ব্লগার হত্যার দায় আরিল ক্লোকারহগেরও!

 

সামহোয়্যার ইন কেমন ব্লগ? মোল্লা না নাস্তিক? যে কোনো স্থানে এই প্রশ্নটি লিখে পোস্ট দেন, পরস্পরবিরোধী একগুচ্ছ মন্তব্য পাবেন।

নাস্তিকরা দেখবেন সোৎসাহে নানা তথ্য দিতে শুরু করেছে। তারা বলবে, সামু একটা পুরোপুরি মোল্লা ব্লগ। এর মডু লেভেলে গোড়া থেকেই নূরানী চেহারার আইটি স্পেশালরা যুক্ত ছিল। দিনে দিনে এই মোল্লারা বাড়ছে। প্রায়ই নাস্তিকগো পোস্ট মুইছা, তাগো ব্যান মাইরা ব্লগটার আকিকা দিতো। পরে বাধ্য হয়ে নাস্তিকরা তদের নিজেদের ব্লগ খুলতে গেছে। সামুতে তারা বেশিদিন থাকতে পারে না।

এবার যদি মোল্লাদের একই প্রশ্ন করা হয়, তারা বলবে, এটা ইসলাম বিরোধী ব্লগ। এখানে নাস্তিকদের লেখা প্রমোট করা হয়। এটা পুরোপুরি একটা ইসলাম বিদ্বেষী ব্লগ হিসেবে ভূমিকা রাখছে। এই ব্লগের মডারেশন প্যানেলে সব নাস্তিকরা থাকে। এই ব্লগের মালিকও নাস্তিক। নাস্তিকদের সঙ্গে ফাইট দিতে এখানে ইসলামপন্থিদের অনেক শক্তি জড়ো করতে হইছে।

এরকম পরস্পর বিরোধী অনেক বক্তব্য আসবে সামুর বিরুদ্ধে। এবং এটা নির্ধারিত যে, নাস্তিকরা বলবে ওটা মোল্লাদের, আর মোল্লারা বলবে ওটা নাস্তিকদের। আমার মতে এটাকে যে যেভাবেই দেখেন না কেন, একটা ব্লগের মালিকপক্ষের জন্য এটা খুবই আনন্দের ও সাফল্যের। এই যে ইউজাররা তাদের বিরোধিতা করে, কিন্তু একমত হতে পারে না যে, আসলে তারা কি করছেন, বরং তারা নিজেদের মধ্যেই বিভেদে জড়িয়ে যায়, এটা নিঃসন্দেহে যে কোনো ব্যবসায়ীর জন্য সাফল্য।

সামহোয়্যার ইন ব্লগের প্রতিষ্ঠাতার নাম আরিল ক্লোকারহগ। তিনি নরওয়ে থেকে এদেশে এসেছেন প্রায় ২১ বছর আগে। দেশে তার ভিত্তি শক্ত করেছেন, গ্রামীনফোনে চাকরির সময় সেখানকার কলিগ গুলশান ফেরদৌস জানাকে বিয়ে করে। জানা আর তিনি একত্রে দুইজনই গ্রামীণফোনে কাজ করেন। এরপর আরিল একটা MIS সফটওয়্যার টিমের সাথে কাজ করেন তিন বছর । পাশাপাশি বাংলাদেশে ব্যবসা বাণিজ্যের পরিকল্পনা করতে থাকেন।

এরপর এক পর্যায়ে ২০০৫ সালের দিকে তারা শুরু করেন সামহোইয়্যার ইন ব্লগের কাজ। ব্লগ প্রতিশঠার পর চ্যালেঞ্জ ছিল তাকে জনপ্রিয় করা। কারণ ব্লগ জনপ্রিয় না হলে তো আর ব্যবসা হবে না। আরিলের কোনো ব্লগিং করার কোন উদ্দেশ্য ছিল না। যে ছিল একজন ব্যবসায়ী। ব্যবসার উদ্দেশ্যেই সে ব্লগে নামে। কারণ বাংলাদেশে এটা ছিল তখন পর্যন্ত ভার্জিন সেক্টর। যাই হোক। সফল হতে তার বেশি সময় লাগেনি। অল্প দিনের মধ্যেই আলোচনায় উঠে আসে ব্লগটি। বাড়তে থাকে একের পর এক ব্যবহারকারী।

এখানে থেমে গেলেই হয়তো এই গল্পটা আমাদের সবার ভালো লাগত। কিন্তু ঘটনা এখানে থামেনি। ব্লগ জগত এখন প্রায় ধ্বংসের মুখে। কিন্তু সামহোয়্যারের অবস্থা এখনো ভালো। আর এর সঙ্গেই যুক্ত আরিলের বিশেষ কৌশল। যার প্রেক্ষিতে আজ তার দিকে আমি আঙ্গুল তুলছি।

এটা সবাই জানেন যে, একটা ব্লগে সাধারণত কি ধরনের ট্রিটমেন্ট ব্লগ কর্তৃপক্ষ দিয়ে থাকে। এটা খুবই চালু ব্যাপার ছিল যে, ব্লগ জনপ্রিয় করার জন্য আরিল মোল্লা ও নাস্তিক দুই পক্ষকেই লালন পালন করত। দুই পক্ষের মধ্যে ব্রিটিশ সেই ডিভাইড অ্যান্ড রুল কায়দা সে ভালোভাবেই প্রয়োগ করেছিল। দুই পক্ষ থেকে মডারেটরও নিয়োগ দেয়া হতো। দুই পক্ষকে টাকা পয়সা দিয়েও লেখানো হতো। সেসব পেইড ব্লগারদের চেহারা এখন অনেকেই চিনেন।

এই যে আরিল সাহেব তার ব্লগকে জনপ্রিয় করতে, অর্থাৎ তার ব্যবসাকে চাঙা করতে আস্তিক ও নাস্তিকদের মধ্যে গেঞ্জাম উস্কে দিলেন- এর ফলাফলটা কোন দিকে গেল? এক সময় সামুতে লাখো হিট পড়তে লাগল। জানা ও আরিলের গুলশানে চমৎকার আলীশান ফ্ল্যাট হলো। তাদের টাকা হলো, ব্যবসা হলো। আর এদিকে ব্লগে চলতে থাকল দুই পক্ষের পাল্লা।

এ-টিম, বি-টিম, এরকম কত কী হলো এক পক্ষ কর্তৃক আরেক পক্ষকে দমনের জন্য। আর আরিল বসে বসে তার অন্যান্য ব্যবসাকে চাঙ্গা করতে থাকল। ব্লগ থেকে আইটি সাউন্ড লোকজন নিয়ে করতে থাকলেন আউটসোর্সিং। তার অধিকাংশ ব্যবসাই ইন্টারনেট সংশ্লিষ্ট। আর সেজন্য সামুর উত্থানটা তার জন্য দরকারি ছিল। এরপর সামুর সূত্রে ডয়েচে ভেলে এবং আরও অনেক দেশীয় প্রতিষ্ঠান থেকে অর্থ পেতে শুরু করলেন। এজন্য আর কিছু করার আগে নিজের অফিস রুমে প্রথমে তিনি শেয়ারে জায়গা দিলেন একজন আইনজীবীকে। সেই আইনজীবী আর তিনি একসঙ্গেই অফিসের একাংশ শেয়ার করেন।


আরিলের আলিশান অফিস!

আরিল খুবই পাকা একজন লোক। আইনজীবী নিয়ে অফিস করার কারণ হচ্ছে, তিনি ভালো করেই জানেন যে, তার এই অর্থ উপার্জনের রাস্তা খোলা রাখতে গেলে তাকে সব দিকই সামলাতে হবে। আরিল সব ঠিকঠাক সামলেছেন। আজ তার অর্থের অভাব নেই। ধনী দেশ নরওয়ে থেকে এসে এই গরীব দেশ বাংলাদেশে বসেই অনেক সম্পত্তির মালিক হয়েছেন তিনি। তার বিনিময়ে কী ঘটেছে?

সামু ব্লগ জনপ্রিয় করতে, ব্লগে হিট বাড়াতে আরিল অনেক লেখা প্রমোট করেছিলেন। সামুতে যখন ব্লগারদের পরস্পরের মধ্যে গালি শুরু হলো, তখন ব্লগ কর্তৃপক্ষ এটাকে বলল স্বাধীনতা। দুই পক্ষের গালির তোড়ে বাংলা ব্লগ জগত যখন দুর্গন্ধময়, আরিল তখন বগল বাজাচ্ছেন, সবচেয়ে বড় ও জনপ্রিয় ব্লগের মালিক হয়ে। এরপর জল আরও গড়াল।

সামুর প্লাস, মাইনাসের পাল্লা ও গালির তুবড়ি সময়ের প্রয়োজনেই তার রূপ বদলে ফেলল। এরপর তা হয়ে গেল একে অপরকে হুমকি দানের ক্ষেত্র। ব্লগে এ নিয়েও কোনো ব্যবস্থা নেয়া হলো না। দুই পক্ষের ক্যাচাক্যাচিতে আসতে থাকল একের পর এক হিট পোস্ট। আর ওদিকে এই গ্যাঞ্জাম অবধারিতভাবে নাস্তিকদেরকে চিহ্নিত করে দিল। মোল্লারা তাদের তরবারিতে শান দিতে লাগল।

এখনো একের পর এক লাশ পড়ছে। আর এ নিয়ে পোস্ট আসছে সামুতে। সামু আরও জনপ্রিয় হচ্ছে। ব্লগারের লাশ পড়লে আরিল ও জানা এখন পিটিসি দেন। কিন্তু কোনো সাংবাদিক তাদের এই কথাটি বলে না যে, আপনারাই তো ব্লগ ব্যবসার নিমিত্তে এই আস্তিক-নাস্তিক ক্যাচালকে প্রমোট করলেন। কই, এগুলো তো নিয়ন্ত্রণ করেননি? নিজের ব্যবসার জন্য এদেরকে লাগিয়ে দিয়েছেন ব্রিটিশ হায়েনাদের মতো করে। আর আজো ওদের লাশ পড়ছে! আপনার লাভের নিমিত্তে হয়তো আরও অনেক ব্লগারকে জীবন দিতে হবে। আপনি কি তার কোনো দায় নেবেন?

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৭ thoughts on “ব্লগার হত্যার দায় আরিল ক্লোকারহগেরও!

  1. খুব মনোযোগ দিয়ে লেখাটা পড়লাম।
    খুব মনোযোগ দিয়ে লেখাটা পড়লাম। আমি যদিও কখনও সামুতে লিখিনি তবে আরিল ও জানা আপা দুজনের সাথেই আমার পরিচয় আছে। জানা আপার সাথে এক সময়ে সখ্যতাও ছিল। এখন নেই।

    বিতর্ক তৈরি বা আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি অথবা মতামত প্রকাশের যায়গা তৈরি ইত্যাদি যা-ই বলি না কেন এ ক্ষেত্রটি তৈরির দরকার ছিল, আছেও। যারা মারছে তারা ব্লগের মানুষ না, হিংস্র ধর্মীয় মানুষ। তারা সব যুগে, সব কালে এভাবে মেরেছে। এটা তাদের শিক্ষা।

  2. ব্লগিং এর উজ্জল সময়ের
    ব্লগিং এর উজ্জল সময়ের পাঠক/ব্লগার আমি না।কিন্ত সামুতে এখন যাই না।মানসম্মত লেখার খুব অভাব। সবকিছু কেমন যেন।এটার প্রতিষ্ঠাতা এক বিদেশি তা জানতাম,কিন্ত ভেতরের এত কাহিনী জানা ছিল না।ব্লগিং একটা শিল্প।এটা কি সত্যই ধ্বংস হয়ে গেছে? হয়তোবা তাই।কিন্ত তবু বিশ্বাস হতে চায় না।তবে ব্লগ তার জনপ্রিয়তা হারিয়েছে এটা সত্য।এর প্রধান কারন হয়তোবা ফেসবুকের উত্থান।যাই হোক,ব্লগ দীর্ঘজীবী হোক।

  3. ইকারাসের এই পোস্টটির বিশেষ
    ইকারাসের এই পোস্টটির বিশেষ গুরুত্ব আছে। আমার কাছে তার লেখাটা এ কারণেই বেশি তাৎপর্যপূর্ণ মনে হয়েছে যে, সামুতে আস্তিক-নাস্তিক ক্যাচাল এবং গালি ও গলাবাজিকে সত্যিকারার্থে কখনোই নিয়ন্ত্রণ করা হয়নি। আর আস্তিক-নাস্তিক ক্যাচাল বাদ দিলে সামু তো শেষ পর্যন্ত বিক্রয় ডট কমের বেশি কিছু ছিল না। র‍্যাম বিক্রির বিজ্ঞাপন দিয়েও পোস্ট দেখছিলাম।

    তবে পুঁজির বিকাশ, মুনাফা ও মালিকের স্বার্থ কিভাবে একটা জাতিকে, কিভাবে সমাজের বিকাশমান একটি গোষ্ঠীকে ভয়াবহ সঙ্কটের মুখে ঠেলে দিতে পারে, সেই জায়গাটাকে বিবেচনায় নেয়াটাই বেশি জরুরী মনে করছি। লেখাটির জন্য ইকারাসকে আবারো ধন্যবাদ।

  4. দারুন বিজনেস প্ল্যান ,
    আচ্ছা

    দারুন বিজনেস প্ল্যান ,
    আচ্ছা আমাদের ইস্টিশনের মালিক এই প্ল্যান আবার কাজে লাগাইবো না তো ? (গভীর চিন্তার ইমু হবে )

  5. পোস্টের সাথে সহমত পোষন করছি
    পোস্টের সাথে সহমত পোষন করছি ।হ্যা আস্তিক নাস্তিক যুদ্ধ সর্বপ্রথম সামু ব্লগ থেকেই শুরু হইছে এর জন্য এখন পর্যন্ত যে হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হয়েছে এর দায় কিছুটা হলেও অরিল ,জানার।অরিল ,জানার ব্লগে আবার ভাটা লাগছে ।পাঠক তো ব্লগে ভিড়তেই চায়না এখন মনে হয় ব্যবসায় ভাটা লাগছে।২০০৮-০৯তে দেখছি সামুতে মোবাইল থেকে ৬-৭ শত ভিজিটর ,পিসি থেকে ১০০০কিংবা তার বেশি ভিজিটর ঘোরপাক খাচ্ছে ।আর এখন একটু অবস্থাটা দেখে আসুন বড়ই করুণ অবস্থা জানাপাদের যা হাস্যকর ।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 2 = 5