বাঙালির বাণিজ্য ইতিহাস ও লর্ড কার্জনের অপরাজেয় বাংলারাষ্ট্র!

ভারতবর্ষ ইংরেজরা দখলে রেখেছিল প্রায় ১৯০ বছর। এর মধ্যে তারা ১০০ বছর পার করেছে কেবল পুরো দেশটা দখলে নিতে গিয়েই। আর শেষের প্রায় ৪০ বছর তাদের কেটেছে স্বাধীনতা সংগ্রাম দমন করতে৷ সেদিক থেকে দেখতে গেলে ব্রিটিশরা‌ আরামে দেশটা শাসন করেছে ১৮৫৭-র সিপাহি বিদ্রোহের পর থেকে ১৯০৫-এ লর্ড কার্জনের বিদায় বছর পর্যন্ত।

?oh=9b553371c0994ca977d727e15e8769f8&oe=567F9D40″ width=”300″ />
জর্জ ন্যাথানিয়েল কার্জন, মার্কুইস অফ কেডলেসটন

কার্জন এদেশে যখন গভর্নর জেনারেল হয়ে আসেন, তখন তাঁর বয়স চল্লিশ। ইটন স্কুল এবং অক্সফোর্ডের ছাত্র, পরম সুদর্শন, বিদগ্ধ পণ্ডিত মানুষটিকে বিলেতের তাবৎ নেতারাই ভয় পেতেন। কারণ ওদেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সমস্ত গুণই তার ছিল। আর সেই গুণই হলো দোষের কারণ। তাই তাঁকে ভারতে পাঠানো হল ভারত-সম্রাজ্ঞী ভিক্টোরিয়ার শাসন ও জীবনের শেষ পর্বে।

দৃশ্যত অনেকগুলো ভাল কাজ করেছিলেন এদেশের জন্য। যেমন খনি আইন, অফিসিয়াল সিক্রেটস আইন, এনসিয়েন্ট মনুমেন্ট প্রিজার্ভেশন আইন ইত্যাদি। এই শেষোক্ত আইনটির জন্য আজও তাজমহল, অজন্তা-ইলোরা, কোনারক, খাজুরাহো, হাজারদুয়ারি, আদিনা মসজিদ টিকে আছে। আবার ইউনিভার্সিটি আইন ও বাংলা ভাগের আইন করে বিতর্কিতও হয়েছিলেন। বাঙালিরা তাই তাকে একপ্রকার শত্রু হিসেবেই জানে।

কার্জনের এই বঙ্গভঙ্গই ব্রিটিশ আমলে বাঙালিসহ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীকে ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামিয়েছিল। শিল্প, বাণিজ্য থেকে শুরু করে বিজ্ঞানচর্চ্চা- সব কিছুতেই ভারতীয়রা মনোযোগ দিয়েছিল। সময়টা ১৯০৫ সাল। তখন শুধু বাংলা নয়, পুরো দেশ জ্বলছে। বঙ্গভঙ্গ তৈরী করেছে বিপুল সংগ্রাম, যার প্রকাশ ঘটেছিল স্বদেশিয়ানায়।

এর ফলে জমিদারিতে অভ্যস্ত বাঙালি নতুন করে উদ্যোগী হলো শিল্প স্হাপনে। তার আগে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ দিকে জয়মণি সেন ও তাঁর বংশধররা শুরু করেন ব্যাঙ্কের ব্যবসা। বড়বাজারের মল্লিকরা করতেন লবণের ব্যবসা। ১৭৭০ সালে শুকদেব মল্লিক ছিলেন তখনকার ভারতের অন্যতম প্রধান লবণ ব্যবসায়ী। জাহাজ ব্যবসা ছিল পঞ্চু দত্ত, রামগোপাল মল্লিক এবং মদন দত্তের হাতে।

দ্বারকানাথের প্রপিতামহ দর্পনারায়ণ ঠাকুর চন্দননগরে ফরাসিদের এজেন্ট হিসেবে লবণ ব্যবসায় বিপুল বিত্ত অর্জন করেন। কিন্তু পরবর্তী কালে বাঙালি ব্যবসায়ীদের রমরমা চক্ষুশূল হয়ে ওঠে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির। নানা আইন, বেআইনি হস্তক্ষেপ ও অন্যায়ভাবে জোর করে বাঙালিদের সব ব্যবসা লাটে তুলে দেয়। শেষমেশ উদ্যোগী বাঙালিরা তাঁদের অর্জিত ও সঞ্চিত ধন জমিদারিতে নিয়োগ করে বিলিতি জমিদারদের নকলে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেন।

কার্জনের বঙ্গভঙ্গ আইন যে স্বদেশির সূচনা করে, তাতে বিংশ শতাব্দীতে আবার বাঙালি শিল্পোদ্যোগে নিজেদের নিয়োগ করে। আর এই উদ্যোগপতিদের প্রধান উৎসাহদাতা ছিলেন কাশিমবাজারের মহারাজা, ভূকৈলাসের রাজা, ভাগ্যকুলের রায়রা এবং ময়মন সিং-এর আচার্য্য চৌধুরীরা এবং আংশিকভাবে জোড়াসাঁকোর ঠাকুররা। বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে বিলিতি কাপড় বর্জন তো করা হলো। কিন্তু দেশি লোক পরবে কী? তাই মৃত বঙ্গলক্ষ্মী কটন মিলের পুনরুজ্জীবন ঘটল ১৯০৬-এ। এর পেছনে ছিলেন কাশিমবাজারের মহারাজা মণীন্দ্রচন্দ্র নন্দী।

এর পরই এক রিটায়ার্ড বাঙালি ম্যাজিস্ট্রেট মোহিনীমোহন চক্রবর্তী ১৫ লাখ টাকার পুঁজি নিয়ে শুরু করলেন কুষ্টিয়ায় মোহিনী মিল। এই মোহিনী মিলের ডিরেক্টরদের মধ্যে ছিলেন রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং, যিনি বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে রাখি বন্ধনের সূচনা করেছিলেন। ওই ১৯০৬ সালেই উদয় দাস সৃজন করলেন শ্রীনাথ মিল। গেঞ্জি, জাঙ্গিয়া, বেনিয়ান, ফতুয়া, এক কথায় হোসিয়ারি শিল্পে জোয়ার এল ঠিক এই সময়ে, একই কারণে। ১৮৯৩-এ খিদিরপুরে ওরিয়েন্টাল হোসিয়ারি লিমিটেডের যাত্রা শুরু হলেও এর অবস্হা ভাল ছিল না। জোয়ার এল স্বদেশি পর্বে৷

একে একে জন্ম নিল পাবনার শিল্প সঞ্জীবনী কোম্পানি, নবাব আবদুস সোভানের বেঙ্গল হোসিয়ারি কোম্পানি। ১৯২৬-এর ট্যারিফ বোর্ডের রিপোর্টে স্পষ্ট উল্লেখ আছে বড়, মেজ, সেজ– নানা সাইজের দেড়শোটি কোম্পানি বাংলায় গড়ে উঠেছিল স্বদেশি জোয়ারে। চটকল ছিল স্কট সাহেবদের একচেটিয়া। সে মনোপলি ভেঙে দিলেন বাংলার শেঠ ঘনশ্যাম দাস বিড়লা ১৯১৯ সালে বিড়লা জুটমিল পত্তন করে৷ এর পর পর গড়ে উঠল হুকুমচাঁদ জুটমিল। এর পর এক এক করে গড়ে উঠল শ্রী অম্বিকা, প্রেমচাঁদ, শ্রীগণেশ, কেদারনাথ, ভারত, লক্ষ্মীনারায়ণ, নফরচাঁদ ও প্রবর্তক জুটমিল।

একইভাবে ওই পর্বে যুগান্তর ঘটে গেল ওষুধ ও রসায়ন শিল্পে। এ ব্যাপারে যিনি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন, তিনি আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়। বেঙ্গল কেমিক্যাল তাঁরই সন্তান। এ ব্যাপারে তাঁকে যাঁরা দারুণ সাহায্য করেছিলেন, তাঁরা হলেন বটকৃষ্ণ পালের দুই বংশধর কৃষ্ণনাথ পাল ও স্যার হরিশঙ্কর পাল৷

বেঙ্গল কেমিক্যালের সাফল্য দেখে অসংখ্য আরও ছোটবড় ওষুধের ও রসায়নের কোম্পানি গড়ে উঠল। যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ইন্ডিয়ান ফার্মাসিউটিক্যাল ওয়ার্কস, মিনার্ভা কেমিক্যাল ওয়ার্কস, ভিক্টোরিয়া কেমিক্যাল ওয়ার্কস। পরে এল ক্যালকাটা কেমিক্যাল কোম্পানি, বেঙ্গল ইমিউনিটি, ব্রহ্মচারী রিসার্চ ইনস্টিটিউট, ইউনিয়ন ড্রাগ, লিখটার অ্যান্টিসেপটিক ড্রেসিং কোম্পানি ইত্যাদি।

পটারি ও সেরামিক শিল্পেও নতুন উদ্যোগ দেখা গেল যখন মহারাজা মণীন্দ্রচন্দ্রের উৎসাহে গড়ে উঠল ক্যালকাটা পটারি ওয়ার্কস। গোটা ভারতে প্রথম এই দিশি উদ্যোগ। ১৯০৮। পরবর্তীকালে ক্যালকাটা পটারির বিবর্তন হল নতুন নামে বেঙ্গল পটারিজ লিমিটেডে।

একইভাবে এনামেল, কাচ, ট্যানারি ও চামড়া শিল্পে স্বদেশি পর্বে গড়ে ওঠল একের পর এক কোম্পানি। ম্যাচ বক্সতৈরির কারখানা বানাল বন্দেমাতরম দেশলাই। সিগারেট দেশেই তৈরি হতে লাগল। ক্যালকাটা সিগারেট কোম্পানি, ইস্ট ইন্ডিয়া সিগারেট কোম্পানির কারখানায়। জলপাইগুড়িতে ১১টি কোম্পানি গড়ে উঠল চায়ের। এই উদ্যোক্তাদের অন্যতম ছিলেন আচার্য জগদীশচন্দ্র বসুর বাবা ভগবানচন্দ্র বসু। এ ছাড়াও জয়চন্দ্র সান্যাল, গোপালচন্দ্র ঘোষ, তারিণীপ্রসাদ রায় প্রমুখ।

ইস্পাত শিল্পের প্রতিষ্ঠাতাও এ অঞ্চলে বাঙালিরাই। ১৮৬৭-তে কে এল মুখার্জি অ্যান্ড কোং সালকিয়ায় গড়ে তোলেন বেঙ্গল আয়রন অ্যান্ড স্টিল কোম্পানি। পরে বিংশ শতাব্দীর শুরুতে মহারাজা মণীন্দ্রচন্দ্র গড়ে তোলেন তারা ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস মানভূমের একরায়। জাহাজ ব্যবসাও নতুন উদ্যোগে গড়ে উঠতে শুরু করে। এরই মধ্যে রাজেন মুখোপাধ্যায় কুলটি ও বরাকরের দুটি কারখানাকে একই ছাতার তলে এনে গড়ে তোলেন ইন্ডিয়ান আয়রন অ্যান্ড স্টিল কোং।

কোথায় গেল সে সব কারখানা? সবই শেষ হয়ে গেল বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধেই। যে দুটি-একটি টিম টিম করে চলছিল তা-ও শেষ পর্যন্ত কর্মীদের মাইনে দিতে পারল বা পারছে কেন্দ্রীয় সরকার অধিগ্রহণ করায়। আর এর জন্য যে ঘটনাটি সবচেয়ে বেশি দায়ী, তা হচ্ছে বঙ্গভঙ্গ ঠেকিয়ে দিল্লিতে দেশের রাজধানীর স্থানান্তর।

রাজধানী স্থানান্তরের বিরুদ্ধে যিনি সবচেয়ে বেশি সোচ্চার ছিলেন, তিনি সেই বঙ্গভঙ্গের হোতা মার্কুইস অব কেডলেসটন, লর্ড কার্জন৷ বাঙালি নেতাদের চেয়ে শতগুণ বেশি প্রতিবাদ করেছিলেন কার্জন- এই রাজধানী সরানোর বিরুদ্ধে। বলেছিলেন, অচিরেই শিল্পে-বাণিজ্যে কলকাতা তার তাবৎ গুরুত্ব হারাবে। কার্জনের কেন বাঙালিদের প্রতি এত মায়া, এমনটাই ভাবছেন? সে রহস্য আরো বিরাট।

আগেই বলেছি, কার্জন ছিলেন সুপণ্ডিত। তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুরাও ছিল তাই। এদের মধ্যে বিশিষ্ট ভূতত্ত্ববিদও ছিলেন কয়েকজন। অনেকেই বলে থাকেন যে, কার্জনের এই বন্ধুরাই মূলত বঙ্গভঙ্গের হোতা এবং আসলে তারাই ছিলেন দিল্লি রাজধানী করার বিরুদ্ধে। জনশ্রুতি আছে, ব্রিটেনের তখনকার ওই বিশিষ্ট ভূতত্ত্ববিদরা চেয়েছিলেন বিশ্বের বুকে রণকৌশলগত দিক থেকে একটি অপরাজেয় দেশ গড়তে। যে দেশটির একপাশে থাকবে তিব্বতের মালভূমি, হিমালয় পর্বতমালা, অন্যদিকে মিয়ানমারের জলাশয় ও গিরিকূল, অন্যদিকে সমুদ্র।

দেশটির সামনে শুধু একটি দিক থাকবে উন্মুক্ত। এই দিকটা ছাড়া হঠাৎ আক্রমণ করার সুযোগ পাবে না কোনো শত্রু। এই একটা দিকেই প্রধানভাবে সেনাবাহিনী মোতায়েন করতে হবে। এছাড়া এতটুকু সীমানার এ দেশটিতে পাওয়া যাবে বিশ্বের প্রায় সব ধরনের খনিজ পদার্থ এবং সব ঋতুর আবহাওয়া। আয়তনে খুব বেশি বড় না হলেও এই দেশটি চীনামাটি থেকে শুরু করে প্রসাধন মাটি পর্যন্ত প্রয়োজনীয় প্রায় সব কিছুরই যোগান দিতে সক্ষম। এছাড়া কৃষি ও খাদ্যেও এ দেশ হবে স্বয়ংসম্পূর্ণ। পাওয়া যাবে সব ধরনের ফল ও মশলাপাতিও।

ওই ভূতত্ত্ববিদদের প্রস্তাবিত দেশটির লক্ষ্যেই ধীরে ধীরে এগুচ্ছিলেন কার্জন। কিন্তু বঙ্গভঙ্গের মানচিত্রে প্রভাব ফেলে ব্রিটিশ ভারতের তৎকালীন অপরাপর কর্তাব্যক্তিরা। সম্রাজ্ঞী ভিক্টোরিয়ার কিছু আমাত্য এতে বাধ সাধেন এবং বাংলাকে ভুলভাবে বিভক্ত করেন। যার প্রেক্ষিতে শুরু হয় আন্দোলন। প্রথম ৫ বছরের (১৮৯৯-১৯০৪) পর দ্বিতীয় মেয়াদও মঞ্জুর হয় কার্জনের। কিন্তু ব্রিটিশ ভারতের সেনাধ্যক্ষ লর্ড কিচেনার তার বিরুদ্ধে বাংলা নিয়ে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনার চেষ্টা করেন। কার্জনের বন্ধুরা তখন এতে আবার হস্তক্ষেপ করেন। তারা কিচেনারকে ঠান্ডা করতে কার্জনকে ইংল্যান্ডে ফিরে যাওয়ার পরামর্শ দেন। ফলত কার্জন তার সব পরিকল্পনা গুটিয়ে ১৯০৫ সালে চলে যান ইংল্যান্ডে। এর মধ্য দিয়ে কিচেনারও দমে যায়। এখানেই শেষ হয় এ অঞ্চলে বিশ্বসেরা দেশটির গোড়াপত্তনের কাজ। তাহলে বাঙালি সূধীজনেরা, কার্জন আসলে কে ছিলেন?

?oh=c9e91ba94df2d9c4d3c4a4bdfafa9f66&oe=5638FA7E” width=”400″ />
ব্রিটিশ ভূতত্ত্ববিদদের প্রস্তাবিত অপরাজেয় বাংলারাষ্ট্রের মানচিত্রীয় ধারণা

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৩ thoughts on “বাঙালির বাণিজ্য ইতিহাস ও লর্ড কার্জনের অপরাজেয় বাংলারাষ্ট্র!

  1. একটানে পড়া শেষ করলাম। ভালো
    একটানে পড়া শেষ করলাম। ভালো লেগেছে লেখাটা। তবে দৃষ্টভঙ্গি ও ইতিহাস বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে দ্বিমত আছে। কিন্তু লর্ড কার্জন ও তার ব্রিটিশ ভূতত্ত্ববিদ বন্ধুরা যে, এ অঞ্চলে বিশ্বের সেরা রাষ্ট্রটি গড়ার পরিকল্পনা করেছিলেন, এটা জানা ছিল না। বাস্তবতা যাই হোক, ধারণা হিসেবে এটা জাতীয়তাবাদীদের তৃপ্ত করার মতো।

  2. কার্জনের মানচিত্র যদি যদি
    কার্জনের মানচিত্র যদি যদি প্রতিষ্ঠা হত, বিশাল সমৃদ্ধশালী একটা অঞ্চল হত। বেশ তথ্যমূলক পোস্ট।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

19 + = 21