রাজনৈতিক চাপে মন্দ ঋণ কিনছে সরকারি ব্যাঙ্কগুলো!

ব্যাংকগুলোতে বর্তমানে যে কোনো পণ্যের মতো ঋণ কেনাবেচা হয়। এক্ষেত্রে ঋণের গুণগত মান বিবেচনা করেই ঋণ বেচাকেনার সিদ্ধান্ত নেয় ব্যাংক। ঋণ কিনতে হয় নগদ টাকার বিনিময়ে। যে ব্যাংক থেকে ঋণ কেনা হবে ওই ব্যাংকে ঋণের সুদসহ সমুদয় টাকা পরিশোধ করে দিলে গ্রাহককে ওই ব্যাংক ঋণের দায় থেকে অব্যাহতি দেয়। ঋণটি চলে আসে যে ব্যাংক কিনল সেখানে। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী ব্যাংকগুলোর ভালো গ্রাহকের বা আদায়যোগ্য ঋণ কেনার কথা। কিন্তু তা না করে রাজনৈতিক প্রভাবে এসব ব্যাংক অবাধে কিনছে মন্দ ঋণ।

সূত্র মতে, যেসব গ্রাহক খেলাপি হয়ে নতুন ঋণ পাচ্ছেন না, তারা রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগ করে সরকারি ব্যাংকগুলোকে তাদের মন্দ ঋণ কেনাতে বাধ্য করছে। পরে তা বিশেষ বিবেচনায় হয়ে যাচ্ছে নিয়মিত ঋণ। আগে ঋণটি খেলাপি হওয়ায় গ্রাহক নতুন ঋণ পাচ্ছিল না। নতুন ব্যাংকে আসার পর বেড়ে যাচ্ছে ঋণের সীমা। তখন গ্রাহক আরও বেশি নতুন ঋণ পাচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় কিছুদিন চলার পর তারা আবার খেলাপি হয়ে যাচ্ছে। মাঝপথে ব্যাংক থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে ঋণের নামে মোটা অংকের টাকা।

এদিকে এই প্রক্রিয়ায় ঋণ কেনাবেচার সুযোগ করে দিতে বাংলাদেশ ব্যাংকও খেলাপি ঋণ নবায়নের ক্ষেত্রে বিশেষ ছাড় দিচ্ছে। এই সুযোগে গত কয়েক বছর ধরে নতুন ব্যাংকগুলো ব্যাপক হারে আগের ঋণ কিনেছে। তারা সেসব গ্রাহককেই আরও ঋণ দিয়ে ব্যবসা করার সুযোগ দিয়েছে। এভাবে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে ঋণ কেনাবেচার মাধ্যমে অসাধু কিছু উদ্যোক্তা বেসরকারি ব্যাংকের পাশাপাশি সরকারি ব্যাংক থেকেও মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।

?oh=6fbf0433fa8c609fe601ebbe5e2f4d0b&oe=5646966C” width=”400″ />

অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক ভিআইপির মন্দ ঋণ এবং জালজালিয়াতির ভারে আক্রান্ত হয়ে বিপর্যস্ত। সম্প্রতি ব্যাংকটি প্রায় ১০০ কোটি টাকার বিল কিনেছে, যা ভুয়া কাগজপত্রের প্রেক্ষিতে হয়েছে বলে প্রমাণীত হয়েছে। এই কায়দাতেই এর আগে হলমার্ক গ্রুপ একই ব্যাংকের রূপসী বাংলা হোটেল শাখা থেকে প্রচুর ঋণ নিয়েছিল। সেখান থেকে আত্মসাৎ করা ৩,১০০ কোটি টাকার মধ্যে ২,১২২ কোটি টাকা খেলাপিতে পরিণত হয়েছিল প্রতিষ্ঠানটি।

২০০৯ থেকে ২০১৪ সালের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত সময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ৯৫০ কোটি টাকার ঋণ কেনার প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। এর মধ্যে ২০১৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে জনতা ব্যাংক কিনেছে ২৫০ কোটি টাকার একটি ঋণ। রাজনৈতিক চাপে ব্যাংক এই ঋণ কিনতে বাধ্য হয়েছে। গ্লোব গ্র“প অব কোম্পানিজের নামে সোনালী ব্যাংকে ২৫০ কোটি টাকার একটি ঋণ ছিল, যা মন্দ হিসেবে চিহ্নিত। খেলাপি থাকার কারণে এই হিসাবের বিপরীতে কোনো নতুন ঋণ নিতে পারছিল না গ্রাহক। এ বছরের মাঝামাঝি সময়ে ঋণটি সোনালী ব্যাংক থেকে কিনে নেয় জনতা ব্যাংক। তারা ঋণটি একেবারে নতুন হিসাবে পেয়েছে। ঋণের সীমা এবং মেয়াদ বাড়িয়ে নতুন করে পুনর্গঠন করেছে। ফলে এর বিপরীতে গ্রাহক আরও টাকা নিতে পারছে।

বেসিক ব্যাংক নগদ টাকায় প্রচলিত নিয়ম ভঙ্গ করে ১৪৭ কোটি টাকার মন্দ ঋণ কিনেছে। এগুলো এতটাই খারাপ ছিল যে, নবায়ন করেও এখন নিয়মিত রাখা যাচ্ছে না। ফলে আবার খেলাপি হয়ে পড়েছে। ঋণের বিপরীতে যথেষ্ট জামানতও নেই ব্যাংকের কাছে। বেসরকারি খাতের পাঁচটি ব্যাংক থেকে বেসিক ব্যাংকের চারটি শাখা পর্ষদের অনুমোদন ছাড়াই এসব ঋণ কিনেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদন থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের রফতানি বিলের বিপরীতে ৫২ কোটি টাকার ঋণ কিনেছিল বেসিক ব্যাংক। পরে ওইসব রফতানি বিল আর দেশে আসেনি। তদন্তে বেরিয়ে এসেছে প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো পণ্য রফতানিই করেনি। উল্টো রফতানির ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে বাজারে রফতানি বিল ইস্যু করে ব্যাংক থেকে ওই টাকা হাতিয়ে নিয়েছে, যা ব্যাংকের কাঁধে দায় হিসেবে পড়েছে।

এ প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ”সরকারি ব্যাংকগুলোর ওপর সব সময়ই রাজনৈতিক চাপ থাকে। আগে ছিল ঋণ দেয়া ও খেলাপি ঋণ নবায়ন করার চাপ। সাম্প্রতিক সময়ে এই চাপের পাশাপাশি আরও একটি চাপ আসতে শুরু করেছে, তা হল অন্য ব্যাংকের মন্দ ঋণ কেনা। কোনো উদ্যোক্তা হয়তো বেসরকারি ব্যাংকে খেলাপি হয়ে আছে। নতুন ঋণ পাচ্ছে না। তখন রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে এটি সরকারি ব্যাংক দিয়ে কেনায়। ঋণের সীমা বাড়িয়ে আরও নতুন ঋণ নেয়। এভাবে তারা বেসরকারি ও সরকারি দুই ব্যাংকই খাচ্ছে।”

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৪ thoughts on “রাজনৈতিক চাপে মন্দ ঋণ কিনছে সরকারি ব্যাঙ্কগুলো!

  1. ব্যাঙ্ক খাতে কিভাবে অর্থ
    ব্যাঙ্ক খাতে কিভাবে অর্থ লোপাট হচ্ছে, তা বুঝতে ছোট্ট এই প্রতিবেদনটি আমাকে অনেকখানি সহায়তা করেছে। পাশাপাশি এ খাতের অনিয়মে সরকারের অবদানটাও বেশ টের পাওয়া যাচ্ছে।

    আগামী দিনের একটাই শ্লোগান- হেইল হাসিনা!

  2. রাষ্ট্রের আর্থিক
    রাষ্ট্রের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিশৃঙ্খলা হয় রাজনৈতিক কারণেই। অতীতের সরকারগুলোর মত বর্তমান সরকারও এই সেক্টরে নোংরাভাবে হস্তক্ষেপ করেছে নিয়মিতত। এক বেসিক ব্যাংক এবং সোনালী ব্যাংকের অবস্থাই বলে দেয় এই খাতের বিশৃঙ্খলা কতটা উলঙ্গ ছিল।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

20 − = 16