জন। আহতদের রাঙ্গামাটি। জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। আলৌকিকভাবে প্রাণে বেঁচে যাওয়া গুরুদাস চাকমা এসব ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছিলেন পরে। তিনি পোয়াপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের পশ্চিম কোণায় অবস্থিত একমাত্র সেনাছাউনির পিছনে ৫০ জনেরও অধিক লাশ গণকবর দিতে দেখেছিলেন। মাত্র ৪টি লাশ ময়নাতদন্তের জন্য রাঙ্গামাটি জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।

এই হত্যাকান্ড শেষে সেনাবাহিনী তাদের ছাউনিতে ৩০ জনের অধিক পহাড়ি নারীকে জোর করে ধরে নিয়ে যায়। সন্ধ্যায় শিশু ও বৃদ্ধ মহিলাদের ছেড়ে দেয়া হলেও মধ্য এবং কম বয়েসী নারীদের আটকে রাখে। সেনাবাহিনী কর্তৃক আটকে রাখা সেই নারীদের অনেকের হদিস পরে আর পাওয়া যায়নি। শিশু ও বৃদ্ধ মহিলারা যখন সেনাছাউনি থেকে বাড়ি ফিরছিলো তখন সেটেলারদের দ্বারা তারা নির্যাতনের শিকার হয়।

সেটেলারদের নিষ্টুরতাঃ

সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ প্রশ্রয় এবং মদদেই সেটেলাররা পাহাড়িদের ওপর চড়াও হয়। তারা কাউখালি উপজেলা সদর, মুখপাড়া, পোয়াপাড়া, কাউখালি বাজার, তোংপাড়া এবং হেডম্যান পাড়া ধবংসস্তপে পরিণত করে ফেলে। এসব এলাকার সব বাড়িঘর লুটপাট করার পর নির্বিচারে জ্বালিয়ে দেয়। যাকে সামনে পেয়েছে তাকেই কুপিয়ে হত্যা করেছে। প্রাক্তন সাংসদ চাইথোয়াই রোয়াজার বাড়িতেও লুটপাট চালানো হয়। লুটপাট করে গুড়িয়ে দেয়া হয় মুখপাড়া কিয়াং, তোংপাড়া আনন্দ মোহন বৌদ্ধ মন্দির, পোয়াপাড়া মন্দির। কিয়াং বা বৌদ্ধ মন্দির থেকে স্বর্ণ, রৌপ্য, পিতলের বৌদ্ধমূর্তি, আসবাবপত্রসহ মূল্যবান সামগ্রী লুট করে সেটেলাররা। হাতিরপাড়া ও কাউখালির দুইটি বৌদ্ধ মন্দির পুড়িয়ে দেয়। সেটেলারদের আকস্মিক উপর্যুপরি হামলায় পাহাড়ি নারী, পুরুষ, শিশু,বৃদ্ধ নিজেদের এলাকা ছেড়ে জঙ্গলে পালিয়ে যায়। পরে এসব বাস্তু ভিটেমাটি হারা মানুষজন ত্রিপুরায় পালিয়ে গিয়ে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়।
পুরো হত্যাকান্ডে প্রায় ৩০০ জনেরও অধিক পাহাড়ি নিহত হয়।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

32 − 31 =