হেফাজতে জুজু

আজ বাংলাদেশের টক অফ দ্যা কান্ট্রি হেফাজত ।কি অনলাইন, কি অফলাইন, রাজপথ থেকে চিপাগলি, চায়ের টেবিল থেকে শুরু করে রান্নাঘর, হেন কোন জায়গা নেই যেখানে হেফাজতের কথা আলোচনা হচ্ছেনা। এই হেফাজত আলোচনা এমন মার্কেট পেয়েছে যে মনে হচ্ছে দুদিন পড়ে এদেরকে স্পন্সর দিতে কোম্পানীরা উঠে পরে লেগে যাবে। কিন্তু কেউ কি একবার ভেবে দেখেছেন এরা কারা? এদের বাড়ি কোথায়? এরা কার প্রতিনিধিত্ব করে? কেউ হয়ত বলবেন এরা কৌমি মাদ্রাসার মোল্লা, আবার কেউ এককাঠি এগিয়ে বলবেন উনারা ধর্মপ্রান হুজুর, এমনো কেউ আছেন যে বলবেন যে এরা আমার আপনার ভাই। যদি এমন কিছু ভেবে থাকেন তাহলে ভুল, এরা আমার আপনার ভাই বা ধর্মপ্রান কিছুই না। এরা পৃথিবীর অলসতম দেশ সৌদি আরবের এদেশীয় সংস্করন। এরা না চিনে বিজ্ঞান না চিনে বাগান। এরা চিনে আল্লাহ, লিল্লাহ, হুর আর গনিমত। এদের কাছে জীবনের কোন পার্থিব অর্থ নেই। এরা পরকাল নামক জীবনের স্বপ্নে বিভোর একদল অন্ধ জনগোষ্ঠী। এরা মনে করে এদের জীবনের অর্থই হচ্ছে সারাদিন আল্লাহ নবিজীর নাম জিকির করা। জ্ঞান-বিজ্ঞান হচ্ছে দুনিয়াতে লোভ জাগানোর জন্য কাফেরদের ষড়যন্ত্র। এরা জানেনা পৃথিবীর মানুষেরা পৃথিবীতে বসেই মঙ্গল নামক গ্রহে কিউরিসিটি পাঠাতে পারে। এদের কাছে চন্দ্রবিজয়ের কথা বললে বলে কাফেরদের মিথ্যা অপপ্রচার। টেলিভিশনকে বলে শয়তানের বাক্স। আর এমন লোকেদের হুমকি ধামকিতে আজ আমরা হাস্যকরভাবে সাড়া দিচ্ছি, তাদেরকে প্রতিরোধের জন্য এই করছি, সেই করছি।

প্রশ্ন আসে, এদের উতপত্তি কোথা থেকে? হ্যা, খুব সহজে বলা যায় এরা এদেশেরই মানুষ। কিন্তু একবারো ভেবে দেখেছেন কি? এদেরকে কতটুকু এদেশের মানুষ বলা যায়? এরা কি বাঙ্গালী কিংবা বাংলাদেশী জাতিয়তাবাদে বিশ্বাসী? না, এরা বাঙ্গালী কিংবা বাংলাদেশি জাতীয়তাদের ধার ধারেনা। এরা নিজেদের মনে করে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধার্মিক। জাতের কথা উঠলে বলে আমরা আগে মুসলিম পরে বাংলাদেশি। সত্যি কথা হল এরা মুখে বলতে পারেনা যে আমি আরবীয়, কিন্তু মনে প্রানে তারা আরব। ভারতীয় উপমহাদেশে এই শ্রেনীর প্রকাশ ও বিকাশ ঘটে মূলত ব্রিটিশ কর্তৃক শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করার ফলে। তখন এরা ইংরেজী শিক্ষাকে বিধর্মী শিক্ষা আখ্যা দিয়ে তা বর্জন করে ও নিজেরা একটা শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তন ও ব্যবহার করে কৌমী নাম দিয়ে। মূলত তখন থেকেই গোয়ার স্বভাবের এইসব হেফাজত মার্কা মোল্লাদের সৃষ্টি । এরা কখনই নতুনকে গ্রহন তো দুরে থাক যাচাই করে দেখতেও রাজী না। গোয়ার্তুমি হচ্ছে এদের মজ্জাগত একটা স্বভাব , যার সর্বশেষ প্রমান আমরা পাই চিটাগাং গনজাগরন মঞ্চের সমাবেশের সময়। এই কৌমী শিক্ষা ব্যবস্থায় বিজ্ঞানের কোন ব্যবহার তো দুরে থাক বিজ্ঞান নামক কোন বিষয়ই সিলেবাসে নাই। এটা সহজেই অনুমেয় যে বিজ্ঞানের শিক্ষা অথবা নূন্যতম ধারনাহীন একটা মানুষের দ্বারা কতটুকু কি আশা করা যায়। পশ্চাদপদ শিক্ষা ব্যবস্থা এদেরকে স্বাভাবিকভাবেই সমাজের এমন স্তরে নিয়ে ফেলেছে যেখানে তারা নিজেদেরকে দেখতে পায় একদল প্রায় সমাজচ্যুত মানুষ হিসেবে। নামাজ পড়ানো, মিলাদ মাহফিল , বিয়ে পড়ানো ও অন্যান্য ধর্মীয় কাজ ছাড়া সমাজে তাদের আর কোন ভুমিকা নেই। আন্যান্য সামাজিক কাজে তাদেরকে মনে করা হয় অনাহুত, অনাকাংখিত, অপ্রয়োজনীয় কাঠ (শক্ত) মোল্লা হিসেবে। আর এই সমাজচ্যুতির কারনে এরা দিন দিন হয়ে উঠছে হিংস্র। ফলে জন্ম নিচ্ছে জঙ্গিবাদী বিভিন্ন সংগঠনের।

যাই হোক কথা হচ্ছিল হেফাজতরে নিয়ে। ধারনা করা হয় লংমার্চে এদের উপস্থিতি ছিল প্রায় পাচ লক্ষ। আর এই পাচলক্ষ লোকের সমাগম দেখে অনেকের চক্ষু চড়ক গাছ। এত লোকের সমাগমের কারন কি? হেফাজত অর্থাত কৌমী মোল্লাদের ছোটকাল থেকেই একটা মারাত্মক ধরনে ভাল শিক্ষা দেয়া হয়ে যে ওস্তাদ কখনই ভুল করতে পারেন না এবং ওস্তাদের যে কোন কাজে কর্মে কোন প্রকার অভিযোগ তো দুরে থাক , কোন ধরনের সন্দেহই পোষন করা যাবেনা। শুধু তাই না, যদি কেউ ওস্তাদের প্রতি সন্দেহপোষন করে তবে তা পাপের সামিল বলে গন্য করা হয়। যার মানে দাড়ায় ওস্তাদ যা বলে তাই সঠিক, না মানলে জাহান্নামে পুড়ার একটা ভয় থাকে। আর লংমার্চে ছাত্রদের প্রতি হুকুম ছিল যেভাবেই হোক অংশগ্রহন করতে হবে। ফলে জাহান্নামের আগুন থেকে বাচার জন্য তাদের লংমার্চে যাওয়া ছাড়া অন্য উপায় ছিলনা। একটা তথ্য এখানে জানা দরকার , কৌমি মাদারাসায় ছাত্র সংখ্যা প্রায় চৌদ্দ লক্ষ। এদিক থেকে দেখলে লংমার্চের সমাগম কম হয়েছে বললে ভুল হবেনা। হয়ত একারনেই হেফাজতের লাগাতার অবস্থান ও হরতালের হুমকির বিপরীতে একদিনের সমাবেশ ও হরতাল কর্মসূচীতেই বিরত থেকেছে নেতারা।

কিন্তু প্রগতিশীল মহলে মাথা ব্যথার বিষয় হল তাদের তেরো দফা দাবী । আমি মনে করি তাদের এই দাবী এতটাই অযৌক্তিক ও বর্তমান সময়ের সাথে অসামঞ্জস্য ও অসঙ্গতিপুর্ন যে তা নিয়ে হাসাহাসি ঠাট্ট করলেও দাবীগুলো তাদের প্রাপ্য থেকে বেশি গুরুত্ব পেয়ে যাবে। মজার বিষয় হল কৌমি মোল্লারা জানেনা বিশ্ব আজ কোথায় গিয়ে পৌছেছে, ফলে তাদের তেরো দফার দাবীতে আজ সারাদিন বাংলার রাজপথগুলো দাবিয়ে বেড়িয়েছে। সমাজচ্যুত মানুষেরা হটাত রাস্তায় নামার সুযোগ পেয়ে একটু বেশি করে লাফাবেই। এরা ব্লগ চিনেনা কিন্তু ব্লগারের ফাসি চায়, এরা ব্লগকে মনে করে পদার্থ দ্বারা তৈরি কোন ভবন বা এমন কিছু। মাসব্যপি তাদের সমাবেশ কর্মসূচী রয়েছে। একটা কথা স্বাভাবিক যে কোন আন্দোলন যখন দীর্ঘ মেয়াদের কর্মসুচি দেয়া হয় তার জোশ বা প্রতিক্রিয়া কমে আসে। আমি এটাকে তাদের গা বাচানো কর্মসূচী হিসেবেই বিবেচনা করবো। আগামী মাসে তারা ঢাকা ঘেরাও কর্মসূচী ঘোষনা করেছে। কিন্তু এরা কি জানে কিভাবে ঢাকার বাতাসে শাস নিতে হয়? এরা কি জানে ঢাকার গরমে কিভাবে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে হয়? জানেনা।

তাই আমি বলব হেফাজত নিয়ে আমাদের মাথা ঘামিয়ে কোন লাভ নেই। এরা ঈমানী যজবায় কয়েকদিন লম্ফজম্ফ করবে, শ্লোগান দিবে, পরে আবার সুড়সুড় করে বাড়ি চলে যাবে। বাড়ি গিয়ে আবার লিল্লাহ মাগা শুরু করবে। কাজের কাজ কিছুই হবেনা।

সবশেষে একটা কথা বলতে চাই, আমরা সবাই জানি আজকের হেফাজত কার কার তৈরী। কারা তাদের ব্যবহার করছে। আমার কাছে মনে হয় ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করলেই ভাল হবে। কারন একটা কথা আছে পুজা শেষ মন্ডপ খালি, ব্রাহ্মন দুচোখের বালি। হেফাজতের ঈমানী জজবাও কয়দিনেই শেষ হবে, ফলে তাদেরকে যারা উত্তেজিত করে রাজপথে নামিয়েছে তারাই তাদের ঝেটিয়ে বিদায় করবে। তখন দেখা যাবে অমুক বিবৃতি দিচ্ছে হেফাজত এই, তমুক বিবৃতি দিচ্ছে হেফাজত সেই। হেফাজতও বাড়িতে গিয়ে আবার সুর করে জিকির শুরু করবে আরো বেশি লিল্লাহ পাবার আশায়। সুতরাং বলি কি ভাই নো টেন্স ছাগল ভেড়া লাফাইতে দেন।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৬ thoughts on “হেফাজতে জুজু

  1. ভাল লিখেছেন। তবে চুপ করে
    ভাল লিখেছেন। তবে চুপ করে থাকাটা ঠিক হবে না। এদের বিরুদ্ধে নিয়মিত লিখতে হবে। না লিখলে এক সময় এদের ছাগলামী আমাদের মানুষরা গিলতে শুরু করবে।

  2. হ্যা চুপ করে থাকা যাবেনা।
    ১৫

    হ্যা চুপ করে থাকা যাবেনা।
    ১৫ ফেব্রুয়ারী থেকে চুপ করে থাকার ফলাফল আজকের হেফাজত।

    আমাদেরকের মাঠ পর্যায়েও কাজ করতে হবে।

  3. হেফাজত হলো জামায়াতেরই অপর
    হেফাজত হলো জামায়াতেরই অপর রুপ। এই সত্যটা প্রতিষ্ঠিত করতে এতো সময় লাগে কেনো অনলাইন ও অফলাইনের রথী-মহারথীদের? এই দেশটা কাদের? ওদের না আমাদের? ওরা কে এইদেশ কিভাবে চলবে সেটার নীতি নির্ধারন করে দেবার? আপনারাই বারবার তাদের সুযোগ করে দিচ্ছেন আলোচনার শীর্ষে টেনে এনে তাদের, তাদের আলোচনায় আনুন কিন্তু তারা যে জামায়াতের অন্যরুপ সেগুলো ফুটিয়ে তুলুন আপনাদের লেখনীতে।

    1. // হেফাজত হলো জামায়াতেরই অপর
      // হেফাজত হলো জামায়াতেরই অপর রুপ। //
      এই ধারনা ভুল।

      জামাত এদেরকে ব্যবহার করে, কিন্তু এরা টেরটি পর্যন্ত পায় না।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

53 + = 61